শ্রীজিৎ সরকার
এখন বেলা প্রায় দেড়টা৷
রণজয় অফিসে, বুবাই স্কুলে৷ দৃশা কাজ সেরে চলে গেছে, হয়তো একটু পরে আবার আসবে৷ এমনিতে সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকার কথা হলেও, ও মাঝেমধ্যে এই সময়টার জন্য বাড়ি চলে যায়৷ এখন কোনও কাজ থাকে না বলে স্মিতাও আপত্তি করে না৷
আপাতত স্মিতা তাই বাড়িতে একাই রয়েছে৷ অবশ্য একা থাকার অভ্যাস ওর আছে৷ শনি-রবি বাদে সপ্তাহে আর পাঁচটা দিন তো ওকে একা-একাই দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত কাটাতে হয়৷
এখনও স্মিতার স্নান হয়নি৷ আসলে হাতের কাজ সব শেষ না-করে ও স্নান করে না৷
আজ বিকালে স্মিতা বুবাইকে লুচি ভেজে দেবে৷ তাই এইমাত্র ময়দা মেখে, ভিজে কাপড় চাপা দিয়ে রাখল৷ আলুর দম তো আগেই বানিয়ে, ঢাকা দিয়ে রেখে দিয়েছে৷
এখনকার মতো সব কাজ শেষ৷ এইবার স্মিতা স্নান করে নেবে৷
স্মিতা কল খুলে বাথটাব ভরল৷ তারপর তাতে লিক্যুইড বাবল-বাথ ঢেলে প্রচুর ফেনা তৈরি করল৷ সারা বাথরুম ভরে উঠল ভ্যানিলা আর সাইট্রাস নোটের মিশ্র মিষ্টি গন্ধে৷
দীর্ঘ কাজ-কর্মের পরে, এমন সুগন্ধিত স্নানের আনন্দই আলাদা৷ সব ক্লান্তি যেন নিমেষে ধুয়ে-মুছে যায়৷
জামা-কাপড় ছেড়ে স্মিতা সবে জলে নামতে যাবে— এমন সময় কলিংবেলটা বেজে উঠল৷
কে আবার এল এইসময়!
স্মিতা একটু বিরক্ত হল৷ তবু ভাগ্যিস ও জলে নেমে পড়ার আগেই বেলটা বাজল, নয়তো সমস্যা হত৷
তাড়াতাড়ি হাউজকোটটা গায়ে চাপিয়ে নিল স্মিতা৷ বুকের উপরে তোয়ালেটা জড়িয়ে নিল৷ তারপর যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে গিয়ে দরজাটা খুলে দিল৷
অদ্ভুত ব্যাপার! কেউই নেই৷
স্মিতা অবাক হল৷ হয়তো পোশাকটা গায়ে চাপিয়ে, ড্রইংরুম পেরিয়ে এসে, দরজা খুলতে ওর মিনিট-পাঁচেক সময় লেগেছে৷ তবু এরমধ্যেই আগন্তুক চলে যাবে?
অবশ্য এরকমও হতে পারে— পাড়ার কোনও দুষ্টু ছেলে হয়তো বেল বাজিয়েই পালিয়েছে৷ কিন্তু তাহলেও বলতে হবে, এমন ঘটনা এই পাড়ায় প্রথম৷ অন্তত স্মিতা তো এরকম কোনও স্মৃতি মনে করতে পারছে না৷
ডানদিক, বাঁদিক, সামনে— যেদিকে যতদূর চোখ যায়, স্মিতা একবার দেখে নিল৷
কেউ কোত্থাও নেই৷
এই ভরদুপুরে পাড়ার রাস্তায় কে-ই বা থাকবে! অবশ্য কলিংবেলের ব্যাপারটা স্মিতার মনের ভুলও হতে পারে৷ দিনের পর দিন একই আওয়াজ শুনতে শুনতে অনেকসময় নাকি এরকম হয়৷ বা হয়তো ওর অবচেতনে এই আওয়াজ শোনার জন্য কোনও প্রতীক্ষা কাজ করছিল!
কিন্তু তাই কি? ও তো যেন স্পষ্টই শুনল...
ওদিকে জলে ফেনা তৈরি করে রাখা আছে৷ বেশিক্ষণ দেরি হলে সেগুলোর কার্য্যকারিতা কমে যাবে৷ আর বেলাও যথেষ্ট চড়েছে৷ তাই স্মিতা আর ভাবনাটাকে তেমন আমল দিল না৷
দরজাটা বন্ধ করতে যাচ্ছিল স্মিতা৷ আর তখনই জিনিসটা চোখে পড়ল— ছোট একটা কুচকুচে কালো রঙের খাম৷ ঠিক ডোর ম্যাটের উপর পরে আছে৷ মনে হচ্ছে, কে বোধহয় খুব যত্ন করে ওটাকে ওখানে রেখে দিয়ে গেছে৷
স্মিতা আরেকবার এদিক-ওদিক দেখে খামটা কুড়িয়ে নিল৷ তারপর দরজা বন্ধ করে দিল৷
খামের মুখটা আঠা দিয়ে বন্ধ করা৷ ওজন দেখে মনে হচ্ছে, ভিতরে ছোটখাট চিঠি ধরনের কিছু আছে৷ আর খামের কাগজটা বেশ মোটা; আর্টপেপার বা কার্টিজ পেপার জাতীয় কিছু হবে৷ খামের উপর কিছুই লেখা নেই— না কোনও ঠিকানা, আর না কারোর নাম৷
কস্মিনকালেও এই বাড়িতে এরকম কিছু আসে না৷ রণজয়ের অফিস থেকে যেসব প্রোফেশনাল চিঠি আসে, সেগুলো ব্রাউন পেপারের খামে ভরা থাকে৷ তাছাড়া, ক্যুরিয়ার বয়রা সেসব চিঠি এইভাবে ফেলে রেখে দিয়ে চলেও যায় না৷ যতক্ষণ না কেউ আসছে, তারা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে; বা ক্রমাগত বেল বাজাতেই থাকে, বাজাতেই থাকে...
কিন্তু একটা কথা খামটায় একটা অদ্ভুত আকর্ষণ আছে— নিষিদ্ধ বস্তুকে চুরি-চুরি করে দেখতে ইচ্ছে করার মতো আকর্ষণ৷ হাতে নেওয়ার পর থেকে স্মিতার খুব ইচ্ছা করছে ওটা খুলে দেখতে৷
ইচ্ছার সঙ্গে-সঙ্গে অবশ্য একটু ভয়ও হচ্ছে! আজকাল চিঠির মোড়কে কত কী বিপজ্জনক জিনিসপত্র পাঠানো হচ্ছে...
স্মিতা চিঠিটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবল৷ খামের মুখটা খুলবে নাকি খুলবে না? যদি কোনও বিপদ ঘটে যায়? নাকি এর ভিতরে তেমন কিছুই নেই, যা ও ভাবছে?
কৌতুহল আর আশঙ্কার এক আশ্চর্য দ্বৈরথ৷ শেষ পর্যন্ত অবশ্য কৌতুহলেরই জয় হল৷
খামের মুখ ছিঁড়তে কোনও কষ্টই করতে হল না৷ ভিতরে একটা ভিজিটিং কার্ডের মাপের শক্ত বাদামী কাগজ৷ তাতে খুব গাঢ় কালো কালি দিয়ে লেখা একটাই সংখ্যা:
2804-2004 DM
এর মানেটা কী?
সংখ্যাটা দেখে অবশ্য খুবই চেনা চেনা মনে হচ্ছে স্মিতার৷ কিন্তু ঠিকঠাক মনে করতে পারছে না৷ তাছাড়া শুধু এই একটা নাম্বার ছাড়া আর কিছু লেখাও নেই চিঠিতে— না কোনও প্রাপকের নাম, আর না কোনও প্রেরকের নাম!
একটা ব্যাপার হতে পারে৷ হয়তো চিঠিটা হাতে হাতে কাউকে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল৷ তারপর সে বেচারি ভুল ঠিকানায় এসে পড়েছে!
তবে স্মিতা চিঠিটা ফেলে দিল না৷ খামে ভরে, ম্যাগাজিনের র্যাকে গুঁজে রাখল৷ তারপর পা বাড়াল বাথরুমের দিকে৷
আর তখনই— আবার কলিংবেল...
আবার রাজ্যের বিরক্তি৷ এবারও না গিয়ে ফাঁকা দেখতে হয়!
স্মিতার আর বাথরুমে ঢোকা হল না৷ ফিরে এসে দরজা খুলতে হল৷
দৃশা এসেছে৷
স্মিতা অবাক হল, ‘আজ এত তাড়াতাড়ি!’
দৃশা একটু আমতা-আমতা করে বলল, ‘আসলে ঘুম আসছিল না৷ তাই চলে এলাম৷’
দৃশারা সাধারণ একটা-দেড়টার মধ্যে দুপুরের খাওয়ার পাট চুকিয়ে নেয়৷ তারপর একটু ঘুমিয়ে নিয়ে আবার কাজে যায়৷ কোনও-কোনওদিন অবশ্য ও দুপুরে ঘুমায় না৷ সেসব দিন ও এই বাড়ি আসে৷
স্মিতা তো কোনওদিনই দুপুরবেলা ঘুমায় না, বসে-বসে টি ভি দেখে৷ দৃশাও ওর সঙ্গে যোগ দেয়৷ তারপর চারটে বাজলে আবার কাজকর্ম শুরু করে৷
স্মিতা দরজা ছেড়ে দাঁড়াল, ‘এসো৷ আজ আমার এখনও স্নান হয়নি৷ তুমি বরং টি ভি দেখো, আমি স্নান করে আসি৷’
দৃশা ভিতরে ঢুকে একটা বেতের মোড়া টেনে নিয়ে বসল৷ স্মিতা টি ভি ছেড়ে দিয়ে বাথরুমে ঢুকে পড়ল৷ তোয়ালে আর হাউজকোটটা হ্যাঙারে ঝুলিয়ে দিল৷ তারপর শরীর ডুবিয়ে দিল ফেনিল জলে৷
আহ! কী আরাম, কী শান্তি...
সকাল থেকে বড্ড ছুটোছুটি যায় স্মিতার৷ এই স্নানটা যেন সব ক্লান্তি মুছে দেয়৷ কোনও-কোনওদিন অবশ্য ও সাতসকালেও গায়ে একটু জল ঢেলে নেয়৷ বিকালে বা রাতে শোওয়ার আগে আরেকবার গা ধুয়ে নেয়৷
কিন্তু দুপুরের এই আয়েশি স্নানটার ব্যাপারই আলাদা! শরীরও ঠান্ডা; মনও ঠান্ডা৷ আবার আরেকবেলার জন্য এনার্জি জমা হয়ে যায়৷
একটা লুফা দিয়ে সারা শরীর ঘষে-ঘষে পরিষ্কার করল স্মিতা৷ পায়ের পাতায় আলতো হাতে ফুট-ব্রাশ বুলিয়ে নিল৷ তারপর উঠে পড়ল বাথটাব থেকে৷ শাওয়ার খুলে আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল তার নিচে৷
মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত ভিজিয়ে আরও কিছুক্ষণ স্নান করল স্মিতা৷ সব কলুষতা যেন ধুয়ে-মুছে বেরিয়ে গেল৷
স্নান সেরে গা-হাত-পা খুব ভালো করে মুছল স্মিতা৷ বাথটাবের ক্যাপ খুলে সাবান-জল বের করে দিল৷ তারপর গায়ে একটা কাচা হাউজকোট চাপিয়ে, মাথায় তোয়ালে জড়িয়ে বেরিয়ে আসল৷
টি ভি তে এখন একটা কমেডি শো হচ্ছে৷ দৃশা চোখ মোটা মোটা করে সেটা দেখছে৷
এই শো-টা দেখলে হাসি পাওয়ার বদলে রাগই হয় স্মিতার৷ কী যে সব সস্তার ভাঁড়ামো আর কাতুকুতু দিয়ে হাসানোর চেষ্টা! এর মধ্যে কী যে এত মজার জিনিস খুঁজে পেয়েছে— দৃশা-ই জানে! তাছাড়া, স্মিতা তো আজ পর্যন্ত ওকে হাসতে দেখেনি৷
স্মিতা কিচেনের দিকে যেতে যেতে বলল, ‘দাঁড়াও, আমি খাবার নিয়ে আসছি৷’
স্মিতা ভাতের হাঁড়ির দিকে হাত বাড়িয়েছিল৷ হঠাৎ যেন হাতে বিদ্যুতের শক এসে লাগল, আর সেইসঙ্গে বাঁ-হাতের অনামিকায় একটা অসহ্য জ্বালা— মনে হল ওই আঙুলটায় বোধহয় আগুনই ধরে গেছে! শুধু
শিখাটা দেখা যাচ্ছে না, আর চামড়া-পোড়া গন্ধটা পাওয়া যাচ্ছে না৷
তাড়াতাড়ি হাতটা গুটিয়ে নিয়ে চোখের সামনে তুলে ধরল স্মিতা৷
অনামিকায় রণজয়ের দেওয়া সেই হীরের আঙটিটা এখনও জ্বলজ্বল করছে৷ রণজয়ের অনুরোধে গত দু-তিন দিন ধরে ওটা স্মিতা পরেই আছে৷ এই ক-দিন কোনও অসুবিধা হয়নি৷ অথচ আজ আঙুলটা কেমন অস্বাভাবিক রকমের লাল হয়ে উঠেছে! মনে হচ্ছে— গোটা শরীরের রক্ত যেন ওই একটা আঙুলে এসে জড়ো হয়েছে৷
এদিকে সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে জ্বালাটা ক্রমশ বেড়েই চলেছে...
আর কিছু মাথায় আসল না স্মিতার৷ ও তাড়াতাড়ি আঙটিটা টেনে খুলে ফেলল৷ ভাগ্য ভালো বলতে হয়— খুব সহজেই আঙটিটা খুলে গেল৷
স্মিতা তড়িঘড়ি ফ্রিজ থেকে একটা জলের বোতল বের করল৷ তারপর বেসিনে হাত রেখে সেই জল ক্রমাগত ঢালতে থাকল আঙুলে৷
কী অসহ্য দাহ! মনে হচ্ছে কে যেন ফুটন্ত অ্যাসিড ঢেলে দিয়েছে হাতে, এক্ষুনি চামড়া-মাংস ঝলসে হাড় বেরিয়ে আসবে৷ চুলের গোড়া পর্যন্ত যেন চিড়চিড় করে উঠছে৷
মিনিট দুয়েক ক্রমাগত জল ঢালার পর স্মিতার আঙুলের জ্বালাটা আস্তে-আস্তে কমে গেল; আর চামড়ার রঙও খানিকটা স্বাভাবিক হয়ে গেল৷
তবে স্মিতা আঙটিটা আর পরল না৷ ঘরে গিয়ে, লকারে ঢুকিয়ে রেখে আসল৷ বোতলটায় পিউরিফায়ার থেকে জল ভরে আবার ফ্রিজে ঢুকিয়ে রেখে দিল৷
রণজয়কে কি ফোন করবে একবার? স্মিতা চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলল৷ সমস্যা তো আপাতত নিয়ন্ত্রণেই আছে৷ এখন ফোন করা মানে শুধু শুধু রণজয়ের দুশ্চিন্তা বাড়ানো ছাড়া আর কিছু না৷ তার চেয়ে ও রাতে বাড়ি ফিরলে, শান্ত হয়ে সবকিছু বললেই হবে৷
শুধু এতটা সময় খালিপেটে থাকলে শরীর খারাপ করবে বলে, একটা থালায় অল্পকিছু খাবার বেড়ে নিয়ে স্মিতা ড্রইংরুমে চলে এল৷ নয়তো খাওয়ার ইচ্ছেটা ওর একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে৷ মনটা তো এখনও কেমন যেন বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে!
থালা হাতে নিয়ে গুছিয়ে সোফায় বসল স্মিতা৷
দৃশা একমনে টি ভি দেখে যাচ্ছিল৷ স্মিতাকে যেন লক্ষ্যই করেনি৷ হঠাৎ কী মনে হতে জিজ্ঞাসা করল, ‘খাবার বাড়তে এত দেরি হল বউদি! শরীর ঠিক আছে তো?’
স্মিতা বলতে গিয়েও ব্যাপারটা চেপে গেল৷ গলাটাকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করে নিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ৷ আসলে ফ্রিজে দেখি একদম জল নেই... তাই দুটো বোতল ভরে ঢুকিয়ে দিয়ে এলাম৷’
দৃশার একটা গুণ আছে— কোনও ব্যাপারে অতিরিক্ত কৌতূহল দেখায় না৷ যতটুকু বলা হয়, ততটুকু শুনেই সন্তুষ্ট থাকে৷
আজও দৃশা কথা বাড়াল না৷
স্মিতা এখনও ভাতে হাত দেয়নি৷ থালাটা সেন্টার-টেবলে নামিয়ে রেখে, রিমোট হাতে নিয়ে বলল, ‘আজকালকার শো-গুলো এত ফালতু হয় না! দাঁড়াও তো, ভালো দেখে একটা সিনেমা দিই...’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন