শ্রীজিৎ সরকার
রণজয় ঘরে ঢুকেই সোফায় বসে পড়ল৷ ক্ষীণ গলায় ডাকল, ‘স্মিতা-আ-আ... একগ্লাস জল নিয়ে এসো না...’
স্মিতা শোওয়ার ঘরের খাটে বসে বুবাইকে পড়াচ্ছিল৷ রণজয়ের ডাক শুনে তাড়াতাড়ি ও একগ্লাস জল নিয়ে ড্রইংরুমে এল৷
হাত-পা এলিয়ে সোফায় বসে আছে রণজয়; শরীরে অফিসের পোশাক৷ টাইটা পর্যন্ত আলগা করেনি৷
অবাক হল স্মিতা৷ রণজয় কোনওদিন বাড়ি ঢুকেই সোফায় বসে পড়ে না৷ বাড়ি ফিরেই ও আগে ঢুকে যায় বাথরুমে৷ সেখানে জামা-কাপড় ছেড়ে, পরিষ্কার হয়ে স্নান করে, চুল আঁচড়ে— তারপর ঘরে এসে বসে৷ এসব করার আগে ও বুবাইয়ের গায়ে পর্যন্ত হাত দেয় না৷
স্মিতা রণজয়ের পাশে গিয়ে বসল৷ জলের গ্লাসটা ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘এই নাও জল৷’
‘হুঁ৷’
রণজয় আস্তে-আস্তে সোজা হয়ে বসল৷ তারপর স্মিতার হাত থেকে
গ্লাসটা নিয়ে, একঢোঁকে পুরো জলটা খেয়ে নিল৷ শেষে যেভাবে ও ঠোঁট চেটে নিল— দেখলেই বোঝা গেল যে, তেষ্টাটা প্রবল ছিল৷
গ্লাসটা ফেরত নিতে গিয়ে স্মিতা লক্ষ্য করল, রণজয়ের হাতের আঙুলগুলো তিরতির করে কাঁপছে৷
স্মিতা সেন্টার-টেবিলে রেখে দিল গ্লাসটা৷ তারপর রণজয়ের টাইয়ের নটটা আলগা করে দিতে-দিতে বলল, ‘কী হয়েছে বলো তো? তোমাকে আজ খুব টেন্সড দেখাচ্ছে...’
রণজয় আস্তে-আস্তে মাথা নাড়ল, ‘বলছি৷ আগে একটু ফ্রেশ হয়ে আসি৷’
স্মিতা আর জোরাজুরি করল না৷ ও শুধু জিজ্ঞাসা করল, ‘একটু কিছু
খাবে রণজয়? কুমড়োফুল আছে, ভেজে দেব?’
দু-পাশে মাথা নাড়ল রণজয়, ‘নাহ! একটু কফি করো তো৷ চিনি ছাড়া, বেশ স্ট্রং ব্ল্যাক-কফি৷’
জামার বোতাম খুলতে-খুলতে রণজয় বাথরুমের দিকে চলে গেল৷
স্মিতাও উঠে ঘরে চলে এল৷ রণজয়ের মুখটা দেখার পর থেকে ওর মনটা কেমন অদ্ভুত রকমের অশান্ত হয়ে আছে৷ মাঝেমাঝে অফিসে খুব অপ্রীতিকর কিছু ঘটলে, বা কাজের বেশি চাপ পড়লে ওর মুখটা একটু ক্লান্ত দেখায়; কিন্তু সেটা এরকম নয়৷ এ যেন আরও সাঙ্ঘাতিক এবং অপ্রত্যাশিত কিছু!
মা নেই, তবুও বুবাই আজ শান্ত হয়ে বসে কাজ করছে৷ অন্যদিন ও একা থাকলেই ফাঁকি দেয়৷
রান্নাঘরে ঢুকে স্মিতা কফির জল চাপিয়ে দিল৷ তারপর কফি পাউডার দিয়ে, ওভেনের আঁচ কমিয়ে ও আবার একবার ঘরে এল৷ বুবাইয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, ‘আজকে তুমি একটু একা-একা পড়ো বুবাই, আমি বাপির সঙ্গে ক-টা দরকারি কথা বলে আসি৷’
বুবাই ঠোঁট উলটে বলল, ‘কিন্তু আমার হোমটাস্ক তো প্রায় কমপ্লিট মা৷’
স্মিতা হাসল, ‘তাই? তাহলে তো তুমি আজকে গুড বয়৷ আচ্ছা, তাহলে নাহয়... না হয় তুমি একটু টি ভি দেখো, বা কমিক্স-টমিক্স পড়ো৷ কেমন?’
বুবাই ঘাড় নাড়ল, ‘আচ্ছা৷’
কফি তৈরি হয়ে গেছে৷ সারা রান্নাঘর ম-ম করছে তার হাল্কা তিতকুটে সুগন্ধে৷ গন্ধটা শুঁকলেই যেন মনে হয়, সব ক্লান্তি উড়ে যাচ্ছে!
স্মিতা বড় চায়না-ক্লের কাপে কফি ঢেলে নিয়ে বসার ঘরে চলে এল৷
রণজয় টি-শার্ট আর ট্র্যাকস্যুট পরে সোফায় বসে আছে৷ ভেজা চুলগুলো আঁচড়ানো, শরীর থেকে শাওয়ার জেলের মৃদু মাস্কি গন্ধ ভেসে আসছে৷ ওর চোখ-মুখ আগের তুলনায় হয়তো কিছুটা তরতাজা দেখাচ্ছে; তবুও এখনও অন্যদিনের তুলনায় অস্বাভাবিক৷ একটা রহস্যময় কিছু যেন সাঁতরে বেড়াচ্ছে সেখানে...
অন্যদিন রণজয় ফোনে এটা-সেটা দেখে, খবরের কাগজটা আরেকটু খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে পড়ে— বিশেষ করে শেয়ার মার্কেটের আপডেট৷ কিন্তু আজ ও একদম চুপচাপ, একমনে অন্যদিকে তাকিয়ে বসে আছে৷
সেন্টার-টেবিলে কাপটা নামিয়ে রাখল স্মিতা৷
স্মিতা বলল, ‘কফি এনেছি রণজয়৷’
রণজয় ছোট্ট করে উত্তর দিল, ‘হুমম৷’
স্মিতা জিজ্ঞাসা করল, ‘বিস্কিট নেবে?’
রণজয় দু-পাশে মাথা নাড়ল, ‘নাহ! এখন আর বিস্কিট-টিস্কিট কিছু খাব না৷ আজ একটু তাড়াতাড়ি ডিনার করে নেব৷’
রণজয়ের আপাতত আর কিছু দরকার নেই৷ তার মানে স্মিতাকেও আর এই ঘর ছেড়ে বেরোতে হবে না৷
স্মিতা রণজয়ের একেবারে পাশে বসে পড়ল৷ তারপর খুব আস্তে-আস্তে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হয়েছে বলো তো রণজয়? এনিথিং সিরিয়াস?’
রণজয় একটা লম্বা শ্বাস নিল৷ সোজা স্মিতার মুখের দিকে তাকিয়ে ও বলল, ‘আজ একটা সাঙ্ঘাতিক দুর্ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিল স্মিতা৷ একটুর জন্য বেঁচে গেছি৷’
স্মিতা শিউরে উঠল, ‘সে কী...!’
রণজয় ঘাড় নাড়ল, ‘হ্যাঁ স্মিতা৷ আজ অফিস থেকে ফেরার সময়, একজনকে প্রায় চাপা দিয়ে দিচ্ছিলাম৷’
অনেকদিন ধরে গাড়ি চালাচ্ছে রণজয়৷ তাছাড়া ওর গাড়ি চালানোর হাতও যথেষ্ট ভাল— খুব সাবধানে চলাফেরা করে, ট্রাফিকের ব্যাপারে সবসময় সতর্ক থাকে, খুব এমার্জেন্সি ছাড়া তাড়াহুড়ো করে না৷ কোনও নিয়ম ভাঙার জন্য রণজয়কে জরিমানা দিতে হচ্ছে, স্মিতা অন্তত এরকম কোনও ঘটনা মনে করতে পারে না৷
কত জায়গায় লং ড্রাইভে গেছে স্মিতারা— পুরী, দীঘা, মুকুটমণিপুর, বোধিগয়া... সব জায়গায় তো রণজয় নিজেই ড্রাইভ করেছে৷ কোনওদিন তো কোনও অসুবিধা হয়নি৷
স্মিতা একবার ঢোঁক গিলল৷ তবে রণজয়ের সামনে নিজের ঘাবড়ে যাওয়াটা খুব একটা প্রকাশ করল না৷ ও তাহলে আরও দুশ্চিন্তা করবে৷
যতটা সম্ভব শান্ত গলায় স্মিতা বলল, ‘কী করে হল রণজয়? শরীর-টরীর খারাপ লাগছিল নাকি?’
‘কী করে হল? সেটা তো আমি জানি না স্মিতা! শরীর তো ঠিকই ছিল... আমি কিন্তু খুব সাবধানেই আসছিলাম৷ হঠাৎ করে যে লোকটা কোত্থেকে একেবারে গাড়ির সামনে চলে এল! একদম ইলেভেন্থ আওয়ারে ব্রেকটা চেপেছিলাম...’
‘তোমার লাগেনি-টাগেনি তো?’
রণজয় কফির কাপটা হাতে নিল৷ দু-পাশে মাথা নেড়ে বলল, ‘নাহ৷ কিন্তু মনে কেমন যেন ধাক্কা লেগেছে৷ ভদ্রলোক যথেষ্ট বয়স্ক৷ আর সবথেকে বড় কথা— ভদ্রলোক আমাদের চেনা৷’
রণজয় কফিতে একটা ফুঁ দিয়ে চুমুক দিল৷
স্মিতা অবাক হল, ‘তাই নাকি! কে ভদ্রলোক?’
‘ডক্টর কুমারেশ চক্রবর্তী৷’
স্মিতা নামটা ঠিক মনে করতে পারল না৷ ওরা সাধারণত তিনজন ডাক্তারের কাছে যায়— গাইনোকলজিস্ট সুচেতনা চন্দ্রা, চাইল্ড স্পেশালিস্ট অরুণজ্যোতি দত্ত, আর জেনারেল ফিজিশিয়ান তপোময় হালদার৷ এছাড়া রণজয়ের এক দুঃসম্পর্কের দাদা ই-এন-টি স্পেশালিস্ট৷ তার নাম সৌম্যকান্তি জোয়ারদার৷
ইনি তো তাঁদের মধ্যে কেউ নন! তবে কে এই পরিচিত ‘ডক্টর’?
‘‘কুমারেশ চক্রবর্তী’ কে বলো তো রণজয়? আমার তো ঠিক মনে পড়ছে না৷’
রণজয় আরেক চুমুক কফি খেয়ে বলল, ‘আরে, ওঁকে মনে করতে মনে পারছ না? সেই যে— বেড়াতে গিয়ে আলাপ হল, বুবাইয়ের পেটে ব্যথা...’
এইবার স্মিতার হুড়মুড়িয়ে সব মনে পড়ে গেল৷ সেদিন ওই ভদ্রলোক ওখানে না-থাকলে ওদের ভালো বিপদে পড়তে হত!
স্মিতা অবাক হল, ‘সেকি!’
রণজয় ঘাড় নাড়ল, ‘হ্যাঁ৷ আমি তো দেখেই চিনতে পেরেছিলাম৷’
‘আর উনি? চিনতে পেরেছিলেন তোমাকে?’
‘নাহ৷ ডাক্তার মানুষ, রোজ কত লোকের সঙ্গে দেখা হচ্ছে! এরকম কোনও একজনকে কি মনে রাখতে পারেন?’
স্মিতা সায় দিল, ‘তা ঠিক৷ তারপর?’
‘তারপর আর কী! উনি চেঁচামেচি করছিলেন৷ আমি তো ভয়ই পাচ্ছিলাম৷ লোকজন যদি খেপে যায়, গাড়ির আর আমার— দু-জনেরই বারোটা বাজিয়ে দেবে৷ তবে উনি সেরকম কোনও সিনক্রিয়েট করেননি৷ শুধু ‘ইরেসপন্সিবল’, ‘ইডিয়েট’— এইসব বলছিলেন৷’
জল বেশিদূর গড়ায়নি শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল স্মিতা, ‘যাক, তবু ভাল৷’
কথায়-কথায় কফিটা এখন একদম ঠান্ডা হয়ে গেছে৷ ছোট-ছোট চুমুকে বাকিটুকু শেষ করে ফেলল রণজয়৷ তারপর প্রসঙ্গ বদলে বলল, ‘ছাড়ো৷ যা হওয়ার তা তো হয়ে গেছে৷ বেশি কিছু যে হয়নি— এই ভাল৷ তুমি কিন্তু অনেকদিন দিদিকে দেখতে যাওনি স্মিতা৷’
অনুরাধাকে স্মিতা শেষ দেখতে গিয়েছিল একমাস আগে৷ হিসেব মতো, অন্যবার এরই মধ্যে ওর আরও দু-বার যাওয়া হয়ে যায়৷ কিন্তু এই মাসে ব্যস্ততা একটু বেশিই৷
স্মিতা মুখ নিচু করে নখ খুঁটতে-খুঁটতে বলল, ‘দেখি, সামনের সপ্তাহে একবার যাব৷’ তারপর ও মুখ তুলে বলল, ‘সেই আংটিটার কী খবর রণজয়?’
‘ওরা তো বলল, আংটিতে নাকি কোনও প্রবলেম নেই৷ তবু ওরা চেঞ্জ করে দেবে৷ বারো তারিখ নাগাদ একবার যেতে বলেছে৷ তোমার আঙুলে কি আর কোনও প্রবলেম হয়েছে?’
‘না-না৷’
কথাবার্তা স্বাভাবিকভাবেই চলছে; কিন্তু স্মিতা বুঝতে পারছে, রণজয়ের মন এখন এখানে নেই৷ ভিতরে-ভিতরে ও এখনও সেই দুর্ঘটনার কথাই ভেবে চলেছে৷ অবশ্য স্মিতা নিজেও কি না-ভেবে থাকতে পারছে? সত্যিই তো৷ একটু এদিক-ওদিক হয়ে গেলে এতক্ষণ এই নিশ্চিন্তের কফি-পান কোথায়...
রণজয় খানিকটা আনমনা হয়ে বলল, ‘আরেকটু হলেই যে কী ঘটছিল... ভাবলেই শিউরে উঠছি! গাড়িটাও তো পালটি খাওয়ার চান্স ছিল৷’
স্মিতা বলল, ‘ছাড়ো৷ যত ভাববে তত টেনশন হবে৷ আইনক্সে নাকি ভালো একটা সিনেমা এসেছে, সবার দেখার মতো৷ যাবে নাকি এই উইক-এন্ডে?’
রণজয় সায় দিল, ‘তা গেলে হয়৷ রবিবার দেখে যাব৷ বুবাইয়ের ড্রয়িং ক্লাস করিয়ে নিয়ে গেলেই হবে...’
রণজয়ের কথা শেষ হল না৷ তার আগেই বেডরুম থেকে বুবাইয়ের গলা ভেসে এল, ‘ও মা, ও বাবা... তোমাদের কথা শেষ হল?’
বোঝাই যাচ্ছে, একা-একা ঘরে বসে থাকাটা বুবাই মোটেই উপভোগ করছে না৷ তাছাড়া বাবা বাড়ি এসেছে৷ সারাদিনের সব কথা বাবার সঙ্গে না-বলা পর্যন্ত ওর শান্তি নেই৷ তাছাড়া ওর বাড়ির লোকের সঙ্গে কাটানোর মতো পুরোপুরি ফাঁকা সময় বলতে এইটুকুই৷
‘কী হল? ও মা... ও বাপি...’
স্মিতা সরে বসতে-বসতে উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ৷ এসো৷ পাখার স্যুইচটা অফ করে দিও৷’
রণজয় চাপা গলায় বলল, ‘বুবাইকে এসব কথা কিছু বলার দরকার নেই স্মিতা৷ ও আবার ভয়-টয় পাবে৷’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন