শ্রীজিৎ সরকার
বুবাই টাওয়েল পরা অবস্থাতেই মোবাইল নিয়ে বসে পড়েছে৷ একটু আগেই ও স্নান করে উঠেছে৷ এখনও চুল তো আঁচড়ায়নি-ই, মাথাটা পর্যন্ত ভালো করে মোছেনি৷ একমনে মোবাইলে মায়াজাকির কোনও একটা সিনেমা দেখে চলেছে৷
স্মিতা অনেকক্ষণ ধরে ছেলেকে ডাকছে৷ বুবাই শুধু সমানে ‘আসছি-আসছি’ বলে যাচ্ছে৷
এবার স্মিতা বিরক্ত হল, ‘এ কীরকম অসভ্যতা বুবাই? এত মোবাইলের প্রতি অ্যাডিকশন হয়েছে তোমার! কখন থেকে ডাকছি— শুনতেই পাচ্ছ না?’
বুবাই মোবাইল থেকে মুখ না-তুলেই উত্তর দিল, ‘আর একটুখানি বাকি মা...’
মাথাটা আরও গরম হয়ে উঠল স্মিতার৷ ওর ছেলের পিঠে দুমদাম দু-ঘা বসিয়ে দিতে ইচ্ছা করল৷ কিন্তু আজ বাইরে বেরোনো হবে, দিনটা অন্যরকমভাবে কাটানো হবে— এসব কথা ভেবে ও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করল৷ তবে রাগটা পুরোপুরি কমল না৷
বুবাইয়ের হাত থেকে মোবাইলটা কেড়ে নিল স্মিতা৷ তারপর ছেলেকে টানতে-টানতে আয়নার সামনে নিয়ে যেতে-যেতে বলল, ‘একটু পরেই তো মাল্টিপ্লেক্সে নতুন সিনেমা দেখতে যাওয়া হবে৷ এখন কীসের জন্য মোবাইল নিয়ে পড়ে আছো? মায়াজাকি কি পালিয়ে যাচ্ছে? ইস! মাথাটা পর্যন্ত ভালো করে মোছোনি!’
একটা শুকনো টাওয়েল দিয়ে বুবাইয়ের চুলগুলো ভালো করে মুছিয়ে দিল স্মিতা৷ তারপর ওকে একটা বাড়িতে পরার জামা-প্যান্ট পরিয়ে দিল৷ এখনও খেতে বসলেই বুবাই জামায় খাবার-দাবার মাখিয়ে ফেলে৷ তাই ব্রেকফাস্ট করার আগে ওকে নতুন জামা পরানো মানে, সেটা জেনে-বুঝে নষ্ট হতে দেওয়া ছাড়া আর কিছু না!
ছেলের চুল আঁচড়ে দিয়ে, স্মিতা ওকে নিয়ে খাবার ঘরে এল৷
সাধারণত শনিবার আর রবিবার করে এই বাড়িতে ব্রেকফাস্টের মেনু বিশেষ হয়— মিক্সড নুডলস, রাধাবল্লভী, মশলা ধোসা, রাজকচুরি... কিন্তু আজ সারাদিন বাইরে খাওয়া-দাওয়া হবে বলে মেনু অন্যান্য দিনের মতো সাধারণ: ভেজিটেবল স্যান্ডউইচ আর ডিমসেদ্ধ৷
রণজয়ের স্নান, জামা-কাপড় পরা— সব অনেক আগেই হয়ে গেছে৷ ও এখন ডানহাতে ব্রেকফাস্ট সারছে, আর সেইসঙ্গে বাঁহাতে ধরা খবরের কাগজে চোখ বোলাচ্ছে৷ বিশ্বসংসার উলটে গেলেও রণজয়ের প্রতিদিন সকালে হেডলাইনগুলো দেখা চাই-ই চাই৷
স্মিতা বুবাইয়ের খাওয়ার ওপর ভরসা না-করে, নিজেই ছেলের মুখে খাবার গুঁজে দিতে-দিতে বলল, ‘তোমার গাড়িটা দেখে নিয়েছ তো রণজয়? সব ঠিকঠাক আছে তো?’
রণজয় কাগজ থেকে চোখ না-সরিয়েই বলল, ‘হ্যাঁ৷ সকালে তো
দেখলাম, তখন সব ঠিকঠাকই ছিল৷’
‘আর টিকিট? সেটা কনফার্ম তো?’
‘হ্যাঁ রে বাবা৷’
বুবাই খুব আস্তে-আস্তে খায়৷ মুখের মধ্যে খাবার ভরে নিয়ে চুপচাপ বসে থাকে; চেবায় না, গেলে না৷ ওকে ক্রমাগত তাড়া দিয়ে যেতে হয়৷
স্মিতা ছেলেকে ঠেলছে, আর নিজেও খাচ্ছে৷
দরজায় বেল বেজে উঠল৷
ছেলের মুখে আরও খানিকটা খাবার ভরে দিয়ে, স্মিতা দরজা খুলতে উঠল৷
দৃশা এসেছে৷
রণজয়ের খাওয়ার পর্ব মিটে গেছে৷ ও হাত ধোওয়ার জন্য উঠেছিল৷ দৃশাকে দেখে অবাক হল, ‘এ কী স্মিতা! তুমি দৃশাকে আসতে বারণ করোনি?’
স্মিতা মাথা নাড়ল, ‘না৷ দুপুরে আর বিকেলে তো বাইরে খাব৷ রাতেও কি তাই খাব নাকি? বুবাইয়ের অমনি পেটব্যথা শুরু হয়ে যাবে! তার চেয়ে দৃশা এখনই কিছু রান্না করে রেখে যাক৷’
রণজয় ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমাদের বেরোতে খুব বেশি হলে আর একঘন্টা৷ ও তার মধ্যে রান্না শেষ করতে পারবে?’
কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল স্মিতা৷ তার আগেই দৃশা ঘাড় নাড়ল, ‘হ্যাঁ-হ্যাঁ৷ শুধু তো ভাত করব, আর মাছের ঝাল৷ এক্ষুণি হয়ে যাবে৷’
আর কিছু বলল না রণজয়৷ ওর হাতে এঁটো শুকিয়ে আসছে, তাই তাড়াতাড়ি ও বেসিনের দিকে চলে গেল৷ দৃশাও রান্নাঘরে ঢুকে পড়ল৷
বুবাই আবার মুখে স্যান্ডউইচ ভরে বসে আছে৷ কাটলারির থেকে একটা ছুরি আর একটা কাঁটাচামচ নিয়ে নিজের মনেই ‘যুদ্ধ-যুদ্ধ’ খেলছে৷
স্মিতা ছেলেকে খাওয়াল, নিজের খাওয়া শেষ করল৷ প্লেট আর চামচগুলো তাড়াতাড়ি বেসিনে ধুয়ে ফেলল৷
এরপর স্মিতা নিজে আগে শাড়ি পরে নিয়ে, তারপর বুবাইকে জামা-প্যান্ট পরাল৷ মাঝখানে একবার চুল আঁচড়াতে-আঁচড়াতে গিয়ে রান্নাও দেখে এল৷ সেদিকে অবশ্য সমস্যা নেই— দৃশা ভালোই সামলাচ্ছে সবকিছু৷ তবু নিজের চোখে না-দেখা পর্যন্ত যেন স্মিতা শান্তি পায় না৷
একঘন্টা পুরোপুরি লাগল না; মোটামুটি পঞ্চাশ মিনিটের মধ্যে স্মিতার নিজের সাজগোজ, বুবাইকে গোছানো, দৃশার রান্না— সব সম্পূর্ণ হয়ে গেল৷
স্মিতাকে অবশ্য খুব-বেশি ঝামেলা পোহাতে হয়নি৷ কোনওরকমে রান্নাবান্না শেষ করেই দৃশা চলে যায়নি৷ যাওয়ার আগে সব খাবার-দাবার নিজেই ঢাকা দিয়ে, সেলফে গুছিয়ে রেখে গেছে৷ রাতে খাওয়ার আগে ভাতটা শুধু একবার মাইক্রোওয়েভে গরম করে নিলেই হবে৷
এবার শুধু বেরিয়ে পড়ার অপেক্ষা৷
রণজয় আর বুবাই গাড়িতে উঠে বসেছে, স্মিতা গেটে তালা লাগাচ্ছে — এমনসময় ওর ফোনটা বেজে উঠল৷
স্ক্রিনে একটা অচেনা নাম্বার ভেসে উঠেছে৷ স্মিতা কল রিসিভ করে, ফোনটা কানে চেপে ধরল৷
—হ্যালো৷
. . . . . . . . . .
—হ্যাঁ, বলছি৷
. . . . . . . . . .
— হ্যাঁ... হ্যাঁ...
. . . . . . . . . .
— মাই গড৷ সেকি! কখন হল এসব?
. . . . . . . . . .
— মানে? আপনাদের স্টাফরা কেউ কিছু বলতে পারছে না? ছিল কোথায় সব!
. . . . . . . . . .
— না-না৷ ইট কমপ্লিটলি হ্যাপেনড ডিউ টু ইওর ইরেসপন্সেবিলিটি৷ এইটুকু খেয়াল আপনারা রাখতে পারেন না? মাস গেলে টাকাটা তো ঠিক নিয়ে নিচ্ছেন৷
. . . . . . . . . .
— চেষ্টা? কীসের চেষ্টা? প্লিজ, একদম অযথা এক্সকিউজ দেবেন না৷
. . . . . . . . . .
— স্যরি৷ আমি শান্ত হতে পারছি না৷ আমি এক্ষুণি আসছি৷ তারপর যা করার করছি৷
স্মিতা ফোন কেটে দিল৷
রণজয় গাড়ির মধ্যে বসেই স্মিতার উত্তেজনা লক্ষ্য করল৷ আশ্চর্য ব্যাপার, ঠিক বেরোনোর মুখে আবার কী হল? ও দরজা খুলে, নেমে এসে দাঁড়াল স্মিতার পাশে৷
নরম গলায় রণজয় জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হয়েছে স্মিতা?’
স্মিতা হাঁফাতে-হাঁফাতে কোনওরকমে বলল, ‘দিদি মিসিং রণজয়৷ আজ সকাল থেকে দিদিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না৷’
রণজয় অবাক হল৷
যেখানে অনুরাধা থাকে, সেটা যথেষ্ট ব্যয়সাপেক্ষ এবং নামকরা জায়গা৷ সেখান থেকে একটা জলজ্যান্ত মানুষ নিরুদ্দেশ হয়ে গেল? তাছাড়া অনুরাধা তো নিজে থেকে সামান্য নড়াচড়াই করতে পারত না! তবে...
রণজয় বলল, ‘সে কী! কিন্তু দিদি কোথায় যেতে পারে বলো তো?’
স্মিতা মাথা ঝাঁকাল, ‘সেটা আমি কী করে জানব রণজয়? আমি এখন আগে থানায় যাব, মিসিং ডায়েরি করব৷ আর সেন্টারের নামেও ইরেসপন্সেবিলিটির অ্যালিগেশন আনব৷ তারপর ওদের ওখানে যাব৷’
রণজয় একটু ইতস্ততঃ করে বলল, ‘সে ঠিক আছে৷ কিন্তু সিনেমায় যাওয়ার জন্য...’
রণজয়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই স্মিতা ঝাঁঝিয়ে উঠল, ‘সিনেমায় যাওয়াটাই তোমার আগে হল রণজয়? একটা জলজ্যান্ত মানুষ মিসিং অ্যান্ড শি ইজ মাই ওন বিগ সিস্টার...!’
রণজয় বলল, ‘আমি সেকথা বলিনি স্মিতা৷ আমি বলতে চেয়েছি, বুবাইয়ের কী হবে? ও কোথায় থাকবে? আগে জানলে না হয় দৃশাকে থাকতে বলা যেত৷’
স্মিতা একটু থমকে গেল৷ উত্তেজনার বশে এই কথাটা তো সত্যিই ও চিন্তা করে দেখেনি! সামান্য ভেবে নিয়ে স্মিতা বলল, ‘যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে৷ দৃশার তো একটা মোবাইলও নেই৷ বুবাই বরং আমাদের সঙ্গেই চলুক৷’
রণজয় আর কোনও কথা বলল না৷ গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিয়ে দিল৷
স্মিতা বুবাইয়ের পিঠে হাত বোলাতে-বোলাতে যতটা সম্ভব নরম গলায় বলল, ‘বুবাই, আমরা আজ সিনেমায় যেতে পারছি না৷ বুঝেছ? তোমাকে যে মাসির কথা বলতাম না, আজ তার খুব বিপদ৷ তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না৷ বুঝেছ?’
বুবাই চোখ গোল-গোল করে বলল, ‘মাসিকে কি ছেলেধরারা ধরে নিয়ে গেছে মা?’
স্মিতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘জানি না৷’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন