আরেকটি ‘কেন’

শ্রীজিৎ সরকার

ঘর সম্পূর্ণ অন্ধকার৷ কিন্তু দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়িটা ডিজিটাল ওয়াচ বলে, এই অন্ধকারেও সময় দেখা যাচ্ছে৷ শুধু সময়? সেইসঙ্গে তারিখ, উষ্ণতাও আর আকাশের অবস্থাও দেখিয়ে চলেছে ৷

5 : 00 a.m.

Date: 8th March

Temperature : 7° C– Cloudy

সে চুপচাপ বসে আছে খাটের উপর৷ তার পায়ের পাতা দুটো এখনও হাল্কা-হাল্কা জ্বালা করছে৷ যদিও কোনও ঠোলা বা ঝলসানোর দাগ নেই— তবে এতে কোনও অস্বাভাবিকতাও নেই৷ ব্ল্যাক নেক্রোম্যান্সারদের মধ্যে এরকম উপসর্গ মাঝেমাঝেই দেখা যায়৷

যখন সে ছাত্রী ছিল, তখন এগুলো আরও বেশি-বেশি হত৷ পিঠে কুঁজ উঠত, আচমকা সব চুল সাদা হতে শুরু করত, চোখদুটো হঠাৎ-হঠাৎ বিড়াল বা নেকড়ের মতো হয়ে যেত, হাতদুটোর রঙ কুচকুচে কালো হয়ে যেত, মুখের অর্ধেকটা আগুনের মতো লাল হয়ে উঠত... আরও কতরকম!

সাধারণত এসব অসুখগুলো পাঁচদিন থেকে কুড়িদিন পর্যন্ত স্থায়ী হত৷ খুব কঠিন ছিল সেই সময়টা৷ কারণ, নেক্রোম্যান্সির একেকটা লেভেল টপকানোর জন্য বিভিন্ন রকম স্কোর বাড়াতে হয়— সক্ষমতার স্কোর (স্কোর অফ অ্যাবিলিটি), জ্ঞানের স্কোর (স্কোর অফ উইশডম)... এরকম কোনও অসুস্থতা শরীরে বাসা বাঁধলে, অসুস্থতা চলাকালীন জমা থাকা সক্ষমতার স্কোর থেকে প্রতিদিন এক পয়েন্ট করে কমতে থাকত৷ তবে তার সৌভাগ্য বলতে হয় যে, সে শুধুই শারীরিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হত৷

অন্য অনেকের তো রীতিমতো মানসিক রোগ হত— নানারকম জিনিসে ভীতি, দৃষ্টিবিভ্রম, চূড়ান্ত অবসাদ, মস্তিষ্কবিকৃতির মতো সাঙ্ঘাতিক সব অসুখ৷ তাদের পক্ষে নিজেদের সামলানো এবং আবার প্র্যাক্টিসে ফেরা খুব কঠিন কাজ হত৷

তাদের মধ্যে অনেকের পাগলামি তো আবার ভয়ংকর হয়ে উঠত৷ যেমন সেই মানুষটার হয়েছিল...

সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল৷ আর সেইসঙ্গে একটা অদ্ভুত রাগ আর তীব্র প্রতিশোধস্পৃহা দাবানলের মতো দাউদাউ করে ছড়িয়ে পড়ল তার মাথার মধ্যে৷

মুঠো করে বিছানার চাদর ধরে সে চিবিয়ে-চিবিয়ে বলল, ‘তোমরা আমার প্রিয় মানুষকে কেড়ে নিয়েছ! তোমাদের অসতর্কতার জন্য আমি এই নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছি৷ তোমরা এত সহজে পার পাবে? কিছুতেই না৷ আনন্দ করে নাও কটাদিনের জন্য৷ এ জগতের কোনও কিছুই স্থায়ী না৷ তোমাদের ওই সুখ আর আনন্দও স্থায়ী হবে না৷’

সে একটা কথা ভেবে হাসল৷

এই যে ছেলেটা সুস্থ হয়ে গেল; ওরা নিশ্চয়ই এর পিছনে দুটো কারণ ভাবছে—

এক: রোগটা তেমন মারাত্মক কিছু ছিল না৷

দুই: রোগনির্ণয় আর ওষুধটা ভালো ছিল৷

আসল কারণ তো ওই মূর্খ দম্পতির মাথাতেই আসবে না৷ রোগটা দীর্ঘস্থায়ী হল না; কারণ— রোগটা যে দিয়েছিল, সে নিজেই চায়নি ওটা দীর্ঘস্থায়ী হোক৷ সে চেয়েছিল, ওই রোগের সঙ্গে আসা দুশ্চিন্তাটাই শুধু দীর্ঘস্থায়ী হোক৷ আর সেই দুশ্চিন্তার স্রোতে সব প্রেম, ভালোবাসা, সোহাগ, সঙ্গমের চিন্তা ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার হয়ে যাক৷

আর এই কাজে সে সফল৷

আকাঙ্ক্ষিত কোনও কিছুকে সফল করতে পারার আনন্দই আলাদা৷ আর সেই সাফল্য যদি আসে নিজের হাতে, তবে তো আনন্দের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়৷

সেই আনন্দ এখন হাসি হয়ে ফুটে উঠল তার মুখে, ‘আমি কি পারি না— এখনই, একমুহূর্তের মধ্যে সব খেলা শেষ করে দিতে? নিশ্চয়ই পারি৷ কিন্তু আমি সেটা চাই না৷ আমি চাই একটু-একটু করে সবকিছু ধ্বংস করে দিতে৷ যেমন জ্বালা আমি বুকের মধ্যে নিয়ে বেঁচে আছি, তেমন জ্বালা তোমাদেরও অনুভব করাতে... সহ্য করতে না-পারলেও সহ্য করতে হবে৷ পালাতে চাইলেও পালাতে পারবে না৷’

সে নিজের উরু খিমচে ধরল৷

নখগুলো যেন চামড়া ভেদ করে ঢুকে যেতে চাইছে৷ সব আক্রোশ যেন শক্তি হয়ে ওই দশ আঙুল বেয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে৷

এই শক্তির আসল আবাস তো তার মনে— তার চেতন-অবচেতন জুড়ে৷ এত শোক, এত প্রতিকূলতা সহ্য করেও কি সে এমনি-এমনি এই জায়গায় আসতে পেরেছে?

এই বিদ্যার চর্চা করতে গেলে শরীর, মন আর মস্তিষ্কের উপর যে চাপ পড়ে— সেটাই তো অধিকাংশ লোক সহ্য করতে পারে না! এই যে স্পেলগুলো, বিশেষত যেগুলো দিয়ে কারোর জীবনকে অভিশপ্ত করা হয়, কারোর জীবনে কোনওরকম অশুভ প্রভাব আনা হয়— সেগুলোর প্রত্যেকটাই তো ব্যবহারকারীর উপরেও কিছু না-কিছু নেতিবাচক প্রভাব ফেলে৷ অনেকটা সেই নিউটনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সূত্রের মতো: Every action has an equal and opposite reaction.

সেই প্রভাব অবশ্য কাটানো যায়৷ তবে তার উপায়ও যথেষ্ট কঠিন৷ ফিরে গিয়েই তাকে আবার সেটা ব্যবহার করতে হবে৷

সে একটা ছোট শিশি বের করল৷ হাত ধরতে এটা ভাগ্যিস সে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল৷ আপাতত তো মনে হচ্ছে, এই দিয়েই পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে৷

সে শিশি থেকে কয়েকফোঁটা তেল হাতের তালুতে ঢেলে নিল৷ ঘষে-ঘষে তেলসুদ্ধ দু-হাতের তালু গরম করে তুলল৷ তারপর বেশ কিছুক্ষণ ধরে তেলটা দু-পায়ের পাতায় টেনে-টেনে মালিশ করল৷ গোড়ালির নীচ, আঙুলের ফাঁক, নখের গোড়াগুলো পর্যন্ত বাদ দিল না৷ এবার সারাদিন ধরে ত্বক তেলটা শোষণ করবে৷

সে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, ‘তোমাদের কোনও ধারনাই নেই আমি কী-কী করতে পারি৷ আমি তোমাদেরকে নগ্ন করিয়ে রাস্তায় নাচ করাতে পারি৷ তোমাদেরকে দিয়ে চুরি করাতে পারি, খুন করাতে পারি, ধর্ষণ করাতে পারি; তোমাদেরকে দিয়ে তোমাদের সন্তানকে হত্যা করাতে পারি, তারপর তোমাদের দ্বারাই তার কাঁচা রক্ত-মাংস ভক্ষণ করাতে পারি; জীবন্ত শব বানিয়ে দিতে পারি তোমাদের, সেসব হিংস্র পশুর চরিত্র তোমাদের মধ্যে সমাহিত করে দিতে পারি— যারা কেবল ক্ষুধা-তৃষ্ণা-শিকার-সঙ্গম ছাড়া আর কিছু জানে না... চাইলে তোমাদেরকে স্রেফ মুছেও দিতে পারি৷ এই পৃথিবীর— না-না, শুধু পৃথিবীর কেন? এই ব্রহ্মান্ডের কেউ আর তোমাদের হদিশটুকুও পাবে না৷ কিন্তু আমি এসব কিচ্ছু করব না৷ শুধু আমি তোমাদের শান্তিটুকু নষ্ট করে দেব৷ শুধু শান্তিটুকু... যেমনভাবে... আর তারপর...’

সে জড়িয়ে আসা কথাটা আর শেষ করতে পারল না৷ আচমকা তার শরীরের মধ্যেটা কেমন যেন গুলিয়ে উঠল, আর দু-চোখ বেয়ে ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়ল৷ জল গড়াতেই থাকল, আর তার শরীরও কেঁপে-কেঁপে উঠতে থাকল৷ তবে মুখ দিয়ে কোনও শব্দ বের হল না৷ নিঃশব্দে কাঁদার অভ্যাস তার আছে৷

সকল অধ্যায়
১.
ম্যাজিক শো থেকে শুরু...
২.
সকালের হেডলাইন
৩.
দুর্ঘটনার পরে
৪.
‘সে’ আছে আড়ালে
৫.
রাত এবং উপহার
৬.
আবার রহস্যময় অঘটন
৭.
নিঝুম দুপুরের আগন্তুক
৮.
একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব
৯.
শান্তির স্নান
১০.
কেমন আছে অনুরাধা?
১১.
নতুন দিনের প্রস্তুতি
১২.
স্বাগত আমার ঘরে
১৩.
আবার ম্যাজিক-শো
১৪.
বুবাই কোথায়
১৫.
আবার বাড়িতে ফেরা
১৬.
আয়না, ওয়াইন, পুতুল এবং...
১৭.
বিভীষিকাময় রাত
১৮.
কোকিল মানে বসন্ত; কোকিল মানে...
১৯.
আরেকটি ‘কেন’
২০.
সাফারি টাইম
২১.
ক্রিস্টাল-ক্লিয়ার ক্রিস্টাল বল শপ
২২.
ত্রুটি সংশোধন
২৩.
নখ কেন কালো
২৪.
স্বচ্ছ স্ফটিক; ঘোলা স্ফটিক
২৫.
ঢাকা থাক, থাক ঢাকা...
২৬.
বেড়ানোর ছবি
২৭.
বহুদিন পর; আবার!
২৮.
নিষ্ফলতার আক্রোশ
২৯.
একটুর জন্য...!
৩০.
অ-সাক্ষাৎ এবং সাক্ষাৎ
৩১.
‘সে’ ছিল, ‘সে’ আছে...
৩২.
একটা অন্যরকম রবিবার
৩৩.
প্রচেষ্টা এবং অভিজ্ঞতা
৩৪.
অন্তিম প্রস্তুতি
৩৫.
দৃশ্য এবং অদৃশ্য
৩৬.
কোন সে সুদূর অতীত হতে...
৩৭.
রইল বাকি এক
৩৮.
জানা এবং অজানা
৩৯.
সময় এসেছে কাছে
৪০.
ইট’স ফাইন
৪১.
ঘন হয়ে উঠেছে অন্ধকার
৪২.
শব্দটীকা
৪৩.
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জী

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%