শ্রীজিৎ সরকার
মুখোমুখি দুটো চেয়ারে বসে আছে প্রণব আর রুমি৷ একটা সিলিং-ল্যাম্প বাদে বাকি সব আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ ঘরের সমস্ত দরজা-জানালা বন্ধ৷
ওদিকে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে জিতেন পাহারা দিচ্ছে৷ কেউ দেখা করতে এলে, তাকে ভিতরে না-ঢুকতে দেওয়া এবং বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ফেরত পাঠানোর দায়িত্ব ওর৷
এখন প্রণব রুমিকে সম্মোহন করতে চলেছে৷ সেটা কিন্তু ওই মঞ্চের মতো সিউডো-হিপনোটিজম নয়; সত্যিকারের সম্মোহন৷ একসময় তো ও এসব কিছুদূর শিখেছিল৷ হয়তো এটা করার কোনও প্রয়োজনই ছিল না৷ কিন্তু প্রণবের মনে ক’দিন ধরেই একটা অদ্ভুত দোলাচল চলছে৷ আর সেই দোলাচল বারেবারে নাড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে ওর মানসিক স্থিতিকে৷ প্রণবকে এই প্রশ্নটার উত্তর জানতেই হবে: রুমি কেন আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল! ব্যাপারটা কি শুধুই ব্যক্তিগত টানাপোড়েন? কোনও একটা মানসিক বিকারের প্রভাব? যা-যা ঘটছে— সত্যিই কি সব কাকতালীয়?
প্রণবের মন বলছে— এসবের মধ্যে কিছু তো একটা গোলমাল আছেই... তবে রুমিকে ভালো মেয়ে বলতে হয়৷ প্রণব একবার বলতেই ও রাজি হয়ে গেছে৷ আসলে ও নিজেই হয়তো টের পাচ্ছে, সবকিছুর মধ্যে কী যেন একটা অস্বাভাবিকতা রয়েছে! বাসমতী চালের মধ্যে কাঁকড়ের মতো অস্বাভাবিক কিছু৷
প্রণব জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি রেডি রুমি?’
রুমি ঘাড় নাড়ল৷
প্রণব পকেট থেকে পলকাটা ক্রিস্টালের টুকরোটা বের করল৷ চেন ধরে সেটাকে ধীরলয়ে দোলাতে থাকল রুমির চোখের সামনে৷ খুব আস্তে-আস্তে, কেটে-কেটে বলতে লাগল, ‘এটার দিকে তাকাও রুমি... এটা দেখো... তোমার চারপাশে আর কিচ্ছু নেই রুমি... কেউ নেই... শুধু তুমি আছো... শুধু তুমি... তোমার সব মনোযোগ এখন এটার ওপর কেন্দ্রীভূত করো... আমার কথা তুমি শুনতে পাচ্ছ রুমি... রুমি...’
দোলার তালে তালে ক্রিস্টালটা ঝিকমিকিয়ে উঠছে৷ মৃদু আলোর মধ্যেই তার সবুজ আর গোলাপী ছটা চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে৷ জগৎ জুড়ে যেন শুধু ওই রশ্মিটাই আছে৷ আর কোনও আলো নেই, অন্ধকার নেই...
কিছুক্ষণের মধ্যেই রুমির চোখের পাতা নেমে এল, কপালে বিন্দু-বিন্দু ঘাম ফুটে উঠল, গলা দিয়ে খুব মৃদু একটা ঘড়ঘড় আওয়াজ হতে লাগল৷
প্রণব ক্রিস্টালটা আবার পকেটে ঢুকিয়ে রাখল৷ তারপর সোজা হয়ে বসে প্রশ্ন করল, ‘তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ রুমি?’
রুমি জড়িয়ে-জড়িয়ে উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ৷’
— তোমার নাম কী?
— রু-উ-রু-উ... উঁহু৷ মনে করতে পারছি না৷
— তুমি নারী না পুরুষ?
— মনে হয় নারী৷ ঠিক জানি না৷
— তুমি এখন কোথায় আছো?
— জানি না৷
— তুমি কী করো?
— মনে পড়ছে না৷
— তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে?
— না৷ কিন্তু ক্লান্ত লাগছে৷ আমার ঘুম পাচ্ছে... ভীষণ ঘু-উ-ম পাচ্ছে... আমি ঘুমাতে চাই৷
— তোমার মনে কি কোনও কষ্ট আছে রুমি?
— হ্যাঁ... না... জানি না... আমি কিচ্ছু জানি না— মনে পড়ছে না আমার কিচ্ছু...
— তবে তুমি আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলে কেন?
— আত্ম-হো-ওত্যা... আমি আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলাম! কবে? কখন? আত্ম-হো-ওত্যা... মনে পড়ছে না৷ আমার কিচ্ছু মনে পড়ছে না...
— একটু কষ্ট করে মনে করার চেষ্টা করো৷ প্লি-ই-জ... পরশুদিন তুমি ছাদ থেকে ঝাঁপ দিতে গিয়েছিলে৷ মনে করে দেখো৷
রুমি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকল৷ তারপর বলল, ‘পরশু... ছাদ থেকে... ঝাঁপ... আমি... ঝাঁপ... ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে৷ আমি তো ঝাঁপ দিতে চাইনি৷ আমি কিছুতেই ঝাঁপ দিতে চাইনি৷
— তবে কেন দিচ্ছিলে?
— কেন দিয়েছিলাম? কেন... কেন... আমাকে না, কেউ বলছিল ঝাঁপ দিতে বারবার বলছিল৷ খুব জোর করছিল৷ আমি কিছুতেই তার কথা অমান্য করতে পারিনি৷ তার বলার মধ্যে কিছু একটা ছিল...
প্রণবের শিরদাঁড়া শক্ত হয়ে উঠল, ‘তুমি তাকে কি দেখতে পেয়েছিলে?’
রুমি খুব জোরে-জোরে দু-পাশে মাথা নাড়ল, ‘না তো৷ আমি শুধু তার আওয়াজ শুনেছিলাম৷ আগে কোনওদিন আমি ওরকম অদ্ভুত আওয়াজ শুনিনি৷ কিন্তু আমি বোধহয় জানি সে কে!’
প্রণব জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটল, ‘কে সে?’
রুমি কোনও উত্তর দিল না৷ ভুরু কুঁচকে চুপচাপ বসে থাকল৷
প্রণবের ধৈর্য্য যেন ফুরিয়ে আসছে৷ মনে হচ্ছে, মাথার মধ্যে এক্ষুনি কিছু একটা ফেটে পড়বে৷ অথচ ও কি জানে না যে, এইসময় উত্তেজিত না-হওয়াই উচিত? জানে, খুব ভালো করে জানে৷ তবু হঠাৎ স্ফূরিত অ্যাড্রেনালিনের স্রোত ওর জ্ঞান-বুদ্ধিকে হারিয়ে দিচ্ছে৷
একটু ঝুঁকে প্রণব বলল, ‘কে সে? বলো— কে তোমাকে ঝাঁপ দেওয়ার জন্য জোর করেছিল?’
রুমি আবারও নিরুত্তর৷
প্রণব আরও বারকয়েক প্রশ্নগুলো করল৷ কিন্তু রুমির আশ্চর্য নির্বিকারতার সামনে সেগুলো বৃথাই গেল৷
হঠাৎ রুমির ভুরুদুটো অস্বাভাবিকরকম কুঁচকে গেল, চিবুকদুটো কথাকলি শিল্পীদের মতো থরথরিয়ে কেঁপে উঠল৷ একটা ঝোড়ো দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে ওর গলা দিয়ে একটা যান্ত্রিক শব্দ বেরিয়ে আসল, ‘সে ছিল... সে ছিল... ওয়ান অফ দা এইট্টিন ডেমনস অফ ডিউক সাইরাস— দ্য গ্রেট ফ্রাইমোস্ট!’
কী নাম বলল ও?
হঠাৎ যেন এক অদ্ভুত শীতলতায় প্রণবের শরীরের সমস্ত রক্ত জমাট বেঁধে গেছে৷ নিস্পন্দ হয়ে গেছে সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ৷ জোরে-জোরে স্পন্দিত হতে থাকা হৃৎিপন্ড মন্থর হয়ে আসছে৷
এতবছর পর এসব কোথা থেকে আসছে? কেন আসছে? কে খুলছে অতীতের এই পৃষ্ঠাগুলো?
তাহলে কি সেদিনের সেই দুর্ঘটনাও...
প্রণবের মনে হল, এই মুহূর্তে বোধহয় জগৎ, সংসার, জীবন, এই ঘর — সব অন্ধকার হয়ে গেছে৷ ও সেই অন্ধকারের মধ্যে একা বসে রয়েছে৷ আর ওর চোখের সামনে উজ্জ্বল হয়ে দুলছে একটাই শব্দ— ‘ডেমন’!
ডেমন নাকি কার্স? হঠাৎ সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে প্রণবের— স-অ-ব... ও জোরে-জোরে মাথা ঝাঁকাল৷
আচমকা রুমির ঘাড় বুকের ওপর ঝুঁকে পড়তে লাগল৷ প্রণব তাড়াতাড়ি ওর মাথাটা ধরে ফেলল৷
এত তাড়াতাড়ি তো সম্মোহনের ঘোর কেটে যাওয়ার কথা নয়৷ তবু গেছে৷ কারণ রুমি বোধহয় আসলে প্রণবের দ্বারা নয়, অন্য কারোর দ্বারা সম্মোহিত হয়েছিল!
তবে এখন এতকিছু ভাবার সময় নেই৷
প্রণব স্বরটা সামান্য উঁচু করে ডাকল, ‘জিতেন?’
জিতেনকে বলাই ছিল, ডাক শুনলেই ও যেন ঘরে ঢুকে পড়ে৷ ও সঙ্গে-সঙ্গে ঘরে ঢুকল৷
প্রণব রুমির মাথাটা দু-হাতে ধরে রেখে বলল, ‘ঘরের আলোগুলো জ্বালিয়ে দাও৷ আর একটা জলের বোতল এনে দাও৷’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন