আয়না, ওয়াইন, পুতুল এবং...

শ্রীজিৎ সরকার

এটা তার নিজের ঘর নয়৷ তাতে কী? নিজের ভাবলে নিজের; অন্যের ভাবলে অন্যের৷ এই জগতে সবই তো আসলে আপেক্ষিক৷ এই দেহ, এই আত্মা— এগুলো কি কারোর নিজের? না, এগুলোও কারোর নিজের না৷ অজানা কারোর হাতে একদিন এগুলোর সৃষ্টি হয়েছিল, আবার অচেনা কারোর হাতে একদিন এদের নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে৷

ঘরটা আজও যথারীতি অন্ধকার৷ শুধু একটাই মাত্র জানালা খোলা আছে৷

সে একটা বিশুদ্ধ ইস্পাতের তৈরি, সামান্য বাঁকা থালা বের করল৷ থালাটা একেবারেই নতুন৷ মৃদু চাঁদের আলোতেও একদম রুপোর মতো চকচক করছে৷ ঘরে যদি জোরালো আলো থাকত, মুখের সামনে থালাটা তুলে ধরলে দিব্যি নিজের চেহারা পর্যন্ত দেখা যেত৷

থালাটাকে সে কোলের ওপর রাখল৷ তারপর একটা কাচের বোতল নিল৷ এই বোতলে রয়েছে সাদা পায়রার রক্ত৷ একটু আগেই সে ঈগলের রূপ ধরে এটাকে শিকার করেছে৷ অবশ্যই তার শিকারের উদ্দেশ্য ছিল শুধু রক্তটুকু সংগ্রহ করা৷ সে তো আর কোনও নিচুমানের নেক্রোম্যানসার না যে, কচকচিয়ে কাঁচা মাংস খাবে বা ঠোঁট চাটতে-চাটতে রক্ত পান করবে!

ওদেরকে— মানে ওই নিচু মানের নেক্রোম্যান্সারদেরও সে ঘৃণা করে৷ শুধু মৃতদেহ আর সমাধিক্ষেত্র নিয়েই ওরা চর্চা করে, আর একগাদা বোকা লোকজন জড়ো করে, অন্ধকার ঘরে কিছু নিম্নমানের জাদু

দেখিয়ে নেক্রোম্যান্সি শাস্ত্রের অবমাননা করে৷ ধিক! কোথায় ওদের মধ্যে শক্তিশালী শব্দরাজি ব্যবহার করার শক্তি-সাহস, আর কোথায় উচ্চস্তরের জাদু দেখানোর মতো যথেষ্ট সক্ষমতা? নেক্রোম্যান্সি কি এভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার জিনিস নাকি?

তর্জনীতে রক্ত মাখিয়ে সে থালার চারকোণায় হিব্রু ভাষায় শক্তিশালী শব্দগুলো লিখল৷

JEHOVA ELOYM

METATRON ADONAY

যদিও এরই মধ্যে তঞ্চন শুরু হয়ে রক্ত থকথকে হতে আরম্ভ করেছে, তবুও সে আরও কয়েকবার ফুঁ দিয়ে নিল৷

এবার সে মেঝেতে বিছিয়ে দিল একটা পরিষ্কার সাদা কাপড়৷ তার ওপর খুব সাবধানে থালাটাকে রাখল৷

এইসব সময় একটা জিনিস খুব খেয়াল রাখতে হয়— এই শব্দগুলোর যেন এতটুকুও বিচ্যুতি না-ঘটে৷ এগুলো একটু এদিক-ওদিক হলে পুরো প্রক্রিয়াটাই জলে যাবে৷ এত আয়োজন, এত শক্তিক্ষয়— সব তো বৃথা যাবেই; সঙ্গে-সঙ্গে সেই নেক্রম্যান্সারেরও চূড়ান্ত ক্ষতি হয়ে যাবে৷ সে পঙ্গু হয়ে যেতে পারে, বিকলাঙ্গ হয়ে যেতে পারে... এমনকি সারাজীবনের জন্য সম্পূর্ণ মানসিক স্থিতিও হারিয়ে ফেলতে পারে৷

আর এগুলোর কোনওটা যদি একবার ঘটে যায়, গোটা পৃথিবীর কারোর সেই নেক্রোম্যানসারকে আবার তার পুরনো সুস্থ-স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সাধ্য নেই৷

অতএব সাবধান এবং সাবধান!

আর সবার মতো তো তারও প্রথম-প্রথম এসব করতে খুব ভয় লাগত৷ বিশেষ করে স্পেলগুলো উচ্চারণ করার সময় সে খুব দুশ্চিন্তায় থাকত৷ শুধু মনে হত— যদি কোনও অংশ বাদ পড়ে যায়, যদি উচ্চারণে গোলমাল হয়ে যায়...

অথচ ওই স্পেলই তো আসল শক্তি৷ যত নির্ভুলভাবে, স্পষ্ট করে এবং দৃঢ়তার সঙ্গে সেগুলোকে উচ্চারণ করা যাবে, তত ভালো ফল পাওয়া যাবে৷

ভুল অবশ্য সে কোনওদিন করেনি৷ পড়াশোনার মতো এই অতীন্দ্রিয় বিদ্যাতেও সে নিজের অনন্য মেধা আর কুশলতার নজির রেখেছিল৷

তার এখনও মনে আছে সেই দিনটার কথা৷ তখন বোধহয় সে ফার্স্ট লেভেলের ছাত্রী ছিল৷ অন্য একজন অতি-বৃদ্ধ শিক্ষকের কাছে সে শিখত৷ সেইসময় একদিন তার সেই শিক্ষক তাদের সামনে এক-বোঝা হাড়গোড় এনে ফেলে দিয়েছিলেন৷

সবাই চেষ্টা করেছিল সেগুলোকে তাদের পুরনো অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে৷ কিন্তু তাদের স্পেলের প্রভাবে সেগুলো শুধু সামান্য নড়াচড়া করেছিল— ব্যস!

তারপর এগিয়ে এসেছিল সে৷ কাঁপতে থাকা হাতে শক্ত করে ধরেছিল বিষাক্ত ইউ কাঠের তৈরি ওয়ান্ড৷ মন স্থির করে কেটে কেটে উচ্চারণ করেছিল স্পেল:

‘অ্যানিমেট ডেড৷’

ওই একবারের প্রচেষ্টাতেই হাড়গুলো আসল চেহারায় ফিরে গিয়েছিল, তাদের ওপর মাংস আর চামড়া গজিয়ে উঠেছিল৷ বোঝা গিয়েছিল— সেটা আসলে ছিল একটা সিংহের শরীর৷

সবাই আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল৷ শিক্ষক এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরেছিলেন তাকে, ‘আই অ্যাম প্রাউড অফ ইউ৷ উইচ তো সবাই হয়; কিন্তু সব উইচ নেক্রোম্যানসার হতে পারে না৷ আবার সব নেক্রোম্যানসার নাইন্থ লেভেল টপকে, আরও হায়ার লেভেলে কৃতকার্য্য হয়ে সুপ্রিম স্টেটে যেতে পারে না৷ কিন্তু তুমি পারবে মাই চাইল্ড৷ এর জন্য যে চূড়ান্ত আত্মনিয়ন্ত্রণ আর মানসিক স্থৈর্য দরকার তা তোমার আছে৷’

আজ তিনি থাকলে দেখতে পেতেন, তাঁর প্রিয় ছাত্রী তাঁর আশা পূরণ করতে পেরেছে৷ মহান অ্যাস্টারথ, বিয়েলজীবাব আর লুসিফারের আশীর্বাদ সে পেয়েছে৷

সে জানালা দিয়ে চাঁদ দেখল৷ থালায় চাঁদের যে অস্পষ্ট প্রতিবিম্ব এসে পড়েছে, সেটাও দেখল৷ তারপর আয়নাকে উপযুক্ত করে তোলার জন্য চোখ বন্ধ করে বলতে থাকল, ‘হে অনাদি, অনন্ত, ঈশ্বরেরও অবর্ণনীয় সম্রাট; যিনি এইসব মানুষ, পশু, পাখি, কীটপতঙ্গ, ভালোবাসা, ঘৃণা, লোভ, উদারতা প্রভৃতি সৃষ্টি করেছেন— আমি তাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করছি এই বস্তুতে দূরদর্শনের শক্তিসঞ্চার করতে৷ আমি অনুরোধ করছি...’

সে এটাকে বলতেই থাকল— বলতেই থাকল— বলতেই থাকল... ততক্ষণ পর্যন্ত বলতে থাকল— যতক্ষণ না থালার উপর থেকে চাঁদের প্রতিবিম্ব সম্পূর্ণ মুছে গিয়ে, এক দম্পতির স্পষ্ট ছবি ফুটে উঠল৷

দম্পতি নিজেদের মধ্যে খুব হাসাহাসি করছে৷ ওদের চেহারা থেকে যেন সুখ উপচে পড়ছে৷ দু-জনের হাতেই গ্লাসে ভরা পানীয়— স্বামীর হাতে হুইস্কি, আর স্ত্রীর হাতে ওয়াইন৷ মৃদুমন্দ চুমুক দিচ্ছে পানীয়তে৷

ওসব প্রেম-ভালোবাসায় তার আর আগ্রহ নেই৷ তবু সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আয়নার দিকে৷ যেন অধীর হয়ে অপেক্ষা করছে কোনওকিছুর জন্য৷ সে জানে কী ঘটতে চলেছে, কিন্তু নিজের চোখে সেটাকে না-দেখা পর্যন্ত তার শান্তি নেই৷

প্রায় পনেরো-কুড়িমিনিট কেটে গেছে৷ দু-জনের গ্লাসই এখন ফাঁকা৷ তারা গ্লাসগুলোকে মাটিতে নামিয়ে রাখল৷

এবার স্বামী স্ত্রীকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল৷ তারপর অস্ফুটে প্রেমালাপ চালাতে থাকল৷ কত মিষ্টি-মিষ্টি কথা, কপালে আর গালে আলতো আদর, নিবিড় ঘনিষ্ঠতা...

ঘনিষ্ঠতা বাড়তেও থাকল৷

কতক্ষণ হয়ে গেল! এবার অসহ্য লাগছে তার৷ সে অধৈর্য্য হয়ে উঠল৷

ওই তো দু-জনে অন্তরঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়ে এইবার চাঁদ দেখছে৷ হাতে-হাত রেখেছে৷

কিন্তু এটা কীভাবে হল? এরকমটা তো হওয়ার কথা ছিল না— কোনওভাবেই না৷

স্ত্রীর গ্লাসে তো জু-জু ওয়াইন থাকার কথা ছিল৷ সে নিজে হোটেলের বয়কে সম্মোহিত করে রেড ওয়াইনের গ্লাসে জু-জু ওয়াইন ভরে দিয়েছিল৷

হ্যাঁ— কোনও ভুল তো ছিল না৷ এই তো সেই ওয়াইনের খালি বোতল এখনও তার পাশে পড়ে রয়েছে৷ আর সেই ওয়াইন পেটে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তো ওর মৃত্যু হওয়া উচিত ছিল; আর মৃত্যু যদি নাও হত, নিদেনপক্ষে ‘জোম্বি’ অর্থাৎ জীবন্ত শব হয়ে যাওয়ার কথা তো ছিলই৷

ও এখনও এত স্বাভাবিক আছে কী করে? ওর চেহারায় বা আচরণে তো নূন্যতম বিকৃতির লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না৷

এদিকে সময় বয়েই যাচ্ছে৷ ওদিকে ওদের প্রেমও আরও-আরও বেশি নিবিড় হয়ে উঠছে৷

সে নিশ্চিত, এ নিশ্চয়ই ষড়যন্ত্র৷ গভীর ষড়যন্ত্র৷ কিন্তু এখন ষড়যন্ত্রীকে খুঁজে বের করা তো দূরে থাক, তাকে নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার সময়টুকুও তার নেই৷ আজ রাতটা তার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ৷

প্রচন্ড রাগে তার মাথা গরম হয়ে উঠল৷

সে থালাটা একপাশে সরিয়ে রাখল৷ ঠোঁট চেপে ক্রূর হাসল, ‘কী ভেবেছ? বেঁচে যাবে এইভাবে? এত সহজ? সুখ তোমরা পাবে না; কিছুতেই না? আমি তোমাদের কিছুতেই সুখ পেতে দেব না৷ আর যে তোমাদের বাঁচাবে বলে উঠে পড়ে লেগেছে— তার ব্যবস্থাও হবে...’

নিজের ব্যাগ থেকে সে একটা পুতুল বের করল৷ নীল চোখ আর কালো চুলের একটা ছেলে-পুতুল৷ হাতে তৈরি জামা-প্যান্ট পরানো৷ শুইয়ে দিলে পুতুলের চোখ বন্ধ হয়ে যায়, আবার দাঁড় করিয়ে দিলে চোখ খুলে যায়৷

আপাতভাবে দেখতে সাধারণ এই পুতুলটা আসলেই কত অসাধারণ!

পুতুলটার সারা শরীরে সে একবার আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল৷ বিড়বিড় করে কিছু বলল৷ তারপর একটা খুব সরু ইস্পাতের কাঁটা ঢুকিয়ে দিল তার বুকের মধ্যে৷ পাগলের মতো সে কাঁটাটা দিয়ে

খোঁচাতেই থাকল— একবার; দু-বার; বারবার...

আঘাত করেও কী আনন্দ!

দাঁতে দাঁত ঘষল সে, ‘লেটস ফিল দ্য পেইন...’

সকল অধ্যায়
১.
ম্যাজিক শো থেকে শুরু...
২.
সকালের হেডলাইন
৩.
দুর্ঘটনার পরে
৪.
‘সে’ আছে আড়ালে
৫.
রাত এবং উপহার
৬.
আবার রহস্যময় অঘটন
৭.
নিঝুম দুপুরের আগন্তুক
৮.
একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব
৯.
শান্তির স্নান
১০.
কেমন আছে অনুরাধা?
১১.
নতুন দিনের প্রস্তুতি
১২.
স্বাগত আমার ঘরে
১৩.
আবার ম্যাজিক-শো
১৪.
বুবাই কোথায়
১৫.
আবার বাড়িতে ফেরা
১৬.
আয়না, ওয়াইন, পুতুল এবং...
১৭.
বিভীষিকাময় রাত
১৮.
কোকিল মানে বসন্ত; কোকিল মানে...
১৯.
আরেকটি ‘কেন’
২০.
সাফারি টাইম
২১.
ক্রিস্টাল-ক্লিয়ার ক্রিস্টাল বল শপ
২২.
ত্রুটি সংশোধন
২৩.
নখ কেন কালো
২৪.
স্বচ্ছ স্ফটিক; ঘোলা স্ফটিক
২৫.
ঢাকা থাক, থাক ঢাকা...
২৬.
বেড়ানোর ছবি
২৭.
বহুদিন পর; আবার!
২৮.
নিষ্ফলতার আক্রোশ
২৯.
একটুর জন্য...!
৩০.
অ-সাক্ষাৎ এবং সাক্ষাৎ
৩১.
‘সে’ ছিল, ‘সে’ আছে...
৩২.
একটা অন্যরকম রবিবার
৩৩.
প্রচেষ্টা এবং অভিজ্ঞতা
৩৪.
অন্তিম প্রস্তুতি
৩৫.
দৃশ্য এবং অদৃশ্য
৩৬.
কোন সে সুদূর অতীত হতে...
৩৭.
রইল বাকি এক
৩৮.
জানা এবং অজানা
৩৯.
সময় এসেছে কাছে
৪০.
ইট’স ফাইন
৪১.
ঘন হয়ে উঠেছে অন্ধকার
৪২.
শব্দটীকা
৪৩.
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জী

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%