শ্রীজিৎ সরকার
সে একটা দীর্ঘ হাই তুলল৷
বেচারা জাদুকর! একে তো ওর সম্মোহন-টম্মোহন ভালোভাবে শেখা হয়নি; তার উপর যেটুকু যা শেখা হয়েছিল— এতদিনের অনভ্যাসে সব ভোঁতা হয়ে গেছে৷
আসলে তো বেচারার সবই ভোঁতা৷ শুধু মঞ্চের ওপর সেজেগুজে দাঁড়িয়ে, হাত-পা নাড়িয়ে, চোখ পাকিয়ে অভিনয় করাই সার!
সে হাসলো, ‘ফ্রাইমোস্ট’ -এর নাম শুনেই এত চমকে গেলে? মিউজিনিস, সারকেড, হিকপ্যাচ, ফ্রুসিসিয়ার, ফ্রুটিমিয়ার— এঁদের নাম কি ভুলতে বসেছ জাদুকর? নাকি এটাই ভুলে গেছ যে, নারী আর শিশুদের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার ফ্রাইমোস্ট-ই করতে পারে?’
অবশ্য ছাত্রাবস্থায় জাদুকর বেচারা এসব নামগুলো ঠিকঠাক উচ্চারণই করতে পারত না৷ প্রায়শই ডেমন আর স্পিরিটদের গুলিয়ে ফেলত৷ অন্যান্য বইগুলো দূরে থাক, এক ‘গ্রিমোরিয়াম ভেরাম’ই ঠিকঠাক হজম করতে পারেনি৷ ঠিক করে স্পেল বলা বা ব্যবহার করা তো দূর অস্ত! তবুও ও শিক্ষিকার প্রিয় ছিল...
খল একটা!
ওই অভিনয় আর সস্তার চাতুরি— যেগুলো দিয়ে এখন হাজার-হাজার লোকের মনোরঞ্জন করে চলেছে, ওগুলো দিয়েই ভালোমানুষ শিক্ষিকার মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল৷ নির্গুণ হয়েও ওরকম একজন মহাগুণীর প্রিয়ভাজনেষু হয়ে উঠেছিল৷ অবশ্য শিক্ষিকাও অতিরিক্ত স্নেহময়ী ছিলেন৷ মেধাবী, অমেধাবী, গণ্ডমূর্খ— সবার প্রতিই তাঁর অসীম স্নেহ ছিল৷
কী শেখানো হত নেক্রোম্যান্সারদের?
মায়াবী ঘটনার প্রভাব প্রধানত ছ-টি মাধ্যম দ্বারা বিস্তার লাভ করে—
১. দৃশ্য ২. শব্দ
৩. গন্ধ ৪. স্বাদ
৫. স্পর্শ ৬. হৃদয়
তো কোথায় ওর এই ষড়বস্তুর ওপর নিয়ন্ত্রণ? কোথায় সেই গভীর প্যাশন? কোথায় সেই একনিষ্ঠ ডেডিকেশন? ও দেখাবে ম্যাজিক... হুহ!
সে খুব জোরে একটা শ্বাস নিল৷ তার ভারী এবং ভরাট বুকটা অনেকটা ফুলে উঠল৷ স্তব্ধ, বদ্ধ ঘরের মধ্যে রহস্যময় হয়ে ফুটে উঠল তার এই শ্বাস নেওয়ার শব্দটা; ঠিক যেন কোনও আত্মার শ্বাস-প্রশ্বাস বা অলৌকিক বাতাসের শব্দ৷
চেয়ারের হাতলদুটো চেপে ধরল সে৷ ঝুঁকে পড়ে নিজের পায়ের আঙুলগুলো দেখল৷
নখের পাশে কালচে ছোপ পড়েছে৷ গোড়ালিতে মরা কোষ জমে শক্ত হয়ে আছে৷
আসলে সে গত দু-দিন স্নান করেনি৷ ফলে শরীরের ত্বক মলিন, কর্কশ হয়ে উঠেছে৷ চুল হয়ে গেছে রুক্ষ্ম৷ পুরো শরীরে নির্জীবতার ছাপ লেগেছে৷
আজ সে স্নান করবে৷
সে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল৷ তার স্নানের ঘরটা ঘুপচিমতো৷ অবশ্য ইচ্ছা করেই এটা এইভাবে বানানো৷
স্নানঘরের একপাশে একটা বিশাল বাথটাব৷ পাশে সুগভীর কুয়ো৷ এই ঘরে কোনও জানালা তো নেই-ই, আলোর একটা রশ্মি আসার মতো সামান্য ঘুলঘুলি পর্যন্ত নেই৷
একে কুয়ো অত্যন্ত গভীর, তার ওপর এইরকম অন্ধকার, বদ্ধ জায়গায় তার অবস্থান; ফলে সারাবছরই কুয়োর জল বরফ-ঠান্ডা৷
বালতি করে জল তুলে-তুলে সে বাথটাব ভরল৷ তারপর সেই জলে সে কিছুটা খাঁটি জংলী মধু, অনেকটা এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল, একচিমটি এপসম লবণ আর কয়েকফোঁটা বিশুদ্ধ ল্যাভেন্ডার অয়েল মেশাল৷
শরীর থেকে একে-একে সমস্ত পোশাক খুলে ফেলল সে৷ সেগুলোকে ডাঁই করে রাখল একপাশে৷ তারপর হাত দিয়ে জলটা কিছুক্ষণ উথাল-পাতাল করল— উপকরণগুলো ভালো করে জলে মিশে যাওয়ার জন্যই৷ তেল অবশ্য জলের সঙ্গে মিশবে না; যেমন সাধারণ মানুষের সঙ্গে নেক্রোম্যান্সাররা মেশে না, মিশতে পারে না৷ কিন্তু পাশাপাশি টিঁকে থাকার মতো একটা ইমালশন তো তৈরি হবে৷
জল ছুঁয়ে সে বলল, ‘আমি জলের আত্মাদের অনুরোধ করছি— এই জলকে পরিশুদ্ধ করতে, সকল অবিশুদ্ধতাকে দূরীভূত করতে... মেরটালিয়া, মিউসালিয়া, ডোফালিয়া... ইজোইল, মিউসিল, গ্রাসিল... অ্যানাফ্যাক্সিটন, সেজিটেলন, প্রাইমিউমেটন...’
হাতে একমুঠো সাধারণ লবণ নিল সে৷ চোখ বন্ধ করে বলল, ‘হে সর্বোত্তম, আপনি লবণের জীবদের আশীর্বাদ করুন, যাতে এর মধ্যে থেকে সকল উৎকট বিপত্তি দূরীভূত হয়, এবং এতে যথেষ্ট পবিত্রতার সঞ্চার হয়... ইমানেল, আরনামন, ইমাতো... ইয়ামেনটন, ইয়ারন, ট্যাটোনন... জ্যাগভেরন, মোমেরটন, জারমেসিটন...’
এইবার এই জল আর লবণ সম্পূর্ণ নিরাপদ৷ তার শক্তিকে প্রভাবিত করতে পারে— এমন কোনও অশুদ্ধি বা অপশক্তি আর এই জলে নেই৷
লবণটাকে জলে মিশিয়ে নিল সে৷ তারপর বাথটাবে নেমে পড়ল৷
জাদুকরকে সে আরেকবার ভড়কে দিতে পেরেছে৷ সঠিক জায়গায় পৌঁছে দিতে পেরেছে সঠিক সংকেত৷ অবশ্য সে জানে, ওই মূর্খ গৃহবধূ কোনওভাবেই ওই সংকেতের অর্থ বুঝতে পারবে না৷
তার দরকারও নেই৷ এই না-বুঝতে পারাটাই ওর মনকে ক্রমাগত ব্যতিব্যস্ত করে তুলতে থাকবে৷ আর ও যা অস্থিরচিত্ত মহিলা— এইটাই ওর মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে দিতে যথেষ্ট! অবশ্য ও কি আর সত্যিই অস্থিরচিত্ত? তা তো নয়; ওকে আসলে অস্থিরচিত্ত বানানো হয়েছে৷
ওরা ব্যতিব্যস্ত হতে থাক৷ অস্থিরচিত্ততা ওদের মনের আরও গভীরে শিকড় ছড়াতে থাক৷ উৎকন্ঠা নিয়ে বাস করতে থাক ওরা৷ তারপর তো সেই সময় আসবেই...
সে আঙুল দিয়ে সারা শরীর ঘষতে থাকল৷ চাপ দিতে লাগল বিশেষ বিশেষ স্নায়ুকেন্দ্রে৷ এতে সে আরও চনমনে হয়ে উঠবে৷ আর এই জল যত বেশি-বেশি তার ত্বকের মধ্যে প্রবেশ করবে, সেটা ততই কমনীয়, সজীব আর উজ্জ্বল হয়ে উঠবে৷ নয়তো সেই যৌবন থেকে কী লাভ, যাতে যথেষ্ট লাবণ্যই নেই!
এমনিতে তাদের যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক জিনিস ব্যবহার করাই বিধি৷ প্রকৃতির সঙ্গে শরীর-মনের যোগ যত বেশি হবে, দেহের অভ্যন্তরে অতীন্দ্রিয় শক্তি তত বেশি জাগ্রত হয়ে উঠবে৷ তবে প্রাকৃতিক হলেও— দুধ, তুলসীপাতা, গোলাপের পাপড়ি থেকে পাওয়া তেলের মতো কিছু অতিশুভ জিনিস ব্যবহারের ক্ষেত্রে আবার বারণ আছে৷
একটা শুকনো ধুঁধুলের ছোবড়া টেনে নিল সে৷ ত্বকের মরা কোষ ঝরিয়ে ফেলা প্রয়োজন৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন