শ্রীজিৎ সরকার
ঘরে আগে অতিরিক্ত একজন মানুষ ছিল৷ সেখানে এখন দু-দু’জন মানুষ ঘুমিয়ে আছে ড্রিমব্লিসের প্রভাবে৷ তাদের শরীরে ক্ষুধা নেই, তৃষ্ণা নেই, উদ্বেগ নেই, আতঙ্ক নেই— আছে শুধু ঘুম৷
আহা! এমন দৃশ্য দেখেও শান্তি...
সে জানে, এবার তার শিকাররা সবাই একে-একে এসে পড়বে৷ কথায় আছে: কান টানলে মাথা আসে৷ কানে টান পড়ে গেছে; এখন মাথাদের এসে পড়া তো শুধু কিছু সময়ের অপেক্ষা৷
আজ যে তার কী আনন্দ হচ্ছে! খাঁচায় বন্দী ইঁদুরের মতো করে সে সবকটাকে মারবে৷ চরম কষ্ট দিয়ে-দিয়ে মারবে৷ এতদিন পর— অবশেষে এতদিন পর সুযোগ এসেছে তার সামনে৷
অপরাধীদের ক্ষমা করায় বিশ্বাস করে না সে৷ অপরাধ করার সময় যদি ঠিক-ভুলের বোধ না-থাকে, তবে শাস্তি দেওয়ার সময় এত মায়া কীসের? নিজের শিক্ষিকাকেও তো সে অর্ধমৃত বানিয়ে রেখে দিয়েছে৷
আর এদেরকে?
এদেরকে সে পুরো মারবে৷ তারপর ওদের রক্তে ভালো করে স্নান করে, দেহগুলোকে পুঁতে ফেলবে মাটির তলায়৷ অবশ্য পোঁতার আগে চামড়াগুলো ছাড়িয়ে নিলে হয়; ওগুলো তো বেশ কাজের জিনিস৷ আর হাড়গুলোও খুলে নেবে৷ তারপর ওগুলো শুকিয়ে, গুঁড়ো করে, বয়ামে ভরে রাখবে৷
রইল পড়ে শুধু মাংসটুকু৷ ওর জন্য কি আর খোঁড়াখুঁড়ির ঝামেলা পোষায়? নাহ! ওইটুকু বরং রাস্তার কুকুরদের দিয়ে খাইয়ে দিলেই হবে৷ ওরাও বেশ তৃপ্তি করে ভোজ সারতে পারবে৷ তাও যে-সে ভোজ না; একেবারে নরমাংসের ভোজ! মাংসাশী পশুদের কাছে নাকি মানুষের মাংসের স্বাদই আলাদা৷
কথাগুলো ভেবেই, তার মুখে হাসির সূক্ষ্ম রেখা ফুটে উঠল৷ কাজগুলো করার জন্য যেন এখনই আঙুল সুড়সুড় করছে৷
ওই দুই ভাই-বোন মিলে খুব নাকাল করেছিল না তাকে? অনেকগুলো জাদু কীভাবে যেন নিষ্ফল করে দিয়েছিল৷ এবারে সে দেখাবে— আসল জাদু কাকে বলে!
সে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল৷ এই তো তার কতদিনের সুখ-দুঃখের সঙ্গী, হাসি-কান্নার সাক্ষী৷
আজ ভীষণ মনে পড়ছে তার কথা৷ মনে হচ্ছে— সে যেন পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে, কাঁধে হাত রেখেছে, তার নিঃশ্বাস এসে পড়ছে ঘাড়ের কাছে... সব মিথ্যে, সব অলীক কল্পনা; তবু এব বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করছে৷
‘এই রূপ, এই যৌবন, এই যৌন আবেদন— এসব যাদের জন্য তুমি ভালো করে উপভোগ করতে পারলে না, এবার তাদেরকে আমি শাস্তি দেব৷ এই পৃথিবী, এই মাটি, এই বাতাস— এসব যাদের জন্য তুমি উপভোগ করতে পারলে না, এবার তাদেরকে আমি শাস্তি দেব৷ তোমার শক্তি, তোমার আয়ু, তোমার জীবন— এসব যাদের জন্য তুমি উপভোগ করতে পারলে না, এবার আমি তাদেরকে শাস্তি দেব৷ যা-যা সম্পূর্ণভাবে তুমি পাওনি, তা ওরাও পাবে না৷ আমি পেতে দেব না৷ এইবার, এতদিন পর তুমিও শান্তি পাবে, আমিও শান্তি পাব৷’
কালই তো সেই তিথি৷ এই তিথিতেই, দশ বছর আগে সে নিজের সবচেয়ে প্রিয়জনকে হারিয়েছিল ৷ আবার চারবছর আগে এই তিথিতেই, জাদুকর তার স্ফটিক-গোলক নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল৷
এত দুঃখ আর যন্ত্রণা পেয়েও তো সে কাঁদেনি৷ সব কান্নার জলকে সে ক্রোধ করে জমিয়ে রেখে দিয়েছে নিজের মনে৷ ঠান্ডা জল এখন ফুটন্ত লাভা হয়েছে৷ এবার সব হিসাব বুঝে নেওয়ার পালা, সেই লাভায় সব শত্রুদের স্নান করানোর পালা৷
এবার এই তিথিতেই তাদের সবার বিনাশ হবে৷
সে হাসল, ‘সব একজায়গায় হয়েছ না তোমরা? হও-হও৷ ভালো করে শলা-পরামর্শ করে নাও৷ মাথাটা কি শুধু ঘাড়ের ওপর সাজিয়ে রাখার জিনিস? একদম না৷ ওটা খাটানোর জিনিস৷ এতদিন তো খাটাওনি৷ আর কবে ওটাকে ব্যবহার করবে? আয়ু তো ফুরিয়েই এল... এবার অন্তত খাটাও ওটাকে৷ আমিও একটু দেখি, তোমাদের দৌড় ঠিক
কতদূর! শক্তি বলতে তো শুধু ওই এক্সোরসাইজড জলটুকু৷ ওটা বড়জোর আমার দূরদৃষ্টিকে আটকাতে পারে৷ আর তো কিছু নয়...’
নিজের হাসি দেখলে নিজেই মুগ্ধ হয়ে যায় সে৷ তার শিক্ষক নিজের মেয়েকে আর তাকে একচোখে দেখতেন৷ কিন্তু সে তো...
কিন্তু তাকে কি সেই মেয়েটার মতো দেখতে নাকি? মোটেই না৷ তাকে দেখতে অনেক-অনেক বেশি সুন্দর৷ অবশ্য পরশুদিন থেকে এসব তুলনা টানার আর প্রয়োজন থাকবে না; কারণ আগামীকালের পর তো ওদের কারোর অস্তিত্বই থাকবে না৷
আয়না থেকে সরে আসল সে৷ তারপর সব জিনিসগুলোকে শেষবারের মতো একবার পরীক্ষা করে নিল৷ কোনওকিছুতে কোনও খুঁত রাখলে চলবে না৷ প্রতিশোধ হবে প্রতিশোধের মতো৷
সবকিছু ঠিকঠাক— পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, নিদাগ-নিভাঁজ, শুকনো৷ জামা, জুতো, ছুরি, কাস্তে— সবকিছুর ওপরেই প্রয়োজনীয় শব্দগুলো খোদাই করে লেখা হয়ে গেছে, এবং সবগুলো পড়াও যাচ্ছে৷
তবে আর কী!
উহ! সেই ক্ষণ যত কাছাকাছি এগিয়ে আসছে, তত যেন সময় আর কাটতেই চাইছে না৷ দীর্ঘ-দীর্ঘ মনে হচ্ছে প্রতিটা মিনিটকে; ঘন্টাকে মনে হচ্ছে আলোকবর্ষ৷ এরকমই বোধহয় হয়৷
এখন শুধু অপেক্ষা— কখন সেই ক্ষণ আসবে... কখন আসবে...
সে ফুঁ দিতেই বাতাসে কয়েকটা শব্দ ফুটে উঠল:
‘FINAL SHOW DOWN’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন