অন্তিম প্রস্তুতি

শ্রীজিৎ সরকার

সমস্ত প্রস্তুতি নেওয়ার পালা শেষ৷ আজ শুধু সরাসরি যুদ্ধে নামার আগে শেষবারের মতো শক্তি সঞ্চয় করে নেওয়ার পালা৷ অবশ্য সে জানে, তার মধ্যে আগে থেকেই যে পরিমাণ শক্তি সঞ্চিত আছে— সেটা যথেষ্টের থেকেও বেশি৷

তবু, অধিকন্তু ন দোষায়ঃ৷

তার ঘরে একটাই আয়না৷ এমনিতে সেটা পরিষ্কার; তবু বিশেষ উপলক্ষ্যে আয়নাটাকে সে আবার খুব ভালো করে মুছেছে৷ নতুন করে যাতে নোংরা না-হয়, তাই সে ওটাকে মোছার পর থেকে কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখেছিল৷ এই একটু আগে সেই আবরণ সরিয়ে দিল৷

এখন হীরের মতো ঝকঝক করছে কাচটা; তার ওপরে রক্ত দিয়ে মোটা-মোটা অক্ষরে লেখা:

TRanCing OuT aNd SeXuAL EcStaSy

ছোট-বড় অক্ষরগুলো একসঙ্গে একটা অদ্ভুত দৃষ্টিবিভ্রম তৈরি করেছে৷ মনে হচ্ছে, লেখাটা যেন জীবন্ত৷ একটানা তাকিয়ে থাকলে মাথার মধ্যেটা কেমন যেন ধোঁয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে, চোখের সামনে যেন অদ্ভুত সব জ্যামিতিক বিন্যাস কেঁপে-কেঁপে বেড়াচ্ছে!

আয়নার সামনে কেবল দুটো মোমবাতি জ্বলছে৷ তাদের ম্লান, হলুদ আলো ঘরকে প্রতিমূহুর্তে আরও— আরও— আরও রহস্যময় করে তুলছে৷

সে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল৷

এখন তার শরীরে কোনও পোশাক নেই৷ তার নিদাগ, নিভাঁজ, ঝকঝকে চামড়ায় মৃদু আলো পিছলে যাচ্ছে; গভীর কালো চোখের মণিতে এক অজানিত, রহস্যময় ইশারা ফুটে বেরোচ্ছে; চকচকে চুলে, উদ্ধত স্তনবৃন্তে, মসৃণ পেটে, মাংসল উরুতে— এক উদগ্র আবেদন প্রকাশ পাচ্ছে৷ তারা যেন সমস্বরে বলছে: আমাদেরকে কামনা করো, কাছে এসো, ছুঁয়ে দেখো...

একেই বোধহয় বলে অক্ষয়-যৌবন৷ শুধুমাত্র একেই!

তাকেই বোধহয় বলা যায় অনন্ত-যৌবনা৷ একমাত্র তাকেই!

আবরণ বা আভরণ বলতে তার গলায় কেবল একটা সরু সোনার চেন রয়েছে৷ সেই চেন থেকে ঠিক স্তনবিভাজিকার কাছে ঝুলছে একটা টুকটুকে চুনীর লকেট— যার ওপর পবিত্র আত্মাদের নাম আর চিহ্ন সূক্ষ্মরেখায় খোদাই করা রয়েছে৷ আগে এই লকেটটা পান্না দিয়ে তৈরি ছিল৷ কিন্তু সবুজের থেকেও লাল তার বেশি প্রিয় রঙ বলে, সে এটাকে পরে চুনী দিয়ে বানিয়ে নিয়েছে৷

যখন সে ছাত্রী ছিল, তখন এসব হার বা লকেট ছিল না৷

এই ডায়াগ্রামটা তখন সে একটা ভূর্জপত্রে সামুদ্রিক কচ্ছপের রক্ত দিয়ে এঁকে, বামপকেটে ভরে নিয়ে ঘুরত৷ তারপর এই লকেট বানানো হল৷ অবশ্যই সেই ভূর্জপত্রের থেকে এর শক্তি বেশি; কারণ সূর্যের ওপর অন্য যে-কোনও কিছুর থেকে রত্নের প্রভাব সবচেয়ে বেশি হয়৷

মোমবাতির রহস্যময় আলোয় নিজের কামিনী রূপ দেখে সে নিজেই হাসল৷

‘আমি যদি পুরুষ হতাম, আমি নিজেই হয়তো নিজেকে কামনা করতাম৷ কিন্তু সব বৃথা গেল... অবশ্য বৃথা আর কী! দু-দিনের ভোগসুখের বদলে আমি এই অসীম শক্তি পেয়েছি...’

সত্যিই তাই৷ কৌমার্য নেক্রোম্যান্সারদের এক আলাদা রকমের শক্তি দেয়৷ যাদের এটা অটুট থাকে— আত্মারা তাদের প্রতি বেশি প্রসন্ন, বেশি আকর্ষিত হয়৷

সে একটানা তাকিয়ে থাকল আয়নার লেখাটার দিকে৷ মাথার মধ্যেটা চিনচিন করে উঠল, রগ দপদপ করে উঠল, তারপর আস্তে-আস্তে সে সব ভুলে যেতে শুরু করল৷

তার দৃষ্টি এখন ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে৷ মনের মধ্যে এক অদ্ভুত অনুরণন শুরু হয়েছে৷ তার চারপাশে যেন একটা অদ্ভুত আলোর স্রোত বয়ে চলেছে, আর সে যেন সেই স্রোতে মাছের মতো সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে৷ বাইরের সবকিছু হারিয়ে যাচ্ছে তার স্মৃতি থেকে, তার ভাবনাচিন্তা থেকে৷ শরীর অবসন্ন, অথচ মন স্ফূরিত৷

এর অর্থ: সে এসেছে... অবশ্যই এসেছে...

‘হে মহান আত্মা, আমি সজ্ঞানে এবং স্বেচ্ছায় আমার হৃদয় ও শরীর আপনার কাছে সমর্পণ করছি৷ আসুন, প্রবেশ করুন আমার মধ্যে৷ মিলনের জন্য আমি তৈরি...’

তার শরীরটা যেন পাথরের তৈরি মূর্তির মতো ভারী মনে হচ্ছে, চোখের পাতা আবেশে বুজে আসতে চাইছে; কিন্তু মনটা আশ্চর্যরকমের হালকা হয়ে আসছে৷ এক অন্যরকম আবেশ ছুটে যাচ্ছে শিরা-উপশিরার মধ্যে দিয়ে৷

ecstasy. . . More Ecstasy. . . MOST ECSTASY. . .

কতদিন তার শরীরে-মনে এমন পুলক জাগে না! সেই যে তার স্পর্শ, মারা যাওয়ার আগের দিন সে একটা ছোট চুম্বন দিয়েছিল কপালে— সেই ছিল তার শেষ পরমানন্দ পাওয়া৷

আস্তে-আস্তে সে আয়নার সামনে থেকে উঠে পড়ল৷ এখন তার শরীর-মন এক আশ্চর্য অতীন্দ্রিয় অনুভূতিতে ভরে উঠেছে; এই পরিবেশ, এই পৃথিবী— সবকিছুকে তুচ্ছ বলে মনে হচ্ছে৷ এর অর্থ, আত্মা আর তার নিজের মধ্যে আধ্যাত্মিক সেতু তৈরি সম্পূর্ণ৷

এই হল মিলনের উপযুক্ত সময়৷

সে টানটান হয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়৷ এই বিছানার চারপাশে ‘স্পিরিট পাউডার’ ছড়ানো৷ কোনও দুষ্ট আত্মার ক্ষমতা হবে না, সেই রেখা ভেদ করে ভিতরে ঢোকার৷ সুতরাং এই ঘেরাটোপের মধ্যে সে নিরাপদে নিজের কাজ সমাধা করতে পারবে৷

ত্যাজিয়াছি যত আবরণ,

রহিয়াছে কেবল চর্ম-নখর-কেশ;

মম উৎসর্গীকৃত শরীরের

আরও-আরও গভীরে করহ প্রবেশ৷

স্তনে, ওষ্ঠে, যোনিতে—

জাগিয়াছে অলৌকিক কামনা;

চরিতার্থ করিয়া এবং করাইয়া

নিভায়ে দাও মম সকল যাতনা...

অনেকক্ষণ চলল এই প্রক্রিয়া— প্রায় চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ মিনিট ব্যাপী তো বটেই৷ গোটা সময়টা জুড়ে সে ক্রমাগত আত্মার ফিসফিসানি শুনতে পাচ্ছিল, তাঁর তপ্ত নিঃশ্বাসের স্পর্শ অনুভব করতে পারছিল৷

এক অতীন্দ্রিয় অনুভূতি চঞ্চল সাপের মতো তার শরীর বেয়ে ছুটে বেড়াচ্ছিল৷

অবশেষে একসময় দু-জনেই তৃপ্ত হল৷

সে এবার আত্মাকে চলে যাওয়ার অনুমতি দিল, ‘হে মহান আত্মা,

এখানে আসার জন্য এবং মিলনের মাধ্যমে আমাকে শক্তি প্রদান করার জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ৷ এখন আমি আপনাকে এই শর্তে যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছি যে, ভবিষ্যতে আবার যখনই আমি আহ্বান করব, আপনি উপস্থিত হবেন৷’

এবার তার শরীর হাল্কা হয়ে আসল, দৃষ্টি স্বচ্ছ হল৷

সে ঘরের কালো মেঝের ওপর একটা বড় হরিণের চামড়া বিছিয়ে দিল— যেটা প্রায় গোটা অবস্থায় পশুটির শরীর থেকে ছাড়িয়ে নেওয়া হয়েছিল৷ তারপর বাতি-দুটো নিভিয়ে, নগ্ন অবস্থাতেই তার ওপর শুয়ে পড়ল৷

যে কোনও শক্তিশালী রিচ্যুয়াল করার পর— প্রাপ্ত শক্তি শরীরে

দ্রবীভূত করার জন্য, পশুর চামড়ার ওপর শুয়ে একটা গভীর ঘুম সম্পূর্ণ করা খুব প্রয়োজন৷

সকল অধ্যায়
১.
ম্যাজিক শো থেকে শুরু...
২.
সকালের হেডলাইন
৩.
দুর্ঘটনার পরে
৪.
‘সে’ আছে আড়ালে
৫.
রাত এবং উপহার
৬.
আবার রহস্যময় অঘটন
৭.
নিঝুম দুপুরের আগন্তুক
৮.
একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব
৯.
শান্তির স্নান
১০.
কেমন আছে অনুরাধা?
১১.
নতুন দিনের প্রস্তুতি
১২.
স্বাগত আমার ঘরে
১৩.
আবার ম্যাজিক-শো
১৪.
বুবাই কোথায়
১৫.
আবার বাড়িতে ফেরা
১৬.
আয়না, ওয়াইন, পুতুল এবং...
১৭.
বিভীষিকাময় রাত
১৮.
কোকিল মানে বসন্ত; কোকিল মানে...
১৯.
আরেকটি ‘কেন’
২০.
সাফারি টাইম
২১.
ক্রিস্টাল-ক্লিয়ার ক্রিস্টাল বল শপ
২২.
ত্রুটি সংশোধন
২৩.
নখ কেন কালো
২৪.
স্বচ্ছ স্ফটিক; ঘোলা স্ফটিক
২৫.
ঢাকা থাক, থাক ঢাকা...
২৬.
বেড়ানোর ছবি
২৭.
বহুদিন পর; আবার!
২৮.
নিষ্ফলতার আক্রোশ
২৯.
একটুর জন্য...!
৩০.
অ-সাক্ষাৎ এবং সাক্ষাৎ
৩১.
‘সে’ ছিল, ‘সে’ আছে...
৩২.
একটা অন্যরকম রবিবার
৩৩.
প্রচেষ্টা এবং অভিজ্ঞতা
৩৪.
অন্তিম প্রস্তুতি
৩৫.
দৃশ্য এবং অদৃশ্য
৩৬.
কোন সে সুদূর অতীত হতে...
৩৭.
রইল বাকি এক
৩৮.
জানা এবং অজানা
৩৯.
সময় এসেছে কাছে
৪০.
ইট’স ফাইন
৪১.
ঘন হয়ে উঠেছে অন্ধকার
৪২.
শব্দটীকা
৪৩.
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জী

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%