শ্রীজিৎ সরকার
অনুরাধার সামনের দিকের চুলগুলোয় আরও একটু পাক ধরেছে, কপালের চামড়ায় আরও কয়েকটা ভাঁজ এসেছে, চোখের তলায় আরও কিছুটা কালি পড়েছে৷ বাকি সব একই আছে— সেই দু-চোখের ভাষাহীন দৃষ্টি, স্থির ঠোঁট, নিশ্চল হাত-পা, ভাবলেশহীন অভিব্যক্তি...
গত চারবছর ধরে অনুরাধা এই একইভাবে আছে৷ যখনই স্মিতা এসেছে, ওকে হুইলচেয়ারে বসে থাকতে দেখেছে৷ ডাকলে শুধু একবার ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছে— ব্যস, এইটুকুই৷
আজ থেকে বছর ত্রিশ আগে একদিন অনুরাধা হঠাৎ বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল৷ মানে আন্দাজ তো সেরকমই করা হয়৷ তখন ওর বয়স বোধহয় আঠারো-ঊনিশ হবে! আর স্মিতার নিজের বয়স কতই বা হবে— বড়জোর বারো৷
তারপর যেমন হয় আর কী! থানা-পুলিশ, খোঁজাখুঁজি, মিসিং ডায়েরি,
খবরের কাগজে ‘সন্ধান চাই’ কলামে বিজ্ঞাপন... কিন্তু কিছুতেই অনুরাধার আর কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি৷
একেবারে না-ভুলে গেলেও, সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে স্মিতার মনে অনুরাধার স্মৃতিটা ক্রমশ ফিকে হয়ে গিয়েছিল৷ ঘটনার পর ঘটনার স্রোত শোক আর শূন্যতার ওপর পলি চাপা দিয়ে গিয়েছিল৷
এরপরের ঘটনাটা হঠাৎ এই চারবছর আগে একদিন ঘটেছিল৷
স্মিতা সেদিন বোধহয় বাজার করতে যাচ্ছিল৷ সেই সময় ও অনুরাধাকে শপিং মলের উল্টোদিকের রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেছিল— অবিকল আজকের এই অবস্থায়৷ প্রথমটা অবশ্য চিনতে পারেনি; তবে খুব চেনা-চেনা মনে হয়েছিল৷ ত্রিশবছরে একটা মানুষের চেহারায় তো কম ভাঙা-গড়া আসে না! তারপর স্মৃতি হাতড়াতে-হাতড়াতে আচমকাই সেই পুরনো চেহারাটা ঝলসে উঠেছিল৷
ভাগ্যিস বদলে যাওয়া অনুরাধার চেহারায় সেই পুরনো আদলের খানিকটাও অবশিষ্ট ছিল, আর স্মিতার ঘোলা হয়ে যাওয়া স্মৃতিতে অনুরাধার চেহারাটা তখনও কিছুটা স্পষ্ট হয়ে টিঁকে ছিল৷
তারপর ধুলো-বালি-মল-মূত্রে মাখামাখি, নিশ্চল-নির্জীব অনুরাধাকে যে কীভাবে বাড়ি পর্যন্ত এনেছিল— সে শুধু স্মিতাই জানে৷
তারপর ডাক্তার, বড় ডাক্তার, আরও বড় ডাক্তার...
কেউই কোনও আশার কথা শোনাতে পারেননি৷ তাঁরা বলেছিলেন অনুরাধার স্নায়ুগুলো নাকি আচমকাই বিকল হয়ে পড়েছে; তারা সাড়া নিতে পারছে, কিন্তু দিতে পারছে না৷ সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, স্নায়ুবৈকল্যের কারণটা কিছুতেই ধরা যাচ্ছে না৷ কারণই যখন অজানা তখন সঠিক তো চিকিৎসা আর কীভাবে হবে!
ডাক্তারের নির্দেশে তাই অনুরাধাকে এখানে ভর্তি রাখা হয়েছে৷
এখানে ওর ওপর নিত্য-নতুন চিকিৎসা চলছে৷ ডাক্তার, নার্স আর প্যারামেডিকেল স্টাফরা মিলে অনবরত ওর ঘুমিয়ে পড়া প্রাণশক্তিটাকে জাগিয়ে তোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে৷
কিন্তু এখনও পর্যন্ত ফলাফল ‘শূন্য’৷
স্মিতা প্রতিমাসে দুই-তিনবার করে আসে অনুরাধাকে দেখতে৷ কখনও-কখনও রণজয়ও আসে ওর সঙ্গে৷ বুবাইকে ও ইচ্ছা করেই
এখানে নিয়ে আসেনি৷ তবে ছেলেকে কিছু-কিছু বলেছে তার বড়মাসির গল্প৷
নার্স স্মিতার হাতে একটা পাম্প-বোতল থেকে কয়েক ফোঁটা স্যানিটাইজার দিল৷ স্মিতা দু-হাত ভালো করে ঘষে নিয়ে, হাঁটু গেঁড়ে বসল দিদির সামনে৷
অনুরাধার মুখের দিকে তাকিয়ে স্মিতা বলল, ‘দিদি, আমি স্মিতা বলছি৷ আমাকে চিনতে পারছিস না? এই দিদি... আমি স্মিতা৷ দিদি... এই দিদি...’
অনুরাধার চোখ আজকে আর সামনের সাদা দেওয়াল থেকে নড়ল না৷ শুধু ওর হাতের আঙুলগুলো খুব সামান্য কেঁপে উঠল৷ মনে হল, ও বোধহয় ওগুলো দিয়েই একটা কিছু বোঝাতে চাইছে৷
কিন্তু অনুরাধার স্নায়ু খুব দুর্বল; অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপর ওর নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে৷ তাই ইশারাটা আর পরিষ্কার ফুটল না৷
আর কিছু বলার নেই স্মিতার৷ ও আরও এক-দু-বার ‘দিদি-দিদি’ ডেকে, অনুরাধার গালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে, উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল৷
প্রতিবারই এই একই ঘটনা, স্মিতার এই একই প্রচেষ্টা, আর অনুরাধারও এই একই প্রতিক্রিয়া৷
স্মিতা নার্সের কাছে অনুরাধার খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিল৷
নতুন কোনও তথ্য নেই৷ সেই চামচ-মাপা ফলের রস, চিকেন স্যুপ, ডাল আর ডবল ট্রিম দুধ দিয়ে কীসব হেলথ-ড্রিঙ্কস৷ সমস্ত ওষুধপত্র তো চলছেই, সঙ্গে আরও কীসব থেরাপিও দেওয়া হচ্ছে৷ কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেসবে কোনও সাড়া আসেনি৷
চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে জড়িত মানুষেরা সাধারণত কখনওই পুরোপুরি নেতিবাচক কথা বলে না৷ নার্সটিও তাই বলল, ‘এখনও পর্যন্ত তেমন কোনও ইমপ্রুভমেন্ট নেই৷ তবে ডিটোরিয়েটও করেনি৷ অর্গ্যানগুলোও ঠিকঠাক কাজ করছে৷ আর এইসব রোগী না, ভালো হয় হঠাৎ করে৷ হয়তো একদিন দেখবেন— কথাবার্তা বলছে, হাঁটাচলা করছে... কম তো এরকম কেস দেখলাম না!’
এইসব কথা শুনে স্মিতা আগে উৎসাহ পেত৷ মনে করত— তাই তো, পৃথিবীতে তো কম আশ্চর্য ঘটনা ঘটছে না! অনুরাধার সঙ্গে সেরকম কিছু ঘটতেই বা কতক্ষণ?
কিন্তু সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে সেই উৎসাহ ক্ষয়ে গেছে৷
অনুরাধা কিন্তু বরাবরই শান্তশিষ্ট ছিল, পড়াশোনাতেও যথেষ্ট মেধাবী ছিল৷ বাড়িতে, স্কুলে, কোচিংয়ে সব জায়গাতেই কথাবার্তা কম বলত৷ দিনের অধিকাংশ সময়ই নিজের ঘরে, নিজের পড়াশোনা নিয়ে কাটাত৷ টিচারদের গুডবুক আর পরীক্ষার প্রোগ্রেস রিপোর্ট— দুটোতেই ওর বরাবরের গ্রেড A+৷
কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল!
স্মিতার দুঃখ একটাই— বাবা-মা আজীবন বুক চাপড়েছেন, চোখের জল মুছেছেন তাঁদের বড়মেয়ের জন্য; আর যখন তাকে পাওয়া গেল, দু-জনের কেউই বেঁচে নেই৷
তাঁরা একসময় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন যে, অনুরাধা আর ফিরবে না৷ সব সম্পত্তি তাই তাঁরা স্মিতার নামে রেখে গিয়েছেন৷ স্মিতা এখন তার থেকেই দিদির চিকিৎসার খরচ চালাচ্ছে৷
তবে একদিক ব্যাপারটা থেকে ভালোই হয়েছে যে, বাবা-মা অনুরাধাকে খুঁজে পাওয়ার আগেই মারা গেছেন৷ সুস্থ-স্বাভাবিক মেয়েকে এই অবস্থায় দেখলে যে তাদের মানসিক অবস্থা কী হত— ভাবলেই স্মিতা শিউরে ওঠে৷
স্মিতা অনুরাধার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, ‘আসি রে দিদি৷ ভালো থাকিস৷’
বাইরে এসে স্মিতা গত সপ্তাহের বিল মিটিয়ে দিল৷ তারপর রাস্তায় চলে এল৷
এখন রোদটা একটু কম আছে৷ তবে গাড়ির চাপ খুব, অহরহ লোকজন রাস্তা পার হচ্ছে৷
‘একটু শুনবেন...’
অচেনা গলার স্বর, একেবারে পিছন থেকেই আসছে৷
স্মিতা মুখ ফিরিয়ে একজনকে এগিয়ে আসতে দেখল৷ যে আসছে, তার চেহারাটা ওর ভালোই চেনা— এই সেন্টারেরই দারোয়ান৷ কয়েকবছর ধরে স্মিতা একে এখানে দেখছে৷
স্মিতা বলল, ‘আমাকে ডাকছেন?’
দারোয়ান ঘাড় নাড়ল, ‘হ্যাঁ৷ আপনিই অনুরাধা মজুমদারের আত্মীয় তো?’
স্মিতা সায় দিল, ‘হ্যাঁ৷ আমি অনুরাধা মজুমদারের বোন৷ কেন বলুন তো?’
দারোয়ান একটু এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিয়ে নিচু গলায় বলল, ‘ওনাকে নিয়ে তো মাঝখানে খুব ঝামেলা হল৷ আপনাকে কেউ কিছু বলেনি?’ অনুরাধাকে নিয়ে ঝামেলা? স্মিতা আশ্চর্য হল৷ অনুরাধা তো উন্মাদ নয় বা অস্বাভাবিক কোনও আচরণ করে না যে, ওকে নিয়ে ঝামেলা হবে৷ তাছাড়া স্মিতার দিক থেকেও তো কোনওদিন টাকা-পয়সার কোনও সমস্যা হয় না৷
স্মিতা জিজ্ঞাসা করল, ‘কী সমস্যা বলুন তো?’
দারোয়ানটা গলা নামিয়ে বলল, ‘একজন ওনাকে দেখতে এসেছিলেন৷ তিনি নাকি ওনার ছেলে! খুব জোর করছিলেন ঢোকার জন্য৷ আমরা অবশ্য ঢুকতে দিইনি৷ এখানকার নিয়ম তো জানেন...’
ভুরু কুঁচকে গেল স্মিতার৷
অদ্ভুত ব্যাপার! অনুরাধার আবার ছেলে এলো কোত্থেকে? ও তো অবিবাহিত বলেই... অবশ্য মাঝখানে কয়েকবছর ওর সঙ্গে কী হয়েছিল না-হয়েছিল— স্মিতা সেসবের কিছুই জানে না৷
যদি তর্কের খাতিরে মেনে নেওয়াই যায়, বাড়ি থেকে বেরিয়ে অনুরাধা বিয়ে করেছিল এবং ওর একটা ছেলে হয়েছিল; তবে এতদিন সেই ছেলে ছিল কোথায়? বরং সেক্ষেত্রে ভেবে নেওয়াই যায়, অনুরাধার এই পরিণতির জন্য সেই ছেলেই হয়তো দায়ী৷
স্মিতা ভুরু কুঁচকেই বলল, ‘আপনি ঠিক শুনেছেন, সে অনুরাধা মজুমদারের ছেলে?’
দারোয়ান জোরে ঘাড় নাড়ল, ‘হ্যাঁ ম্যাডাম৷ আমার সঙ্গেই তো তার বেশি কথা হয়েছিল৷ আমাকে ঘুষ অবধি দেবে বলেছিল৷ কিন্তু আমি তো অসৎ কাজ করি না ম্যাডাম৷ আমি ঠিক শুনেছিলাম, লোকটা নিজেকে অনুরাধা মজুমদারের ছেলে বলছিল৷’
স্মিতার কপালে কয়েকটা ভাঁজ বাড়ল৷ ও একটু গম্ভীর গলায় বলল, ‘কত বয়স হবে ছেলেটার?’
দারোয়ানটা মনে-মনে হিসাব করে নিয়ে বলল, ‘এই পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর মতো হবে৷’
স্মিতা জিজ্ঞাসা করল, ‘নাম-ধাম কিছু বলেছে?’
দারোয়ান একটু মাথা চুলকে নিয়ে বলল, ‘একবার মনে হয় বলেছিল!’ তারপর একটু আমতা-আমতা করতে লাগল, ‘কী একটা নাম... কী যেন বেশ... ঠিক মনে পড়ছে না... আসলে তখন ঝামেলা সামলাচ্ছিলাম তো!’
স্মিতা একবার ভাবল, ভিতরে গিয়ে একবার খোঁজ নেবে কিনা৷ ওরা তো এতক্ষণ ওকে এসব ব্যাপারে কিছুই বলল না৷ অথচ জানানোটা কর্তব্য ছিল৷
তবে পরক্ষনেই মনে হল, খোঁজ নেওয়াটা বোধহয় খুব-একটা ভালো কাজ হবে না৷ যদি ওরা ব্যাপারটা স্রেফ অস্বীকার করে, তখন? প্রমাণ দেওয়ার জন্য দারোয়ানের নাম বললে হয়তো বেচারার চাকরিটাই যাবে৷ তার চেয়ে, যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে৷ এমনিতে তো কারোর কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়নি৷ পরে তেমন কিছু ঘটলে, তখন দেখা যাবে৷
স্মিতা চিন্তা করতে-করতে ফিরে আসছিল৷ এমন সময় দারোয়ান বলল, ‘আসলে কি জানেন তো ম্যাডাম, এসব খবর তো এরা লিক করতে দেয় না৷ কিন্তু পেশেন্টের বাড়ির লোকের তো জানা দরকার৷ তাই কিনা বলুন? আমি বলেছি— শুনলে যে আমার কী করবে...’
একটা ‘থ্যাংকস’ বলতে যাচ্ছিল স্মিতা৷ হঠাৎ দারোয়ানকে হাত কচলাতে দেখে ব্যাপারটা বুঝতে পারল৷
স্মিতা ব্যাগ থেকে একটা একশো টাকার নোট বের করে এগিয়ে দিল দারোয়ানের দিকে৷
দারোয়ান টাকা পেয়ে একগাল হাসল, ‘আসি ম্যাডাম৷ আমার নামটা যেন জানাজানি না-হয়, একটু দেখবেন৷ গরীব মানুষ...’
আরও কীসব বলে যাচ্ছিল দারোয়ানটা৷ কিন্তু সেসব আর স্মিতার মাথায় ঢুকছিল না৷ ওর মাথায় একটাই প্রশ্ন: এই অনুরাধার ছেলেটা আবার কে?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন