দৃশ্য এবং অদৃশ্য

শ্রীজিৎ সরকার

বুবাইকে কয়েকদিন স্কুলে পাঠানো হচ্ছে না৷ আসলে অনুরাধার হঠাৎ অন্তর্ধান পুরো সংসারটাকে এলোমেলো করে দিয়ে গেছে৷

দেখতে-দেখতে তো ছ’দিন কেটেই গেল...

পুলিশ একই আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে; নার্সিং হোম থেকেও নরম সুরে ‘চেষ্টা চালানো হচ্ছে’ বলে যাচ্ছে৷ কিন্তু স্মিতা জানে, আসলে ওরাও আস্তে-আস্তে হাল ছেড়ে দিচ্ছে৷ এত রোগী, এত নিরুদ্দেশ, আরও এত-এত হাজারো সমস্যা— কাঁহাতক কোনও একজনকে নিয়ে পড়ে থাকা যায়!

কিন্তু স্মিতার তো ‘এত দিদি’ নেই!

এরই মধ্যে কিছু না-হোক, আট-নটা হাসপাতালে গিয়ে খান-ত্রিশেক দুর্ঘটনায় জখম, আত্মীয়হীন রোগী দেখে আসা হয়েছে; আর পুলিশ মর্গে গিয়ে সাত-আটটা বেওয়ারিশ মৃতদেহ শনাক্ত করার চেষ্টা করতে হয়েছে৷

একদিকে ওষুধের গন্ধের মধ্যে পড়ে থাকা অঙ্গহীন, চেতনাহীন অর্ধমৃতের দল; আর অন্যদিকে মর্গের স্তব্ধ পরিবেশে শুয়ে থাকা ততোধিক স্তব্ধ দেহের সারি— যাদের কোনওটা অবিকৃত, কোনওটা বিকৃত, আবার কোনওটা অতিবিকৃত... কীভাবে যে স্মিতা খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে মুখগুলো দেখেছে, দেখার সময় যে কীভাবে নিজেকে ভিতরে-বাইরে নিয়ন্ত্রণ করেছে, দেখা হয়ে যাওয়ার পর যে দর্শনের রেশটা কীভাবে প্রশমিত করেছে— তা শুধু ও-ই জানে৷

কিন্তু অনুরাধার জড়ভরত শরীরটা কোনও দলে নেই— না মৃতের, না অর্ধমৃতের; এমনকি না কোনও ভবঘুরের৷ এই কয়েকদিনে যতক্ষণ স্মিতা রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করেছে, যতটা সম্ভব চোখ পেতে রেখেছে রাস্তার মানুষদের ওপরে৷ যদি কোনও মিরাকল ঘটে যায়!

এক অনুরাধা বাদে, কলকাতা শহরের বাকি সবাইকে বোধহয় ও রাস্তায় দেখতে পেয়েছে৷

এখন বুবাই বারান্দায় নিজের মনে খেলছে আর স্মিতা একটা ন্যাকড়া দিয়ে জানালার শার্সি মুছছে৷ কিন্তু ওর কান খাড়া হয়ে আছে ফোনের দিকে— কখন বেজে ওঠে... অবশ্য পুলিশের তরফ থেকে বয়ান বলতে তো ওই এক: ‘অমুক হাসপাতালে একজন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে তমুক নাম্বার বেডে অ্যাডমিট করানো হয়েছে৷ প্লিজ শনাক্ত করে আসুন৷’ অথবা ‘অমুক জায়গা থেকে একজন বেওয়ারিশ মহিলার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে৷ প্লিজ শনাক্ত করে যান৷’

তাড়াহুড়ো করে বেরোনোর সময় প্রতিবার স্মিতার মন বলে— এই উদ্যোগই সার৷ এবারেও গিয়ে কিছু পাওয়া যাবে না৷

তবুও স্মিতার মনে আশ্চর্য উৎকন্ঠা এক জেগে থাকে৷ কথায় আছে:

যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই... কে জানে, কোত্থেকে কোন অমূল্যরতন বেরিয়ে পড়ে!

বুবাই স্মিতার পাশে এসে দাঁড়াল৷ ও দেখছে, কয়েকদিন ধরেই ওর মায়ের মন-মেজাজ ঠিকঠাক নেই৷ আনমনা হয়ে যাচ্ছে, ভুলে যাচ্ছে, আর আগের থেকেও বেশি-বেশি মেজাজ হারিয়ে ফেলছে৷

গলা নামিয়ে মাকে ডাকল বুবাই , ‘মা, ও মা...’

স্মিতা কাজ করতে-করতেই বলল, ‘কী হয়েছে? খিদে পেয়েছে?’

‘না-না৷’

‘তবে?’

‘মাসিকে কি আর খুঁজে পাওয়া যাবে না মা?’

স্মিতা একটু থমকে গেল৷ তারপর মনে জোর এনে ও বলল, ‘নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে বুবাই৷ ঠিক পাওয়া যাবে৷’

বুবাই আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘মাসি কি ইচ্ছা করে হারিয়ে গেছে মা?’

স্মিতা ভুরু কুঁচকে ছেলের দিকে তাকাল, ‘কেউ ইচ্ছে করে কখনও হারিয়ে যায় বুবাই? তোমাকে কে বলেছে এসব?’

দু-পাশে মাথা নাড়ল বুবাই, ‘কেউ না৷ আমার এমনি-এমনিই মনে হল! আচ্ছা মা, মাসি যদি একা-একা হারিয়ে না-যায়— তবে আমাদের বাড়ি চলে আসছে না কেন?’

‘তোমাকে তো বলেছি বুবাই, মাসির শরীর খারাপ৷ হাঁটতে পারে না, কথা বলতে পারে না; আমাদের বাড়িও চেনে না৷ তাহলে আসবে কী করে, তুমিই বলো?’

বুবাই নিজের মনেই বলতে থাকল, ‘মাসি হাঁটতে পারে না... মাসি আমাদের বাড়ি আসতে পারে না... তাহলে মাসি হারিয়ে গেল কী করে?’

ছেলের প্রশ্নোত্তর পর্ব সাময়িকভাবে শেষ হওয়ায় স্মিতা আবার নিজের কাজে ফিরে গিয়েছিল৷ বুবাইয়ের কথা শুনে ওর হাত থমকে গেল৷

এই প্রশ্নটা স্মিতার মনেও বারে-বারে এসেছে৷ একজন চলচ্ছক্তিহীন মানুষ কীভাবে নিজে থেকেই হারিয়ে যেতে পারে? এক, যদি না কেউ তাকে অপহরণ করে থাকে৷ কিন্তু এরমধ্যে ছ-দিন কেটে গেছে; মুক্তিপণ চাওয়ার পক্ষে কি এটা যথেষ্ট সময় নয়?

বাকি থাকে আর একটাই সম্ভাবনা৷

হয়তো সেন্টার থেকেই গোপনে অনুরাধার সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে৷ আর তারপর ওর মৃতদেহটাকে স্রেফ গুম করে ফেলা হয়েছে— গোপনে পুড়িয়ে দেওয়া হতে পারে, কোথাও পুঁতে দেওয়া হতে পারে... আর বস্তাবন্দী করে ভাসিয়ে দেওয়ার জন্য তো অত বড় গঙ্গাটা রয়েইছে৷

কিন্তু এই কথাটা কি আদৌ সত্য? এখনও তো সেরকম কোনও প্রমাণ নেই!

আর সিকিওরিটি যে ছেলেটার কথা বলেছিল— ওর কি কোনও যোগ আছে অনুরাধার হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে? স্মিতা তো এখনও পর্যন্ত ওর প্রসঙ্গটা তোলেইনি কারোর সামনে৷ অথচ ওর কথা শোনার থেকে স্মিতার মনে যেন একটা কাঁটা ফুটে আছে, চলতে-ফিরতে ফুটে যাচ্ছে৷ কে ও? কীসের যোগ ওর সঙ্গে অনুরাধার? সত্যিই ও অনুরাধার ছেলে, নাকি অন্য কেউ!

কথা শেষ করে, বুবাই এবার ম্যাগাজিনের র‌্যাক ঘাঁটাঘাঁটি করছে৷ চোখে পড়তে হালকা ধমক দিল স্মিতা, ‘আহ বুবাই, কী করছ? এইমাত্র সব গুছিয়ে উঠলাম৷ আবার তো সব অগোছালো হয়ে যাচ্ছে৷’

বুবাই মুখ তুলে জিজ্ঞাসা করল, ‘আর্চির সেই বইটা কোথায় মা?’

স্মিতা বলল, ‘দাঁড়াও, আমি দিচ্ছি৷’

কাজ থামিয়ে স্মিতা বুবাইয়ের বইটা খুঁজে দিল৷ তারপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাওয়া বইগুলো গুছিয়ে রেখে, ও আবার ঝাড়পোঁছে মন দিল৷ অবশ্য ওর আসল মনোযোগ পড়ে আছে অন্য জায়গায়...

বুবাই সোফায় পা ঝুলিয়ে বসল৷ তারপর আপনমনে বইয়ের পৃষ্ঠা উলটে যেতে থাকল৷ ওর বারান্দায় খেলাধুলো করার পর্ব আপাতত শেষ৷

খানিক্ষণ সব শান্ত৷ যে যার মতো নিজের কাজ আর চিন্তার জগৎ নিয়ে ব্যস্ত৷ হঠাৎ স্মিতা গলা উঁচু করে ডাকল, ‘বুবাই-ই-ই...’

মায়ের গলা শুনে চমকে উঠল বুবাই৷ বলার ধরণ থেকেই পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, মা কিছু একটা দেখে অসন্তুষ্ট হয়েছে৷

স্মিতা ডাকল, ‘এদিকে এসো তো৷’

আর্চির বইয়ের মধ্যে বুবাই আচমকাই একটুকরো বাদামী কাগজ খুঁজে পেয়েছে৷ একে তো খাতার সাদা পাতা আর অরিগ্যামির লাল-হলুদ কাগজ ছাড়া ওর কাগজের অভিজ্ঞতা খুব কম, তারউপর আবার এই অদ্ভুত মোটা কাগজে লাল কালি দিয়ে কয়েকটা রহস্যজনক সংখ্যা লেখা রয়েছে৷ ও তাই খুব খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে জিনিসটা দেখছিল, আর গল্পের গোয়েন্দাদের মতো করে রহস্যভেদের চেষ্টা করছিল৷

মায়ের ডাক শুনে, বুবাই কাগজটা মুঠোয় চেপে ধরে আস্তে-আস্তে এগিয়ে গেল৷

স্মিতা গম্ভীর গলায় বলল, ‘হোয়াট ইজ দিস বুবাই?’

জানালার ফ্রেম বেয়ে মিহি লবণের গুঁড়োর মতো কী একটা জিনিস ছড়ানো৷ স্মিতা সেটাকেই দেখাচ্ছে৷

আগের মতোই গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করল স্মিতা, ‘লবণ নাকি কাস্টার্ড সুগার— কী ছড়িয়েছ এটা?’

বুবাই জোরে-জোরে দু-পাশে মাথা নাড়ল, ‘আমি জানি না মা৷ আমি এসব ছড়াইনি...’

‘এই ঘরে তুমি ছাড়া এসব অকাজ আর কে করে?’

বুবাই কাতর গলায় বলল, ‘আমি এসব করিনি মা... বিশ্বাস করো...’

স্মিতার মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে; তাই ও আর এসব নিয়ে বেশি কথা বাড়াল না৷ অসন্তুষ্ট মুখ করে, হাতের ন্যাকড়াটা দিয়ে ও গুঁড়োগুলোকে ঝেড়ে ফেলল৷

মনে হয় না, জিনিসটা বেশিদিন ছড়ানো হয়েছে; মাত্র একবার ঝাড়তেই কেমন ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ে গেল৷

বুবাই আস্তে-আস্তে জিজ্ঞাসা করল, ‘মা, ও মা...’

স্মিতা ছেলের দিকে না-ফিরেই জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হয়েছে? খিদে পেয়েছে?’

বুবাই দু-পাশে মাথা নাড়ল, ‘না-না৷ এইটা কীসের কাগজ মা?’

স্মিতা পিছন ফিরল, ‘কোনটা?’

বুবাই মুঠো করা হাতটা বাড়িয়ে দিল, ‘এই যে...’

বুবাই হাতের মুঠো খুলে কাগজটা দেখাতে গিয়েছিল৷ কিন্তু ওদের জন্য মুঠোর মধ্যে যেটা অপেক্ষা করছিল— সেটা দেখার জন্য ওরা কেউই অপেক্ষা করছিল না৷

হাতের চাপে কাগজের টুকরোটা দুমড়ে-মুচড়ে গেছে৷ কিন্তু তবুও

লেখাগুলো পরিষ্কার পড়া যাচ্ছে৷ কারণ? কারণ নির্জীব অক্ষরগুলো এখন লাল আলো হয়ে জ্বলে উঠেছে৷

আলোটা ক্রমশই উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছে!

চিৎকার করে উঠল স্মিতা, ‘ওটা ফেলে দাও বুবাই...’

স্মিতাও কথাটা শেষ করে উঠতে পারল না, বুবাইও কাগজটা ফেলে দিতে পারল না৷

হঠাৎ ঘরটা পলকের জন্য খুব উজ্জ্বল, হলুদ একটা আলোয় ধাঁধিয়ে উঠল৷ আর সেই আলোটা যখন নিভল, স্মিতার দৃষ্টি যখন স্বাভাবিক হল— স্মিতা দেখল, ঘরের মধ্যে ও একা দাঁড়িয়ে রয়েছে৷

বুবাই কোথাও নেই!

সকল অধ্যায়
১.
ম্যাজিক শো থেকে শুরু...
২.
সকালের হেডলাইন
৩.
দুর্ঘটনার পরে
৪.
‘সে’ আছে আড়ালে
৫.
রাত এবং উপহার
৬.
আবার রহস্যময় অঘটন
৭.
নিঝুম দুপুরের আগন্তুক
৮.
একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব
৯.
শান্তির স্নান
১০.
কেমন আছে অনুরাধা?
১১.
নতুন দিনের প্রস্তুতি
১২.
স্বাগত আমার ঘরে
১৩.
আবার ম্যাজিক-শো
১৪.
বুবাই কোথায়
১৫.
আবার বাড়িতে ফেরা
১৬.
আয়না, ওয়াইন, পুতুল এবং...
১৭.
বিভীষিকাময় রাত
১৮.
কোকিল মানে বসন্ত; কোকিল মানে...
১৯.
আরেকটি ‘কেন’
২০.
সাফারি টাইম
২১.
ক্রিস্টাল-ক্লিয়ার ক্রিস্টাল বল শপ
২২.
ত্রুটি সংশোধন
২৩.
নখ কেন কালো
২৪.
স্বচ্ছ স্ফটিক; ঘোলা স্ফটিক
২৫.
ঢাকা থাক, থাক ঢাকা...
২৬.
বেড়ানোর ছবি
২৭.
বহুদিন পর; আবার!
২৮.
নিষ্ফলতার আক্রোশ
২৯.
একটুর জন্য...!
৩০.
অ-সাক্ষাৎ এবং সাক্ষাৎ
৩১.
‘সে’ ছিল, ‘সে’ আছে...
৩২.
একটা অন্যরকম রবিবার
৩৩.
প্রচেষ্টা এবং অভিজ্ঞতা
৩৪.
অন্তিম প্রস্তুতি
৩৫.
দৃশ্য এবং অদৃশ্য
৩৬.
কোন সে সুদূর অতীত হতে...
৩৭.
রইল বাকি এক
৩৮.
জানা এবং অজানা
৩৯.
সময় এসেছে কাছে
৪০.
ইট’স ফাইন
৪১.
ঘন হয়ে উঠেছে অন্ধকার
৪২.
শব্দটীকা
৪৩.
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জী

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%