শ্রীজিৎ সরকার
‘ওরে ভয় নাই, নাই স্নেহমোহবন্ধন—
ওরে আশা নাই, আশা শুধু মিছে ছলনা৷
ওরে ভাষা নাই, নাই বৃথা বসে ক্রন্দন—
ওরে গৃহ নাই, নাই ফুলশেজ-রচনা৷
আছে শুধু পাখা, আছে মহানভ অঙ্গন
উষা-দিশাহারা-নিবিড়-তিমির-আঁকা৷
ওরে বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,
এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা৷’
ক্ষীণস্বরে আবৃত্তির আওয়াজ ভেসে আসছে৷ বলার ভঙ্গি শুনে মনে হচ্ছে, যে আবৃত্তি করছে— তার মন আজ খুব উৎফুল্ল৷ তবে গলার স্বরে কোনও চাপল্য এই; আছে এক চাপা, শান্ত আনন্দের আভাস৷
দরজা খোলাই ছিল৷ দৃশা ঘরের মধ্যে ঢুকে দাঁড়াল৷
ঘরটা একদম অন্ধকার, আর চুপচাপ৷ মনে হচ্ছে যেন ঘরের কোণায়-কোণায় মৃত্যুরা ঘাপটি মেরে বসে রয়েছে, বিপদেরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে৷ শিকার পেলেই তারা গুঁড়ি মেরে এগিয়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে৷
আর এসবের সঙ্গে ঘর জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে একটা অদ্ভুত গন্ধ৷ তাকে সুগন্ধও বলা যায় না, দুর্গন্ধও বলা যায় না৷ বাসি রক্ত, শুকনো ল্যাভেন্ডার, উৎকৃষ্ট কস্তুরি, কোহবার, নানারকম জানা-অজানা ভেষজ— সবকিছুর নির্যাসই তাতে মিলে-মিশে আছে৷
আবৃত্তি বন্ধ হল৷ আবৃত্তিকার বোধহয় দৃশার উপস্থিতি টের পেয়েছে৷ অন্ধকারের মধ্যে থেকেই সেই একই গলার আওয়াজ আরেকটু জোরালো হয়ে ভেসে এল, ‘ও, তুমি এসে গেছো? বাহ! এসো-এসো৷ আমি কিন্তু জানতাম দৃশা, তুমি ঠিক আসবে৷’
দৃশা কোনও উত্তর দিল না৷ চুপচাপ নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকল৷
‘তা একাই এলে যে? তোমার ভাই, সেই বিখ্যাত জাদুকর, বুবাইয়ের বাবা, মা— এরা সব কোথায়?’
দৃশা স্পষ্ট গলায় উত্তর দিল, ‘ওরা কেউ আসেনি৷ আমি একাই এসেছি৷’
এবার একটু হাসির আওয়াজ এল, ‘ওহ— তাই নাকি? ওদেরকে ফেলে রেখে একাই এসে পড়লে? আচ্ছা-আচ্ছা৷ ভালো, বেশ ভালো৷ কতদিন পর তোমার সঙ্গে দেখা হচ্ছে... একটু খবরাখবর নিয়ে নিই৷ তা এতবছরে নতুন কিছু শিখতে-টিখতে পারলে? নাকি এখনও সেই পুরনো লেভেল আর পুরনো অ্যাবিলিটি নিয়েই পড়ে আছো?’
ও এখনও সবাইকে ছিপে গাঁথা মাছের মতো খেলাতে চাইছে৷ আর তাই অপ্রাসঙ্গিক কথা বলেই যাচ্ছে... বলেই যাচ্ছে...
দাঁতে দাঁত ঘষল দৃশা, ‘আমি যে এখানে অযথা কথা বলতে আসিনি— সেটা তো তুমি ভালোই জানো৷ বুবাই আর হিয়াকে কোথায় রেখেছ? ওদের এক্ষুনি ছেড়ে দাও৷’
দৃশার কথা শেষ হওয়া মাত্র যেন ঘরের নিস্তব্ধতা আরও জমাট হয়ে উঠল৷
কিছুক্ষণের অপেক্ষা৷ তারপর সেই নিস্তব্ধতা খান-খান করে দিয়ে, ঘর ভরিয়ে হেসে উঠল সে, ‘ওরে বাবা! ‘এক্ষুনি ছেড়ে দাও’— তুমি যে দেখছি আমাকে আদেশ করছ দৃশা! বাববা৷ আগে তো মিনমিন করে কথা বলতে৷ এখন এত সাহস হয়েছে? ভালো-ভালো৷ কিন্তু কথাটা হচ্ছে, তোমার বাবা অথবা মা হলে না হয় এই আদেশ করা মানিয়ে যেত৷ যত যাই হোক, তাঁরা একদিন তো আমার শিক্ষক-শিক্ষিকা ছিলেন৷ কিন্তু তুমি কে? কী অধিকার তোমার? বয়সেও তো তুমি আমার থেকে অনেক ছোট৷’
দৃশা কেটে-কেটে বলল, ‘যাক৷ আমি যে আসলে তোমার থেকে বয়সে অনেক ছোট— সেটা তাহলে তোমার মনে আছে৷ আমি তো ভেবেছিলাম, ‘ফাউন্টেন অফ ইউথ’ খেতে-খেতে তুমি হয়তো নিজেই তোমার আসল বয়স ভুলে গেছ৷’
‘চটাস’ করে একটা একটা জোর টেবিল চাপড়ানোর শব্দ হল৷ আর তারপরেই রেগে ওঠা অজগরের মতো হিসহিস করে উঠল তার স্বর, ‘হ্যাঁ-হ্যাঁ— আমি ফাউন্টেন অফ ইউথ খাই৷ সেটা তো নতুন কিছু নয়৷ বহুদিন... না-না, দিন কেন? বহুবছর ধরে আমি ‘ফাউন্টেন অফ ইউথ’ খাচ্ছি৷ আর তার জোরেই এই ছিয়াশি বছর বয়সেও আমার বার্ধক্য আসেনি, জরা আমাকে কাবু করতে পারেনি, এখনও আমার ঋতুচক্র বন্ধ হয়নি৷ আর এই যৌবনের শক্তি অটুট রয়েছে বলেই তো আমি এত শক্তি অর্জন করতে পেরেছি৷’
দৃশা ঘাড় নাড়ল, ‘তা হয়তো পেরেছ৷ কিন্তু এই পথ তো আসলে অস্বাভাবিক৷ প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে, জোর করে আদায় করা৷’
সে আবার তার সেই বিখ্যাত কাচ-ভাঙা শব্দে হেসে উঠল, ‘অস্বাভাবিক? কীসের অস্বাভাবিক দৃশা? কীসের অন্যায়? নাথিং ইজ আনফেয়ার, ইন লাভ অ্যান্ড ওয়্যার— এই কথাটা তুমি শোনোনি? আর যুদ্ধ করতে গেলে কী দরকার বলো তো? শক্তি— অপরিমিত শক্তি৷ এভাবে না-হলে, আমি সেটা কীভাবে পেতাম?’
‘স্বাভাবিক উপায়েই তো সেটা পাওয়া যায়৷ আমার মায়ের কথা ভেবে দেখো তো৷ তোমার অর্ধেক বয়সে সে তার চূড়ান্ত ক্ষমতা অর্জন করেছিল৷ অথচ বাবা বলতেন, তোমার মধ্যেও সম্ভাবনা এমনকিছু কম ছিল না৷ প্রয়োজনীয় মানসিক সক্ষমতা, ধীশক্তি, পরিশ্রম করার ক্ষমতা— সবই তোমার ছিল৷ তিনি তো অনেকদিন থেকে দেখেছেন তোমাকে৷ নিশ্চয়ই ভুল বলতেন না৷’
তার গলায় ব্যঙ্গ ঝরে পড়ল, ‘আদিখ্যেতা করে ‘মা-মা’ কোরো না তো৷ উহ, অসহ্য! বলো: সৎ মা৷ হ্যাঁ, ঠিক বলতেন তোমার বাবা৷ আমার মধ্যে সম্ভাবনা ছিল৷ আমার মানসিক শক্তি তোমার ওই সৎ মায়ের চেয়ে কিছু কম ছিল না৷ ভালোই তো এগিয়ে যাচ্ছিলাম৷ কিন্তু একবার... একবার একটা ছোট্ট ভুলের জন্য আমার লেভেল পিছিয়ে গেল৷ অনেকগুলো স্কোর হারিয়ে ফেললাম! আমি কী সাঙ্ঘাতিক ভাবে কার্সড হয়ে পড়েছিলাম! আয়নায় নিজের চেহারা নিজে দেখতে ভয় পেতাম৷ সেটা কাটিয়ে উঠতেই আমার কতগুলো বছর নষ্ট হয়ে গেল!’
দৃশা আস্তে-আস্তে মাথা নাড়ল, ‘জানি৷ আমার মা, মানে আমার গর্ভধারিণীকে তুমি খুন করেছিলে৷’
সে চমকে উঠল৷ হঠাৎ যেন তার আত্মবিশ্বাসে হোঁচট লেগেছে, এতক্ষণের সেই সাবলীলতা ঠোক্কর খেয়েছে, চিড় ধরে গেছে তার অটুট মানসিক দৃঢ়তায়৷ আমতা-আমতা করে সে বলল, ‘তু-তুমি এটা কী করে জানলে?’
‘শুধু আমি নই৷ আমার বাবাও জানত৷ আমার বাবাকে তুমি মনে-মনে কামনা করেছিলে, আর সেই ঈর্ষায়...’
এবার অধৈর্য্য হয়ে উঠল সে, ‘হ্যাঁ-হ্যাঁ৷ আমি কামনা করেছিলাম তোমার বাবাকে৷ ওকে জীবনসঙ্গী হিসাবে চেয়েছিলাম৷ ওই শক্তি, চরিত্রের ওই দৃঢ়তা— এসব আমাকে পাগল করে দিয়েছিল৷ তাই তোমার নিজের মাকে আমি ডেথবার্স্ট দিয়ে খুন করেছিলাম৷ তো? যা করেছিলাম, বেশ করেছিলাম৷ কী যোগ্যতা ছিল তোমার মায়ের?’
একটা অব্যক্ত ঘৃণা আর দুঃখের স্রোত যেন দৃশার শরীরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত বয়ে গেল৷ এই ওর মায়ের খুনী— এ-ই!
দৃশা শান্ত হয়ে, খুব ঠান্ডা গলায় বলল, ‘একবার ভাবো তো, আমার বাবা তো সব জানতেন৷ তবুও তিনি তোমাকে নিজের কাছে রেখেছিলেন৷ তিনি সব জেনেও চেয়েছিলেন, তোমার মেধা জগতের ভালোর কাজে লাগুক৷ তুমি অন্যায়ের পথ ছেড়ে দাও৷’
আবার সে ফুঁসে উঠল, ‘ভালো? কীসের ভালো দৃশা? একমাত্র ভালো ছিলেন আমার প্রথম শিক্ষক৷ তোমার বাবা তো তারপর আবারও বিয়ে করলেন৷ তাও নিজের থেকে বয়সে অনেক ছোট এক ছাত্রীকে৷ প্রায় অর্ধেক বয়সীই বলা যায়... আর আমাকে কিনা তাকেই শিক্ষিকা বলে মেনে নিতে হল— যাকে তুমি এখন ন্যাকামি করে ‘মা-মা’ করছ!’
‘হ্যাঁ করেছিলেন৷ কারণ, তারা দু-জনেই দু-জনকে পছন্দ করেছিলেন৷ বাবাও দেখেছিল, তার সব দায়িত্ব একমাত্র আমার নতুন মা-ই নিতে পারেন৷ সামাজিক সম্পর্ক না-থাকলে যদি অন্যেরা তাকে মান্যতা দেয়না— বিয়ে করার পিছনে এটাও একটা কারণ ছিল৷ যদি তুমি এত ঈর্ষাকাতর না-হতে, অবৈধভাবে ব্ল্যাক নেক্রোম্যান্সির চর্চা না করতে— তবে বাবা হয়তো তোমাকেই স্কুলের দায়িত্ব দিত৷ আর তোমার শিক্ষিকা হওয়ার সমস্ত যোগ্যতাই তাঁর ছিল— অস্বীকার করতে পারবে?’
‘না৷ কিন্তু আমাকে দায়িত্ব দেওয়ার হলে, তোমার বাবা এমনিই দিতেন দৃশা৷ তোমার বাবা আমার রূপ, যৌবনকে পায়ে ঠেলে দিয়েছিলেন৷ আমার শক্তিকে ওই দু-দিনের মেয়েটার জন্য অগ্রাহ্য করেছিলেন৷ যাইহোক, তোমার বাবার সেই বিয়েতে আমি বাধা দিয়েছিলাম দৃশা? দিইনি৷ আমি অন্য একজনকে ভালোবেসে নিয়েছিলাম৷ কিন্তু ওই অসাবধানী, মূর্খ মানুষের দল তাকেও বাঁচতে দিল না৷ এতে আমি কতটা কষ্ট পেয়েছিলাম— সেটা বোঝার মতো ক্ষমতা তোমার আছে? সেটাও ভোলার চেষ্টা করেছিলাম আমি৷ তাই তারপর আমি জাদুকরকে আস্তে-আস্তে বন্ধু হিসাবে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম৷ কিন্তু সেও আমাকে ঠকাল৷ একটা ঠগ, প্রবঞ্চক!’
কত জন্মের জমানো ঘৃণা যেন ঝরে পড়ল তার গলা থেকে৷
‘তুমিও কিন্তু এক হিসাবে তাদের সবাইকে ঠকিয়েছিলে? তোমার সেই ভালোবাসার মানুষকেও, আর জাদুকরকেও৷ তুমি তাদের কাউকে একবারও বলেছিলে— তুমি বয়সে তাদের থেকে অনেক বড়? এমনকি তুমি তো আমার বাবার থেকেও বড় ছিলে বয়সে৷ অস্বীকার করতে পারবে?’
সে ফুঁসে উঠল, ‘বয়সে কী আসে-যায়? আসলে তো আমি অক্ষয়-যৌবনা৷ আমার আগের শিক্ষকও তো আমাকে কত স্নেহ করতেন৷ আমি শিশুবেলা থেকে তার কাছে শিখছিলাম৷ তাঁর মৃত্যুর পর তোমার বাবার কাছে এসেছিলাম৷ শ্রদ্ধার সঙ্গে-সঙ্গে আরও অনেককিছু দিতে চেয়েছিলাম৷ কিন্তু তার মূল্য আমি পেয়েছিলাম?’
আচমকা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল সে, ‘সহ্য করব না... আমার সঙ্গে যারা প্রবঞ্চকতা করেছে, আমার প্রিয়জনদের যারা কেড়ে নিয়েছে, আমার শক্তিলাভের পথে যারা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে— তাদের কাউকে আমি ছাড়ব না৷’
ঘরটা নীল আলোয় ভরে উঠল৷ দৃশা স্তম্ভিত হয়ে দেখল— মিথিল, প্রণব, রণজয় আর স্মিতা ঘরের একপাশে নির্জীব হয়ে পড়ে আছে৷ ওদের জ্ঞান আছে, ওরা সব দেখতে পাচ্ছে, সব শুনতে পাচ্ছে; কিন্তু নড়াচড়া করতে পারছে না৷
আর আরেক পাশে খাটে শুয়ে অঘোরে ঘুমিয়ে চলেছে বুবাই আর হিয়া৷
আড়াল থেকে বেরিয়ে সে এবার সামনে এসে দাঁড়াল৷
এখনও সে দেখতে অবিকল একইরকম আছে— ঠিক বছর-চারেক আগে স্মিতা শেষবার তাকে যেমন দেখেছিল৷ একটাও অতিরিক্ত বলিরেখা বা জরার অন্য কোনও অতিরিক্ত চিহ্ন তাকে স্পর্শ করতে পারেনি৷ সে এখনও একইরকম সুন্দরী, তার শরীর এখনও একইরকম ঋজু আর সুঠাম৷
সে একটা কালো লিনেনের পোশাক পরে আছে, যেটার বুকের কাছে লাল রেশম দিয়ে বিশেষ নকশা আঁকা৷ নকশাটা যেন এই ম্লান আলোতেও জ্বলজ্বল করছে৷ পায়ে সাদা চামড়ার জুতো, মাথায় বিশুদ্ধ চামড়ার তৈরি মুকুট৷ সবকিছুতে হিব্রু ভাষায় কিছু বিশেষ নাম আর চিহ্ন খোদাই করা রয়েছে৷
তাকে দেখলে মানুষ বলে মনে হচ্ছে না; মনে হচ্ছে যেন সাক্ষাৎ মৃত্যুর দেবী নরক থেকে উঠে এসেছেন৷
সে হাসল, ‘একটা পরিকল্পনা করেছিলে না তোমরা? তুমি বেশ আমাকে কথায়-কথায় ব্যস্ত রাখবে, চারপাশে একটা এনার্জি-ফিল্ড তৈরি করবে— যাতে আমি কিছুই টের না-পাই৷ আর সেই সুযোগে তোমার ভাই ওদেরকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে৷ আর তুমি আচমকা ডেথ স্পেল প্রয়োগ করবে৷ তাই তো?’
দৃশা কোনও উত্তর না-দিয়ে শুধু একবার ঢোঁক গিলল৷
মুখ দিয়ে সে চুকচুক আওয়াজ করল, ‘মূর্খ তুমি৷ আসলে তোমরা সবাই-ই মূর্খ৷ একে তো তুমি হোয়াইট নেক্রোম্যান্সি চর্চা করতে দৃশা৷ তার ওপর এখনও সুপ্রিম লেভেলেও পৌঁছাতে পারোনি৷ তোমার ডেথ স্পেল কী করে কাজ করবে? কী যে সব অপরিণত প্ল্যান ভাবো না... যেমন তোমার মা ভেবেছিলেন, স্ফিয়ারটাকে সরিয়ে দিলেই বোধহয় আমাকে নিরস্ত করা যাবে! অদ্ভুত৷’
সে চোখ সরু করে বলল, ‘আমি তোমাদের চোখের সামনে দিনের পর দিন ঘুরেছি৷ একবারের জন্যও চিনতে পেরেছ আমাকে? অবশ্য চিনতে পারলেই বা কী করতে... ওই তো— গালের পাশে সেই অ্যাসিডের দাগটা এখনও আছে৷ এত তাড়াতাড়ি সব ভুলে গেলে?’
তার মুখটা ক্রমশই হিংস্র হয়ে উঠছে, কুঁচকে যাচ্ছে কপাল আর
দু-চোখের কোণ, মোহিনী হাসি বদলে যাচ্ছে চূড়ান্ত নৃশংসতায়৷ তাকে দেখে মনে হচ্ছে, যে কোনও মুহূর্তে সে যে কোনও চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারে৷
বুবাই আর হিয়া তো অকাতরে ঘুমিয়েই চলেছে৷ কিন্তু আর চারটে মানুষ অপলক তাকিয়ে আছে৷
সে ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল, ‘তোমাদের ভাই-বোনের রূপ বদলানোর দৌড় তো ওই কোকিল পর্যন্ত৷ ওহ, না-না— একবার তোমরা তো বাবা আর ছেলে সেজেছিলে৷ সেবার ভালোই সেজেছিলে কিন্তু; আমিও তখন বুঝে উঠতে পারিনি৷ মাঝখানে পড়ে আমার জু-জু ওয়াইনের চালটা নষ্ট করে দিয়েছিলে! সে যাইহোক... আমাকে কি তোমরা একবারও ধরতে পেরেছিলে? দেখো তো...’
পলকে রূপ বদলে গেল তার৷
নীল আলো মেখে এখন ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন ডক্টর অমরেশ চক্রবর্তী৷ ডক্টর চক্রবর্তী বদলে হয়ে গেলেন রিমা— বুবাইয়ের প্রাইভেট টিউটর৷ পরক্ষণেই সে হয়ে গেল মিস জেনিফার— ‘ক্রিস্টাল-ক্লিয়ার ক্রিস্টাল শপ’-এর মালকিন৷
শেষে সে আবার ফিরে এল নিজের মূর্তিতে৷
পলকের মধ্যে এই রূপ-বদলের খেলা দেখে স্মিতা আর রণজয়ের চোখ গোল-গোল হয়ে গেছে৷ তাছাড়া ওরা ভাবতেও পারেনি যে, শত্রু ওদের বাড়িতেই লুকিয়ে ছিল৷
দৃশা বলল, ‘এতদিন ধরে তো ওদের জীবন তুমি ক্রমাগত অভিশপ্ত করে এসেছ৷ তাও শান্তি হয়নি?’
সে দু-পাশে মাথা নাড়ল, ‘না দৃশা, হয়নি৷ তুমিও তো কম চেষ্টা করোনি ওদের বাঁচাতে৷ এই প্রভাব কমানোর চেষ্টা করতে-করতে নিজের নখগুলো পর্যন্ত কালো করে ফেলেছিলে৷ তেমন কিছু কি করে উঠতে পেরেছিলে? এই তো, তোমাদেরই বাড়িতে বসে, পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়া তোমার বাবা-মায়ের সেই সাধের স্কুলে বসে এতদিন আমি সাধনা চালিয়ে এসেছি৷ জানতে তো তুমি৷ পেরেছ কিছু করতে? শুধু লুকিয়ে-লুকিয়ে বেড়িয়েছ৷ তোমার মা তোমাদেরকে ওই একটা জিনিসই ঠিকঠাক
শেখাতে পেরেছিল৷ আর আমি— ওদের দাম্পত্যকে অসুস্থ করেছি, জাদুকরের কেরিয়ার নষ্ট করেছি; আর তোমাদের দুই ভাই-বোনকে পাগলের মতো খুঁজেছি৷ অবশেষে আমার প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে৷ তোমরা নিজেরাই এসে ধরা দিয়েছ৷ এবার কী করব বলো তো?’
দৃশার উত্তরের অপেক্ষা না-করেই সে বলল, ‘এবার আমি তোমাদের সবার অস্তিত্ব শেষ করে দেব৷ যাস্ট ফিনিশ-শ-শ!’
কথা শেষ করে সে চোখ বন্ধ করল৷
দৃশা বুঝতে পারছে, ওর গোটা শরীরটা ধীরে-ধীরে অসাড় হয়ে আসছে৷ ও একটা পালকের মতো আস্তে-আস্তে মাটি ছেড়ে বাতাসে ভেসে উঠছে৷ ও জানে, ওর কোনও স্পেল এই অবস্থায় কাজ করবে না৷
পরিস্থিতি পুরোপুরি বিপক্ষের হাতে৷
এখন মোট সাতটা দেহ ভেসে আছে বাতাসে— পাঁচটা সজ্ঞান দেহ, আর দুটো অজ্ঞান দেহ৷ সাতটা দেহেরই পরিণতি একই৷
পরিচিত সেই নাম্বারটা ভেসে উঠল বাতাসে৷
2804-2010DM
এইবার নাম্বারটা ভেঙে টুকরো-টুকরো হয়ে গেল; আরও কিছু বর্ণ আর কিছু চিহ্ন এসে যোগ হল তার সঙ্গে৷
28 04 2010 DUNGEON MASTER
তারিখটা আজকের; আর সবচেয়ে বড় কথা, আজ বুবাইয়ের জন্মদিন; সালটা বুবাইয়ের জন্মসাল৷ আবার এই তারিখেই চারবছর আগে প্রণব স্ফটিক-গোলক নিয়ে পালিয়েছিল; শুধু সালটা তখন আলাদা ছিল৷
চাইলে এখনই সে সরাসরি ‘ডেথস্পেল’ প্রয়োগ করতেই পারে৷ ওয়ান্ড উঁচু করে, স্পেল উচ্চারণ করার সঙ্গে-সঙ্গে ওই সাতটা শরীর থেকে প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাবে, সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেমে যাবে, নিথর হয়ে যাবে সব...
কিন্তু সে এটা করবে না৷ কারণ, এতগুলো মানুষের ওপর ডেথস্পেল প্রয়োগ করলে সেই প্রভাব তার নিজের শরীরে এসে পড়বে৷ আর তার ফল হবে মারাত্মক৷ আবার অভিশপ্ত হয়ে উঠবে সে৷ হয়তো সেই প্রভাব কাটিয়ে উঠতে-উঠতেই তার বাকি জীবনটা চলে যাবে৷
তাই সে একটা অন্য পন্থা নিল৷
দৃশা টের পেল, ওর শ্বাস ধীরে-ধীরে ভারী হয়ে উঠছে৷ বাকি সবারও ওই একই অবস্থা৷
এর একটাই অর্থ: পরিবেশ বাতাস-শূণ্য হয়ে আসছে৷ আর তার ফলে ডাঙায় তোলা মাছের মতো খাবি খাচ্ছে পাঁচজন মানুষ৷ বাকি দু-জন ড্রিমবিসের ঘোরে হয়তো কিছু টের পাচ্ছে না; কিন্তু তাদের ফুসফুসও নিশ্চয়ই নিস্তেজ হয়ে আসছে৷
সে হাসল, ‘লেট’স ফিল দা পেইন অফ ডেথ৷ এমনি-এমনি মরলে তো হয়েই গেল৷ তারচেয়ে অনুভব করতে-করতে মরো৷ এই ব্রহ্মান্ডের সমস্ত যন্ত্রণা এসে তোমাদের শরীরে জড়ো হোক৷ আরও ছটফট করো... আরও... আরও...’
এবার নীল আলো যেন ক্রমশ কালো হয়ে আসছে, সব যেন কোন এক অতলে ডুবে যাচ্ছে৷ সব বোধ, সব অনুভূতি নিষ্ক্রিয় হয়ে আসছে, হৃদপিণ্ডটাও যেন কোনওরকমে স্পন্দিত হচ্ছে৷
কোথায় থাকে এই মৃত্যু? পাতালের গভীরে? নাকি অন্য কোনও এক সমান্তরাল জগতে? সেখানে যাওয়ার পর কি স্মৃতি বেঁচে থাকে? ঠিক কী হয় সেখানে? জানে না... কেউ জানে না... আর কিছুক্ষণ পর এই সাতজন হয়তো সেগুলো জানতে পারবে, কিন্তু আর কাউকে জানাতে পারবে না৷ হয়তো তাদের এই শরীরগুলো নিয়েও কেউ নেক্রোম্যান্সি চর্চা করবে৷
বুকের ভিতরের ক্রমশ মন্থর হয়ে আসতে থাকা ধুকপুকানিটা কি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল?
আর তো সেই দমচাপা কষ্টটা নেই৷ এই কি তবে মৃত্যুর পরের অবস্থা? সব দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা থেকে মুক্তি!
কিন্তু শরীরটা তো ভারী লাগছে!
দৃশা চোখ খুলল৷ দেখল ওরা মাটিতে পড়ে আছে, শরীরে খুব অল্প-অল্পকরে সাড় ফিরে আসছে, শ্বাস-প্রশ্বাসও আগের থেকে স্বাভাবিক৷
সে নিজেও বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছে৷ বিশ্বাস হচ্ছে না তার— কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না৷
চিৎকার করে উঠল সে, ‘কী হচ্ছে এসব?’
‘যা হওয়ার ছিল, ঠিক তাই হচ্ছে৷ মহান ঈশ্বর ছাড়া কালচক্রকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কারোর নেই৷ আমারও না, তোমারও না৷ সব পাপেরই একটা শেষ থাকে৷ অন্যায় করলে অতি শক্তিধরকেও শাস্তি পেতে হয়৷ আর তুমি তো কোন ছার!’
অনুরাধা এসে দাঁড়াল ঘরের মধ্যে৷ কয়েক জোড়া আশ্চর্য চোখ দেখল— অনুরাধা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর শত অসুস্থতা-দুর্বলতাকে উপেক্ষা করেও তার চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে৷ ওর চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে এক আশ্চর্য দীপ্তি৷
সে আগের চেয়েও জোরে চিৎকার করে উঠল, ‘এটা কীভাবে হল...’
তাড়াতাড়ি কোমরে গোঁজা ছোরাটাকে টেনে বের করতে চাইল সে৷ কিন্তু পারল না৷ কারণ তার সাবলীল হাত-পা এখন শক্ত বরফের মতো জমে গেছে৷ আলো পিছলে যাওয়ার মতো ত্বকে বিবর্ণতার আভাস৷
অনুরাধা ডানহাতের তর্জনী আকাশের দিকে উঁচু করে ধরল, আর বাঁহাতের তর্জনী নির্দেশ করল তার দিকে৷ তারপর চোখ দুটোকে অর্ধেক বুজে, দৃঢ় গলায় বলতে থাকল, ‘জী-ডীন-গীর-কী-ইয়া-কান-পা... জী-ডীন-গীর-আন-না-কান-পা...’
হঠাৎ যেন ঝড় উঠল ঘর জুড়ে, সবার দৃষ্টি ঢেকে গেল সেই ঝড়ে৷ একটা অস্ফুট, অপার্থিব গর্জন আছড়ে পড়ল কানের মধ্যে, চোখ ঝলসে দিয়ে গেল বিদ্যুতের শিখা৷ আতঙ্কে, উত্তেজনায় শরীরের ভিতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো যেন লাফিয়ে গলার কাছে উঠে এল৷
যখন পরিবেশ শান্ত হল, ঝড়-বিদ্যুতশিখা অদৃশ্য হয়ে গেল— তখন সে আর ঘরের মধ্যে নেই৷
দৃশা আস্তে-আস্তে অনুরাধার কাছে এসে বলল, ‘কাকে ডাকলে মা? মারডুক— তাই না?’
একটু-একটু হাঁফাচ্ছিল অনুরাধা৷ এতটা শক্তিশালী রিচ্যুয়াল করার পর অবশ্য সেটাই স্বাভাবিক৷
জোরে একটা শ্বাস নিয়ে অনুরাধা বলল, ‘হ্যাঁ৷ যখন জাদুকরদের জীবন বিপন্ন হয়, সামনে-পিছনে আর কোনও পথ খোলা থাকে না— তখন তিনিই তো উদ্ধার করেন৷ এবার আর কোনও চিন্তা নেই৷ ওর আত্মাকে মহান সম্রাট সলোমন অন্যান্য দুষ্টাত্মাদের সঙ্গে তাঁর পিতলের পাত্রে ভরে রাখবেন৷ সেখান থেকে কারোরই বেরোনোর সাধ্য নেই৷’
মিথিল এসে মাকে জড়িয়ে ধরল৷
স্মিতা আর রণজয়ের যেন এখনও ঘোর কাটেনি৷ তার ওপর শরীরটাও এখনও কেমন দুর্বল-দুর্বল লাগছে৷
অনুরাধা বোনের দিকে তাকিয়ে হাসল, ‘কেমন আছিস?’
স্মিতা আস্তে-আস্তে এগিয়ে এসে অনুরাধাকে ছুঁয়ে দেখল৷ এখনও যেন ও বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের দোলাচলে দুলছে৷ ওর দিদি সুস্থ হয়ে গেছে? ওর দিদি এসব করছে? ওর সেই চিরকালের শান্ত দিদিটা!
‘তুই এসব পারিস দিদি?’
মাথা নাড়ল অনুরাধা, ‘হ্যাঁ রে৷ সেই কবে বাড়ি ছেড়েছিলাম তো এসবের জন্যই৷ সেসব অনেক কথা৷ এখন বলা আর না-বলা একই ব্যাপার৷ যাইহোক... তারপর থেকে তো এতগুলো বছর এসব নিয়েই আছি৷ মাঝখানে শুধু... ও ভেবেছিল, আমি কোমায় চলে গেলে বোধহয় আমার একরকম মৃত্যুই হয়ে যাবে৷ কিন্তু শরীর অচল হলেই তো আর মন অচল হয় না৷ আমি অনেকদিন আগেই এই প্রভাব কাটিয়ে উঠেছি৷ শুধু কাউকে বুঝতে দিইনি৷ আমি ঠিক করেই নিয়েছিলাম, এবার সবকিছুর শেষ দরকার৷ আমি অপেক্ষা করছিলাম, কবে এরকম পরিস্থিতি আসবে৷ আমি জানতাম— ও এই কাজ করবেই৷ খুব দরকার না-হলে তো মারডুককে ডাকা যায় না৷ এদিকে আমি হোয়াইট নেক্রোম্যান্সার৷ অন্যের ক্ষতি হয়— এমন স্পেল তো ব্যবহারও করতে পারি না; তা সে যতই আমার শত্রু হোক না কেন৷ এইসব কারণেই এতকিছু ঘটে গেল৷’
মিথিল বলল, ‘কিন্তু মা, তুমি তো মাসির কার্স আরও আগে কাটিয়ে দিতে পারতে৷’
‘আমি তো জানতাম না, ও আমার বোনকেই কার্সড করেছে৷ এসব জেনেছি এই চারবছরে৷’
দৃশা বলল, ‘আমি কোকিলের ছদ্মবেশে ওকে নজরে রাখতাম৷ বুবাইয়ের জন্মের রাতেও আমি রাস্তার পাশে ছিলাম৷ কিন্তু অত শোকের মধ্যেও, ও যে মনে-মনে স্পেল বলছে— আমি ধারণাও করতে পারিনি৷’
অনুরাধা শান্ত গলায় বলল, ‘ব্যক্তিগত শোক-দুঃখ কাটিয়ে নিরপেক্ষ হয়ে ওঠাটাই তো সবচেয়ে বড় আত্মশক্তি৷ ও সেটা পারেনি৷ তাই অত দক্ষতা, অত শক্তি— সব জলে গেল৷ যাক, যা হওয়ার তা হয়ে গেছে৷’
প্রণব এসে অনুরাধার পা ছুঁয়ে প্রণাম করল৷ অনুরাধা ওকে আশীর্বাদ করল, ‘কেমন আছো প্রণব?’
‘ভাল৷’
‘সেদিন আমি স্বার্থপরের মতো ব্যবহার করেছিলাম৷ ভুল লোককে বাঁচানোর জন্য তোমার শিক্ষা আটকে দিয়েছিলাম৷ আমাকে ক্ষমা কোরো৷’
প্রণব বাধা দিল, ‘না-না৷ এখন মনে হচ্ছে, এসব বেশি শিখিনি— সেটা একদিক থেকে ভালোই হয়েছে৷ যা কিছু অস্বাভাবিক, তা বেশি মানুষের না-জানাই ভালো৷ সবার তো সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা থাকে না৷’
অনুরাধা সায় দিল, ‘তা ঠিক৷’
স্মিতা বলল, ‘তুই কোথায় ছিলিস, কী করতিস— আমার কিচ্ছু শোনার দরকার নেই৷ তুই আমার সঙ্গে আমাদের বাড়ি চল দিদি৷’
রণজয়ও সায় দিল, ‘হ্যাঁ দিদি৷ চলুন৷’
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল অনুরাধা, ‘না রে৷ আমার আর ফিরে যাওয়া চলবে না৷ আমি আর দৃশা এখন থেকে এখানেই থেকে যাব৷ আবার চালু করব এই স্কুলটা৷ এই বিদ্যা আমি হারিয়ে যেতে দেব না৷ তবে এবার থেকে খুব বেছে-বেছে ছাত্র-ছাত্রী নেব, যারা নেক্রোম্যান্সিকে শুধু মানুষের কল্যাণের কাজেই ব্যবহার করবে৷ তোরা ফিরে যা৷ চিন্তা করিস না, আর কিচ্ছু হবে না৷ মিথিলও ফিরে যাক৷ ওর আর প্রবাহ হওয়ার দরকার নেই৷’
অনুরাধা এখনও ঘুমিয়ে থাকা বুবাই আর হিয়ার দিকে আঙুল তুলে বলল, ‘কাল সকালেই ওদের ঘুম ভেঙে যাবে৷ তারপর ওদের কিছুই মনে থাকবে না৷ কেউ ভবিষ্যতে কখনও ওদের সামনে, এইসব ব্যাপারে কিছু উচ্চারণ করবে না৷ ভাববে— তোমরা ঘুমিয়ে ছিলে আর এটা একটা দুঃস্বপ্ন ছিল৷ আর প্রণব, পারলে তোমার বোনের সঙ্গে...’
প্রণব অনুরাধার হাতদুটো নিজের হাতের মধ্যে চেপে ধরল, ‘বলতে হবে না ডি এম৷ আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে আমার বোনের সঙ্গে মিথিলের বিয়ে দেব৷ কিন্তু আমার সেই স্ফিয়ারটা?’
অনুরাধা হাসল, ‘ওটা নিয়ে আর কোনও চিন্তা নেই৷ বাড়ি গিয়ে
দেখবে, ওটা পুরোপুরি স্বচ্ছ হয়ে গেছে৷ ওটা এবার থেকে ওরকমই থাকবে আর তোমার ইচ্ছামতোই চলবে৷ ওটা তোমাকে আরও-আরও অনেক সাফল্য এনে দেবে৷ স্মিতার বদমেজাজি চরিত্রটাও একদম মিলিয়ে যাবে৷ তোমাদের সবার জীবন থেকে সব অভিশাপ মুছে গেছে৷’
এরই মধ্যে রাত কেটে গেছে৷ দৃশা এক ফাঁকে ঘরের জানালাগুলো খুলে দিয়েছে৷ সেখান দিয়ে ভোরের নরম, মায়াবী আলো এসে ভাসিয়ে দিচ্ছে ঘর৷ কতদিন পর এই ঘর আলো আর মুক্ত বাতাসের স্পর্শ পাচ্ছে!
নতুন সূর্য্য মানে নতুন দিন; আর নতুন দিন মানে নতুন আশা৷ সব অন্ধকার, সব আতঙ্ক, সব উৎকন্ঠা আজ সেই আশার স্রোতে ভেসে যাচ্ছে৷ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে সব খারাপ অনুভূতি৷
তিমির বিদায়, উদার অভ্যুদয়,
তোমার-ই হউক জয়...
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন