শ্রীজিৎ সরকার
স্ফটিক-গোলকের ওপর আলতো হাত বোলাল সে; আর সঙ্গে-সঙ্গে এতক্ষণ ধরে চলতে থাকা দৃশ্যপট নিকষ অন্ধকারে ঢেকে গেল৷
কী সুন্দর পরিকল্পনাটা ছিল তার!
জাদুকর বেশ পা পিছলে গর্তের মধ্যে পড়ে যাবে৷ সেখানে আধো অন্ধকার পরিবেশে শুধু দুর্গন্ধ, পচা-খসা মৃতদেহ আর বীভৎস দেখতে সব শকুনের পাল তাকে স্বাগত জানাবে৷ সেসব দেখে আতঙ্কে যখন জাদুকরের প্রায় মরো-মরো অবস্থা হবে, তখন সে আবার আলো-হাওয়ার পৃথিবীতে ফিরে আসবে৷
ধাক্কার ওপর ধাক্কা৷
কিন্তু সব ভেস্তে গেল... স-অ-ব!
এই নিয়ে তিন-তিনবার৷
প্রথমবার: আঙটিতে করা জাদু নিষ্ফল হয়ে গিয়েছিল৷ আসলে ওই মূর্খ মহিলা তো আঙটি খুলে ফেলেছিল৷ ফলে তার 'To curse a gift'—এর জন্য পড়া স্পেল বৃথা হয়ে গিয়েছিল৷
দ্বিতীয়বার: জু-জু ওয়াইনের গ্লাসটা কোনওভাবে হাত-বদল হয়ে গিয়েছিল৷ সে তক্ষুনি অবশ্য বিকল্প ব্যবস্থা একটা করেছিল, আর সেটা কাজও করেছিল৷ কিন্তু প্রথম পরিকল্পনাটাই তো বেশি শক্তিশালী ছিল! দৃশ্যটাও বেশি ভয়ংকর হত...
আর তৃতীয়বার: আতঙ্ক আর মৃত্যুর সীমানায় শত্রুকে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার এমন সুযোগটা হাতে এসেও ফস্কে গেল৷
বার-বার তিনবার!
তার মনের মধ্যেটা যেন তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে৷ প্রথমদুটো না হয় কাকতালীয় ছিল৷ কিন্তু এটা? এটা তো স্পষ্ট ‘anti-magic’! আর এটা করা মোটেও যার-তার কাজ না৷
কেউ না-কেউ তো আছে এর পিছনে৷ পিছনে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে যথাসাধ্য চেষ্টা করে চলেছে তার জাদুকে প্রভাবিত করার৷ আর সবচেয়ে বড় কথা, এই চেষ্টায় কখনও-কখনও সেই বিপক্ষ সফলও হয়ে যাচ্ছে৷
এখন তার ইচ্ছা করছে ওই স্ফিয়ারটাকে এক-আছাড়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলতে, লন্ডভন্ড করে দিতে সবকিছু৷ কিন্তু তাতে তো তার নিজের ক্ষতি ছাড়া আর কিছু হবে না৷
ক্রোধ... তার শিক্ষক বলতেন: এই ক্রোধের জন্যই সে জীবন থেকে অনেক মূল্যবান জিনিস হারিয়ে ফেলবে৷ কথাটা একেবারে মিথ্যে নয়৷ সে রাগের বশে হঠকারিতা করতে গিয়ে অনেক কিছু আগেও হারিয়েছে, এখনও হয়তো হারাচ্ছে৷
সে কিন্তু চেষ্টা করে নিজেকে যথাসম্ভব সংবরণ করার৷ কখনও পারে, কখনও পারে না৷
কিন্তু এখন? এত কিছু ঘটে যাওয়ার পর, এখনও কি শান্ত হয়ে থাকা যায়?
সে উত্তেজিত হয়ে ঘরময় পায়চারি করতে থাকল৷ শরীরে আগুন লেগে গেছে তার৷ নিজেকে চিতায় জ্বলতে থাকা জীবন্ত-শবের মতো মনে হচ্ছে তার— চেতনা আছে, জ্বালা-যন্ত্রণা অনুভব করতে পারছে, অনেক বিধ্বংসী কাজ করতে ইচ্ছা করছে; কিন্তু শুধু শরীরটা নিষ্ক্রিয় হওয়ার আর কিছু করে ওঠা হচ্ছে না৷
দাঁতে দাঁত ঘষছে, বামহাতের তালুতে ডানহাতের মুঠো দিয়ে ঘুঁষি মারছে, ঘন-ঘন মাথা নাড়ছে, থেকে-থেকেই সজোরে ঠোঁট কামড়ে ধরছে— কিন্তু কিছুতেই সে নিজের রাগ কমাতে পারছে না৷
সে হয়তো কিছুটা আন্দাজ করতে পারছে, এই বিপক্ষটি কে৷ কিন্তু আদৌ কি এ ‘সে’? তাই বা কী করে সম্ভব!
বুঝতে পারছে না, সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না... সব হিসাব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে৷ চূড়ান্ত অস্থির লাগছে তার৷ শরীরের মধ্যে যেন জ্বালা ধরে গেছে তার! রক্তবাহগুলো দিয়ে দুরন্ত-বেগে যেন রক্ত না, অম্লরাজ ছুটে চলেছে৷
এখন তো তার মনে হচ্ছে আগের দুটো ঘটনাও মোটেই কাকতালীয় ছিল না৷ সবই সেই বিপক্ষের নিপুণ ষড়যন্ত্র ছিল৷ মনে হবে যেন অঘটন, অথচ অঘটন নয়৷ ইস! সেও কিনা বোকা হয়ে গিয়েছিল?
তবে এই আড়ালে বসে কলকাঠি নেড়ে যাওয়া ব্যক্তিটি সম্ভবত খুব-একটা শক্তিশালী নয়৷ নয়তো প্রতিক্ষেত্রেই সেই বিপক্ষই জিতে যেত৷
এখন তো তার আরও একটা সন্দেহ হচ্ছে৷
বিপক্ষ একজন তো? নাকি একাধিক? এইসব সেই একাধিক-দের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল নয়তো?
হাঁটতে-হাঁটতে ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ল সে৷ মেঝেতে পা ঠুকে বলল, ‘তুমি কে— আমি এখনও জানি না৷ তবে জানতে তো পারবই৷ আর যেদিন সেটা জানব, সেদিনই তোমার শেষদিন৷ ঠিক কতটা কষ্ট তুমি পাবে— সেটা তুমি ধারণাও করতে পারছ না৷ আর কতদিনই বা ওদের বাঁচাবে তুমি? এমনিতেও তো ওদের অভিশপ্ত জীবন৷ কার্সড লাইফ! আর এবার তোমার জীবনও তাই হবে৷ আমার আর আমার লক্ষ্যের মাঝখানে আমি কোনওদিন কাউকে সহ্য করিনি৷ আর করবও না...’
সে খুব জোরে-জোরে কয়েকবার শ্বাস নিল৷ তাক থেকে একটা সুগন্ধী তেলের শিশি নিয়ে তার গন্ধ শুঁকল৷ এটা স্নায়ুকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে, অ্যাড্রেনালিনের ক্ষরণ বাড়িয়ে আচম্বিতে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়া আবেগের রাশ টানতে সাহায্য করে৷
আরেকটা কাচের কৌটো থেকে একটা মোমের মতো মসৃণ মিশ্রণ সামান্য পরিমাণে নিয়ে, বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিতে সে চেপে-চেপে কপালে ডলে নিল৷ এটা মস্তিষ্ককে শীতল রাখে৷
সে আবার স্ফটিক-গোলকের পাশে গিয়ে বসে পড়ল৷ আজ তাকে সবকিছু জানতেই হবে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন