শ্রীজিৎ সরকার
প্রণব একমনে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল৷
অবশ্য তাকিয়ে দেখার মতো বাইরে তেমনকিছু নেই৷ ওই নারকেলগাছ, আমগাছ, পুকুর, মেঠোরাস্তা, দুই-একটা পাখি— এইসব৷ তবু প্রণবের ধোঁয়া-ধুলো দেখে আসা চোখে সেসবই দেখতে ভালো লাগছে৷ তার ওপর, কোথা থেকে যেন একটা কোকিলের ডাক ভেসে আসছে৷ অনেকদিন পর প্রণব কোকিলের ডাক শুনছে তো, আশ্চর্যরকম ভালো লাগছে৷ তবে কোকিলটাকে দেখা যাচ্ছে না৷
এই ক-দিনেই প্রণবের মনটা অনেকটা ঠিক হয়ে গেছে৷ মনে হচ্ছে, জীবনে তো কত দুর্ঘটনা ঘটে থাকে! তাদের প্রভাব যেমন পড়ে, সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে আবার তেমন সব ঠিকও হয়ে যায়৷ এটাও সেরকমই কিছু; এসেছে, আবার চলেও যাবে৷
তবে যে মেয়েটা মারা গেছে— তার জন্য প্রণবের এখনও খারাপ লাগছে৷ বেচারি ভাগ্যের দোষে শুধু-শুধু প্রাণটা খুইয়ে বসল৷
আর প্রণব আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছে রুমির কথা ভেবে৷ তবে মেয়েরা তো একটু বেশিই অনুভূতিপ্রবণ হয়৷ হয়তো কোনও প্রেম-ভালোবাসাঘটিত ব্যাপারে মানসিক আঘাত পেয়েছিল৷ তার ফলেই ওরকম সিদ্ধান্ত নিয়েছিল৷
আবেগের বশে এরকম কাজ করাটাও যেমন স্বাভাবিক, আবেগটা কেটে যাওয়ার পরে সেসব স্বীকার করতে লজ্জা পাওয়াও তেমন স্বাভাবিক৷
তবে রুমি সেদিন যদি সত্যিই কোনও দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলত, প্রণবকে ভালোরকম বিপদে পড়তে হত— এই ব্যাপারে ওর কোনও সন্দেহ নেই৷
ঘরে বসে থাকতে আর ভালো লাগছে না৷
প্রণব নীচে নেমে এল৷ বাড়ির পিছন দিকে গিয়ে পাখিটার খোঁজে একটু চোখ চালাল৷
এখনও এদিকে তেমন একটা গরম পড়েনি৷ তাই পাখার আওতা থেকে বেরিয়ে এসেও খুব-একটা গরম লাগছে না৷ বরং কোত্থেকে যেন একটা ঝিরিঝিরি বাতাস এসে গায়ে লাগছে৷ এটাই আজকাল দুর্লভ জিনিস হয়ে পড়েছে৷
প্রণব পাখিটাকে দেখতে পেল না৷ আসলে ডাকতে থাকা কোকিলকে দেখতে পাওয়া প্রায় অসম্ভবই৷ কোথায় কোন পাতার আড়ালে যে লুকিয়ে বসে আছে!
তবে ডাকটা ক্রমাগত চলতেই আছে... চলতেই আছে...
বাড়ির পেছনে একটা বিশাল কালোজামগাছ৷ গাছটার বয়স বোধহয় প্রণবের থেকেও বেশি৷ ঋতুতে-ঋতুতে ফলে একেবারে ভরে ওঠে৷ মনে হচ্ছে যেন সেখান থেকে আওয়াজটা আরও জোরে আসছে৷
সেদিকেই এগোতে যাচ্ছিল প্রণব৷ হঠাৎ একটা ফিসফাস শুনে দাঁড়িয়ে পড়ল৷
হিয়া আর আরেকটা কালো হাফ-শার্ট পরা, ফর্সা যুবক কথা বলছে৷ ছেলেটার বয়স হয়তো বছর পঁচিশেক হবে৷ রোগা, লম্বা চেহারা৷ মাথাভর্তি কোঁকড়ানো চুল আর মুখভরা খোঁচা-খোঁচা দাড়িতে বেশ একটা ‘কবি-কবি’ ভাব ফুটে উঠেছে চেহারার মধ্যে৷
প্রণব তাড়াতাড়ি সরে এসে পাঁচিলের আড়ালে দাঁড়িয়ে পড়ল৷
হিয়ার মুখে উত্তেজনার ছাপ লেগে আছে৷ চাপা গলায় বলল, ‘তোমাকে এভাবে আসতে বারণ করেছি না? কে কখন, কোত্থেকে দেখে ফেলবে! তারউপর আমার দাদা বাড়ি এসেছে— জানো সেটা?’
ছেলেটা হাসল, ‘তো? এমন করে বলছ, মনে হচ্ছে তোমার দাদা যেন মস্তান! তোমার দাদা যথেষ্ট ভালোমানুষ৷ আর কেউ দেখলে দেখবে...’
কথা শেষ হল না, ছেলেটা চট করে হিয়ার একটা হাত টেনে নিল৷
দৃশ্যটা দেখে একটু অস্বস্তি লাগল প্রণবের; যত যাই হোক, ছোট বোন তো৷ তবু কী ভেবে ও দাঁড়িয়ে থাকল৷
হিয়া লজ্জাও পেয়েছে, সেইসঙ্গে খানিকটা অপ্রস্তুতও হয়েছে৷ মুখ-চোখ কেমন অদ্ভুত অভিব্যক্তিতে ভরে গেছে৷ মনে হচ্ছে, খুশি হবে নাকি রাগ করবে— সেটা বোধহয় বুঝতে পারছে না৷
তাড়াতাড়ি হিয়া এদিক-ওদিক একবার তাকিয়ে নিল৷
কাউকেই দেখা যাচ্ছে না৷ এই ভরদুপুরে কে আর বেরোবে, কেই বা আর জানালা খুলে বসে থাকবে? আর ওদের পক্ষে তো প্রণবকে
দেখতে পাওয়ার উপায়ও নেই৷
ছেলেটা বোধহয় তেমন জোরে হাত ধরে ছিল না৷ সেই সুযোগে হিয়া আচমকা একটানে হাতটা ছাড়িয়ে নিল৷ তারপর মুখ নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল৷
ছেলেটা বলল, ‘আমার তো বাবা-মা নেই৷ আছে একমাত্র দিদি৷ দিদি সব জানে৷ তুমি তোমার মা আর দাদাকে সব বলছ না কেন?’
হিয়া মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে বলল, ‘আমার ভীষণ লজ্জা লাগে৷’
ছেলেটা আবার হাসল, ‘আচ্ছা৷ তোমাকে কিছু বলতে হবে না৷ আমার দিদিই তোমাদের বাড়ি আসবে৷’
এবার দু-জনে ফিসফিস করে যেগুলো আলোচনা করল, সেগুলোর একটা বর্ণও প্রণব আর শুনতে পেল না৷ অবশ্য ওর যে শোনার খুব-একটা আগ্রহ আছে, তাও না৷
ছেলেটা আর খুব বেশিক্ষণ দাঁড়াল না৷ মিনিট পাঁচেক কথা বলল৷ তারপর একবার, ‘আসছি হিয়া’— বলে চলে গেল৷
আস্তে-আস্তে ছেলেটার চেহারা ছোট হয়ে গেল৷ তারপর একসময় ওর কালো হাফ-শার্ট বিন্দু হয়ে বাতাসে মিলিয়ে গেল৷ হিয়া তারপরও আরও কিছুক্ষণ একা-একা দাঁড়িয়ে থাকল৷
প্রণব খুব সহজভাবে বেরিয়ে আসল পাঁচিলের পিছন থেকে৷ একদম সাধারণ গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘কী রে, এই ভরদুপুরে এখানে কী করছিস?’
প্রণব এবং ওর গলার আওয়াজ— নিঃসন্দেহে দুটোই এখন হিয়ার কাছে অযাচিত৷
হিয়া একবার ঢোঁক গিলল৷ বোধহয় সপ্রতিভ সাজার জন্যই জোরে একটা শ্বাস নিল৷ তারপর আমতা-আমতা করে ও বলল, ‘ওই একটা কোকিল ডাকছে তো... তাই এসেছিলাম৷ মানে, যদি ওই কোকিলটার দেখা পাওয়া যায় আর কী! আজকাল তো আর কোকিল-টোকিল দেখা যায় না...’
প্রণব ঘাড় নাড়ল, ‘ও৷ আমিও তো ওইজন্য নেমে এলাম৷ কোকিলটাকে দেখতে পেলি নাকি?’
প্রণবের গলায় কোনও অস্বাভাবিকতা নেই, মুখেও বেশ হাসি-হাসি ব্যাপার লেগে আছে৷ যেন সত্যিই ও কোকিল খুঁজতে এসেছে৷ একটু আগে কী ঘটেছে না-ঘটেছে— কিছুই ওর চোখে পড়েনি৷
হিয়াও সহজ হয়ে গেল৷ দু-পাশে মাথা নেড়ে বলল, ‘না-না৷ কোকিলগুলো এত চালাক হয় না! এই জামগাছেই মনে হয় কোকিলটা থাকে, বুঝলি তো দাদা?’
রণজয় অবাক হল, ‘থাকে মানে? কোকিল কি আবার বাসা বাঁধে নাকি?’
হিয়া তাড়াতাড়ি বলল, ‘আরে না-না৷ আমি সেরকম থাকার কথা বলিনি৷ আমি বলতে চেয়েছি, এমনিই বসে থাকে৷ কারণ দুই-একদিন রাত্রিবেলাও ওর ডাক শুনতে পাই৷’
কোনও-কোনওদিন প্রণবের মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়৷ এখন হিয়ার কথা শুনে ওর মনে পড়ল, সেই জেগে থাকার সময় ও নিজেও কখনও-কখনও কোকিলের ডাক শুনতে পেয়েছে৷
তবে বিষয়টা প্রণবের কাছে নতুন৷ এতদিন ওর ধারণাই ছিল না যে, কোকিল মাঝরাতেও ডাকতে পারে৷
এই জায়গাটায় সারাদিন গাছের ছায়া পড়ে৷ জায়গাটা তাই এই দুপুরেও বেশ ঠান্ডা-ঠান্ডা হয়ে আছে৷ অনেক আগে, কোনও-কোনও পূর্ণিমার রাতে হিয়া আর রত্না এখানে মাদুর বিছিয়ে বসত৷
শীতকালে হিয়া আবার এখানে শাকের গাছ লাগায়৷ তখন এই জায়গাটাই আবার ভরাট হয়ে যায়৷
হিয়া আর প্রণব মিলে আরও কিছুক্ষণ কোকিলটাকে খোঁজার চেষ্টা করল৷ কিন্তু পেল না৷ অবশ্য তার ডাক সমানে চলছে৷
প্রণব বলল, ‘চল৷ বাইরে গরম নেই ঠিক, কিন্তু ধুলো আছে৷ ভিতরে যাই৷’
হিয়াও দাদার প্রস্তাবে সায় দিল, ‘চল৷’
ঠিক বাড়িতে ঢোকার মুখে, হঠাৎ প্রণব জিজ্ঞাসা করল, ‘ছেলেটা কে হিয়া?’
হিয়া বোধহয় এটার জন্য তৈরি ছিল না৷ ও ধরেই নিয়েছিল, প্রণব কিছুই দেখেনি৷ আচমকা এরকম সোজাসাপ্টা প্রশ্নে ও একদম চমকে উঠল৷
তবে হিয়া নিজেও সোজাসাপ্টা চরিত্রের মেয়ে৷ তাই কিছু লুকানোর চেষ্টা করল না৷ গলা নামিয়ে বলল, ‘ওর নাম মিথিল৷’
‘কী করে?’
‘একটা কোম্পানিতে ডাটা অপারেটরের কাজ করে, আর টুকটাক
লেখালিখি করে৷’
‘হুমম৷’
প্রণব আর কোনও কথা বলল না৷ চুপচাপ দোতলায় নিজের ঘরে চলে গেল৷ হিয়াও যেচে আর কিছু বলল না৷
এখন প্রণবের মনে একটু সাহস এসেছে৷ তাই ইচ্ছা আছে, দুই-তিনদিনের মধ্যেই কলকাতায় গিয়ে ব্যক্তিগত দরকারটা মিটিয়ে আসবে৷ পরে আবার একদিন মা আর বোনকে নিয়ে তো যাবেই৷
তবে এইদিন আর প্রণব গাড়ি নিয়ে যাবে না৷ ওখানে গাড়ি রাখার অনেক সমস্যা৷ ও সাধারণ মানুষের মতো ট্রেনে যাবে, ট্রেনেই ফিরে আসবে৷ সেটা অনেক নিরাপদ আর ঝঞ্ঝাটহীন হবে৷
এসব মিটে যাওয়ার পর মিথিলের ব্যাপারটা সমাধান করতে হবে৷
একটা বালিশ টেনে শুয়ে পড়ল প্রণব৷ চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করতে লাগল৷
কিন্তু ঘুম আসা কি এতই সহজ? বিশেষ করে, যে একইসঙ্গে দুশ্চিন্তা আর বহু পুরনো কোনও অনুশোচনার আগুনে জ্বলছে— তার পক্ষে কি সবসময় সহজেই ঘুমিয়ে পড়া আদৌ সম্ভব?
কে জানে!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন