‘সে’ ছিল, ‘সে’ আছে...

শ্রীজিৎ সরকার

অবশেষে অনেকে খুঁজে সে একটা মনের মতো ভেড়ার চামড়া জোগাড় করতে পেরেছে৷ সব শর্ত, সব লক্ষণ একেবারে মিলে গেছে৷

চামড়াটাকে সে খুব যত্ন করে ধুয়েছে, লোমগুলোকে চেঁচে-চেঁচে তুলে ফেলেছে৷

এখন সে মোমবাতির আলোয়, কাঠের টেবিলের ওপর চামড়াটাকে পাতিয়ে নিয়ে লবণ ঘষছে৷ এই কাজটা বেশ অনেকক্ষণ ধরে করতে হবে৷ চামড়াটাকে সমস্ত নিয়ম মেনে, বিশুদ্ধ করে কাজের উপযোগী করে তোলা কি সহজ কাজ নাকি?

তার হাত আর মন— দুটোই সমানতালে নিজেদের কাজ করে যাচ্ছে৷ হ্যাঁ, দরকার পড়লে তার পা-দুটোও সে এরই সঙ্গে অন্য কাজে ব্যবহার করতে পারে৷ ‘ইন্দ্রিয়-সংযম’ না-থাকলে আর জীবনে থাকল কী!

তিনটে মাত্র পাগল কুকুর দেখে বেচারি জাদুকর ভয় পেয়ে গেল৷ মনে হল যেন— কুকুর না, ও বোধহয় একদল বাঘ কি সিংহ দেখে ফেলেছে৷

হুঁহ৷ সামান্য কয়েকটা পশুকে পর্যন্ত ও বশ মানাতে পারল না! এদিকে মঞ্চে দাঁড়িয়ে তো বিশ্বসুদ্ধু মানুষকে বশ করে ফেলার মতো হাবভাব করে৷ মূর্খ! মহামূর্খ!

আর ওই অসাবধানী লোকটা? ভাবছে, আরেকটু হলেই হয়তো দুর্ঘটনা ঘটে যাচ্ছিল প্রায়... কিন্তু আসলে তো সেটা কিছুতেই ঘটত না৷ ঘটেওনি৷ অথচ ও এখনও কেমন ভয় পেয়ে চলেছে! ভয় পেতে-পেতে ভিতরে-ভিতরে একেবারে ঝাঁপির মধ্যে রাখা সাপের মতো গুটিয়ে যাচ্ছে৷ বেচারি!

কী নিপুণ চাল যে সে চেলেছে, কী নিশ্ছিদ্র পরিকল্পনা যে সে বানিয়েছে— ভাবতেই একটা অদ্ভুত আত্মপ্রসাদে তার মনটা ভরে উঠছে৷ অশ্ব-গজ-নৌকা সব এবার একসঙ্গে বাজিমাত হবে৷

ক্ষয়ক্ষতি তো এখনই তেমন হবে না, খুব একটা বড় কোনও বিপদও হবে না; শুধু ‘সুখী জীবন’-এর সাম্যাবস্থাটা টালমাটাল হয়ে যাবে৷ কোনও কাজ করে শান্তি পাওয়া যাবে না৷ শুধু মনে হবে— ‘যদি ওটা ঘটত, তবে কী হত...’ আর এই মনে হওয়াটাই বাকি সব আনন্দে জল ঢেলে যেতে থাকবে৷

সে হাসল৷ মনে-মনে বলল, ‘স্ফিয়ারের তোমার বড্ড শখ— তাই না জাদুকর? নাও, এবার মন খুশি করে শখ মিটিয়ে নাও৷ ওটাকে বিদায় করার এত তাড়া কীসের? কিছুদিন রাখো না নিজের কাছে, ওকে বশ করো, কাজে লাগাও৷ দেখাও: তুমি কত বড় মাপের জাদুঘর৷ আর তুমি— তুমি খুব ভালো গাড়ি চালাও না? নিজেকে খুব দক্ষ আর সাবধানী ড্রাইভার মনে করো না? তোমার বাড়ির লোকগুলোও তো তাই মনে করে৷ হুঁহ! দেখো এইবার সব অহংকার কোথায় যায়...’

চামড়ায় লবণ ঘষার পালা শেষ৷ সে এবার ঘরের এককোণ থেকে একটা বড়, বিশেষ চিহ্ন আঁকা পোড়ামাটির পাত্র নিয়ে এল৷ পাত্রের মধ্যে বড় পিপেটার থেকে অনেকটা বৃষ্টির জল ভরল; তাতে মেশাল রোদে শুকিয়ে গুঁড়ো করে রাখা লেবু৷ চামড়াটাকে গুটিয়ে নিয়ে, দড়ি দিয়ে বান্ডিলের মতো করে বাঁধল৷ তারপর সেই চামড়ার বান্ডিলটাকে সে পাত্রের মিশ্রণে ভিজিয়ে রাখল৷

এবার এই পাত্রটাকে টানা তিনদিন একটা ঠান্ডা আর অন্ধকার জায়গায় রেখে দিতে হবে৷ সেই তিনদিন এটাকে ছোঁয়া পর্যন্ত যাবে না৷ তারপর বাকি ব্যবস্থা৷

পাত্রটাকে সে ঘরের এক কোণায় রেখে দিয়ে আসল৷

তার প্রস্তুতি প্রায় শেষের দিকে৷ যত সময় কাছে এগিয়ে আসছে, তার উত্তেজনা ততই বেড়ে উঠছে৷ অবশ্য আত্মবিশ্বাস তার যথেষ্টই আছে; নইলে আর এতদিন ধরে কী-ই বা পরিশ্রম করল, আর কীসেরই বা চর্চা করল!

যে অদৃশ্য প্রতিপক্ষ সমানে তার কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তারা যে বিশেষ ক্ষমতাধর না— সে তো আগেই বোঝা গেছে৷ তবে এর মধ্যেও একটা আশ্চর্য ব্যাপার আছে৷ সে কিছুতেই তাদেরকে চিহ্নিত করতে পারছে না৷ অথচ কম পদ্ধতি তো প্রয়োগ করল না!

এর একটাই অর্থ: তারাও নেক্রোম্যান্সার৷ আর কিছু জানুক না-জানুক, অন্য নেক্রোম্যান্সারদের কাছ থেকে নিজেদের লুকিয়ে রাখার পদ্ধতি তারাও জানে৷

‘লুকোচুরি খেলছ? খেলো... খেলো... কদ্দিন আর! গর্ত যখন ভাঙা হবে তখন তোমাদেরও বেরিয়ে আসতে হবে৷ আর সেদিন প্রত্যেককে ইঁদুরের মতো মরতে হবে৷ জাল যখন ডাঙায় টেনে তুলব, তখন কি শুধু চুনোমাছ উঠবে নাকি? রুই, কাতলা, মহাশোল, বোয়াল— সবই উঠবে৷ আর শিকারী তার সব শিকারের সঙ্গেই সমান ব্যবহার করে৷ বেইমানদের কাউকে আমি ছাড়িনি৷ এমনকি নিজের...’

সে কথাটা শেষ করল না৷

কিছু কথা নিজের ভিতরে থাকাই ভাল৷ বুকের মধ্যে ধিকধিক করে জ্বলতে থাকা আগুনে সেগুলো বেশ ইন্ধনের কাজ করে৷

সে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকাল৷

আজ আকাশে চুমকির মতো তারা ফুটেছে৷ সাধারণত এটা দেখতে তার খুব-একটা ভালো লাগে না; তবে আজ খুব খারাপও লাগছে না৷ মনে হচ্ছে যেন শত-শত মহান আত্মা তাঁদের অনুজ্জ্বল চোখ দিয়ে ওকে দেখে চলেছেন, ওই ক্ষীণ আলোর মধ্যে দিয়ে তাঁদের আশীর্বাদ আর শক্তির অংশ তার মধ্যে সঞ্চারিত হচ্ছে৷

তাছাড়া আকাশে আজ গোল চাঁদ উঠেছে৷ তার চাঁদ দেখতে ভালো লাগে৷

ধীরগলায় আবৃত্তি শুরু করল সে:

‘উর্ধ্ব আকাশে তারাগুলি মেলি অঙ্গুলি,

ইঙ্গিত করি তোমা পানে আছে চাহিয়া৷

নিম্নে গভীর অধির মরণ-উচ্ছলি

শত তরঙ্গে তোমা পানে উঠে ধাইয়া৷

বহুদূর তীরে কারা ডাকে বাঁধি অঞ্জলি,

‘এসো এসো’ সুরে করুণ মিনতি মাখা৷

ওরে বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,

এখনি অন্ধ বন্ধ কোরো না পাখা৷’

এখন সে নিজের এবং নিজের কর্মপদ্ধতির ভবিষ্যৎ জানার জন্য আর উতলা হয়ে উঠছে না, আর সে আমনকে ডাকার প্রয়োজন অনুভব করছে না৷ কী দরকার আর অত ঝুঁকিপূর্ণ এবং শক্তিশালী রিচুয়্যালের? এই দীর্ঘ কয়েক বছরে সে কম শক্তি তো নিজের মধ্যে সঞ্চয় করেনি৷ জয় তার হবেই৷

এখন শুধু মাছ ডাঙায় তোলার আগে সে একটু সুতো খেলিয়ে নিচ্ছে৷ এতে যে কী অদ্ভুত আনন্দ— সেটা শুধু একজন দক্ষ মেছুরেই বোঝে!

তাছাড়া, শিকার ধরার আগে শিকারকে ছোটানোয় একটা মজা আছে৷ সে প্রাণপণ দৌড়াবে, দৌড়াতে-দৌড়াতে হাঁফিয়ে উঠবে, কিন্তু থামতে পারবে না৷ একটুখানি পিছনে ফিরে শিকারীর অবস্থান দেখবে আর আরও দ্রুত ছুটবে৷ শিকারীও ইচ্ছা করে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেরি করবে৷ দেখাই যাক না— তার দমের আয়ু কতক্ষণ...

সে জানালার ধার থেকে সরে এল৷

আজ ভরা পূর্ণিমা৷ এখন সে ছাদে উঠে, নগ্ন হয়ে শুয়ে থাকবে৷ প্রতি রোমকূপ দিয়ে সে চাঁদের আলো গ্রহণ করবে, প্রতিটা ইন্দ্রিয় দিয়ে সে বাতাসে উপস্থিত পবিত্র আত্মাদের উপস্থিতি অনুভব করবে৷ এই চাঁদের আলো আর পবিত্র আত্মাদের স্পর্শই তো তাকে আরও শক্তিশালী, আরও অনন্ত-যৌবনা করে তুলবে৷ যত মনোযোগ দিতে পারবে, প্রকৃতির সঙ্গে নিজেকে যত একাত্ম করতে পারবে— তত বেশি ফল পাবে৷ এর পাশে কোথায় লাগে ওই নিচুমানের নেক্রোম্যান্সারদের শব-সর্বস্ব সাধনা!

অবশ্য বাতাসে অনেক ক্ষতিকারক আত্মারাও থাকে৷ কিন্তু তাতে তার কী? যতক্ষণ তার শরীরে সম্রাট সলোমনের পবিত্র পঞ্চভূজ আছে, ততক্ষণ কোনও দুষ্টাত্মার সাধ্য নেই তার কিছু করে৷

সে ফুঁ দিয়ে মোমবাতিটা নিভিয়ে দিল৷ ঘরে এখন অন্ধকার আর চাঁদের মৃদু আলোর রহস্যময় সহাবস্থান৷ কেউ কারোর সঙ্গে পুরোপুরি মিশে যাচ্ছে না, তবু দু-জনেই আছে৷ নিজের-নিজের বৈশিষ্ট্য নিয়ে আছে৷ তারমধ্যে দাঁড়িয়েই সে নিজের পোশাকগুলো খুলতে শুরু করল৷

সকল অধ্যায়
১.
ম্যাজিক শো থেকে শুরু...
২.
সকালের হেডলাইন
৩.
দুর্ঘটনার পরে
৪.
‘সে’ আছে আড়ালে
৫.
রাত এবং উপহার
৬.
আবার রহস্যময় অঘটন
৭.
নিঝুম দুপুরের আগন্তুক
৮.
একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব
৯.
শান্তির স্নান
১০.
কেমন আছে অনুরাধা?
১১.
নতুন দিনের প্রস্তুতি
১২.
স্বাগত আমার ঘরে
১৩.
আবার ম্যাজিক-শো
১৪.
বুবাই কোথায়
১৫.
আবার বাড়িতে ফেরা
১৬.
আয়না, ওয়াইন, পুতুল এবং...
১৭.
বিভীষিকাময় রাত
১৮.
কোকিল মানে বসন্ত; কোকিল মানে...
১৯.
আরেকটি ‘কেন’
২০.
সাফারি টাইম
২১.
ক্রিস্টাল-ক্লিয়ার ক্রিস্টাল বল শপ
২২.
ত্রুটি সংশোধন
২৩.
নখ কেন কালো
২৪.
স্বচ্ছ স্ফটিক; ঘোলা স্ফটিক
২৫.
ঢাকা থাক, থাক ঢাকা...
২৬.
বেড়ানোর ছবি
২৭.
বহুদিন পর; আবার!
২৮.
নিষ্ফলতার আক্রোশ
২৯.
একটুর জন্য...!
৩০.
অ-সাক্ষাৎ এবং সাক্ষাৎ
৩১.
‘সে’ ছিল, ‘সে’ আছে...
৩২.
একটা অন্যরকম রবিবার
৩৩.
প্রচেষ্টা এবং অভিজ্ঞতা
৩৪.
অন্তিম প্রস্তুতি
৩৫.
দৃশ্য এবং অদৃশ্য
৩৬.
কোন সে সুদূর অতীত হতে...
৩৭.
রইল বাকি এক
৩৮.
জানা এবং অজানা
৩৯.
সময় এসেছে কাছে
৪০.
ইট’স ফাইন
৪১.
ঘন হয়ে উঠেছে অন্ধকার
৪২.
শব্দটীকা
৪৩.
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জী

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%