শ্রীজিৎ সরকার
কম্পিউটারের সঙ্গে ক্যামেরাটা জুড়ে নিয়েছে রণজয়৷
বেড়াতে গিয়ে তো কিছু না-হোক, অন্তত দেড়শো-দু’শো ছবি তো তোলা হয়েইছে৷ এখন সেগুলো দেখা হবে, যেগুলো প্রিন্ট করতে পাঠানো হবে— সেগুলো বাছাই করে আলাদা ফোল্ডার বানানো হবে৷
এছাড়া যেসব ছবি বাজে এসেছে, হাত কেঁপে ঝাপসা হয়ে গেছে, বা একাধিকবার তোলা হয়েছে— সেগুলোকেও মুছে ফেলা হবে৷
আজ ক্যামেরার ছবি ঝাড়াই-বাছাই করার পালা৷ পরের রবিবার হবে মোবাইলের ছবি৷ তাতেও তো যথেষ্ট ছবি আছে; অন্তত একশো তো হবেই৷
প্রথমে রেলস্টেশনে বসে তোলা ছবি, তারপর ট্রেনের মধ্যে বসে, দিল্লিতে নেমে, হোটেলে ঢুকে, করবেট যাওয়ার পথে... এবার অবশ্য সময়ের অভাবে দিল্লি তেমন ঘোরা হয়নি৷ শুধু ইন্ডিয়া গেট, বিড়লা মন্দির আর লোটাস টেম্পল যাওয়া হয়েছিল৷ তবে সেসব জায়গাতেও অনেকগুলো ছবি তোলা হয়েছে৷
ছবিগুলো দেখতে-দেখতে স্মিতা বলল, ‘ইস! দিল্লি গেলাম, অথচ তেমন কিছু দেখা হল না৷ রাজঘাট, শান্তিবন, শক্তিস্থল, জামা মসজিদ, কুতুব মিনার, অক্ষয়ধাম— সব বাকি থেকে গেল! তারপর ধরো গান্ধীস্মৃতি, লালবাহাদুর শাস্ত্রীর বাড়ি, ইন্দিরা গান্ধীর রেসিডেন্স...’
রণজয় স্মিতাকে আশ্বস্ত করল, ‘হবে-হবে৷ সব হবে৷ যেবার রাজস্থান যাব— সেবার দিল্লির জন্য দু-দিন, আর আগ্রার জন্য একদিন হাতে রাখব৷ সেবার সব ভালো করে ঘুরব৷ তবে এবার যদি লোটাস টেম্পলে অত দেরি না-হত, তবে আরও একটা-দুটো স্পট হয়তো দেখা হত৷’
স্মিতা সায় দিল, ‘তা ঠিক৷ যা লাইন— বাপ রে!’
ভিড়ভাট্টা, দীর্ঘসময় লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা— এসব স্মিতা একদম পছন্দ করে না৷ যে কারণে দুর্গাপুজোর নবমীর রাতে পর্যন্ত ও বেরোতে চায় না৷
রণজয় হাসল, ‘ওতেই কাত? অক্ষয়ধাম গেলে কী করবে স্মিতা? চেকিং আর লাইন তো এয়ারপোর্টকেও লজ্জা দেবে! বাট ট্রুলি, অ্যান ওয়ান্ডারফুল প্লেস৷’
দৃশা দু-কাপ চা আর একবাটি বাড়িতে বানানো নিমকি নামিয়ে রাখল৷
সকালে স্মিতাদের একপ্রস্ত চা-বিস্কুট খাওয়া হয়ে গেছে৷ এটা দ্বিতীয়বার৷ অবশ্য দ্বিতীয়বার চা-পর্ব কেবল রবিবারেই হয়৷ অন্যান্য দিন তো এতক্ষণ প্রাতরাশের পর্ব পর্যন্ত চুকে যায়৷
কাজ সেরে দৃশা চলে যাচ্ছিল৷ স্মিতাই কী মনে হতে ওকে ডাকল, ‘আমাদের বেড়ানোর ছবি দেখবে নাকি দৃশা? একটু বসে যাও না৷’
দৃশা একটু ইতস্ততঃ করল৷ একবার দরজার বাইরের দিকে তাকাল৷ তারপর ওড়নাটা মুখের কাছে আরও একটু টেনে-টুনে নিয়ে, ওদের পাশে বসে পড়ল৷
করবেট যাওয়ার পথে উত্তরপ্রদেশের একটা জায়গায় বসে ওরা ইডলি-দোসা-সাম্বর খেয়েছিল৷ সেখানকার ছবি৷ তারপর একে-একে ট্যুরিস্ট লজের ছবি, ডাইনিং হলের ছবি, খেয়ে-দেয়ে ফেরার সময় বাগানের দোলনাটার সামনে দাঁড়িয়ে তোলা ছবি...
স্মিতা বলল, ‘উহ! এখানে যা বিপদে পড়েছিলাম না৷’
দৃশা জিজ্ঞাসা করল, ‘কেন দিদি? বুবাইয়ের শরীর-টরীর খারাপ করেছিল নাকি?’
‘সে আর বলতে! সুস্থ ছেলের হঠাৎ...’, কথা বলতে-বলতে আচমকা স্মিতার চোখ সরু হয়ে গেল৷ ভুরু কুঁচকে বলল, ‘তুমি কী করে জানলে যে, বুবাইয়ের শরীর খারাপ হয়েছিল? বুবাই বলেছে?’
তাড়াতাড়ি দু-পাশে মাথা নাড়ল দৃশা, ‘না-না৷ আসলে বুবাইয়ের মাঝেমাঝে পেটব্যথা হয় তো— তাই বললাম৷ তারপর বেড়িয়ে এসে তুমি একদিন বুবাইকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে না? তাই আন্দাজ করলাম৷’
স্মিতা একটু যেন নিশ্চিন্ত হল, ‘ও৷’
একচুমুক চা খেয়ে স্মিতা বুবাইয়ের অসুখ-বৃত্তান্ত যতটা সম্ভব ছোটখাটো করে বলল৷ যথারীতি, দৃশার মুখের আর কোনও পরিবর্তন হল না৷ ও শুধু নির্বিকার হয়ে শুনে গেল৷ এসব যেন কিছুই না, ও যেন সবই জানে আগে থেকে৷
স্মিতার বলা শেষ হয়ে গেলে দৃশা বলল, ‘কখন যে কোথা থেকে কী আসবে— কেউ-ই বলতে পারে না দিদি৷ কখনও-কখনও বাঁচতে চাইলেই বাঁচা যায়; আবার কখনও যায় না৷’
কথাটা অদ্ভুত! খট করে যেন কানে লাগল স্মিতার৷
অবশ্য দৃশা মাঝেমাঝেই এরকম অদ্ভুত-অদ্ভুত, অসংলগ্ন আর খানিকটা
খাপছাড়া কথা বলে৷ তাই স্মিতা এটাকে নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাল না৷ আবার ছবিতে মন দিল৷
করবেটের ছবি আপাতত শেষ৷ এবার রাণীখেত আর নৈনিতাল৷
রণজয় আর স্মিতার কথার শেষ নেই৷ সব ট্যুরিস্ট স্পটের সঙ্গে জড়িয়ে তো বটেই; হোটেল, ধাবা, রাস্তার মোড়, কমলালেবুর গাছ, ছোট-ছোট ঝর্ণা— সবকিছুর সঙ্গেই ওদের স্মৃতি জড়িয়ে আছে৷
‘দেখো রণজয়, সেই বাড়িটা৷ তুমি একটু ছবি তুলেছিলে বলে ওরা কতগুলো কমলালেবু দিয়েছিল!’
‘সেই বাজারটা স্মিতা৷ কী বড়-বড় পাতিলেবুর মতো ফল বিক্রি হচ্ছিল— মনে আছে?’
‘মনে নেই আবার! ওখান থেকে তো আমরা ভূট্টাপোড়া খেলাম, পেঁয়াজের পরোটা খেলাম৷’
‘রাণীখেতের এই ঝাউবন... ট্রুলি মার্ভেলাস! এত অপূর্ব হবে আমি ভাবতেও পারিনি৷’
‘সেই ঝোরাটা...’
‘সেই কাঠের জিনিসের দোকানটা...’
দৃশা চুপচাপ দেখছে ছবিগুলো; কোনও প্রশ্ন করছে না৷ এদের কথা শুনছে নাকি শুনছে না, ছবিগুলো ভালো লাগছে নাকি লাগছে না,
এখানে বসে থাকাটা উপভোগ করছে নাকি করছে না— কিছুই বোঝা যাচ্ছে না৷ অবশ্য ওরাও নিজেদের মতো স্মৃতি রোমন্থন করতে ব্যস্ত; দৃশাকে বুঝতে চেষ্টা করার সময় কোথায়?
স্মিতা হঠাৎ বেড়ানোর কথা থামিয়ে বলল, ‘এমা! আমরা তো সব নিমকি খেয়ে নিলাম৷ তুমিও নাও দৃশা৷’
বাটিটা দৃশার দিকে বাড়িয়ে দিল স্মিতা৷ দৃশা যন্ত্রের মতো তিন-চার কুচি নিমকি তুলে নিল৷ তারপর সেগুলোর থেকে একটা মুখে ভরে খুব ধীরে-ধীরে খেতে লাগল৷
রণজয় কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আশ্চর্য ব্যপার! সেই ছবিটা গেল কোথায় বলো তো?’
স্মিতা বলল, ‘কোন ছবিটা রণজয়?’
‘আরে সেই যে— ধিকালায় ঢোকার মুখে ড্রাইভার যেটা তুলে দিল৷ আমাদের সবার সেই ছবিটা৷’
স্মিতা অবাক হল, ‘সেকি! ভালো করে দেখো তো৷’
রণজয় ভালো করে পুরো ফাইলটা খুঁজে দেখল৷ যাবতীয় সব ছবিই
সেখানে আছে; শুধু ওই একটা বাদে৷
স্মিতা বলল, ‘ছবিটা কোনওভাবে ডিলিট হয়ে যায়নি তো রণজয়? মানে অসাবধানে হাত-টাত লেগে...’
রণজয় জোরে-জোরে মাথা নাড়ল, ‘না-না৷ কী করে ডিলিট হবে? বেড়িয়ে এসে আজই প্রথম তো এসব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছি৷ এতদিন তো হাতই পড়েনি৷’
স্মিতা একটু চিন্তা করল৷ তারপর সন্দেহ প্রকাশ করল, ‘তোমার ঠিক মনে আছে রণজয়, ওটা ক্যামেরাতেই তোলা হয়েছিল? ফোনে তোলা হয়নি তো?’
রণজয় জোর দিয়ে বলল, ‘না-না৷ ওইদিন তো গ্লাভস পরে ছিলাম৷ সেই অবস্থায় ফোনের টাচ-সেন্সর কাজ করছিল না বলে তো ফোন বের করাই হয়নি৷ করবেটের সব ছবিই তো ক্যামেরাতেই তোলা হয়েছিল৷’
কথাটা ঠিক৷
তবু স্মিতা রণজয়ের আর ওর নিজের ফোনের গ্যালারি পনেরো মিনিট ধরে তন্ন-তন্ন করে খুঁজে দেখল৷
নাহ! ছবিটা কোত্থাও নেই৷
নেই? নাকি ছিলই না?
দৃশা উঠতে-উঠতে বলল, ‘ইস, ছবিটা হারিয়ে গেল? অবশ্য জানো তো দিদি, যা যাওয়ার তা যায়ই৷ কিছুতেই তাকে বেঁধে রাখা যায় না৷ হয়তো ছবি গেছে, তার বদলে আরও ভালো কিছু বেঁচে গেছে৷’
দৃশার এই কথাটা যেন খচ করে উঠল স্মিতার বুকের মধ্যে৷ এগুলো কি সত্যিই অসংলগ্ন? নাকি কোনও তাৎপর্য্য আছে, যা স্মিতা ধরতে পারছে না! দৃশা আজকাল খুব বেশিই এসব কথা বলছে না?
তবে খচখচানিটা বেশিক্ষণ টিঁকল না৷
দৃশা রান্নাঘরে চলে গেছে৷ ঘড়ির দিকে চোখ পড়তে স্মিতাও ব্যস্ত হয়ে উঠল, ‘এই রণজয়, তাড়াতাড়ি ওঠো৷ বুবাইয়ের ড্রইং ক্লাসে তো শেষ হওয়ার মতো হয়ে গেল৷ ওকে নিয়ে এসো৷’
‘এই যাই৷’, বলে রণজয় কম্পিউটার শাট-ডাউন করে দিল৷
স্মিতাও উঠে পড়ল৷ বুবাই বাড়ি এসে ব্রেকফাস্ট খাবে, এখন ওকে তার জোগাড় করে রাখতে হবে৷ তারপর আবার দুপুরের রান্নার জোগাড় আছে৷ রবিবারে সাধারণত একটু স্পেশাল মেনু হয়৷
এদিকে বেলা বাড়ছে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন