নখ কেন কালো

শ্রীজিৎ সরকার

রণজয় আঙটিটা ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে দেখছিল৷ শক্ত প্ল্যাটিনামের মধ্যে বসানো আশ্চর্যরকমের মসৃণ, নিখুঁত হীরে রামধনু রঙ ঝলকাচ্ছে৷

দেখলেই তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখতে ইচ্ছা করছে৷

রণজয় বলল, ‘কী করে যে হল, বুঝতেই পারছি না! তুমিও তেমন— এতদিন পর এসে বললে...’

আংটি পরে অসুবিধা হয়েছিল, আজ বোধহয় তিন-সাড়েতিন মাস হতে চলল৷ মাঝেমাঝেই দিনের বেলা স্মিতা ভেবেছে, রণজয় বাড়ি আসলেই ওকে সব বলবে; তারপর রাত হতেই ভুলে গেছে৷

আজ স্মিতাদের একটা বিয়েবাড়িতে যাওয়ার আছে৷ সেই উপলক্ষ্যে গয়না পরতে গিয়ে ব্যাপারটা ওর খেয়াল হয়েছে৷

স্মিতা চুলে চিরুনি চালাতে-চালাতে বলল, ‘ভেবেছিলাম আগেই বলব৷ আমার তো জানো কী রকম ভুলোমন! তার ওপর আজ এটা-সেটা ঝামেলা, কাল বেড়াতে যাওয়া... কিছুতেই মনে থাকছিল না৷ ভয়ের চোটে আর কিন্তু পরিওনি৷’

রণজয় আবার আঙটিটা বাক্সের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখল৷ বলল, ‘এটাকে তবু একবার জুয়েলার্সে নিয়ে যাব৷ আর তোমাকেও একটা ডার্মাটোলজিস্ট দেখিয়ে নেব৷’

বুবাই নিজের জামার বোতাম নিজেই আটকে নিয়েছে৷ কিন্তু ওর চুলগুলো একটু কোঁকড়ানো৷ তার ওপর ও আবার ভীষণ দুরন্ত৷ চুলগুলো তাই হাজার আঁচড়ে দিলেও যখন-তখন এলোমেলো হয়ে যায়৷

স্মিতা ফাইনাল টাচ-আপ হিসাবে ছেলের মাথায় আরেকবার চিরুনি চালিয়ে দিল, জামার কলারটা একটু ঠিকঠাক করে দিল, আর একটা ছোট রুমাল ভাঁজ করে বুক-পকেটে ঢুকিয়ে দিল৷

মায়ের হাত থেকে ছাড়া পেতেই বুবাই আবার বারান্দায় ছুটল৷ অবশ্য কিছুক্ষণ পরেই আবার ফিরে এল দৌড়াতে-দৌড়াতে৷

বারান্দার দিকে আঙুল তুলে বুবাই বলল, ‘ও মা, একবার বাইরে চলো৷ আমাদের গাড়ির পাশে কতগুলো ডগি!’

স্মিতা অবাক হল, ‘ডগি?’

বুবাই ঘাড় নাড়ল, ‘হ্যাঁ৷ অনেকগুলো৷’

একটু ভাবল স্মিতা৷ তারপর বলল, ‘চলো তো৷’

বাইরে সব বেবাক ফাঁকা৷ গাড়ি যেমন ছিল তেমনই উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে৷ কুকুর কেন, আশেপাশে একটা পিঁপড়ের চিহ্ন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না৷

স্মিতা ছেলের দিকে তাকিয়ে চোখ পাকাল, ‘কোথায় ডগি? তুমি আবার বানিয়ে-বানিয়ে কথা বলছ বুবাই?’

বুবাই নিজেও যথেষ্ট অবাক হয়েছে৷ ও বলল, ‘কিন্তু এই এক্ষুণি তো

এখানে এত-এত ডগি ছিল! সত্যি বলছি মা...’

বুবাই মাঝে-মাঝেই নানারকম মিথ্যে কথা বলে৷ তবে সেসব সাধারণত বিভিন্নরকম শরীর খারাপের অজুহাত: পেটে ব্যথা, চোখে যন্ত্রণা, মাথা টিপটিপ— এইসব৷ এইরকম কাল্পনিক কথা ও বড় একটা বলে না৷

অবশ্য হতেই পারে, এখানে হয়তো সত্যিই কুকুর ছিল৷ বুবাইয়ের অনুপস্থিতির ফাঁকে চলে গেছে৷ জীব-জন্তুর মর্জি বলে কথা!

স্মিতা আর বারান্দায় দাঁড়াল না৷ ঘরে ফিরে এসে নিজের শরীরে পারফিউম ছড়াল, রণজয়ের রুমালেও খানিকটা দিয়ে দিল৷ তারপর আরেকবার চুলে চিরুনি বুলিয়ে নিয়ে, দরজার ল্যাচ টেনে বেরিয়ে পড়ল৷

এরপর দরজায় আর গেটে তালা দিতে, লক ঠিকঠাক লেগেছে কিনা পরীক্ষা করতে-করতে আরও পাঁচমিনিট৷

রণজয় গাড়ি চালাবে; তাই ও বসেছে সামনে৷ স্মিতা আর বুবাই বসল পিছনের সিটে৷

স্মিতা গাড়িতে উঠেই বলল, ‘শোনো বুবাই, তোমাকে একটা কথা বলে দিই৷ ওখানে গিয়েই যেন এত-এত পকোড়া আর কোল্ডড্রিঙ্ক খেও না— কেমন?’

বুবাই বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় নাড়ল৷

স্মিতা অবশ্য ছেলের ঘাড় নাড়া দেখেই শান্ত হল না৷ সন্দেহের সুরে ও বলল, ‘এখানে তো ঘাড় নাড়ছ৷ এরপর বিয়েবাড়ি গেলেই সব ভুলে যাবে৷ বেড়াতে গিয়ে কীরকম শরীর খারাপ হয়েছিল— মনে আছে তো? বেশি জাঙ্কফুড খেলে কিন্তু আবার ওইরকম হবে৷ আর তাহলে কিন্তু আর কোথাও তোমাকে নিয়ে যাব না৷ মাইন্ড ইট৷’

বুবাই বলল, ‘আচ্ছা মা, একটা কথা শুনবে?’

স্মিতা বলল, ‘কী?’

বুবাই স্মিতার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দৃশাদির নখগুলো যেন কেমন ব্ল্যাকি-ব্ল্যাকি!’

ছেলের কথা শুনে স্মিতা অবাক হল৷ ও দেখেছে, দৃশা খুবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন৷ জামা-কাপড়, হাত-পায়ের আঙুল— কোথাও এতটুকু নোংরা, একটা ছোট্ট ফুসকুড়ি পর্যন্ত নেই৷

ভুরু কোঁচকাল স্মিতা, ‘সে কী! তুমি ঠিক দেখেছ?’

বুবাই ঘাড় নাড়ল, ‘হ্যাঁ মা৷ সেদিন যখন দৃশাদি আন্টিকে চা দিতে আসল, তখন আমি দেখলাম৷ পুরো নখগুলো কেমন যেন ব্ল্যাক!’

রণজয় সামনের দিকে তাকিয়ে একমনে গাড়ি চালাচ্ছে৷ কিন্তু কথাগুলো ঠিকই ওর কানে গেছে৷ ও বলল, ‘তুমি কাল একবার চেক কোরো তো স্মিতা৷ দৃশা তো আবার খাবারে-টাবারে হাত দেয়... নখে কোনও সমস্যা থাকলে চিন্তার কথা!’

স্মিতা সায় দিল, ‘হ্যাঁ-হ্যাঁ৷ আমি কালই দেখব৷’

স্মিতার মাথায় আবার আরেকটা নতুন চিন্তা ঢুকে গেল৷ এমনিতেই সেই যে বেড়াতে গিয়ে বুবাইয়ের শরীর খারাপ হয়েছিল, সেখান থেকে চিন্তায় আছে ও৷ বাড়িতে ফিরেই অবশ্য বুবাইকে ডাক্তার দেখানো হয়েছিল৷ ব্লাডটেস্ট, ইউ এস জি ইত্যাদি করেও কোনও সমস্যা খুঁজে পাওয়া যায়নি৷ ডাক্তারের ধারণা, ওটা একটা সাডেন ফুড-পয়জনিংই ছিল৷ তবুও সেই থেকে বুবাইয়ের খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে ও সাবধানে থাকে৷

আপনমনেই স্মিতা বলল, ‘এ তো ভালো প্রবলেম হল৷ তবে তোমাকে যা বলেছি, মনে রেখো বুবাই৷ দুটোর বেশি পকোড়া কিন্তু খাবে না৷’

বুবাই মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘হ্যাঁ-হ্যাঁ৷ মনে থাকবে৷ এতবার বলতে হবে না৷’

রণজয় বলল, ‘তোর মা আবার একই কথা দশবার না-বললে শান্তি পায় না রে৷’

একটা গভীর চিন্তার মধ্যে ছিল স্মিতা৷ রণজয়ের কথা শুনে মেজাজটা যেন আরও টালমাটাল হয়ে গেল৷ ও রুক্ষ্ম গলায় বলল, ‘আমি তো একই কথা দশবার বলি৷ আর তোমরা? তোমরা তো দশবার বলার পরেই সেই ভুল করো৷ তার বেলায়? আর তখন সবচেয়ে বেশি সাফার কাকে করতে হয় রণজয়? টেল মি...’

রণজয় তাড়াতাড়ি শান্ত গলায় বলল, ‘কাম ডাউম স্মিতা৷ আমি তো মজা করলাম৷ তুমি কি সিরিয়াসলি নিলে নাকি?’

স্মিতা গম্ভীর গলায় বলল, ‘ইয়েস৷ বিকজ দিস টপিক ইজ সিরিয়াস৷ এটা নিয়ে মজা করা মানে ছেলেটাকে প্রশ্রয় দেওয়া৷ আর তুমি সেটাই...’

স্মিতার কথা শেষ হল না৷ কোথা থেকে একপাল কুকুর দৌড়াতে-দৌড়াতে রাস্তা পার হয়ে গেল৷

পিছনের সিটে বসে থাকা অবস্থাতেই ব্যাপারটা বুবাইয়ের চোখে পড়েছে৷ ও উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘ও মাই গড! এরা কি আমাদের ফলো করছে নাকি বাবা?’

রণজয় হাসল, ‘হতেও তো পারে বুবাই— এরা ‘তারা’ নয়, যাদের তুমি দেখেছিলে৷’

বুবাই আস্তে-আস্তে মাথা নাড়ল, ‘তা পারে৷’

স্মিতা কোনও কথা বলল না৷ জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে চুপচাপ বসে থাকল৷ ওর মেজাজ শান্ত হতে সময় লাগবে৷

সকল অধ্যায়
১.
ম্যাজিক শো থেকে শুরু...
২.
সকালের হেডলাইন
৩.
দুর্ঘটনার পরে
৪.
‘সে’ আছে আড়ালে
৫.
রাত এবং উপহার
৬.
আবার রহস্যময় অঘটন
৭.
নিঝুম দুপুরের আগন্তুক
৮.
একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব
৯.
শান্তির স্নান
১০.
কেমন আছে অনুরাধা?
১১.
নতুন দিনের প্রস্তুতি
১২.
স্বাগত আমার ঘরে
১৩.
আবার ম্যাজিক-শো
১৪.
বুবাই কোথায়
১৫.
আবার বাড়িতে ফেরা
১৬.
আয়না, ওয়াইন, পুতুল এবং...
১৭.
বিভীষিকাময় রাত
১৮.
কোকিল মানে বসন্ত; কোকিল মানে...
১৯.
আরেকটি ‘কেন’
২০.
সাফারি টাইম
২১.
ক্রিস্টাল-ক্লিয়ার ক্রিস্টাল বল শপ
২২.
ত্রুটি সংশোধন
২৩.
নখ কেন কালো
২৪.
স্বচ্ছ স্ফটিক; ঘোলা স্ফটিক
২৫.
ঢাকা থাক, থাক ঢাকা...
২৬.
বেড়ানোর ছবি
২৭.
বহুদিন পর; আবার!
২৮.
নিষ্ফলতার আক্রোশ
২৯.
একটুর জন্য...!
৩০.
অ-সাক্ষাৎ এবং সাক্ষাৎ
৩১.
‘সে’ ছিল, ‘সে’ আছে...
৩২.
একটা অন্যরকম রবিবার
৩৩.
প্রচেষ্টা এবং অভিজ্ঞতা
৩৪.
অন্তিম প্রস্তুতি
৩৫.
দৃশ্য এবং অদৃশ্য
৩৬.
কোন সে সুদূর অতীত হতে...
৩৭.
রইল বাকি এক
৩৮.
জানা এবং অজানা
৩৯.
সময় এসেছে কাছে
৪০.
ইট’স ফাইন
৪১.
ঘন হয়ে উঠেছে অন্ধকার
৪২.
শব্দটীকা
৪৩.
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জী

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%