সময় এসেছে কাছে

শ্রীজিৎ সরকার

মিথিল সেদিন অনেকক্ষণ কথা বলেছিল প্রণবের সঙ্গে৷ প্রায় একঘন্টা ধরে খুব গোপন আর গুরুত্বপূর্ণ সেই আলোচনাটা চলেছিল৷

কথা শুরু করার আগে মিথিল প্রণবের ঘরের জানালায়, দরজায় কীসব যেন ছিটিয়ে দিয়েছিল— জলের মতো কিছু৷ এতে নাকি কিছুক্ষণের জন্য অন্তত দূরে বসে কেউ ওদের ওপর নজরদারি করতে পারবে না৷

সেদিন নাকি যে দাঁড়কাকটা কালোজামগাছ থেকে উড়ে গেল, সেটা আদৌ কাক-ই ছিল না৷ সেটা নাকি ‘সে’ ছিল৷ এমনিতেই নাকি তার নজর সবসময় শত্রুদের ওপর রয়েছে; আর মাঝেমাঝে সে নিজে এসে সরজমিনে সবকিছু দেখে যাচ্ছে৷ কোথাও কোনও ফাঁক সে থাকতে দেবে না৷

রাস্তায় তো প্রণব কত-কত পশুপাখি দেখে৷ সব কি সে নাকি? এইভাবে সে সারাজীবন আঠার মতো লেগে থাকবে নাকি প্রণবের পিছনে?

মঞ্চের দুর্ঘটনাগুলো থেকে শুরু করে ওই যে পাগল কুকুরের দল, সেদিন রাতের ওই বুকের রক্ত জল করিয়ে দেওয়া জাদু— সব নাকি তার চাল৷ সে নাকি প্রণবকে প্রতিমুহূর্তে আতঙ্ক আর উৎকন্ঠার মধ্যে রেখে দিতে চায়৷ যত দিন যাবে, এসব নাকি তত বেশি-বেশি হতে থাকবে!

কী সাঙ্ঘাতিক! ভাবলেই যেন প্রণবের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে৷

প্রণব কি আদৌ পারবে এই ফাঁদ থেকে বেরোতে? বুদ্ধি, শক্তি, সাহস— সবদিক থেকেই তো ও তার পাশে নগণ্য৷ মিথিলও তো খুব বেশি কিছু করতে পারবে না৷

হিয়া ঘরে ঢুকল৷

‘কী রে দাদা, কী ভাবছিস?’

বোনের গলার আওয়াজ পেয়ে প্রণব মনে-মনে সাবধান হয়ে গেল৷

রত্না কয়েকদিনের জন্য তার নিজের বোনের বাড়ি গিয়েছে৷ যাওয়ার আগে ও হিয়াকে বারবার বলে গেছে, হিয়া যেন প্রণবের ঠিকঠাক

খেয়াল রাখে৷ রোজ দু-বেলা ফোন করে মেয়ের কাছে খবরও নিচ্ছে৷

আসলে বোধহয় রত্না আন্দাজ করতে পারছে, প্রণব ঠিক স্বাভাবিক অবস্থায় নেই৷ যত যাই হোক— মা বলে কথা! ওর তো মোটেই এখন বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না৷ কিন্তু প্রণবের মাসির শরীরও খুব

খারাপ; সেখানে না-গেলেও খারাপ দেখায়৷

অবশ্য যাওয়ার সময় রত্না বলে গেছে, বোনের বাড়িতে খুব বেশি হলে ও তিন-চারদিন থাকবে৷

হিয়া আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘কী রে দাদা, বললি না তো— কী ভাবছিস?’

মুখে হাসি টেনে প্রণব বলল, ‘এই কত কী ভাবছি! তোর কথা, মায়ের কথা, আমার নিজের কথা...’

‘সবসময় এত আমাদের নিয়ে টেনশন করিস না তো৷ এমনিতেই ক-দিন আগে যা গেল... বাড়ি এসেছিস, কটাদিন রিল্যাক্স কর৷ এত টেনশন করলে শরীর-টরীর খারাপ হবে৷’

প্রণব ম্লান হাসল, ‘টেনশন করবা না ভাবলেই কি আর টেনশন না-করে থাকা যায়? হয়েই যায়৷ যেদিন এরকম অনেকের দায়িত্ব তোর একার ঘাড়ে এসে পড়বে— সেদিন বুঝবি৷’

‘ও৷’

একটু থামল হিয়া৷ মুখ নিচু করে ও কিছুক্ষণ একটা কিছু চিন্তা করল৷ তারপর বলল, ‘ইয়ে... আমি একটা কথা বলছিলাম রে দাদা৷’

‘হ্যাঁ৷ বল৷’

একটু ইতস্ততঃ করে হিয়া বলল, ‘বলছি, মিথিলকে তো সেদিন দেখলি৷ কীরকম মনে হল?’

সেদিন দোতলায় এসে, দরকারি কথাবার্তা সেরে নেওয়ার পর— প্রণব ওর মা আর বোনকে ডেকেছিল৷ হিয়া তো মিথিলকে দেখে দিনে-দুপুরে ভূত দেখার মতো চমকে উঠেছিল৷ আর রত্না ভেবেছিল, এটা হয়তো প্রণবের চেনা-জানা কেউ হবে; হয়তো দলেরই কেউ৷

প্রণব খুব সহজভাবেই রত্নার সামনে মিথিলকে উপস্থাপন করেছিল৷ বলেছিল, হিয়া ওকে অনেকদিন আগেই মিথিলের কথা জানিয়েছে, আর ও-ই মিথিলকে আজ এই বাড়িতে আসতে বলেছে৷

প্রণবের তো আগেই মিথিলকে ভালো লেগেছিল; রত্নারও ওকে পছন্দ হয়েছে৷ পরে ওরা মা-ছেলে এসব নিয়ে আলোচনাও করেছে৷ মিথিল যথেষ্ট শিক্ষিত, চাকুরে, ভদ্র, শালীন— আর কী চাই!

হিয়ার উৎসুক মুখটা দেখে যতটা মজা পাওয়ার কথা, প্রণব এখন ঠিক ততটাও মজা পাচ্ছে না৷ তবুও ও সহজ হওয়ার জন্য ঠাট্টা করে বলল, ‘ওই একরকম মনে হল! আমাদের মনে হওয়াতে আর কী এসে যায়? তুই এখন বড় হয়েছিস, তোর যেটা পছন্দ...’

কোনও উত্তর দিল না হিয়া৷ ও শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে, মুখ নিচু করে, নখ দিয়ে নখ খোঁটাতে লাগল৷

প্রণব জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হল? কিছু বলবি?’

সম্ভবত হিয়া লজ্জা পেয়েছে৷ ও মুখ তুলে, প্রসঙ্গ বদলে বলল, ‘নাহ! তুই কি এখন কিছু খাবি দাদা? মা মুড়ির মোয়া আর তিলের নাড়ু বানিয়ে রেখে গেছে৷ ঘরে সাবুর পাঁপড়ও আছে৷ ভেজে দেব?’

দু-পাশে মাথা নাড়ল প্রণব, ‘না রে৷ আমি এখন আর কিছু খাব না৷ এই তো দুপুর হয়ে এল৷ একটু পরেই ভাত খাওয়ার সময় হয়ে যাবে৷’

হিয়া আস্তে-আস্তে প্রণবের পাশে এসে বসল৷ বলল, ‘এবার একদিন তোর ম্যাজিক দেখাতে নিয়ে যাবি দাদা? মানে ধর, যখন কাছাকাছি শো পড়বে— তখন?’

সত্যিই... এই যে প্রণব এতদিন ধরে ম্যাজিক দেখাচ্ছে— হাজার-খানেক শো তো হয়ে গেছেই! রত্না আর হিয়া বোধহয় মাত্র বার-দুয়েক ওর

খেলা দেখেছে৷ আসলে প্রণব এত দূরে-দূরে খেলা দেখাতে যায় যে, এদের আর যাওয়া হয়ে ওঠে না৷ প্রণব কতবার ভেবেছে— একটা লম্বা ছুটি নিয়ে, মা আর বোনকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে যাবে৷ দিন-সাতেক সময় বের করতে পারলেই অনেক ভালো-ভালো জায়গায় যাওয়া যায়৷ সময়ের অভাবে সেটাও আর হয়ে ওঠে না৷

প্রণব বোনের মাথায় হাত রেখে বলল, ‘আচ্ছা, নিয়ে যাব৷ আমার তো আমেরিকা থেকে ডাক এসেছে৷ যাব নাকি যাব না— সেসব অবশ্য এখনও ঠিক করিনি৷ যদি যাই, তুই আমার সঙ্গে যাবি?’

হিয়া ঠোঁট ওল্টাল, ‘ধুস! আমি যাব আমেরিকা— তাহলেই হয়েছে! কত খরচ বল তো? শুনেছি একলাখ টাকারও বেশি লাগে৷’

প্রণব বলল, ‘তাতে কী হয়েছে? আমি না হয় আমার পারিশ্রমিকটা নেব না৷ ওদেরকে বলব, সেটা দিয়েই তোর যাওয়া-আসা আর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে৷ যদি আরও অল্পকিছু লাগে, আমি দিয়ে দেব৷’

হিয়া নাকচ করে দিল, ‘না রে দাদা৷ তাহলেও আমি যেতে পারব না৷ অত দিন মাকে একা-একা থাকতে দেব না৷ আর নয়তো আমাদের দু-জনকেই নিয়ে যেতে হবে৷ সেটাও তো ঠিক সম্ভব না৷’

দু-জনকে আমেরিকা নিয়ে যাওয়ার খরচ সত্যিই অনেক৷ তার ওপর, হিয়া বা রত্না— দু-জনের কারোরই পাসপোর্ট নেই৷ সেসব করানোও এখন একটা সমস্যা৷ সময়ও লাগবে, আবার দৌড় ঝাঁপও করতে হবে৷ এখন ওখানকার আবহাওয়া কেমন, তাই বা কে জানে! ওদের যা শীতের পোশাক আছে, তাতে নিশ্চয়ই চলবে না৷ প্রণবকেই হয়তো কিছু লংকোট, গামবুট, ভালো গ্লাভস ইত্যাদি কিনতে হবে৷

বোনের কথায় সায় দিল প্রণব, ‘সেটা ঠিক৷’

আরও কিছুক্ষণ এটা-সেটা নিয়ে কথা বলল প্রণব আর হিয়া— এই বছর এখানে কটা নতুন দুর্গাপুজো হবে, হিয়ার কলেজের কোন প্রোফেসর কীভাবে কথা বলেন, বাজারে নতুন কী পারফিউম এসেছে, প্রণবের রকমারি অভিজ্ঞতা... কথা বলতে বসলে একের পর এক বিষয় এসেই যায়৷

তবে মিথিলের প্রসঙ্গটা হিয়া আর তুলল না৷ প্রণব নিজেও আর ওই ব্যাপারে একটা শব্দও উচ্চারণ করল না৷

ঘড়িতে একটা পঁচিশ বাজে৷

হিয়া বলল, ‘চল দাদা৷ এবার গিয়ে খেয়ে নিই৷ মা আবার ঠিক পৌঁনে দুটোয় ফোন করবে, শুনবে আমরা খেয়েছি কিনা৷’

প্রণব যখন বাইরে থাকে, তখন ওর খাওয়ার সময়ের কোনও ঠিক থাকে না৷ কখনও-কখনও দুপুরের খাবার খেতে বিকেল পর্যন্ত গড়িয়ে যায়৷ কোনও-কোনওদিন হয়তো রাতে কিছু খাওয়াই হল না৷

কিন্তু এই বাড়িতে দুপুরের খাবার খাওয়ার বাঁধা সময়: বেলা একটা থেকে সোয়া একটা৷ কোনওদিন এর নড়চড় হয় না৷ সেই হিসাবে আজ তো দেরি হয়ে গেছে৷

একটু ভেবে প্রণব বলল, ‘না হয় খাবারটা ওপরেই নিয়ে আয় না৷

এখানেই বসে খেয়ে নিই৷’

হিয়া নীচে চলে গেল৷

ঘরটা আবার ফাঁকা, প্রণব আবার একা৷

এরকম নয় যে, এতক্ষণ সব চিন্তা-ভাবনা প্রণবকে ছেড়ে অনেকদূর পালিয়ে গিয়েছিল৷ কিন্তু তাদের অত্যাচার তো কিছুটা কম ছিল৷

এবার যেন এই একাকীত্বের সুযোগে তারা শুঁড় বাগিয়ে, অষ্টপদের মতো আঁকড়ে ধরতে চাইছে প্রণবকে৷

মিথিল তো বলেই গেল, স্পিরিট পাউডার ছড়িয়ে নাকি খুব বেশি কিছু করা যাবে না৷ কারণ, স্বয়ং স্ফটিক-গোলকই ঘরের মধ্যে উপস্থিত৷ তাই এখন এসব করা আর না-করা— দুটোই সমান৷

শুধু সাবধান থাকতে হবে৷ তাতেও যে খুব-একটা আশা আছে, তা নয়৷ তবুও...

মিথিলের বাবাকে তো প্রণব দেখেনি৷ মিথিলের মা ছিলেন প্রণবের শিক্ষিকা— Dangeon Master; যাকে ওরা ছাত্র-ছাত্রীরা ‘ডি এম’ বলে ডাকত৷ খুব কম মেয়েই এই যোগ্যতা অর্জন করতে পারে৷ তিনি পেরেছিলেন, এবং সেটাও অল্পবয়সে৷ কারণ তিনি অসাধারণ ছিলেন৷

মিথিলের বাবাও নাকি ‘Dangeon Master’ ছিলেন৷ গোপনে তিনি নেক্রোম্যান্সির চর্চা জিইয়ে রেখে দিয়েছিলেন৷ কিছু বাছাই করা ছাত্রছাত্রীকে নিয়ে অতিগোপনে, শহর থেকে বহুদূরে এই বিদ্যা

শেখানোর প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছিলেন৷ মিথিলের মা ছিলেন তাঁর ছাত্রী— বলা চলে, সর্বশ্রেষ্ঠ ছাত্রী৷ তিনি অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়ার পর ওর মা-ই স্বামীর স্বপ্নের ‘স্কুল অফ উইচক্র্যাফট অ্যান্ড নেক্রোম্যান্সি’-এর দায়িত্ব নেন, যেটাকে অনেকেই একটা বোর্ডিং স্কুল বলে জানত৷ কোনও সন্দেহ নেই, তিনি প্রথম থেকেই খুবই দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন নিজের দায়িত্ব৷ শৃঙ্খলা, উৎকর্ষ ইত্যাদি দিকে যেমন লক্ষ্য রেখেছেন, তেমনই রক্ষা করেছেন প্রতিষ্ঠানের গোপনীয়তা— ওই উঁচু প্রাচীরের বাইরের মানুষদের কাছে চিরকাল অধরাই থেকে গেছে ভিতরের ব্যাপার-স্যাপার৷

শুধু একটাই খামতি ছিল তাঁর! নিজের শ্রেষ্ঠ ছাত্রীটিকেই তিনি সামলাতে পারেননি৷ অবশ্য সেও একসময় মিথিলের বাবার ছাত্র ছিল, এবং মিথিলের মায়ের থেকেও অনেক সিনিয়র ছিল৷

এখনও প্রণবের মনে পড়ে সেই রাতের কথা৷ তখন স্কুলের সবাই নিজেদের-নিজেদের ঘরে ঢুকে পড়েছে৷ সব শুনশান৷ কোনও-কোনও জানালায় হয়তো আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে, আবার কোনও-কোনও জানালা অন্ধকার৷

একটা স্ফটিক-গোলক হাতে নিয়ে নিরুপায়ের মতো তার শিক্ষিকা বলছেন, ‘এটা নিয়ে তুমি পালিয়ে যাও প্রণব৷ আমি ওকে এখন ঘুম পাড়িয়ে রেখেছি৷ দু-দিনের আগে ওর এই ঘুম ভাঙবে না৷ এই স্ফিয়ার এখন থেকে তোমার অধীনস্থ— সেরকমই ব্যবস্থা করে দিয়েছি আমি৷ ও জেগে ওঠার পর ওকে আমিই শান্ত করব৷ তোমার কোনও দুশ্চিন্তা নেই৷’

হতভম্ব প্রণব শুধু বলেছিল, ‘আমি স্কুল ছেড়ে চলে যাব ডি এম?’

‘হ্যাঁ প্রণব৷ আমি বুঝতে পারছি, তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে৷ আমিও হয়তো স্বার্থপরের মতো আচরণ করছি৷ কিন্তু পৃথিবীর ভালোর জন্য এইটুকু ত্যাগ তুমি করতে পারবে না? তুমি ওর কাছের বন্ধু৷ ওর সঙ্গে তোমার একটা সোল-কানেকশন আছে৷ তাই ওর স্ফিয়ারের সঙ্গেও তোমার কানেকশন করিয়ে দিতে আমার সুবিধা হয়েছে৷ একবার যদি ওর এই বিপুল শক্তি ‘হোয়াইট নেক্রোম্যান্সি’র বদলে ‘ব্ল্যাক নেক্রোম্যান্সি’র কাজে লাগে... তুমি বুঝতে পারছ, তার ফল কী হবে?’

শিক্ষিকার উদ্বেগের কারণ আঁচ করতে প্রণবের অসুবিধা হয়নি৷ সে তো দীর্ঘদিন তার সঙ্গে প্রিয়বন্ধুর মতো নিবিড়ভাবে মিশেছে৷ আর সেই সুযোগে প্রণব তার অতুল মেধা দেখেছে, অসীম শক্তি দেখেছে, তার মনের তীব্র কষ্ট আর একাকীত্বের কথা জেনেছে; আর অনুভব করেছে সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো তার মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা তীব্র ঘৃণা আর প্রতিশোধস্পৃহাকে৷ প্রণব যেমন তার শক্তি আর একাগ্রতাকে শ্রদ্ধা করেছে, তেমনই ভয় পেয়েছে তার প্রতিশোধস্পৃহাকে৷

ওরা দু-জনেই রবীন্দ্রনাথের কবিতা ভালোবাসে৷ অবসরে গলা মিলিয়ে পাঠ করতে-করতে হঠাৎ সে কেঁদে উঠেছে, তারপর তার দু-চোখ এক অদ্ভুত রিরিংসায় জ্বলে উঠেছে৷ তার কান্না দেখে প্রণব যেমন দুঃখ পেয়েছে, ওই জ্বলে ওঠা চোখ দেখে তেমন ভয়ও পেয়েছে৷ প্রণব হতবাক হয়ে দেখেছে, সে যখন দাঁতে দাঁত চেপে নিজের ক্রোধকে প্রশমন করার চেষ্টা করে, তখন কেমন করে আশপাশের ঘাসগুলো আপনা-আপনি পুড়ে খাঁক হয়ে যায়৷

‘আমি বুঝতে পারছি ডি এম৷’

‘তবে আর দেরি কোরো না প্রণব৷ দয়া করো তোমার এই শিক্ষিকাকে৷ তোমার এই অবদানের কথা নেক্রোম্যান্সির জগত কোনওদিন ভুলবে না৷ আশীর্বাদ করি, জীবনে তুমি অনেক প্রতিষ্ঠা লাভ করো৷ যা শিখেছ, আর নিজের যা মেধা আছে, পরিশ্রম করার শক্তি আছে— সেসব খাটিয়ে তুমি নিশ্চয়ই সফল ইন্দ্রজালিক হতে পারবে৷ মহান সম্রাট সলোমনের আশীর্বাদ তোমার উপর সদা বর্ষিত হোক৷ চলে যাও... চলে যাও...’

সেই রাতেই পালিয়েছিল প্রণব৷ তারপর স্ফটিক-গোলকের শক্তির জোরে আর নিজের চেষ্টায় ও জীবনটাকে নতুন করে গড়ে নিয়েছে৷

প্রথমদিকে কি প্রণবের কষ্ট হয়নি? হয়েছিল— ভীষণ কষ্ট হয়েছিল৷ কিন্তু ও ভেবে নিয়েছিল, ওর এইটুকু সাহায্যেই হয়তো ওর শিক্ষিকা নিজের ছাত্রীকে অন্ধকারের পথ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারবেন৷ তাতে তো সবারই ভাল৷

কিন্তু মানুষের হিসাবে কত ভুল থাকে!

প্রণবের মতো সেও এত বছর ধরে নিজেকে গড়েছে৷ পার্থক্য শুধু একটাই: প্রণব শিক্ষা সম্পূর্ণ করতে না-পারার কষ্টটা ধীরে-ধীরে ভুলে গেছে; আর সে প্রিয়বন্ধুর বিশ্বাসঘাতকতার কথা মনের মধ্যে পুষে রেখে দিয়েছে৷ শুধু নীরবে সঠিক সময়ের অপেক্ষা করে গেছে৷

আর এইবার সে শুধু ফিরে আসেনি— সে বিপুলবেগে, ভীষণভাবে ফিরে এসেছে৷ এবার তার ক্রোধ শুধু ঘাসগুলোকে পোড়াবে না, পোড়াবে তার সব শত্রুদেরকে৷

প্রণব কীভাবে এঁটে উঠবে তার সঙ্গে?

হিয়া ঘরে ঢুকে, মেঝেতে খাবারের থালা নামিয়ে রাখল৷ তারপর কাঁধের থেকে আসন নামিয়ে পাততে-পাততে প্রণবকে ডাকল, ‘খাবি আয় দাদা৷’

‘হ্যাঁ, আসছি৷’

প্রণব চিন্তা করা বন্ধ করে উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই ও স্থির হয়ে গেল৷

কদিন আগেই স্ফটিক-গোলকের আঘাতে মেঝেতে একটা সূক্ষ্ম চিড় ধরেছিল৷ সেটা এখন ঠিক জ্বলন্ত প্ল্যাটিনামের তারের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে৷ একটা সাদা, অপার্থিব রশ্মি বেরিয়ে আসছে তার মধ্যে থেকে৷ পিছন করে দাঁড়িয়ে আছে বলে হিয়া বুঝতে পারছে না৷

প্রণব সাবধান করে দেওয়ার আগেই হিয়া সেই রশ্মির গর্ভে হারিয়ে গেল৷ অবশ্য ও আর কী সাবধানই বা করত! ওই রশ্মির শক্তি তো ও জানে৷

খুব-একটা আশ্চর্য হল না প্রণব৷ মিথিল ওকে আগেই জানিয়ে দিয়েছিল, এরকম কিছু ঘটতে পারে৷ না-না, ঘটতে পারে নয়; ঘটবেই৷

এবং ঘটলই৷

এবারই তো আসল পরীক্ষা৷

কালোজামগাছ থেকে ডাকতে-ডাকতে কোকিলটা প্রণবের ঘরে এসে ঢুকল৷ তারপর সেটা বদলে গেল মিথিলে৷

সকল অধ্যায়
১.
ম্যাজিক শো থেকে শুরু...
২.
সকালের হেডলাইন
৩.
দুর্ঘটনার পরে
৪.
‘সে’ আছে আড়ালে
৫.
রাত এবং উপহার
৬.
আবার রহস্যময় অঘটন
৭.
নিঝুম দুপুরের আগন্তুক
৮.
একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব
৯.
শান্তির স্নান
১০.
কেমন আছে অনুরাধা?
১১.
নতুন দিনের প্রস্তুতি
১২.
স্বাগত আমার ঘরে
১৩.
আবার ম্যাজিক-শো
১৪.
বুবাই কোথায়
১৫.
আবার বাড়িতে ফেরা
১৬.
আয়না, ওয়াইন, পুতুল এবং...
১৭.
বিভীষিকাময় রাত
১৮.
কোকিল মানে বসন্ত; কোকিল মানে...
১৯.
আরেকটি ‘কেন’
২০.
সাফারি টাইম
২১.
ক্রিস্টাল-ক্লিয়ার ক্রিস্টাল বল শপ
২২.
ত্রুটি সংশোধন
২৩.
নখ কেন কালো
২৪.
স্বচ্ছ স্ফটিক; ঘোলা স্ফটিক
২৫.
ঢাকা থাক, থাক ঢাকা...
২৬.
বেড়ানোর ছবি
২৭.
বহুদিন পর; আবার!
২৮.
নিষ্ফলতার আক্রোশ
২৯.
একটুর জন্য...!
৩০.
অ-সাক্ষাৎ এবং সাক্ষাৎ
৩১.
‘সে’ ছিল, ‘সে’ আছে...
৩২.
একটা অন্যরকম রবিবার
৩৩.
প্রচেষ্টা এবং অভিজ্ঞতা
৩৪.
অন্তিম প্রস্তুতি
৩৫.
দৃশ্য এবং অদৃশ্য
৩৬.
কোন সে সুদূর অতীত হতে...
৩৭.
রইল বাকি এক
৩৮.
জানা এবং অজানা
৩৯.
সময় এসেছে কাছে
৪০.
ইট’স ফাইন
৪১.
ঘন হয়ে উঠেছে অন্ধকার
৪২.
শব্দটীকা
৪৩.
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জী

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%