শ্রীজিৎ সরকার
স্পিকারে গমগম করে উঠল একটা ভরাট, পুরুষালি কন্ঠস্বর,‘এবারের খেলা— ‘দ্বিখন্ডিতা নারী’৷’
প্রণব কথাটা ঘোষণা করতেই সারা হল জুড়ে হাততালি পড়ল৷
আজ শনিবার, অনেকেরই ছুটির দিন৷ শো-ও আজ অনেকদিন পর হাউজফুল হয়েছে৷ তবে কেউই বোধহয় আজ এই খেলাটা দেখার আশা করেনি৷ তাইজন্যই হাততালিটা এত জোর পড়ল৷
স্মিতা আজ বুবাইকে নিয়ে কেনাকাটা করতে বেরিয়েছিল৷ ফেরার পথে ওরাও ঢুকে পড়েছে ম্যাজিক দেখতে৷
এসেছে কালো বোরখায় আপাদমস্তক ঢাকা এক অবগুন্ঠনবতী— যে আগেরদিনের মতো আজও হলের এককোণায় বসে আছে৷
আজ মঞ্চের উপর প্রথম টেবিলে যাজ্ঞসেনী আর দ্বিতীয় টেবিলে রুমি৷
এক হিসাবে, প্রণব আজ একটা বাজি খেলতে চলেছে৷ ঝুঁকিপূর্ণ বাজি৷ দলের অনেকেই যে ওর এই সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট— সেটা ও বুঝতে পারছে৷ কিন্তু এই ক্রমশ জৌলুস হারাতে থাকা শো-কে টেনে দাঁড় করানোর জন্য এর চেয়ে ভালো উপায় আর ওর মাথায় আসছে না৷
প্রণব ঠিক করে রেখেছে— আজ যদি কোনও দুর্ঘটনা ঘটে, তবে ও নিজেকে বাঁচানোর কোনও চেষ্টা তো করবেই না; এবং সারাজীবনের মতো ম্যাজিক দেখানোই ছেড়ে দেবে৷
আগেরদিনের মতো আজ আবার অডিটোরিয়ামের সমস্ত আলো নিভে গেল৷ শুধু জ্বলে উঠল জোরালো স্পটলাইটটা৷ সব আওয়াজ থেমে গিয়ে ঘরজুড়ে আবার সেই হিরন্ময় নিস্তব্ধতা৷
প্রণবের হাতের করাত চলতে শুরু করল৷
প্রণব করাত ছুঁয়ে একবার ঈশ্বরের নাম স্মরণ করল৷ তারপর ওটাকে নামিয়ে আনল৷
সাঁই-সাঁই-সাঁই...
দেহটা দু-ভাগে ভাগ হয়ে গেল৷ তবে আজ রক্তও বেরোল না; আর কেউ চিৎকার করেও উঠল না৷ প্রণবও একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল৷
প্রণব দুটো টেবিল আলাদা করে দর্শকদের দেখিয়ে দিল৷ তারপর আবার দুটো টেবিল পরপর লাগিয়ে পুরো শরীরটা ঢেকে দিল; শুধু মুখটুকু বাদ দিয়ে৷ আঙুল নাড়িয়ে জাদুর অঙ্গ-ভঙ্গি করল৷
সব ক্যারিকেচার শেষ করে প্রণব এক-টানে আবরণটা সরিয়ে দিল৷
গোটা যাজ্ঞসেনী নেমে পড়ল টেবিল থেকে৷ হাত নাড়িয়ে আর মাথা ঝুঁকিয়ে দর্শকদের জানিয়ে দিল যে, সে ঠিক আছি৷
ফটাফট আলো জ্বলে উঠল৷ ঘোর কাটতেই দর্শকরা আগের বারের থেকেও বেশি হাততালি দিল৷
এই জাদু শেষ হওয়ার পরেও কিছুক্ষণ দর্শকদের স্তব্ধ হয়ে বসে থাকা, তারপর তাদের প্রচন্ড জোরে হাততালি দিয়ে ওঠা— এগুলোই তো একজন জাদুকরের আসল পাওনা৷ এর নেশাতেই তো প্রণবরা সব বিপদ-আপদের সম্ভাবনাকে তুচ্ছ করে বারবার মঞ্চে ছুটে আসে৷
আজ সেই ছুটে আসা, ঝুঁকি নেওয়া সার্থক৷
হাততালি থামলে বুবাই স্মিতাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘ওর কিছু হল না কেন মা? ওর রক্ত বেরোল না কেন?’
‘ওই যে ম্যাজিক করে দিল...’
বুবাই আরও অবাক হল, ‘তাই? তবে আমিও ম্যাজিক শিখব৷ তাহলে বেশ তোমার হাত কেটে গেলে জুড়ে দিতে পারব৷’
বুবাইয়ের অভ্যাসই এরকম৷ কোনওকিছু খুব ভালো লাগলেই ও সেটা নিজে করতে চায়৷ ছেলের কথা শুনে স্মিতা হেসে ফেলল, ‘এ তো মিথ্যে-মিথ্যে ম্যাজিক৷ তবে সত্যি-সত্যি কিন্তু এরকম জুড়ে দেওয়ার একটা ম্যাজিক হয়৷ সেটা কারা দেখাতে পারে বলো তো?’
বুবাই চোখ গোল-গোল করে বলল, ‘কারা?’
স্মিতা হাসতে-হাসতেই উত্তর দিল, ‘ডক্টররা৷’
বুবাই খুব উৎসাহিত হয়ে বলল, ‘তাহলে আমি ডাক্তার হব৷’
স্মিতা ছেলের গাল টিপে দিল, ‘নিশ্চয়ই হবে৷ ঠিকঠাক পড়াশোনা করলেই ডাক্তার হতে পারবে৷’
ওদিকে মঞ্চের ওপর পরিষ্কার করা হচ্ছে পরের ম্যাজিক দেখানোর জন্য৷
এইসময় খুব দ্রুত কাজ করতে হয়৷ কারণ বেশিক্ষণ চুপচাপ বসে থাকা দর্শকরা পছন্দ করে না৷ প্রণব তাই নিজেও হাত লাগাল৷ চাকা-লাগানো টেবিলদুটো ঠেলে দিল সহকারীদের দিকে৷ আর সেটাতেই লুকিয়ে ছিল একটা অভাবনীয় চমক!
প্রথম টেবিলটা যে হালকা হবে সে তো সবাই জানে৷ কিন্তু দ্বিতীয়টা— এত কম কেন এটার ওজন? এর ভিতর তো একটা জলজ্যান্ত মানুষ শুয়ে আছে! যতই চাকা লাগানো থাক, আর যতই মানুষটার ওজন কম হোক; একেবারে কিছুই টের পাওয়া যাবে না?
সহকারীদের সঙ্গে-সঙ্গেই প্রণব মঞ্চের পিছনে চলে এল৷ খুলে ফেলল টেবিলের ঢাকনা৷
ভিতরটা খাঁ-খাঁ করছে৷ রুমি নেই৷
দর্শকাসনে বসে অবগুন্ঠনবতী নিজের মনেই হেসে উঠল, ‘এটাও এক-ধরনের ম্যাজিক জাদুকর৷ তবে এটা তোমার মতো লোক-ঠকানো ভাঁড়ামো না; এটা সত্যিকারের ম্যাজিক৷ অনেক কষ্টে আয়ত্ত করতে হয়েছে একে৷ বড় জেদ না তোমার? দ্যা শো মাস্ট গো অন... ওই জেদকে আমি আমার পায়ের কাছে এনে ফেলবই৷ দেখি কত তোমার শিরদাঁড়ার জোর!’
বুবাই অধৈর্য্য হয়ে পড়েছে৷ ও জিজ্ঞাসা করল, ‘পরের খেলা কখন হবে মা?’
স্মিতা বলল, ‘এই তো, এক্ষুনি হবে৷’
কিন্তু পরের খেলা শুরু হতে দেরি হচ্ছে৷ ফাঁকা স্টেজে শুধু একটা বাজনা বেজে চলেছে৷
মিনিটখানেক চুপচাপ থেকে বুবাই আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘এত দেরি হচ্ছে কেন মা?’
স্মিতা একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘ম্যাজিশিয়ান হয়তো জল-টল খাচ্ছে৷ তুমি কি একটু পপকর্ন খাবে?’
পপকর্ন বুবাইয়ের পছন্দের জিনিস৷ ও সঙ্গে-সঙ্গে ঘাড় নাড়ল, ‘হ্যাঁ৷’
ওদিকে প্রণব হতভম্ব! যাজ্ঞসেনী তো গোটা দাঁড়িয়ে আছে সামনে৷ এটা তাহলে কী করে হল?
অবাক দলের বাকিরাও৷
সলিল তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে প্রণবের কাঁধে হাত রাখল, ‘প্লিজ স্যার, সব যখন ঠিক আছে তখন আর টেনশন করবেন না৷’
প্রণব জোরে-জোরে মাথা নাড়ল, ‘ঠিক নেই সলিল৷ কিচ্ছু ঠিক নেই৷ এতদিনের সব সিস্টেম গুলিয়ে গেছে! এগুলো কী করে হচ্ছে? আমাকে এর রহস্যটা জানতেই হবে... যে করেই হোক!’
সলিল শান্ত গলায় বলল, ‘হ্যাঁ স্যার৷ কিন্তু অডিয়েন্স অপেক্ষা করছে৷ এখন অন্তত মাথা ঠান্ডা করে খেলাটা দেখিয়ে নিন৷’
উত্তেজনার বশে প্রণব শো-এর কথা ভুলে গিয়েছিল৷ দর্শকদের কথায় ওর সাড় ফিরল৷ ও নিজেকে যতটা সম্ভব শান্ত করে বলল, ‘ঠিক বলেছ সলিল৷ অডিয়েন্সকে হতাশ করাটা ঠিক হবে না৷’
প্রণবের কপালে বিন্দু-বিন্দু ঘাম জমেছিল৷ সলিল একটা টিস্যু দিয়ে সেগুলো মুছিয়ে দিল৷ কয়েক ঢোঁক জল খেয়ে প্রণব আবার মঞ্চের ওপরে উঠল৷
খেলা শুরু হতে এত দেরি হওয়া আর জাদুকরের হঠাৎ মঞ্চত্যাগ— এই দুটো জিনিস একসঙ্গে ঘটতে দেখে দর্শকরা নিজেদের মধ্যে গুনগুন শুরু করে দিয়েছিল৷ প্রণবকে দেখে আবার সেটা থেমে গেল৷
প্রণব হাতজোড় করে বলল, ‘আমি এই অনিচ্ছাকৃত দেরির জন্য উপস্থিত সব দর্শকবন্ধুর কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থনা করছি৷ যা-যা খেলা
দেখানোর কথা ছিল— আমি সবই দেখাব৷ আপনারা নিশ্চিন্তে থাকুন৷’
স্মিতা বলল, ‘দেখেছ, আমি কী বলেছিলাম? মানুষকে টাইম দিতে হয় বুবাই৷ সবারই একটু রেস্ট দরকার হয়৷ দুটো সাবজেক্টের মধ্যে তুমি গ্যাপ নাও না?’
বুবাইয়ের মুখ-ভর্তি পপকর্ন৷ তাই ও মায়ের কথার উত্তর দিতে পারল না৷ শুধু একটু মাথা নেড়ে দিল৷
অবগুন্ঠনবতী নিজের মনেই বলল, ‘বাববা! বেশ সাহস তো তোমার জাদুকর! এক্ষুনি আবার খেলা দেখাতে নেমে পড়লে? ভাল-ভাল৷ সাহসী লোকেদের আমি আবার খুব পছন্দ করি৷ আর তাদেরকে ভেঙে পড়তে দেখতে আরও অনেক বেশি পছন্দ করি৷ আমিও দেখি, কতদিন তুমি ক্রিজে টিকে থাকতে পারো...’
আবার অন্ধকার অডিটোরিয়ামে শুধুই স্পটলাইটের উপস্থিতি৷
এবারের খেলা— ‘ভ্যানিশিং অবজেক্টস’৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন