শ্রীজিৎ সরকার
সমস্ত যন্ত্রপাতি, আলো, প্রপস— প্রণব নিজে সবকিছু একাধিকবার পরীক্ষা করে দেখেছে৷ যেসব খেলাগুলো নিয়ে ধন্ধ আছে, সেগুলো নতুন করে রিহার্সাল করেছে৷ সহকারীদেরকে বারবার তাদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছে৷ সবাই কিন্তু ভালোই জানে, কাকে কী করতে হবে না-হবে; তবু ও যেন কিছুতেই নিশ্চিন্ত হতে পারছে না!
স্ফিয়ারটা থাকলে হয়তো বুকে কিছুটা বল আসত৷
এসবের মাঝখানে প্রণবের বাড়ি থেকে একবার ফোন এসেছিল৷ সাধারণত বাড়ি থেকে ফোন এলে কথা শেষ করতে করতে প্রায় ত্রিশ-চল্লিশ মিনিট লেগে যায়৷ কিন্তু আজ প্রণব তাড়াতাড়ি ফোন রেখে দিয়েছে৷ ওরাও অবশ্য এইপক্ষের তাড়াটা বুঝেছে৷ তাই বেশিক্ষণ আর কথা দীর্ঘায়িত করেনি৷ শুধু কিছু ভালো, মন্দ, হ্যাঁ, হুঁ, না, শরীর কেমন, কবে নাগাদ বাড়ি ফিরতে পারবে— ব্যস৷
সলিল একমনে মোবাইলে একটা কিছু করছিল৷ ওর আঙুলগুলো খুব দ্রুত স্ক্রিনের এমাথা-ওমাথা দৌড়াদৌড়ি করে বেড়াচ্ছিল৷
প্রণব জিজ্ঞাসা করল, ‘আজ টিকিট কেমন সেল হচ্ছে সলিল?’
সলিল মুখ তুলে বলল, ‘অনলাইনে এখনও অধি থার্টি সিক্স পার্সেন্ট টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে দাদা৷ কাউন্টার সেল তো শুনিনি৷ খোঁজ নিয়ে বলব?’
কয়েকমাস হল প্রণবের দল একটা নিজস্ব ওয়েবসাইট খুলেছে৷ কোথায় খেলা দেখানো হচ্ছে, ক-টা থেকে ক-টা পর্যন্ত শো, টিকিটের দাম— এসব আপডেট তো সেখানে দেওয়া থাকেই; সঙ্গে টিকিট বুক করারও ব্যবস্থা থাকে৷ ব্যাঙ্ক ট্রানজেকশন ঠিকঠাক হলেই এস এম এস মারফত টিকিট কনফার্ম করে দেওয়া হয়৷ অডিটোরিয়ামে ঢোকার সময় শুধু সেই এস এম এস-টা দেখালেই হয়৷
প্রণব বারণ করল, ‘না থাক৷’
সলিল আবার ফোনে ফিরে গেছে৷ ওয়েবসাইটটা দেখভালো করার দায়িত্বটা ও-ই পালন করে৷ মনে হয় সেসব কিছুই করছে৷
প্রণব আবার ডাকল, ‘সলিল...’
‘হুঁ দাদা৷’
প্রণব জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার কী মনে হয় বলো তো?’
‘কোন ব্যাপারে দাদা?’
‘কোন ব্যাপারে আর... আজকের শোয়ের ব্যাপারে৷ এটা কি সাকসেসফুল হবে?’
সলিল মোবাইল থেকে মুখ তুলল৷ ও অবাক হয়ে দেখল— প্রণব ওর সঙ্গে কথা বললেও, ওর মুখের দিকে তাকিয়ে নেই৷ প্রণবের চোখ আটকে আছে দূরে৷ অথচ ও সবসময় মানুষের চোখের দিকে তাকিয়েই কথা বলে৷
প্রণব সাধারণত যত দুশ্চিন্তাই করুক না কেন, আশপাশের কারোর সামনে সেসব খুব একটা প্রকাশ করে না৷ কিন্তু আজ যেন পরিস্থিতি অন্যরকম৷
সলিল আশ্বস্ত করল, ‘নিশ্চয়ই হবে দাদা৷ আপনার শো কোনওদিন
খারাপ যায়?’
প্রণব এবার সলিলের মুখের দিকে তাকাল৷ একটা ম্লান হাসি হেসে বলল, ‘কী বলছ তুমি সলিল? আমার শো কোনওদিন খারাপ যায় না? ঠিক করে ভেবে দেখো তো— এখনও কি আর জোর দিয়ে এই কথা বলা যায়?’
সলিল মুখ নিচু করে ফেলল৷ ও বরাবরই হাউজফুল শো দেখে অভ্যস্ত৷ সেই হিসাবেই কথাটা বলেছিল৷
একটু ভেবে সলিল প্রসঙ্গ বদল করল, ‘আপনি অনেকদিন বাড়ি যান না দাদা৷ এবার একটু বাড়ি গেলে পারেন৷ আপনার মা-বোনেরও তো
খারাপ লাগে৷’
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রণব বলল, ‘হ্যাঁ, যাব৷’
যাজ্ঞসেনী এতক্ষণ স্টেজের পিছনে ছিল৷ মনে হয়, নিজের কাজগুলো আরেকবার ও ভালো করে ঝালিয়ে নিচ্ছিল৷ কয়েকদিন ও খুব গোলমাল করেছে৷ বা বলা ভাল, গোলমালগুলো কয়েকদিন সব ওর হাত দিয়েই হয়েছে৷
এখন মনে হয় কাজকর্ম শেষ৷ যাজ্ঞসেনী নিজের ঘরে ফিরে যাচ্ছে৷
প্রণব ডাকল, ‘যাজ্ঞসেনী...’
দাঁড়িয়ে পড়ল যাজ্ঞসেনী৷ প্রণবের দিকে কয়েক-পা এগিয়ে এসে বলল, ‘বলুন দাদা৷’
একটু ইতস্ততঃ করে প্রণব জিজ্ঞাসা করল, ‘রুমি কেমন আছে? মানে ওর মন-টন তো ঠিক... তাই ভাবলাম একটু খবর নিই৷ তোমারই তো রুমমেট৷’
যাজ্ঞসেনী ঘাড় নাড়ল, ‘ভালোই আছে দাদা৷ এতক্ষণ তো আমার সঙ্গে ছিল৷ এখন বোধহয় এখন স্নান করছে৷ ডেকে দেব?’
প্রণব তাড়াতাড়ি দু-পাশে মাথা নাড়ল, ‘না-না৷ এমনিই খোঁজ নিচ্ছিলাম৷ আমি যে ওর কথা শুনতে চেয়েছি— সেসব ওকে কিছু বলার দরকার নেই৷ তুমি বরং ওর ওপর একটু খেয়াল রেখো৷ যতক্ষণ দলে আছে, আমারই তো দায়িত্ব! আই মিন আমাদের সবার দায়িত্ব৷’
মাথা নেড়ে যাজ্ঞসেনী চলে গেল৷ ওর দু-চোখে স্পষ্ট কৌতূহল৷
প্রণব জানে, সেদিন ও অতক্ষণ রুমিকে নিয়ে বদ্ধ ঘরে কী করছিল— এটা জানার আগ্রহ সবার৷ ও যে ইশারা-ইঙ্গিতে কিছু আভাস দেয়নি, তা নয়৷ কিন্তু তাতে মনে হয় সবাই আন্দাজ করেছে যে, ও রুমিকে খুব কড়া জিজ্ঞাসাবাদ করেছে! রুমি নিজেও তো কাউকে কিছু বলতে পারেনি৷ সবাই যা কিছু ভেবেছে, সব যার যার নিজের-নিজের কল্পনা৷
এদিকে কৌতূহল বড় ভয়ংকর! তাকে ঠিকমতো শান্ত করতে না-পারলে সে ক্রমাগত ছোবল মেরেই যাবে৷ সেই ছোবলের তাড়নায় দলের সবাই এখন ছটফট করছে৷
প্রণব অনেকদিন পর, সেইদিন রুমির ওপর সম্মোহনবিদ্যা প্রয়োগ করেছিল৷ ব্যাপারটা যে একেবারেই সফল হয়নি— সেরকম নয়৷ কিন্তু শেষের দিকে গিয়ে পুরো জিনিসটা ঘেঁটে গেল! ভাগ্য ভালো বলতে হয়, রুমির জ্ঞান ফিরে এসেছে৷ সম্মোহনের শেষে জ্ঞান ফিরে না-আসাটা খুব বিপজ্জনক৷ অনেকসময়ই সেই জ্ঞান আর ফেরে না৷
সেই থেকে প্রণব রুমির ব্যাপারে একটু দুশ্চিন্তায় আছে৷
আসলে সম্মোহনের পদ্ধতিতে কোনও গলদ থাকলে, অনেক সময় সম্মোহিতের শারীরিক বা মানসিক সমস্যা দেখা যায়৷ তবে সেসব লক্ষণ সাধারণত সম্মোহনের পরের তিনদিনের মধ্যেই চেহারায় ফুটে ওঠে৷
এখন ভালোয়-ভালোয় এই তিনদিন কাটলেই হল৷
সলিল বলল, ‘অনেক বেলা হয়েছে দাদা৷ একটু খাওয়া-দাওয়া করে, রেস্ট নিয়ে নিন৷’
‘হ্যাঁ৷ নেব৷’
প্রণব ঘরের দিকে পা বাড়াল৷
এখনও পর্যন্ত সবই ঠিকঠাক৷ কোথাও এতটুকু গোলমালের চিহ্ন নেই৷ তবু কিচ্ছু ভালো লাগছে না প্রণবের৷ সেদিনও তো সবকিছু এরকমই ঠিকঠাক ছিল৷ বা হয়তো এর থেকে বেশি ঠিকঠাক ছিল...
তাছাড়া ঘুরেফিরে প্রণবের মাথার মধ্যে একটাই শব্দ বাজনার মতো বেজে চলেছে: ফ্রাইমোস্ট... ফ্রাইমোস্ট... ফ্রাইমোস্ট...
প্রণব কি মনে করতে পারছে, সেই রাতে ও কেন পালিয়েছিল? প্রণব কি সত্যিই জানে না, কে ওর পিছু নিতে পারে? প্রণব কি একটুও আন্দাজ করতে পারছে না, এই শব্দগুলো কোথা থেকে উঠে আসছে?
প্রণব মাথা ঝাঁকিয়ে অন্য প্রসঙ্গ মনে করার চেষ্টা করল— গ্রামের বাড়ির কথা, দলের লোকেদের কথা...
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন