শ্রীজিৎ সরকার
দোকানগুলো সব ঘুপচি-ঘুপচি৷ দরজাগুলো সরু-সরু, তাতে আবার ভারী পর্দা টাঙানো৷ বাইরে কাচের শোকেসে দোকানে বিক্রি হওয়া জিনিসের কিছু-কিছু নমুনা সাজিয়ে রাখা৷
পর্দার ফাঁক দিয়ে যে ঈষৎ আলোর ছিটে বাইরে বেরিয়ে আসছে, তার থেকেই দৃশ্যটা বোঝা যাচ্ছে: বেশিরভাগ দোকানের ভিতরেই মৃদু, রঙিন আলো জ্বলছে— গোলাপি, নীল, জলপাই-সবুজ...
এখানে যেসব জিনিসের বিক্রিবাট্টা চলে, তা আর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না৷ যেসব পণ্য বাইরে সাজানো আছে, তার কোনও-কোনওটার দিকে তাকালে তো সাধারণ মানুষের লোম দাঁড়িয়ে যাবে!
এর মানে কি— এখানে যারা আসে, তারা সব ভিনগ্রহী?
না, তারা এই পৃথিবীরই মানুষ৷ আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো তারাও পার্থিব নর-নারীর মিলনে জন্মেছে, তাদেরও রক্ত লাল, তাদেরও দুই-হাত, দুই-পা... তারাও এই সমাজেই বাস করে৷
তফাৎ শুধু একটাই: তারা সবাই পেশাদার জাদুকর৷
এখানে এমন অনেক দোকান আছে, যেখানে সত্যিকারের জাদুর জিনিস পাওয়া যায়৷ ‘সত্যিকারের জাদুর জিনিস’ মানে, সেগুলো যন্ত্রচালিত বা কারসাজিওলা ভেলকি দেখানোর বস্তু নয়৷ সেগুলোকে কাজে লাগাতে গেলে সত্যিকারের ম্যাজিক ট্রিকস, স্পেল ইত্যাদি জানা দরকার; দীর্ঘ অভ্যাসে নিজের ভিতরের অতীন্দ্রিয় শক্তিকে জাগিয়ে তোলা দরকার;
চূড়ান্ত ধীশক্তি আর সাহসের অধিকারী অথবা অধিকারিনী হওয়া দরকার৷ আর যদি সেগুলোকে ঠিকঠাক কাজে লাগানো যায়...
ওসব ভেলকি দেখানো যন্ত্র তো ওদের পাশে শিশু!
প্রণব এরকমই কিছু খুঁজছে৷
কত বিচিত্র মানুষ যে যাওয়া-আসা করছে! সবারই শরীর মোটামুটি আপাদমস্তক ঢাকা৷ কারোর হয়তো শুধু চোখদুটো খোলা রয়েছে; কারোর আবার সেটুকুও অন্তরালে ঢুকিয়ে ফেলা হয়েছে৷ এখানে যারা এসেছে— তারা কেউ চায় না যে, তাদের আসল পরিচয় অন্য সবার কাছে ফাঁস হয়ে যাক৷
যে চোখগুলো দেখা যাচ্ছে, একটু লক্ষ্য করলেই তাদের বৈচিত্র্য বোঝা যায়৷ কোনও চোখ মাছের মতো স্থির, নিষ্পলক; কোনও চোখ অনবরত লাট্টুর মতো এদিক-ওদিক ঘুরছে; আবার কোনও চোখে আশ্চর্য ক্রূরতা ঝিলিক দিয়ে যাচ্ছে৷
অবশ্য সবই আড়চোখে দেখে যেটুকু বোঝা যায়, শুধু সেটুকু৷ এখানে কেউই কারোর মুখের দিকে সরাসরি তাকায় না; প্রণবও সেই নিয়ম মেনে চলছে৷ সেইসঙ্গে যতটা সম্ভব সতর্ক থাকারও চেষ্টা করছে৷
এখানে ভীষণ পকেটমারি হয়৷
কিন্তু প্রণব যা চাইছে, তা পাচ্ছে কই?
যে দোকানেই প্রণব যাচ্ছে, তারাই রকমারি স্ফটিক-গোলক দেখাচ্ছে৷ কিন্তু সবই তো সেই গিমিক৷ ভিতরে সেই নকল আলো আর রাসায়নিক ধোঁয়ার কারসাজি৷ অথচ কিছু না-হোক, ঘন্টা-তিনেকের মধ্যে ও অন্তত পনেরো-কুড়িটা বড়-বড় দোকানে তন্নতন্ন করে খুঁজে ফেলেছে৷
প্রণবকে দাঁড়িয়ে পড়তে হল৷
দুটি কফিন একটা দোকানের মধ্যে ঢোকানো হচ্ছে৷ রাস্তাগুলো তো এমনিতেই খুব সরু— গলিপথই বলা যায় প্রায়৷ তার ওপর কফিনদুটো দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে যথেষ্ট৷ দেখে মনে হয় ওগুলোর মধ্যে খুব সম্ভবত ঘোড়ার দেহ আছে৷
প্রণবের মনে পড়ল, আগামীকাল পূর্ণিমা ছিল৷ পূর্ণিমার রাতে যে ঘোড়া মারা যায়, তার কঙ্কালে অদ্ভুত শক্তি থাকে৷ জাদুকরদের কাছে তার দাম অনেক৷
এই দোকানটাও অনেক পুরনো৷ কিছু না-হোক, এরা গত সত্তর বছর ধরে এইসব বিশেষ-বিশেষ তিথিতে মৃত জীবজন্তুর হাড়গোড় বিক্রি করে আসছে৷
ঘোড়া তো সামান্য জিনিস; উপযুক্ত দাম ফেললে এদের কাছে হংসচঞ্চু বা তিমির হাড় পর্যন্ত পাওয়া যাবে৷ অনেক আগে প্রণবও বেশ কয়েকবার এদের দোকানে এসেছে৷
এদিকটায় সব সংকীর্ণ গলি৷ তার মধ্যে রাজ্যের সস্তার জিনিসপত্রের দোকান— পুরনো বই, কমদামী তেল, বাসি চামড়া, ছোটখাট হাড়গোড়, শুকনো জড়িবুটি...
সাধারণ ভাবে মনে হবে, এখানে ভালো কিছু পাওয়ার আশা প্রায় নেই বললেই চলে৷ লোকজনের আনাগোনাও অনেক কম৷ কিন্তু প্রণব জানে, ঠিকঠাক খুঁজলে এখানে মাঝেমধ্যে আশ্চর্য সব জিনিস পাওয়া যায়৷
প্রণব গলিপথেই ঢুকে পড়ল৷ এসেই যখন পড়েছে, তখন সব জায়গা দেখে যাওয়া ভালো৷ আজকের দিনটা তো এমনিই গেছে৷
আরও মিনিট-কুড়ি বৃথা ঘোরাঘুরি করার পর প্রণব দোকানটা দেখতে পেল৷ একেবারে ছোট দোকান৷ বাইরে কোনও শোকেস-টোকেস নেই৷ শুধু পর্দার ফাঁক দিয়ে একটা মৃদু নীল আলো বেরিয়ে আসছে৷
দোকানের বাইরে একটা সাইনবোর্ড টাঙানো৷ তাতে উজ্জ্বল হলুদ রঙ দিয়ে লেখা দোকানের নাম এবং বিবরণটা একেবারে ঝকঝক করছে:
______________________________________
CRYSTAL CLEAR CRYSTAL BALL SHOP®
Specially made crystal spheres are available here
Proprietor : Miss Jenifer
Licence No. 2804ô2004DM
______________________________________
এখানকার বেশিরভাগ দোকানই প্রণবের চেনা৷ কিন্তু এই দোকানটা ও আগে কখনও দেখেছে বলে মনে করতে পারল না৷
অবশ্য এই বাজারে নিত্য নতুন দোকান গজিয়ে উঠছে, পুরনো দোকানের মালিকানা হাত-বদল হচ্ছে৷ এটা হয়তো সেরকম কিছু হবে৷ কারণ, দোকানের চেহারা বেশ পুরনো-পুরনো হলেও, সাইনবোর্ডটা একদম নতুন৷ দেখলেই মনে হচ্ছে, বোধহয় নাক ঠেকালেই ওর থেকে নতুন রঙ আর বার্ণিশের গন্ধ পাওয়া যাবে৷
প্রণব পর্দা ঠেলে ভিতরে ঢুকল৷
ভেতরে মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত কাঠের তাক বানানো৷ দু-দিকের তাকে শুধুই নানা আকারের স্ফিয়ার৷ অন্যগুলোতে বিভিন্ন রকম বাক্স, বয়াম, ছবি, মূর্তি ইত্যাদি রাখা৷ কয়েকটা বাহারি ছোরাও ঝুলছে
এখানে ওখানে৷ একপাশে একটা কাঠের মই দেওয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে রাখা— মনে হয় উঁচু তাক থেকে জিনিস পাড়ার জন্যই৷
‘হাউ ক্যান আই সার্ভ ইউ স্যার?’, ঘরের কোণার দিক থেকে একটা রিনরিনে গলার স্বর ভেসে এল৷
একজন বৃদ্ধা ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন৷ ছোটখাট চেহারা, প্রচন্ড মোটা, চোখদুটো ছোট-ছোট, মাথার চুলগুলো একটা সাদা ফিতে দিয়ে বাঁধা রয়েছে৷ মুখময় একটা হাসি ছড়ানো৷ দেখে মনে হয়— বয়স কিছু না-হোক, অন্তত পঁয়ষট্টি-ছেষট্টি তো হবেই৷
বৃদ্ধা চোখ পিটপিট করলেন, ‘ওয়েলকাম জেন্টলম্যান টু মাই ‘ক্রিস্টাল-ক্লিয়ার ক্রিস্টাল বল শপ’৷ আই অ্যাম দা প্রোপ্রাইটর অফ দিস শপ— মিস জেনিফার৷ হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট ফ্রম মি?’
একটু আশ্চর্য ধরনের মহিলা, সন্দেহ নেই৷ তবে এখানকার কোন মানুষটাই বা আর সহজ-সরল!
দোকানের চেহারা দেখে অবশ্য মনে হচ্ছে না, এখানকার কোনও জিনিস ‘বিশেষ’ হতে পারে বলে৷ তবু এই আপাতত প্রণবের শেষ আশা৷
প্রণব বলল, ‘আমি কিছু ভালো ক্রিস্টাল-স্ফিয়ার দেখতে চাই৷’
মিস জেনিফার একটা রহস্যময় হাসি হাসলেন, ‘কীরকম স্ফিয়ার জেন্টলম্যান— জীবন্ত না জড়বৎ?’
প্রণব একটু চমকে উঠল, ‘মানে?’
মিস জেনিফার মুখ দিয়ে চুকচুক শব্দ করলেন, ‘ভেরি ইজি টু আন্ডারস্ট্যান্ড, ভেরি ইজি৷ জীবন্ত মানে: যে স্ফিয়ারের নিজস্ব ক্ষমতা আছে, যাকে বশ মানাতে হয়, যার কাজ ডিপেন্ড করে তার মালিকের ইচ্ছা আর শক্তির ওপরে৷ আর, জড়বৎ মানে: যে যন্ত্র দ্বারা চালিত হয় এবং শুধুমাত্র ওই সিস্টেমেটেড কিছু কাজই করতে পারে৷’
প্রণব তার মানে ঠিক জায়গাতেই এসেছে৷ এইজন্যই বলে: Never judge a book by it's cover.
প্রণব মনে-মনে উত্তেজিত হল৷ চাপা গলায় বলল, ‘আই নিড দ্যা লিভিং ওয়ান...’
মুখ দেখে মনে হল— মিস জেনিফার খুশি হয়েছেন৷ হয়তো এরকম জিনিসের খরিদ্দার আজকাল আর পান না৷ মাথা নেড়ে বললেন, ‘ভেরি গুড, ভেরি গুড৷’
মিস জেনিফার একটা ফুটবলের সাইজের স্ফিয়ার বের করে রাখলেন প্রণবের সামনে৷ স্ফিয়ারটা অদ্ভুত— অর্ধেকটা স্বচ্ছ, অর্ধেকটা ঘোলাটে৷ প্রণব আগে কখনও এরকম দেখেনি৷
মিস জেনিফার বললেন, ‘তবে এই স্ফিয়ারটা নিয়ে যাও৷ ইয়ং জেন্টলম্যানদের জন্য এটা খুব ভাল৷ ডু ইউ নো, হোয়াই?’
স্ফিয়ারটা ভালো করে দেখতে-দেখতে প্রণব জিজ্ঞাসা করল, ‘কেন?’
মিস জেনিফার ব্যখ্যা করলেন, ‘কারণ, এই যুবক অবস্থাতেই মানুষের মনে ভালো আর মন্দের কন্ট্রাডিকশনটা সবচেয়ে বেশি চলে৷ এর এই ট্রান্সপারেন্ট সাইডটা ভালো দিককে প্রেজেন্ট করে, আর ঘোলা দিকটা মন্দ দিককে৷ এই দুটো জিনিস ব্যালেন্স করেই এটা তৈরি হয়েছে৷ যখন এর ইউজার এর পুরো কন্ট্রোল নিয়ে ফেলবে, তখন তার মেন্টাল স্টেটের ওপর এর রঙ নির্ভর করবে৷ ইট’স এ ডায়ামিটার অফ ইওর মেন্টাল স্টেট টু৷’
প্রণব আশ্চর্য হল৷ তবে আর কথা বাড়াল না৷ দাম মেটানোর জন্য পকেটে হাত দিল৷ কাজ মিটে যাওয়ার ওর মনটা এখন একটু খুশি-খুশি হয়ে আছে৷
হঠাৎ বিদ্যুতের শক... পার্স পকেটে নেই৷
প্রণব প্যান্টের চারটে পকেটই হাতড়াল৷ কিন্তু কোত্থাও মানিব্যাগ নেই৷ কিছু না-হোক— আগে অন্তত পনেরো-ষোলোবার এখানে এসেছে প্রণব৷ এখানকার এত বদনাম কিন্তু কোনওদিন ওর শার্টের একটা বোতাম পর্যন্ত খোয়া যায়নি৷
প্রণব ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে বলল, ‘স্যরি৷ বাজারে মনে হচ্ছে আমার পিকপকেট হয়ে গেছে৷ আমি আজ এটা নিতে পারছি না৷’
বৃদ্ধা কোনও কথা বললেন না৷ কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে স্ফিয়ারের দিকে তাকিয়ে থাকলেন৷ তারপর প্রণবের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এটা আমি তোমাকে ফ্রিতেই দিলাম জেন্টলম্যান৷ কমপ্লিটলি ফ্রি৷ টেক ইট৷’
অবাক হল প্রণব৷ মিস জেনিফার ওকে চেনেন না পর্যন্ত৷ অথচ
বিনামূল্যে এত মূল্যবান একটা জিনিস দিয়ে দিচ্ছেন? ওর সঙ্গে মজা করছেন নাকি?
কিন্তু মিস জেনিফারের চোখে-মুখে মজার বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই৷ সেই রহস্যময় হাসিটাও এখন ওঁর মুখ থেকে মুছে গেছে৷
প্রণব অবাক হয়ে বলল, ‘কিন্তু কেন মিস? আমি না হয় এটা কয়েকদিন পর এসে নিয়ে যাব৷’
মিস জেনিফার মুখ নিচু করলেন৷ তারপর ধীরে-ধীরে দু-পাশে মাথা নেড়ে বললেন, ‘দিস স্ফিয়ার হ্যাজ চুজেন ইউ জেন্টলম্যান৷ আমি একে আর নিজের কাছে রাখতে পারব না— ইভেন নট ফর এ সিঙ্গল ডে৷ থিঙ্ক অ্যাজ, আই অ্যাম গিভিং ইট অ্যাজ এ গিফট৷’
প্রণব আর কোনও উত্তর খুঁজে পেল না৷
মিস জেনিফার একটা বড় ব্রাউন-বোর্ডের বাক্স, চওড়া সেলোটেপ, ধারালো ছুরি আর একগাদা কুচো কাগজ নিয়ে আসলেন৷ এসব জিনিস ঠিকঠাক প্যাকিং করা খুব জরুরি; ভঙ্গুর বস্তু বলে কথা৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন