শ্রীজিৎ সরকার
একটা পেঁচা ল্যাম্পপোষ্টের ওপর এতক্ষণ চুপ করে বসে ছিল৷ আধবোজা চোখে, ঘাড় ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে মন দিয়ে দেখছিল আশপাশ৷ মনে হচ্ছিল যেন পছন্দসই শিকার খুঁজছে৷ পেলেই সঙ্গে-সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়বে৷
সে এবার ডানা ঝটপটিয়ে নেমে এল রাস্তায়৷
কোনও সাপ বা ইঁদুর দেখতে পেয়েছে নাকি?
পেঁচার অবয়ব বদলে গেল মানুষে৷
অন্যান্য যে কোনও সুপ্রিম-লেভেল নেক্রোম্যান্সারের মতো এই মানুষটারও দিনে অন্তত তিনবার নিজের রূপ বদলে ফেলার ক্ষমতা আছে৷ শুধু যার রূপ ধরতে চায়, তাকে গভীর মনোযোগের সঙ্গে স্মরণ করে একবার একটা স্পেল উচ্চারণ করতে হবে— ‘পলিমর্ফ সেল্ফ৷’
অনেক রাত হয়েছে৷ কিন্তু তার এখনই ঘরে ফিরে যাওয়ার কোনও তাড়া নেই৷ কার জন্য ফিরবে সে? তার কোনও আত্মীয় বা প্রিয়জন তো তার জন্য অপেক্ষা করে বসে নেই৷ আসলে আত্মীয় বা প্রিয়জন যাদেরকে বলে— তার জীবনে তো সেরকম কেউ নেই-ই৷
তাছাড়া অন্ধকার তার খুব প্রিয়৷ শুধু মনে হয়, যদি এইসব সূর্য, তারা— সব একেবারের মতো নিভে যায়, তবে বেশ হয়৷ তখন শুধু থাকবে সে, আর তার প্রিয় নিকষ কালো অন্ধকার৷
কোটি-কোটি বছর আগে এই অন্ধকারেই তো সৃষ্টির সূচনা হয়েছিল, আবার কোটি-কোটি বছর পর এই অন্ধকারেই তার নাশ হবে৷ এই অন্ধকারেই তো ঘটে যায় ব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে রহস্যময় ঘটনাগুলো৷ আবার এই অন্ধকারেই উঠে আসেন আদিম আরাধ্যরা...
আজ তো জাদুকরের এত সহজে ঘুমিয়ে পড়ার কথা ছিল না৷ কিন্তু তবু সে শেষপর্যন্ত ঘুমিয়ে পড়ল৷ কারণটা অবশ্য গোটা পৃথিবীতে দু-জনই জানে— এক, যে এখন নিচে রাস্তার ধারে একটা অকেজো ল্যাম্পপোস্টে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে; আর দুই, মহান ডেমন হুইকটিগ্যারাস— যার কৃপায় অনিদ্রার রোগীও নিমেষে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়, ঘুমকাতুরে লোকও বিনাকারণে বিনিদ্র রাত কাটায়...
সে এখন দোতলার জানালার দিকে তাকাল একবার৷ এতক্ষণ ভিতরে কী হচ্ছিল, না-হচ্ছিল— সবই তো সে নিজের চোখে দেখছিল৷ চাইলে অবশ্য ঘরে বসেই সে এসব দেখতে পারত৷ কিন্তু যে কোনও জিনিস সামনা-সামনি উপলব্ধি করার আনন্দই আলাদা৷
সে ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল, ‘ঘুমিয়ে নাও তুমি৷ এখনও কত বিনিদ্র রাত তোমাকে জাগতে হবে! তার আগে একটু বিশ্রাম নিয়ে নাও৷ কেউ কি জানে জীবন তার জন্য কী সাজিয়ে বসে আছে? জানে না৷ হয়তো ‘জীবন’ নিজেই জানে না৷ তবু আগে থাকতে যতটা সম্ভব প্রস্তুত হয়ে থাকাই ভাল...’
তার চোখদুটো অন্ধকারের মধ্যেও যেন লুসিফেরিনের মতো জ্বলজ্বল করে উঠল৷
সে দু-হাতের তালু ঘষল৷ তারপর সেই তাপ ভালো করে মেখে নিল নিজের দু-গালে৷ এমন জমাট অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে এসব করার মজা যে কী— তা আর সাধারণ মানুষ কী বুঝবে! তারা দিনেরবেলা সর্বক্ষণ তো বাড়ির দরজা-জানালা আলো আসার জন্য হাট করে খুলে রেখে দিয়েছেই; ওদিকে সন্ধ্যা নামতে না-নামতেই ঘরের ভিতরে, বাইরে, রাস্তার ধারে জোরালো আলো জ্বালিয়ে দিচ্ছে৷ কোথাও এতটুকু রহস্য দানা বাঁধার উপায় নেই৷
ল্যাম্পপোস্টটা কী শীতল! যেন একটা দীর্ঘদেহী, নিস্পন্দ সরিসৃপ৷ তার ভীষণ ইচ্ছা করছে, বিবস্ত্র হয়ে এটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরতে৷
থেকে-থেকে যে শরীরের চাহিদাটা এত বেড়ে যায়! অবশ্য সঙ্গীর চিন্তা করলেই সব উত্তেজনা আবার স্তিমিত হয়ে আসে৷
সে মাথা নিচু করে হাঁটতে শুরু করল৷ অন্ধকারে তো তার কোনও অসুবিধা হয় না৷ তার চোখের দৃষ্টিতে এখনও অন্তত এক-কিলোমিটার
দূরের জিনিস ধরা পড়ছে৷
একটা বিড়াল রাস্তা পার হয়ে গেল৷
অন্য কোনও সাধারণ মানুষ হলে হয়তো এই দৃশ্য দেখে দাঁড়িয়ে যেত৷ কিন্তু সে দাঁড়াল না৷ বিড়াল আবার অশুভ নাকি? বরং তাদের কাছে বিড়াল আর দাঁড়কাক যথেষ্ট শুভ৷ রূপ বদলানোর জন্যও তো তাদের কোনও না কোনও শিকারী প্রাণীকেই বেছে নিতে হয়— চিতা, চিতাবাঘ, হাঙর, কুকুর...
তাছাড়া সে হিংস্রতা খুব ভালোবাসে৷ ওই যে এক-লাফে ঝাঁপিয়ে পড়া, টুঁটি ছিঁড়ে ফেলা, দেহটাকে টুকরো-টুকরো করে ফেলা— এগুলোর মধ্যে যে কী এক অদ্ভুত বীরত্ব, পৌরুষ আর সৌন্দর্য্য মিশে আছে!
এই সৌন্দর্য্য শুধু তারাই দেখতে পায়, যারা দেখতে জানে৷ যেমন মনের ক্ষমতা— তারাই ব্যবহার করতে পারে, যারা ব্যবহার করতে জানে৷ আর একবার সেই ক্ষমতার স্বাদ পেলে যেন বেঁচে থাকার অর্থটাই বদলে যায়৷ শারীরিক শক্তি দিয়ে আর কতটুকুই বা পাওয়া যায়, আর কতজনের সঙ্গেই বা লড়াই করা যায়!
কেমন অবলীলায় মৃত মেয়েটির বাড়ির লোকের মানসিকতাকে প্রভাবিত করে ফেলল, কেমনভাবে গোটা প্রশাসনকে নির্বিকার বানিয়ে দিল অথচ সাংবাদিকদের ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকল— সে এইসব কথা ভাবছিল আর হাঁটছিল৷
বেশ চলছিল সবকিছু৷ হঠাৎ একটা হ্যাঁচকা টান...
এক-টানেই সে একেবারে একটা ঘাম আর মদের গন্ধে মাখা বুকের মধ্যে গিয়ে পড়ল৷ তবে যে টানল, তার শরীরে জোর আছে বলতে হবে৷ কাঁধের থেকে হাতটা যেন কনকনিয়ে উঠল!
গন্ধটা নাকে লাগতেই ঘৃণায় তার পেটের ভিতর থেকে যেন বমি ঠেলে উঠল৷
‘উহ! কী নরম মাইরি... উমম...’
লোকটা তাকে নিজের শক্ত দু-হাতের মধ্যে পিষছে, বুকের মধ্যে ডলছে, তার ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট দুটো পাগলের মতো ঘষছে৷ সঙ্গে জড়ানো ঘ্যাড়ঘেড়ে গলায় চালিয়ে যাচ্ছে অস্পষ্ট প্রেমালাপ৷ মনে হচ্ছে যেন দুর্বল নেটওয়ার্কে কেউ রেডিও চালিয়ে দিয়েছে৷
কী ভেবেছে এ? এটা ঠিক, যে সে মিলন ভালোবাসে; কিন্তু এমন কাপুরুষচিত দুর্বলতা তো ভালোবাসে না৷
তার হঠাৎ প্রচন্ড রাগ হয়ে গেল৷ অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার বাসনায় মনটা যেন গলা টিপে ধরা পাখির মতো ছটফটিয়ে উঠল৷
সে কোনওরকমে লোকটাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘চিল টাচ...’
অন্ধকারের মধ্যে খুব হালকা একটা নীল জ্যোতি দেখা গেল৷ অবশ্য সেটা এই এক দু-সেকেন্ডের জন্য মাত্র৷ তারপরেই আবার সব আগের মতো৷
যে মাটিতে থুতু ফেলে নিজের রাস্তা ধরল, তার মতো দৃষ্টিশক্তি থাকলে হয়তো দেখতে পাওয়া যেত— সেই ‘ঘৃণার্হ-নেশাখোর-কামার্ত-কাপুরুষ’ লোকটা এখন নিস্পন্দ হয়ে মাটিতে পড়ে আছে৷ তার মুখ দিয়ে হালকা গ্যাঁজলা বেরোচ্ছে, হাত-পা আড়ষ্ট, চোখ উল্টে গেছে৷
এমনিতে দেখলে মনে হবে, হয়তো বেশি নেশা করে ফেলেছে বলে এই অবস্থা হয়েছে৷ তবে চিকিৎসকরা দেখলেই বলে দিতে পারবেন, ও আসলে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছে৷
তবে পক্ষাঘাতের কারণ অজানা৷ আর পৃথিবীর কোনও চিকিৎসাতেই এই পক্ষাঘাত সারবে না৷
‘CHILL TOUCH... ALMOST KILL TOUCH.’
কথাটা মনে করে সে হাঁটতে-হাঁটতেই আপন মনে হেসে উঠল৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন