প্রচেষ্টা এবং অভিজ্ঞতা

শ্রীজিৎ সরকার

চেষ্টাটা যে অসমসাহসী, সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহই নেই৷ প্রতি পদে-পদে বিপদ, আর প্রতি পলে-পলে দুর্ঘটনা ঘটার যথেষ্ট আশঙ্কা ছিল; তবু প্রণব ঝুঁকি নিয়েছে৷ তবে এই অশান্তির জীবন কাটানোর থেকে, ঝুঁকি নেওয়া ভাল৷

নিশ্ছিদ্র গভীর অন্ধকারে ঢেকে রয়েছে কবরখানা৷ শুধু কিছু জোনাকি থেকে-থেকে জ্বলছে-নিভছে... নিভছে-জ্বলছে... এখানে ওরাই একমাত্র জীবনের প্রতীক৷ কিন্তু তাতে এই মৃত্যুপুরীর কালো ইশারা এতটুকুও কমছে না; জোনাকির ওই ক্ষীণ হলুদাভ-সবুজ আলো নিমেষে শুষে নিচ্ছে জমাট অন্ধকার৷

কবরখানার মাটির অনেক শক্তি৷ বিশেষ করে ভূমির যে অংশটা সরাসরি সমাধিকে ছুঁয়ে থাকে— তার তো অসীম ক্ষমতা৷ ওই জন্য তো যুগে-যুগে প্রকৃত জাদুবিদ্যা চর্চায় কবরখানা অনস্বীকার্য ভূমিকা পালন করে আসছে৷

প্রণব একেবারে একটা কবরের গা ঘেঁষে পুঁতে দিয়েছে স্ফিয়ারটা, তারপর খুব ভালো করে মাটি চাপা দিয়ে দিয়েছে৷ ওই বিশেষ মাটি, এই স্থানের নিজস্ব শক্তি, প্রেতাত্মার আকর্ষণ— সব ছাড়িয়ে কি আর ওটা বেরিয়ে আসতে পারবে? মনে তো হয় না৷

কাজটা করতে গিয়ে ঘামে ভিজে উঠেছে প্রণবের শরীর, আরও জোরে স্পন্দিত হয়েছে ওর হৃৎিপন্ড৷ এগুলো যতটা না-হয়েছে পরিশ্রমের জন্য, তারচেয়ে বেশি হয়েছে দুশ্চিন্তা আর আশঙ্কার জন্য৷

এইসব কাজ শেষ করার পর আর পিছন ফিরে দেখার নিয়ম নেই৷ কারণ পিছনে দেখা মানেই মায়া তৈরি করা, ত্যাজ্যকে আবার আহ্বান করা৷ প্রণবও তাই একটুও দেরি না-করে হনহনিয়ে বেরিয়ে আসছিল৷ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, এই জায়গা ছেড়ে ও বেরিয়ে পড়তে পারলেই বাঁচে৷

হঠাৎ প্রণবের কাঁধে একটা ঠান্ডা স্পর্শ লাগল...

হৃৎিপন্ডটা কি বন্ধই হয়ে গেল?

ধক করে প্রণবের চোখদুটো খুলে গেল৷

এতক্ষণ কি তবে প্রণব স্বপ্ন দেখছিল? তাই-ই তো মনে হচ্ছে৷ হ্যাঁ, এই তো প্রণব নিজের বিছানায় পিঠ দিয়ে, নিজের পাতলা বালিশে মাথা রেখে শুয়ে আছে৷

স্বপ্ন এতটাও জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে!

মনে হচ্ছে যেন— এখনও প্রণবের শরীরে কবরখানার গন্ধ লেগে আছে, এখনও ওর দু-হাতে ওখানকার মাটির স্পর্শ লেগে আছে...

মাঝরাতে প্রণবের মাঝেমাঝেই ঘুম ভেঙে যায়৷ এই সমস্যার জন্য ও কয়েকবার ডাক্তারও দেখিয়েছে৷ তিনি বলেছেন, এ হল সারাদিন এটা-সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করার ফল৷ যত সিডেটিভ-ই খাওয়া হোক না কেন, মন শান্ত করতে না-পারলে এই সমস্যা যাবে না৷

কিন্তু যে বিদ্যার চর্চা প্রণব কিছুদিনের জন্য হলেও করেছিল— তাতে আবার এই মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাওয়ার আরেকরকম ব্যাখ্যা দেওয়া ছিল৷ তাতে বলা হত: আচমকা মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাচ্ছে মানে আশপাশে অবশ্যই অস্বাভাবিক কিছু উপস্থিত হয়েছে— এবং সেটা সম্ভবত কোনও আত্মা! যদি দেখা যায়— তেষ্টা পাচ্ছে এবং গলা খুশখুশ করছে, অথচ কাশি হচ্ছে না; তবে বুঝতে হবে উপস্থিত আত্মা বা শক্তির অভিপ্রায় শুভ না৷

প্রণবের এখন ঠিক তেমনই হচ্ছে৷ অথচ এই পরিস্থিতিতে পড়লে ঠিক কী করতে হয়— সেটা ওর অজানা৷ আসলে ততদূর শেখার সুযোগ তো ও পায়নি৷

দিনের মধ্যে বারবার আপনা থেকেই প্রণবের চোখ স্ফিয়ারের দিকে চলে যায়৷ এখনও গেল৷

টেবিলের ওপর নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডের মধ্যেই জিনিসটা আছে৷ কিন্তু ওটার মধ্যে দিয়ে এখন একটা ঘোলাটে আলো বেরিয়ে আসছে৷ আলোটার কোনও রঙ নেই, ঔজ্জ্বল্য নেই; বরং সে যেন অন্ধকারের থেকেও বেশি ম্রিয়মান৷

আগে কখনও প্রণব এরকম আলো তো দেখেনি-ই, ওর ধারনাও ছিল না, কোনও আলো এরকম হতে পারে৷ ও জানে, আলো মানেই কম-বেশি ঔজ্জ্বল্য৷ অথচ এই আলোয় কীরকম এক অদ্ভুত, অস্পষ্ট বিষণ্ণতা!

তাছাড়া স্ফটিক-গোলক এরকম স্বতঃপ্রভ হয় নাকি?

প্রণব আর কিছু তলিয়ে ভাবতে পারছে না, হাত-পা নাড়াতে পারছে না; শুধু ও ধীরলয়ে শ্বাস নিতে পারছে, তাকিয়ে দেখতে পারছে, আর আবছা ভাবে অবাক হতে পারছে৷

আচমকা যেন প্রণবের কোমরটা চিনচিন করে উঠল আর শরীরের সমস্ত লোমগুলো পর্যন্ত কেঁপে উঠল৷

কালো ট্র্যাকস্যুট পরা পা-জোড়া এখন কোমর থেকে আলাদা হয়ে শূন্যে ভাসছে৷ কে যেন অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে দোলাচ্ছে তাদের; তারাও দুলছে মৃদু-মৃদু৷ আর ঊর্ধাংশ নিশ্চল হয়ে পড়ে আছে খাটের ওপর৷ না-না, সম্পূর্ণ নিশ্চল নয়— চোখজোড়া তো দিব্যি দেখছে সব...

এখনও কি বেঁচে আছে প্রণব? ওর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো কি এখনও চলছে? শিরা-ধমনীর মধ্যে দিয়ে রক্ত ছুটছে এখনও? আর হৃৎিপন্ড— সেটা কি এখনও নিজের লয়ে সঙ্কুচিত-প্রসারিত হচ্ছে?

প্রণবের কানের মধ্যে কোত্থেকে একটা নারীকন্ঠের হাসি যেন খিলখিল করে হেসে উঠল!

‘ইউ হ্যাভ হ্যাড এ ডিজায়ার ফর স্ফিয়ার৷ আই ফর প্লেইং৷ সো লেটস হ্যাভ সাম মোর ফান...’

এবার প্রণবের হাতের আঙুলগুলোও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল৷ কী সাঙ্ঘাতিক! রক্ত ঝরছে না, যন্ত্রণা হচ্ছে না; তবু অঙ্গহানি ঘটে চলেছে৷

এখন একজোড়া পা, আর পাঁচজোড়া আঙুল একসঙ্গে বাতাসে নাচছে৷

কিছুক্ষণ চলল এরকম৷ প্রণব জানে না সেটা ঠিক কতক্ষণ— দশমিনিট, পনেরোমিনিট, কুড়িমিনিট... নাকি আরও!

এরপর অঙ্গগুলো আবার নিজেরাই নিজেদের জায়গায় ফিরে এসে, আপনা-আপনিই জুড়ে গেল৷ স্ফিয়ারের মরা আলোটাও ধীরে-ধীরে নিভে গেল৷

ঘর জুড়ে এখন অন্ধকার৷ কিছুক্ষণ আগে প্রণব স্বপ্নে যেরকম অন্ধকার দেখেছিল— ঠিক সেরকম৷

প্রণবের ধাতস্থ হতে আরও পাঁচ-সাতমিনিট লাগল৷ ও বেঁচে আছে নাকি নেই, এটা স্বপ্ন নাকি সত্যি— এগুলো বুঝতে গিয়েই সময়টা কেটে গেল৷ তারপর ও আস্তে-আস্তে উঠে বসল, হাতড়ে-হাতড়ে বেডস্যুইচ টিপে ঘরের আলো জ্বালাল, বালিশের পাশ থেকে বোতল টেনে নিয়ে ঢকঢক করে জল খেল৷

এবার প্রণব ঝলমলে বৈদ্যুতিক আলোর নীচে নিজের অস্থিসন্ধিগুলোকে মেলে ধরে দেখল৷

সব একেবারে স্বাভাবিক৷ মনেই হচ্ছে না যে, একটু আগেই ওগুলো শরীর থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল৷ এই তো— দিব্যি প্রণব নিজের আঙুল নাড়াতে পারছে, পা মুড়তে পারছে, কোমর ভাঁজ করে বসতে পারছে৷ এতটুকু যন্ত্রণা কি বাধা নেই৷

স্ফটিক-গোলক এখন সম্পূর্ণ অস্বচ্ছ৷

প্রণবের মনের ভেতরেও তো হাজারো প্রশ্ন আর ধোঁয়াশা ওইভাবে জমাট বেঁধে রয়েছে৷ তাহলে মিস জেনিফারের এই কথাটা অন্তত সত্যি: স্ফটিক-গোলক তার অধিকর্তার মানসিক পরিস্থিতিকে নিজের মধ্যে ফুটিয়ে তোলে৷

বিছানা থেকে নেমে প্রণব ঘরময় কিছুক্ষণ পায়চারি করল৷

চিন্তা তো করা উচিত৷ কিন্তু ঠিক কী নিয়ে?

ওই যে হাসির আওয়াজটা ভেসে এল— সেটা কি প্রণবের অচেনা? না৷ ওরকম কাঁচ-ভাঙা শব্দের হাসি তো ওর পরিচিতদের মধ্যে মাত্র একজনই হাসতে পারত৷ ওই কাঁপা-কাঁপা আবছা কন্ঠস্বর, জড়িয়ে-জড়িয়ে বলা ইংরেজি— সব তো সেই বিশেষ একজনকেই নির্দেশ করছে৷

তার সঙ্গে কতগুলো দিন প্রণব কাটিয়েছিল! তারপর...

প্রণব কি অন্যায় করেছিল সেদিন? কিন্তু তা কী করে হয়! ওটাকে তো অন্যায় বলা চলে না৷

যিনি প্রণবকে এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করতে পারতেন— কোথায় গেলেন তিনি? অসহায়, শক্তিহীন প্রণব কী করবে এবার?

প্রণব ছুটে এসে দাঁড়াল টেবিলের পাশে; দু-হাতে আঁজলা করে ধরল স্ফটিক-গোলকটাকে৷

প্রণবের মন বলছে, এর সঙ্গে নিশ্চয়ই ‘তার’ কোনও না-কোনও সম্পর্ক আছে৷

একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে প্রণব বলল, ‘আমি হয়তো বুঝতে পারছি— তুমি কে৷ হয়তো জানি— আমার ওপর তোমার কীসের এত ক্ষোভ৷ তবু বলছি, তুমি আমাকে ভুল বুঝছ৷ হয় ক্ষমা করো আমাকে, নয়তো একেবারে মেরে ফেলো৷ এইভাবে আমার জীবন দুর্বিষহ করে তুলো না৷ আমি আর সহ্য করতে পারছি না... পারছি না আমি আর...’

জোরে-জোরে স্ফিয়ারের গায়ে কপাল ঠুকতে শুরু করল প্রণব৷

‘আমার সামনে এসো তুমি৷ আমাকে যা শাস্তি দেওয়ার, দাও৷ আমি সব মাথা পেতে নেব৷ আমি তোমার পা ধরে ক্ষমা চেয়ে নেব৷ কিন্তু প্লিজ এগুলো কোরো না...’

প্রণবের দু-চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়ছে৷ উজ্জ্বল বৈদ্যুতিন আলোয় সেগুলো ঠিক হীরের কুচির মতো ঝিকমিকিয়ে উঠছে৷ গাল বেয়ে সেই জল পড়ছে স্ফিয়ারে, তারপর স্ফিয়ারের মসৃণ শরীরে পিছলে গড়িয়ে পড়ছে মাটিতে৷

কাল থেকে আর মাঝরাতে প্রণবের ঘুম ভাঙবে না৷ কারণ, কাল থেকে হয়তো ওর আর ঘুমই আসবে না৷

সকল অধ্যায়
১.
ম্যাজিক শো থেকে শুরু...
২.
সকালের হেডলাইন
৩.
দুর্ঘটনার পরে
৪.
‘সে’ আছে আড়ালে
৫.
রাত এবং উপহার
৬.
আবার রহস্যময় অঘটন
৭.
নিঝুম দুপুরের আগন্তুক
৮.
একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব
৯.
শান্তির স্নান
১০.
কেমন আছে অনুরাধা?
১১.
নতুন দিনের প্রস্তুতি
১২.
স্বাগত আমার ঘরে
১৩.
আবার ম্যাজিক-শো
১৪.
বুবাই কোথায়
১৫.
আবার বাড়িতে ফেরা
১৬.
আয়না, ওয়াইন, পুতুল এবং...
১৭.
বিভীষিকাময় রাত
১৮.
কোকিল মানে বসন্ত; কোকিল মানে...
১৯.
আরেকটি ‘কেন’
২০.
সাফারি টাইম
২১.
ক্রিস্টাল-ক্লিয়ার ক্রিস্টাল বল শপ
২২.
ত্রুটি সংশোধন
২৩.
নখ কেন কালো
২৪.
স্বচ্ছ স্ফটিক; ঘোলা স্ফটিক
২৫.
ঢাকা থাক, থাক ঢাকা...
২৬.
বেড়ানোর ছবি
২৭.
বহুদিন পর; আবার!
২৮.
নিষ্ফলতার আক্রোশ
২৯.
একটুর জন্য...!
৩০.
অ-সাক্ষাৎ এবং সাক্ষাৎ
৩১.
‘সে’ ছিল, ‘সে’ আছে...
৩২.
একটা অন্যরকম রবিবার
৩৩.
প্রচেষ্টা এবং অভিজ্ঞতা
৩৪.
অন্তিম প্রস্তুতি
৩৫.
দৃশ্য এবং অদৃশ্য
৩৬.
কোন সে সুদূর অতীত হতে...
৩৭.
রইল বাকি এক
৩৮.
জানা এবং অজানা
৩৯.
সময় এসেছে কাছে
৪০.
ইট’স ফাইন
৪১.
ঘন হয়ে উঠেছে অন্ধকার
৪২.
শব্দটীকা
৪৩.
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জী

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%