ত্রুটি সংশোধন

শ্রীজিৎ সরকার

সমাধিস্থলটা একেবারে জমাট অন্ধকার৷ আসলে এখানে তো খুব-একটা কেউ আসে না৷ যারা একেবারে গরীব, অনাথ, ভবঘুরে— সাধারণত তাদেরই অন্তিম সৎকার এখানে করা হয়৷

এখানে কেবল জঙ্গল আর জঙ্গল৷ পাথরের বেদি-টেদি কিচ্ছু নেই৷ কফিনগুলোকে শুধু কোনওরকমে পুঁতে, মাটি ফেলে বুজিয়ে, তার ওপর দায়সারাভাবে কাঠের ক্রুশ গেঁথে দেওয়া হয়েছে৷ রোদ-বৃষ্টির অত্যাচারে অবশ্য অধিকাংশ ক্রুশই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে৷ তাছাড়া অনেক কাঠকুড়ুনিরাও ক্রুশগুলো উপড়ে নিয়ে গেছে৷

সে শরীরের ওপরে চাপিয়ে রাখা কালো আলখাল্লাটা খুলে ফেলল৷ তারপর সঙ্গে নিয়ে আসা থলেটার থেকে একটা কোদাল বের করে মাটি কোপাতে আরম্ভ করল৷

ক-দিন ধরেই তার অল্প কাশি হচ্ছে, সন্ধ্যাবেলা করে জ্বরও আসছে৷ এগুলো সবই কোনও বড় অসুস্থতার পূর্বলক্ষণ৷ কী যে ঠিক হতে চলেছে— সেটা বুঝে নেওয়ার জন্যই সে এখানে এসেছে৷

এখন বর্ষার সময় না৷ ফলে মাটি শক্ত হয়ে আছে৷ একা হাতে, অসুস্থ শরীরে সেই মাটি কোপাতে তার যথেষ্ট কষ্ট হচ্ছে৷ ঘাম বেরোচ্ছে অনর্গল, পেশী ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, অস্থিসন্ধিগুলো টাটিয়ে উঠছে৷ হাজার হোক, মানুষেরই তো শরীর৷

তবু সে থামছে না৷ তার মনের জোর চিরকালই অদম্য৷ লক্ষ্য পূরণ করার আগে হাল ছেড়ে দিতে সে জানে না৷

যখন খুব কষ্ট হচ্ছে— সে একটু দাঁড়িয়ে নিচ্ছে, জোরে বুক-ভরা প্রশ্বাস নিচ্ছে; তারপর আবার নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করছে৷

অবশেষে কাঠের কফিনটা বের হল৷

সে এবার একটা শাবল বের করল৷ তারপর চাঁড় দিয়ে খুলে ফেলল কফিনের ঢাকনা৷ এটার জন্য অবশ্য তাকে এমনকিছু কষ্ট করতে হল না৷ কারণ, কাঠটা জলবায়ু আর জীবাণুর অত্যাচারে পচে এমনিই নরম হয়ে গেছে৷

কফিনের মধ্যে শোয়ানো তিন-চারদিনের পুরনো একটা শরীর৷ পচে ফুলে উঠেছে, রস গড়িয়ে মাখামাখি হয়ে গেছে সারা কফিনময়৷ খুব ছোট-ছোট সাদা পোকা ঘুরে বেড়াচ্ছে৷

ঢাকনা খোলার সঙ্গে-সঙ্গে আশপাশের বাতাস দুর্গন্ধে ভরে উঠল৷

এবার একটা ছোট্ট কাজ বাকি৷ তাকে শুধু একবার দেখে নিতে হবে— তার কাজে বাধা দিতে পারে, এমন কোনও আত্মা আশপাশের পরিবেশে উপস্থিত আছে কিনা৷

সে থলি থেকে বিশুদ্ধ পশুর চামড়া দিয়ে তৈরি একটা মোড়ক বের করল৷

এই মোড়কের মধ্যে কিছু জিনিস ভরা আছে— মোরগের টাটকা মস্তিষ্ক, সমাধির ধুলো, বিশুদ্ধ আখরোটের তেল, আর খাঁটি মৌমোম৷ মোড়কের উপরে হিব্রু ভাষায় লেখা দুটো শব্দ: GOMERT KAILOETH!

সে দেশলাই ঠুকে মোড়কটাকে পুড়িয়ে ফেলল৷ অপেক্ষা করল পুরো ধোঁয়াটা বাতাসে মিশে যাওয়া পর্যন্ত৷

না, কিছুই দেখা যাচ্ছে না৷ তার মানে আশপাশে কোনও অস্বাভাবিকতা নেই৷

সে এবার নেমে পড়ল কফিনের মধ্যে৷ পচা-গলা, পোকায় ভরা শরীরটার ওপরেই সোজা হয়ে শুয়ে পড়ল৷

এখন তার চোখের সামনেই তারা-ভরা আকাশ৷ বিশাল জীবনের মধ্যে যেমন ছোট্ট-ছোট্ট ঘটনাগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে, বিশাল আকাশের বুকেও তেমন তারাগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে৷

সাধারণ মানুষেরা কত মূর্খ! ওই তারা দেখে ছড়া আর গান বাঁধে, ছবি আঁকে৷ যতসব নির্বোধ... ওরা যে আসলে কী অতুল শক্তির প্রভা ছড়িয়ে চলেছে, তাদের সদা পরিবর্তনশীল অবস্থানের ওপর যে কত কী নির্ভর করে আছে— সেসবের খবরটুকু পর্যন্ত ওরা রাখে না৷

এরা নাকি আবার বুদ্ধিমান!

অবশ্য চাঁদের একটা সৌন্দর্য আছে৷ সে ছোট থেকে চাঁদ দেখতে ভালোবাসে৷ সারাদিন জাদুচর্চার শেষেও সে চাঁদ দেখত৷ কখনও একা-একা, কখনও শিক্ষকের সঙ্গে, কখনও সেই মানুষটার সঙ্গে... একসময় তো ওই বেইমানটার সঙ্গেও সে দিনের পর দিন চাঁদ দেখেছে!

আজ অবশ্য আকাশে চাঁদ নেই৷ কিন্তু ওর প্রসঙ্গ মনে পড়লেই যেন দলা পাকানো একটা ঘৃণা সাপের ফণার মতো তার বুকের মধ্যে ফুঁসে ওঠে৷ কী দেখে যে ওর ওপর বিশ্বাস জন্মেছিল! বোকামি করেছিল সে— জীবনের সবচেয়ে বড় বোকামি৷ যার মাশুল এখনও দিয়ে চলছে...

অনেকক্ষণ কেটে গেছে৷ সে এবার উঠে এল কফিন থেকে৷ কফিনের ঢাকনা আটকে দিল, আবার আগের মতো মাটি ভরাট করল৷ জিনিসপত্রগুলো থলের মধ্যে গুছিয়ে নিল৷

তারপর সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল খোলা বাতাসে৷ বাড়িতে গিয়ে তো এমনিতেই ভালোভাবে স্নান করতে হবে৷ নেক্রোম্যান্সারদের জন্য ঠিকঠাক রিচুয়াল মেনে স্নান করাটা অত্যন্ত দরকারি৷

আশা করা যাচ্ছে, যে-যে লক্ষণগুলো সুপ্ত অবস্থায় আছে— সেগুলো আজ রাতের মধ্যেই ফুটে উঠবে৷ তারপর অসুখের অবস্থা বুঝে আরোগ্যের ব্যবস্থা৷

নেক্রোম্যান্সারদের জন্য সমাধিস্থল হল আরেকটা বাড়ি৷ নানারকম ক্রিয়া-কলাপ করতে, ধুলো সংগ্রহ করতে, মৃতদেহ জোগাড় করতে তাদের প্রায়ই এসব জায়গায় আসতে হয়৷ নেক্রোম্যান্সির প্রাথমিক শিক্ষাগুলোই তো সব মৃতদেহ-সম্পর্কিত হয়৷ মৃতের সঙ্গে যোগাযোগ করা, তাকে প্রয়োজনমতো জীবিত করে তোলা, তার শক্তিকে অধিগ্রহণ করা... ফলে এখানে আসা নিয়ে তাদের আলাদা কোনও আবেগ থাকার কথা নয়৷

কিন্তু এই সমাধিস্থলে, কেবল এইখানে আসলেই তার মনটা খারাপ হয়ে যায়৷ উদাসীনতাকে ছাপিয়ে ওঠে শোকের ধোঁয়া৷

তার সঙ্গে তো শেষ কথা এখানেই হয়েছিল৷ খুব অস্থির লাগছিল তাকে সেদিন৷ সেটা অবশ্য ওই ব্ল্যাক নেক্রোম্যান্সি চর্চা করারই ফল৷ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসাবে হোমোফোবিয়া, অর্থাৎ রক্তভীতি হয়েছিল তার৷

দু-জন কথা বলছিল৷ হঠাৎ কোত্থেকে একটা মশা এসে বসল শরীরে; একটা চড় মারতেই রক্ত ফুটে উঠল৷

ক্ষীণ আলোতেও সেই রক্তের ফোঁটাটুকু সে দেখতে পেয়েছিল৷ কেমন যেন হয়ে গিয়েছিল তার চোখ-মুখ! একটা কুকুরের রূপ ধরে সে ছুটে পালাচ্ছিল৷ সেইসময় আচমকা একটা গাড়ি...

পিছন-পিছন সেও তো ছুটে এসেছিল৷

এই দৃশ্য দেখে কিন্তু কাঁদেনি সে৷ খুব বেশি তো কাঁদে না সে; ওসব ভীরুতার লক্ষণ!

তখন চালকের অসাবধানতা আর দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কথা ভেবে তার সারা শরীরে যেন আগুন জ্বলে উঠেছিল৷ নিকটজনকে হারিয়ে ফেলার শোক আর সদ্য সৃষ্টি হওয়া অনন্ত শূন্যতা সেই আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছিল৷

সেই ক্রোধ, সেই প্রতিশোধস্পৃহা— আজও একইভাবে রয়ে গেছে৷ বরং দিনে-দিনে মহীরুহের মতো আরও বেড়ে উঠেছে৷

সে মনে-মনে বলল, ‘অভিশাপ তো তোমাদের জীবনে সেদিন থেকেই নেমে এসেছিল৷ সেই আগুনে একটু-একটু করে যতদিন না পুড়ে সম্পূর্ণ ছাই হচ্ছ, ততদিন আমার শান্তি নেই৷’

এখনও তার শরীর থেকে বাতাসে শব পচা গন্ধ মিশে যাচ্ছে৷ কিন্তু তার বমি পাচ্ছে না৷ এসবে তার অভ্যাস আছে৷ বমি তো তার পায় ঘৃণার্হ মানুষগুলোর কথা ভাবলে৷

অনেকক্ষণ হয়ে গেছে৷ আসলে এখানে থাকতে যেমন দুঃখ লাগে, তেমন ভালোও লাগে তার৷ কারণ— এখানে আসলে সেই মানুষটার কথা মনে পড়ে, এখানে থাকলে হিংস্র রিপুগুলো আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে, প্রতিশোধস্পৃহা আরও শাণিত হয়ে ওঠে৷

কিন্তু এবার ওঠার দরকার৷ কারণ সময়ে স্নান সেরে ফেলাটাও জরুরি৷

সে এবার আলখাল্লাটা শরীরে চাপিয়ে নিল৷ তারপর থলেটাকে পিঠে ঝুলিয়ে বেরিয়ে আসল সমাধিক্ষেত্র থেকে৷

নির্জন রাস্তা দিয়ে একা-একা হাঁটছে সে৷ বিড়বিড় করে আবৃত্তি করছে—

‘এখনও সমুখে রয়েছে সুচির শর্বরী,

ঘুমায়ে অনন্ত সুদূর অস্ত-অচলে৷

বিশ্বজগৎ নিশ্বাসবায়ু সম্বরি

স্তব্ধ আসনে প্রহর গণিছে বিরলে৷

সবে দেখা দিল অকুত তিমির সন্তরি

দূর দিগন্তে ক্ষীণ শশাঙ্ক বাঁকা৷

ওরে বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,

এখনই, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা৷’

কিন্তু আজ কোনও রাতচরা পাখি নেই, আকাশে বাঁকা চাঁদ নেই৷ শুধু অন্ধকার, থম মেরে যাওয়া বাতাস, স্তব্ধ হয়ে যাওয়া পরিবেশ, ভ্রাম্যমাণ দুর্গন্ধের ঝাপটা, নেশাগ্রস্থের মতো হেঁটে চলা সে— আর তার মস্তিষ্কের মধ্যে আছড়ে পড়া দুর্বার স্মৃতির স্রোত...

সকল অধ্যায়
১.
ম্যাজিক শো থেকে শুরু...
২.
সকালের হেডলাইন
৩.
দুর্ঘটনার পরে
৪.
‘সে’ আছে আড়ালে
৫.
রাত এবং উপহার
৬.
আবার রহস্যময় অঘটন
৭.
নিঝুম দুপুরের আগন্তুক
৮.
একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব
৯.
শান্তির স্নান
১০.
কেমন আছে অনুরাধা?
১১.
নতুন দিনের প্রস্তুতি
১২.
স্বাগত আমার ঘরে
১৩.
আবার ম্যাজিক-শো
১৪.
বুবাই কোথায়
১৫.
আবার বাড়িতে ফেরা
১৬.
আয়না, ওয়াইন, পুতুল এবং...
১৭.
বিভীষিকাময় রাত
১৮.
কোকিল মানে বসন্ত; কোকিল মানে...
১৯.
আরেকটি ‘কেন’
২০.
সাফারি টাইম
২১.
ক্রিস্টাল-ক্লিয়ার ক্রিস্টাল বল শপ
২২.
ত্রুটি সংশোধন
২৩.
নখ কেন কালো
২৪.
স্বচ্ছ স্ফটিক; ঘোলা স্ফটিক
২৫.
ঢাকা থাক, থাক ঢাকা...
২৬.
বেড়ানোর ছবি
২৭.
বহুদিন পর; আবার!
২৮.
নিষ্ফলতার আক্রোশ
২৯.
একটুর জন্য...!
৩০.
অ-সাক্ষাৎ এবং সাক্ষাৎ
৩১.
‘সে’ ছিল, ‘সে’ আছে...
৩২.
একটা অন্যরকম রবিবার
৩৩.
প্রচেষ্টা এবং অভিজ্ঞতা
৩৪.
অন্তিম প্রস্তুতি
৩৫.
দৃশ্য এবং অদৃশ্য
৩৬.
কোন সে সুদূর অতীত হতে...
৩৭.
রইল বাকি এক
৩৮.
জানা এবং অজানা
৩৯.
সময় এসেছে কাছে
৪০.
ইট’স ফাইন
৪১.
ঘন হয়ে উঠেছে অন্ধকার
৪২.
শব্দটীকা
৪৩.
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জী

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%