শ্রীজিৎ সরকার
এটাই স্বাভাবিক যে, ঠিকঠাক পালিশ করা স্ফটিক-গোলকের শরীর মসৃণ হবে৷ এই গোলকটাও তেমন মসৃণ; সেইসঙ্গে এর পুরো উপরিতলটা জুড়ে অদ্ভুত ঠান্ডা-ঠান্ডা ভাব! হাত ছোঁয়ালেই যেন শরীরের মধ্যে কেমন শিরশির করে উঠছে৷
আগের স্ফটিকটা নিয়ে তো কম নাড়াচাড়া করেনি প্রণব৷ ও জানে, খুব গরম আবহাওয়ার মধ্যেও ঠান্ডা থাকাটা আসল স্ফটিকের একটা গুণ৷ কিন্তু তাতে এরকম শিরশিরে অনুভূতি হত না৷
স্ফটিকের নীচে খুব সূক্ষ্ম আঁচড়ে দোকানের সংক্ষিপ্ত পরিচয় খোদাই করা আছে: Mgf. By 2804-2004DM
আগেরদিনের মতো আজও গোলকটার অর্ধেকটা স্বচ্ছ, আর্ধেকটা ঘোলা৷
প্রণব দু-হাতে কতগুলো আংটি পরে নিল৷ কোনওটা সোনার, কোনওটা তামার; সবগুলোতেই রঙ-বেরঙের পাথর বসানো— বেগুনী, ফিরোজা, লাল, হলুদ...
বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে-পড়তে আংটিগুলোতে প্রণব চুমু খেল একবার করে৷ দশ আঙুল বিছিয়ে ও চেপে ধরল গোলকটাকে, চোখ বন্ধ করল; তারপর একবুক বাতাস ভরে নিয়ে বহুবছর আগে শেখা মন্ত্র পড়তে শুরু করল:
‘হে মহান আত্মাগণ, আমি আপনাদের সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাচ্ছি : আমার মানসিক শক্তির অংশবিশেষ এবং আত্মিক অনুভব এই স্ফটিক-গোলকের মধ্যে সঞ্চার করার জন্য; এবং একে জীবিত বা অর্ধজীবিত বস্তুরূপে উন্নীত করার জন্য৷ এই জল, মাটি, আকাশ, আগুন, বায়ু এবং আত্মার মধ্যে সঞ্চিত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুভব...’
খুব ধীর অথচ গম্ভীরস্বরে প্রণব কথাগুলো বলছে৷ নতুন শ্রোতা শুনলে শব্দগুলো বুঝতে পারবে না; অথচ শ্রোতার বুকের মধ্যে একটা দ্রিমি-দ্রিমি অনুরণন উঠবে৷
‘...মহান, আদি-অনন্ত, সর্বশক্তিমান সম্রাটের সঙ্গে যেমন তাঁর সকল সৃষ্টির চিরন্তন এবং আত্মিক যোগ— আমি সেই আদি-অনন্ত সম্রাটকে অনুরোধ করছি আমার সঙ্গেও এই জড়বস্তু, এই স্ফটিক-গোলকের তেমন আত্মিক যোগ গড়ে তোলার অনুমতি এবং শক্তি দেওয়ার জন্য৷ হে মহান বেরাল্যানেনসিস, বাল্ডচিয়েনসিস, পাউনেশিয়া এবং অ্যাপোলোজিয়েট সেডেস...’
গোলক এখন সম্পূর্ণ স্বচ্ছ৷ তবে তার শীতল শরীর ধীরে-ধীরে উষ্ণ হয়ে উঠছে, একটা স্বতঃপ্রভ আলো বেরিয়ে আসছে ভিতর থেকে৷ এখন চট করে দেখলে গোলকটাকে জীবন্ত বলেই মনে হবে৷
এই সবই একটা লক্ষণ— স্ফটিক-গোলক আর প্রণবের মধ্যে মানসিক সংযোগ দৃঢ় হওয়ার, স্ফটিকের মধ্যে প্রণবের চারিয়ে দেওয়া শক্তি
পুঞ্জীভূত হওয়ার...
প্রণব খুব আস্তে-আস্তে হাত সরিয়ে নিল৷
‘দেখাও... দৃশ্যাবলী দেখাও...’
গোলকের ভিতরের সেই মৃদু আলোটা কাঁপতে-কাঁপতে নিস্পন্দ হয়ে গেল৷
আবারও গা-শিরশিরে শীতলতা৷ আবারও অর্ধেক স্বচ্ছ, অর্ধেক অস্বচ্ছ রূপ৷
ভুরু কোঁচকাল প্রণব৷ এরকম তো হওয়ার কথা ছিল না৷ কিছু না-কিছু তো ফুটে ওঠার কথা ছিলই৷
পদ্ধতিগুলো প্রণব একবার পরপর মনে করে যাবার চেষ্টা করল৷
বিশুদ্ধিকরণ, স্পর্শ, মনোসংযোগ, বশীকরণ...
নাহ৷ ঠিকই তো আছে সব!
তবে? গোলকটায় কি কোনও গোলমাল আছে?
পেতলের তেপায়া স্ট্যান্ডের উপর থেকে গোলকটা হাতে তুলে নিল প্রণব৷ চোখের কাছে এনে সব খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখতে লাগল৷ অবশ্য উপাদানের অনুপাতে বা প্রক্রিয়াগত কোনও সমস্যা থাকলে ও হয়তো বুঝতে পারবে না৷ কিন্তু অন্য কোনও ত্রুটি-বিচ্যুতি, যেমন— কোনও চিড়, বুদ্বুদ, ফাটল ইত্যাদি থাকলে তো বুঝতে পারবে৷
কিন্তু সেসব কিছু তো প্রণবের চোখে পড়ছে না৷ তবে?
হঠাৎ আপনা-আপনিই স্ফটিক-গোলকে আবার আলোর আভাস ফুটে উঠল, মসৃণ শরীরের শীতলতা হুড়মুড় করে কমতে থাকল৷
কিন্তু প্রণব তো নতুন করে কোনও মন্ত্র পড়েনি!
প্রণব আশ্চর্য হয়ে দেখল, গোলকের মধ্যে ফুটে উঠছে একবিন্দু রক্ত৷ দেখতে-দেখতে সেই টলটলে রক্ত হয়ে উঠল আরেকটা ছোট্ট গোলক৷ এরপর কোত্থেকে দুটো কালো হাত এসে ছোট গোলকটাকে ছোঁ মেরে তুলে নিল৷ দু-হাতের পাতায় ঢাকা একটা মুখ যেন শোকে হাহাকার করে উঠল৷ এরপর সেই ছোট্ট গোলকটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল আর প্রণবের হাতে ধরা গোলকের ভিতরটা ভরে উঠল কালো ধোঁয়ায়৷
স্ফটিক-গোলক আচমকা এত গরম হয়ে উঠল যে, প্রণবের হাত ফসকে ওটা মেঝেতে আছড়ে পড়ল৷ সঙ্গে-সঙ্গে কী বিকট শব্দ!
আবার...
পরবর্তী দৃশ্যটা চিন্তা করেই প্রণবের বুকের ভিতরটা ছ্যাঁত করে উঠেছিল৷ কিন্তু যা অনুমান করা হয়, সবসময় কি তা ঘটে? ঘটলে তো ‘অত্যাশ্চর্য্য’ শব্দটার অস্তিত্বই থাকত না৷ পরের সেই অভাবনীয় দৃশ্য ওকে আরও আশ্চর্য করে দিল৷
সশব্দে পাথরের মেঝেতে আছড়ে পড়েও গোলক অটুট রয়েছে৷ বরং মেঝের পাথরে একটা সূক্ষ্ম চিড় দেখা যাচ্ছে৷
এতদিন জাদু দেখিয়ে প্রণব দর্শকের বুকের ধুকপুকানি বাড়িয়ে দিয়েছে৷ আজ ও নিজে সেটা অনুভব করতে পারছে৷ মনে হচ্ছে, ঠিক যেন গলার কাছে একটা কর্কের ছিপি আটকে আছে৷ আর খানিকটা বদ্ধ-বাতাস ওর বুকের মধ্যে শিরা-ধমনীর গলিঘুঁজিতে ধাক্কা দিয়ে-দিয়ে বেড়াচ্ছে৷
এই অবস্থায় কিছুক্ষণ নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল প্রণব৷ তারপর আস্তে-আস্তে ওর হাতে-পায়ে সাড় ফিরল৷ সাহস করে ও নিচু হল, আঙুল বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেখল গোলকটাকে৷
কী অদ্ভুত, গোলক ঠিক আগের মতোই শীতল!
কে একটা যেন দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে...
প্রণব বারবার বলেছিল, অন্তত ঘন্টাখানেক ওকে যেন কেউ বিরক্ত না করে৷ কে যে আবার এল!
প্রণব গলা তুলে জিজ্ঞাসা করল, ‘কে?’
পরিচিত গলা ভেসে এল, ‘আমি হিয়া, দাদা৷’
হাতের আংটিগুলো তাড়াতাড়ি খুলে রাখল প্রণব৷ হাতের তালু দিয়েই মুখটা একবার মুছে নিল৷ তারপর চোখ-মুখ যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করে নিয়ে ও দরজা খুলল৷
একটু বিরক্তির সুরে প্রণব বলল, ‘কী হল? বলেছিলাম না, আমাকে কিছুক্ষণ বিরক্ত করবি না!’
হিয়া একটু অপ্রস্তুত হল৷ দাদার কাঁধের ওপর দিয়ে ঘরের ভিতরটা
দেখার চেষ্টা চালাতে-চালাতে বলল, ‘আমি নীচের থেকে কী জোর একটা আওয়াজ শুনলাম! মনে হল, তোর ঘরে বোধহয় কিছু ভেঙে-টেঙে পড়েছে৷ তাই তাড়াতাড়ি খোঁজ করতে এলাম৷’
হিয়ার পড়ার ঘরটা প্রণবের ঘরের ঠিক নীচেই৷ ওর আওয়াজ শোনাটা এমনকিছু অস্বাভাবিক না৷
তার মানে আওয়াজটা সত্যিই বেশ জোর হয়েছে৷
প্রণব একটা মিথ্যে কথা বলল, ‘ও কিছু না৷ হাত থেকে একটা বই পড়ে গিয়েছিল৷’
হিয়ার মনে হয় কথাটা ঠিক বিশ্বাস হল না৷ অবাক হয়ে ও বলল, ‘বই পড়লে এত শব্দ হয়? মনে হল তো যেন ইঁট কি পাথর পড়ল!’
প্রণব তাচ্ছিল্য ভঙ্গিতে বলল, ‘বই আর তুই দেখেছিস কী! এ প্রায় দেড়-হাজার পৃষ্ঠার লেদার-বাউন্ড বই৷ বাইশ ইঞ্চি বাই আঠারো ইঞ্চি সাইজ৷ বিদেশী বই তো— মলাট আর পৃষ্ঠার কোয়ালিটিও সেইরকম! বল, এই বই ইঁটের চেয়ে কম হল?’
হিয়া ঘাড় নাড়ল, ‘তা ঠিক৷’
প্রণবের কথা বাড়ানোর ইচ্ছা নেই৷ ও বোনকে তাড়া দিল, ‘তুই এখন যা তো৷ আমাকে আমার কাজ করতে দে৷’
হিয়া আর কিছু বলল না৷ চুপচাপ চলে গেল৷ তবে ও যদি সত্যিই বইটা দেখতে চাইত, তাহলেও কোনও সমস্যা হত না৷ প্রণবের কাছে সত্যিই ওরকম একটা সুবিশাল বই আছে— 'The Brief History of World Magic And Great Magicians'; সেটাই দেখিয়ে দিত৷
প্রণব দরজা বন্ধ করে দিল৷
এখনও গোলকটা সেই একই জায়গায় পড়ে আছে৷
ওটা যে শক্ত মেঝেতে পড়েও ভাঙল না— এটা তো একটা আশ্চর্য ব্যাপার বটেই৷ তার চেয়েও আশ্চর্য— ওটা হাত থেকে ঠিক যেখানে পড়েছিল, এখনও সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে৷ মসৃণ মেঝে আর মসৃণ শরীরের মাঝখানে কীসের এত ঘর্ষণ, যা ওর গতিশক্তির মান শুরুতেই শূন্য করে দিয়েছে?
প্রণব গোলকটাকে ধরে আবার স্ট্যান্ডে বসিয়ে দিল৷
এখন ওটা ঠান্ডা৷ তবে ওর রঙ পুরোপুরি অস্বচ্ছ৷ প্রণবের মনও কি তাই?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন