রইল বাকি এক

শ্রীজিৎ সরকার

বাচ্চা ছেলেটা গুটিশুটি মেরে কেমন অকাতরে ঘুমিয়ে রয়েছে!

চোখের পাতা, ঠোঁট, হাত-পা— সব স্থির হয়ে আছে৷ একদম স্থির, কিন্তু ঠিক মৃত মানুষের মতো নিস্পন্দ নয়; বরং ধ্যানীর মতো শান্ত৷ যেন কতদিন পর ও এমন একটা শান্তির ঘুম ঘুমানোর সুযোগ পেয়েছে, কতদিন পর ও এমন একটা আরামদায়ক বিছানা পেয়েছে, এমন একটা ঠান্ডা আর শান্ত ঘর পেয়েছে...

সে জানে, যতক্ষণ ওর শরীরে ড্রিমব্লিসের প্রভাব থাকবে,— ততক্ষণ ও সুখস্বপ্ন দেখতে থাকবে, আর এইভাবেই ঘুমাতে থাকবে৷

আর প্রভাব কেটে গেলে?

প্রভাব কেটে গেলে সে আবার খানিকটা ড্রিমব্লিস প্রয়োগ করে দেবে৷ ঘরে তো ওটা অপরিমিত পরিমাণে রয়েইছে৷

সে এখন চুপচাপ তাকিয়ে আছে বাচ্চাটার মুখের দিকে৷

আহা রে! যে কারোরই ওর মুখটা দেখলেই মায়া হবে৷ কী সরল, নিষ্পাপ, নির্মোহ!

কিন্তু তার কি খুব-একটা মায়া হচ্ছে?

না৷ ওই মুখ দেখে তার কোনও মায়া-টায়া হচ্ছে না৷ বরং তার মনে একটা অদ্ভুত বিতৃষ্ণা পাক দিয়ে-দিয়ে জেগে উঠছে৷ এই তো ‘সে’—যার জন্য সেদিন অত বড় দুর্ঘটনাটা ঘটেছিল৷ প্রত্যক্ষভাবে না-হলেও, পরোক্ষভাবে তো এ-ই দায়ী৷

কথাগুলো ভাবতে-ভাবতেই মাথা ঝাঁকাল সে৷

না-না... পরোক্ষভাবে নয়৷ আসলে এ-ই দায়ী৷ এ যাতে সুস্থভাবে, নিরাপদে পৃথিবীতে আসতে পারে— সেইজন্যেই তো ওর বাবা সেদিন অমন উন্মত্তের মতো গাড়ি চালাচ্ছিল৷ রাস্তায় যে আচমকা কেউ এসে পড়তে পারে, গাড়ি চালানোর সময় স্ত্রী আর সন্তানের সঙ্গে-সঙ্গে যে পথচারীদের কথাও খেয়াল রাখা দরকার— সব ভুলে গিয়েছিল সে!

এ-ও খুনী৷ হ্যাঁ-হ্যাঁ, এ নিশ্চয়ই খুনী৷

মাথার মধ্যেটা দপদপিয়ে উঠল তার৷ তার প্রচন্ড ইচ্ছা হচ্ছে, এখনই এই বাচ্চাটাকে শেষ করে দেয়৷ তার পক্ষে তো এই কাজটা করা কোনও ব্যাপারই না৷ তার সেই ধারালো ছুরি বা কাস্তের মধ্যে যে কোনও একটা নিয়ে এসে, শুধু গলার কাছে হাল্কা একটা পোঁচ...

আহ! ফিনকি দিয়ে ওঠা রক্তের ধারা যে দেখতে কত সুন্দর— যারা দেখেছে, কেবল তারাই জানে৷

তারপর এই নরম-সরম দেহটা কেমন করে ছটফট করতে থাকবে, ওই আদুরে মুখটা একটু দম নেওয়ার জন্য কেমন করে আকুলি-বিকুলি করতে থাকবে, ওই ছোট-ছোট আঙুলগুলো কেমন করে বাতাসকে আঁকড়ে ধরতে চাইবে— এসব দৃশ্যগুলো ভাবতেই তার মনটা অদ্ভুত আনন্দে ভরে উঠছে৷

কিন্তু সে নিজেকে সংবরণ করে নিল৷

ছেলেটাকে সে এখনই মারবে কেন? তারচেয়ে বরং সে কয়েকটা দিন অপেক্ষা করবে৷ সবাই আগে একজায়গায় হোক, তারপর তো... এতদিন যখন অপেক্ষা করতে পেরেছে, চোখ-কান বুজে সে আর কয়েকটা দিনও কাটিয়ে দিতে পারবে৷

এই ছেলেটাও ততদিন একটু ঘুমিয়ে নিক৷

অন্যান্য সবকিছুর মতো রসায়নটাও সে খুব ভালোই শিখেছিল৷ এখন সেগুলো সব কেমন কাজে লেগে যাচ্ছে! প্রথমে সোলট্রাভেল, তারপর এই ড্রিমব্লিস৷ গাছ-গাছড়ার শক্তি মন্ত্রের চেয়ে কিছু কম নাকি? বরং বেশি৷ প্রকৃতির গোপন শক্তি গাছেরা নিজেদের মধ্যে অনেক ভালোভাবে সঞ্চয় করে রেখে দিতে পারে৷

ঘরের কোণা থেকে সে সেই পাত্রটা নিয়ে আসল, যাতে কিছুদিন আগেই শুকনো লেবুর গুঁড়ো আর জল দিয়ে চামড়ার টুকরো ভিজিয়ে রেখেছিল৷ এই কদিনে নিশ্চয়ই সেটা আরও বিশুদ্ধ, আরও পোক্ত হয়ে উঠেছে৷

যতটা সম্ভব সে চামড়াটা থেকে জল ঝরিয়ে নিল৷ তার ওপর যত্ন করে হিব্রু ভাষায় লিখল:

AGLA

ADONAI ELOHI

তারপর সে জিনিসটাকে ঘরের একপাশে টাঙিয়ে রাখল৷

রান্নাবান্না নিয়ে কোনওদিন খুব একটা ঝামেলায় যায় না সে৷ আজও গেল না৷ যদি সারাদিন ধরে অতসবই করবে, তো সাধনা করবে কখন?

তাছাড়া দিনে তিনবার করে নেক্রোম্যান্সারদের শরীর থেকে একরকম বিষাক্ত আভা বের হয়৷ তখন ত্রিশফুটের মধ্যে থাকা যাবতীয় খাবার আর পানীয় বিষাক্ত হয়ে যায়৷ সেগুলোর রঙও বদলে যায়৷ ভুলক্রমেও যদি সেগুলোর একটা কণা বা একটা ফোঁটা পাকস্থলীতে ঢুকেছে— সঙ্গে-সঙ্গে শরীর জুড়ে খিঁচুনি শুরু হয়ে যায়; আর সেই খিঁচুনির শেষ হয় মৃত্যুতে গিয়ে৷

তারচেয়ে এই ভালো ব্যবস্থা— নির্ঝঞ্ঝাট আর নিরাপদ৷

সে একটা থালায় একখণ্ড বাসি পাঁউরুটি, আর খানিকটা অতিরিক্ত নোনতা মাখন নিয়ে বসে পড়ল৷ কাল রাতে সে বাড়ি ছিল না, তাই এই খাবারগুলো বিষক্রিয়ার প্রভাব থেকে বেঁচে গেছে৷ আজকের প্রভা বিচ্ছুরণ শুরু হওয়ার আগেই এগুলো খেয়ে ফেলতে হবে৷

না-সেঁকা পাঁউরুটিগুলো শক্ত হয়ে আছে, ঠান্ডা মাখনের দলাটাও জমে আছে৷ সে সেই অবস্থাতেই ওগুলো খেতে শুরু করল৷ ঠান্ডা মাখন

মুখের মধ্যে জড়িয়ে যাচ্ছে, শুকনো পাঁউরুটি মুখের সমস্ত লালা শুষে নিচ্ছে৷

খাবার চিবোতে-চিবোতে সে হেসে উঠল, ‘কাছের মানুষকে হারালে যে ঠিক কেমন লাগে— সেটা তোমরা এইবার বুঝবে৷ এতদিন আমি জ্বলে-পুড়ে খাঁক হয়েছি, আর তোমরা আনন্দে দিন কাটিয়েছ৷ এবার আমার আনন্দ করার পালা, আর তোমাদের পোড়ার৷ তোমরা প্রথমে উতলা হবে, হন্যে হয়ে এদিকে-ওদিকে দৌড়াবে, পাগলের মতো সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করবে; তারপর শেষপর্যন্ত সেই আমার কাছেই আসবে৷ শুধু তোমরা কেন? তোমাদের সেই অদৃশ্য শুভাকাঙ্ক্ষীও আসবে৷ সে তো এখন পরামর্শ দিতে জুটেছে৷ সে-ই আমার কাছে নিয়ে আসবে তোমাদের৷ ভাল-ভাল৷ তোমরা সব একজায়গায় হবে, আর তারপর আমি শুরু করব আমার...’

হাসির দমকে তার গলায় শুকনো খাবার আটকে গেল৷ পেটের ভিতর থেকে খুক-খুক করে কাশি উঠে এল৷

ছেলেটা যথারীতি নির্ভাবনায় ঘুমিয়ে চলেছে৷ আসলে এই কাশি তো তুচ্ছ জিনিস; পৃথিবী যদি ফেটে চৌচির হয়ে যায়— সেই শব্দেও ওর এই ঘুম ভাঙবে না৷

ঘুম-ঘুম - মহাঘুম! সেই ‘যোগনিদ্রা’ না কী যেন বলে!

‘ঘুমিয়ে নাও বাবু৷ একেবারের মতো ঘুমিয়ে পড়ার আগে, একটু আরাম করে ঘুমিয়ে নাও৷’

সে ঢকঢক করে অনেকটা জল খেল৷ তারপর অবশিষ্ট পাঁউরুটিটা জানালা গলিয়ে বাইরে ফেলে দিল৷ নেক্রোম্যান্সিতে বলে: যদি কোনও কাজের মাঝখানে অভাবিত বাধা এসে পড়ে, তবে সেটাকে তৎক্ষনাৎ থামিয়ে দেওয়া উচিত৷

এখন তার অনেক কাজ৷ আরও একজনকে এখানে নিয়ে আসা প্রয়োজন৷ আর তার সঙ্গে-সঙ্গেই একটা প্রস্তুতি...

সকল অধ্যায়
১.
ম্যাজিক শো থেকে শুরু...
২.
সকালের হেডলাইন
৩.
দুর্ঘটনার পরে
৪.
‘সে’ আছে আড়ালে
৫.
রাত এবং উপহার
৬.
আবার রহস্যময় অঘটন
৭.
নিঝুম দুপুরের আগন্তুক
৮.
একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব
৯.
শান্তির স্নান
১০.
কেমন আছে অনুরাধা?
১১.
নতুন দিনের প্রস্তুতি
১২.
স্বাগত আমার ঘরে
১৩.
আবার ম্যাজিক-শো
১৪.
বুবাই কোথায়
১৫.
আবার বাড়িতে ফেরা
১৬.
আয়না, ওয়াইন, পুতুল এবং...
১৭.
বিভীষিকাময় রাত
১৮.
কোকিল মানে বসন্ত; কোকিল মানে...
১৯.
আরেকটি ‘কেন’
২০.
সাফারি টাইম
২১.
ক্রিস্টাল-ক্লিয়ার ক্রিস্টাল বল শপ
২২.
ত্রুটি সংশোধন
২৩.
নখ কেন কালো
২৪.
স্বচ্ছ স্ফটিক; ঘোলা স্ফটিক
২৫.
ঢাকা থাক, থাক ঢাকা...
২৬.
বেড়ানোর ছবি
২৭.
বহুদিন পর; আবার!
২৮.
নিষ্ফলতার আক্রোশ
২৯.
একটুর জন্য...!
৩০.
অ-সাক্ষাৎ এবং সাক্ষাৎ
৩১.
‘সে’ ছিল, ‘সে’ আছে...
৩২.
একটা অন্যরকম রবিবার
৩৩.
প্রচেষ্টা এবং অভিজ্ঞতা
৩৪.
অন্তিম প্রস্তুতি
৩৫.
দৃশ্য এবং অদৃশ্য
৩৬.
কোন সে সুদূর অতীত হতে...
৩৭.
রইল বাকি এক
৩৮.
জানা এবং অজানা
৩৯.
সময় এসেছে কাছে
৪০.
ইট’স ফাইন
৪১.
ঘন হয়ে উঠেছে অন্ধকার
৪২.
শব্দটীকা
৪৩.
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জী

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%