শ্রীজিৎ সরকার
এখন তার আর জ্বর আসছে না৷ শরীরে হঠাৎ-হঠাৎ যন্ত্রণার অনুভূতি জেগে ওঠা, নখ কালো হয়ে যাওয়া, চুলে সাদা রঙ ধরা— সব অনেকটা কমে এসেছে৷ সেই সঙ্গে তার শরীরে আবার পুরনো শক্তি ফিরে এসেছে৷
খুব সামান্য কিছু-কিছু লক্ষণ বাদ দিলে, এখন সে অনেকটা সুস্থ— প্রায় আগের মতোই সুস্থ৷
সে একটা কাঠের চেয়ারে, সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে বসে আছে৷ সামনে একটা লম্বাটে টেবিল৷ তার ওপর ফেলে হাতের ইস্পাতের তৈরি কাস্তের মতো জিনিসটা দিয়ে একটা শিকড় কুচি-কুচি করে কাটছে৷
কাস্তেটা অবশ্যই কোনও সাধারণ কাস্তে নয়; পবিত্র সময়ে জন্ম নেওয়া সম্পূর্ণ সাদা ভেড়ার রক্ত দিয়ে শোধিত এবং মন্ত্রপূতঃ করা আছে ওটাকে৷ কাস্তের পুরো শরীর জুড়ে শক্তিশালী আত্মাদের নাম এবং আহ্বানবাণী খোদাই করা রয়েছে৷
এই শিকড়টাও কি কোনও সাধারণ ‘জড়িবুটি’ নাকি? উঁহু!
এই শুকনো শিকড়কে ঠিকঠাক মন্ত্রপূতঃ করতে পারলেই তৈরি হবে এক ভয়ংকর ভেষজ ওষুধ— স্লিপবার্স্ট৷ শুধু একবার সেই বিষ শত্রুর দেহে ছোঁয়াতে পারলেই হল...
এইসব জিনিস সে ভাঁড়ার থেকে ফুরোতে দেয় না৷ শেষ হওয়ার মতো দেখলেই আবার তৈরি করে ফেলে৷ তাছাড়া, উপযুক্ত কাঁচের বয়াম যেখানে যথেষ্টই আছে— শুধু-শুধু সেগুলোকে খালি ফেলে রাখার কি কোনও অর্থ হয়? আর দিন-দিন যেভাবে এসব দুর্লভ ভেষজ দুর্লভতর হয়ে উঠছে, তাতে এখন থেকে যত সংগ্রহ করে রাখা যায়— ততই ভাল৷ ঠিকঠাকভাবে প্রক্রিয়াজাত করতে পারলে তো এগুলো দীর্ঘদিন গুণ-সহ সংরক্ষণ করা যায়৷
একটা বয়ামে ধুনোর মতো রঙের একটা স্বচ্ছ তরল৷ তরলের ঘনত্বটা অদ্ভুত— জলের মতো হালকাও নয়, আবার তেলের মতো ঘনও নয়৷ তরলটায় খুব মৃদু একটা বুনো-বুনো গন্ধও আছে৷
শিকড়গুলোকে কুচানো শেষ৷ এবার সে সেগুলোকে তরলের মধ্যে ভিজিয়ে দিল৷ অবশ্য সাবধান থাকল, যাতে তার আঙুল তরল স্পর্শ না-করে ফেলে৷ তারপর বয়ামের ঢাকনা বন্ধ করে, ভালো করে পুরো জিনিসটাকে ঝাঁকাল৷
কিছুক্ষণ ঝাঁকাঝাঁকির পরে স্বচ্ছ তরল অর্ধ-স্বচ্ছ হয়ে উঠল,পরিচ্ছন্ন উপরিতলে কিছু গেঁজলাও জমা হল৷
এবার সে বয়ামটাকে খুব সাবধানে একটা কাঠের তাকের উপর রেখে দিল৷
এখন এটাকে এভাবেই রাখা থাকবে অন্তত তিনসপ্তাহ৷ তারপর এই মিশ্রণ আরও স্বচ্ছ এবং আরও ঘন (প্রায় আঠার মতো) হয়ে উঠবে৷ তখন এটাকে সে একটা পরিষ্কার, নতুন মসলিনের কাপড়ে ছেঁকে নেবে৷ তারপর একটা পিতলের মুখঢাকা পাত্রে ভরে, কুসুমকাঠের আগুনে উত্তপ্ত করতে-করতে মন্ত্রপূতঃ করবে৷
খুঁটিনাটি কি কম! কোথাও যদি এতটুকু গলদ হয়, পুরো পরিশ্রম মুহূর্তে জলে চলে যাবে৷
অবশ্য ভুল সে করে না৷ কম দিন তো হল না এসব নিয়ে চর্চা করছে...
সে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল৷
আয়নাটা এখনও একটা কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা৷ এটাই নিয়ম৷ আর যতদিন না সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠছে, ততদিন এই নিয়ম পালন করতে হবে— কোনও মতেই আয়নায় মুখ দেখা যাবে না৷
অথচ মাঝে-মাঝেই যে তার নিজের মুখটা এত করে দেখতে ইচ্ছা করছে! মনে হচ্ছে, একটানে ওই আবরণটা সরিয়ে দেয়; আর তারপর খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে নিজেকে দেখে৷
সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করল৷ নিজেই নিজেকে কিছুটা ধমকও দিল৷ আত্মনিয়ন্ত্রণ আর সংযমই যেখানে নেক্রোম্যান্সারদের জীবনের শেষ কথা, সেখানে সে এসব ভাবছে কী করে?
আয়নার সামনে থেকে সরে গেল সে৷
শরীরটা পুরোপুরি ভালো হলেই সে বাঁচে৷ খুব শিগগিরই তার একটা বড় ক্রিয়া করার আছে৷ অসুস্থ শরীরে তো সেটা করা যাবে না৷ অবশ্য এমনিতেও তাকে কিছুদিন অপেক্ষা করতেই হবে৷ কারণ, সব প্রস্তুতি এখনও সম্পূর্ণ হয়নি৷
সে তাকে পরপর সাজিয়ে রাখা বয়ামগুলো একবার দেখে নিল৷
আর শুধু ‘স্পিরিট পাউডার’ বানানো বাকি আছে৷ অবশ্য কিছু ভার্জিন পার্চামেন্টও বানাতে হবে৷ সেটা ওই ক্রিয়া-কৌশলে লাগবে না, তবে অন্তিম যুদ্ধের জন্য প্রয়োজন হবে৷
তার আপাতত একটা ভেড়ার বাচ্চা দরকার৷ যেমন-তেমন ভেড়া হলে তো আর হবে না৷ মৃত অবস্থায় জন্মেছে, সর্বশুভ্র, পবিত্র— এমন একটি পুরুষ ভেড়া৷ এবং অবশ্যই ভেড়াটি অব্যবহৃত হতে হবে; অর্থাৎ ভেড়াটি আগে কোনও কাজে ব্যবহার হয়ে গেলে চলবে না৷
এতকিছু শর্ত মিলিয়ে জিনিস জোগাড় করা কঠিন! তবু কঠিন কাজেই তো আনন্দ, দুর্গম পথ জয় করেই তৃপ্তি৷ মৃতদেহের প্রতি ভয়, বিকৃতির প্রতি ঘৃণা, অন্ধকারের প্রতি বিতৃষ্ণা জয় করতে পেরেছে বলেই না আজ সে এই জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছে! সহজ-সরল জীবন চাইলে তো সে কোনও সাধারণ মানুষ, কী বড়জোর ওই একটা উইচ হয়েই জীবন কাটিয়ে দিত৷
এখন দুপুরবেলা৷ বাইরে ঝকমক করছে রৌদ্র৷ এইসময় রাস্তায় বেরিয়ে ঘোরাঘুরি করাটা তার মোটেও পছন্দ না৷ কিন্তু সে জানে, হাড়গোড় ঠিকঠাক রাখতে গেলে— ‘ফাউন্টেন অফ ইউথ’ খাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে মাঝে-মাঝে শরীরে রোদ লাগানোটাও প্রয়োজন৷ কিন্তু ভাবলেও কীরকম যেন অস্বস্তি হয়!
কিন্তু এটাই ভেড়া সংগ্রহের উপযুক্ত সময়৷ বিশেষত, আর কিছুক্ষণ পর থেকেই শুরু হচ্ছে মঙ্গলের যোগ৷ এই লগ্নকে হাতছাড়া করলে চলবে না৷
একটা কালো আলোয়ান শরীরে জড়িয়ে নিয়ে সে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন