শ্রীজিৎ সরকার
‘অনুগ্রহ করে শুনবেন, শিয়ালদা-নিউদিল্লি এ সি দুরন্ত এক্সপ্রেস সন্ধ্যা ছটা বেজে কুড়ি মিনিটে রওনা হবে৷ যাত্রীদেরকে অনুরোধ করা হচ্ছে...’
স্মিতারা প্রায় একঘন্টার ওপর স্টেশনে লাগেজ বিছিয়ে বসে আছে৷ ওরা আসলে জ্যামের ভয়ে বাড়ি থেকে একটু তাড়াতাড়িই বেরিয়ে পড়েছিল৷ এদিকে আজ আবার রাস্তা মোটামুটি ফাঁকাই ছিল৷ তাই ওরা অনেকটা আগে এসে পৌঁছাতে পেরেছে৷
তবে স্টেশনে বসে থাকতে মোটেই খারাপ লাগছে না৷ বেশ কত মানুষ দেখা যাচ্ছে! কেউ-কেউ বেড়াতে যাচ্ছে; আবার কেউ-কেউ বেড়িয়ে ফিরছে৷ কত ট্রেন স্টেশন ছেড়ে চলে যাচ্ছে; আবার কত ট্রেন স্টেশনে ফিরে আসছে৷ তাছাড়া কত কুলি, ভেন্ডার, ফেরিওয়ালা...
বুবাই এমনিতেই খুব চঞ্চল৷ একজায়গায় শান্ত হয়ে বসে থাকতে পারে না৷ বারণ করা সত্ত্বেও ও সর্বক্ষণ প্লাটফর্মময় দৌড়াদৌড়ি করছিল৷ তারই মধ্যে আবার একবার মোমো, আর আরেকবার ঝালমুড়ি খাওয়া হল৷ বুবাই অবশ্য এই দুটোর মধ্যে একটাও পছন্দ করে না৷ এসব ঝাল-ঝাল বা টক খাবার ওর ভালো লাগে না৷ ও ভালোবাসে মিষ্টি৷ তাই রণজয় ওকে চকলেট ম্যুজ কিনে দিয়েছিল৷ কোনওরকমে সেটা শেষ করেই ও আবার দৌরাত্ম্য শুরু করে দিয়েছে৷
শেষপর্যন্ত ট্রেনে উঠে তাই শান্তি৷
স্মিতা বসার আগে টুকটাক কিছু দরকারি জিনিস বের করে নিল৷ তারপর রণজয় লাগেজটা ঢুকিয়ে দিল সিটের নিচে৷
উল্টোদিকের বার্থে এক যুবক আর একজন বয়স্ক ভদ্রলোক বসে আছেন৷ কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে, তাঁরা বাবা-ছেলে৷ অবশ্য খুবই নিচু গলায় তাঁরা নিজেদের মধ্যে কথা চালাচ্ছেন৷
উইন্ডো-সিটটা এখনও পর্যন্ত ফাঁকা পড়ে রয়েছে৷ হয় সেখানকার যাত্রী এখনও ওঠেননি, আর নয়তো অন্য কোনও স্টেশন থেকে উঠবেন৷
বুবাই বলল, ‘মা, আমি টয়লেট যাব৷’
স্মিতা সন্ধ্যার টিফিন গোছাচ্ছিল— মানে এক-জায়গায় করে হাতের কাছে রাখছিল আর কী৷ ছেলের কথা শুনে বলল, ‘একমিনিট দাঁড়াও, যাচ্ছি৷’
রণজয় বলল, ‘কেন? তোমাকে যেতে হবে কেন? ও একা চলে যাক না!’
স্মিতা নিজের কাজ করতে করতেই বলল, ‘আর ইউ ক্রেজি রণজয়? ওইটুকু বাচ্চা বাড়ির বাইরে বেরিয়ে একা-একা টয়লেট যাবে?’
বুবাইয়ের বরাবরই বড়দের মতো আচরণ করার ইচ্ছা৷ মায়ের জন্য সেটা হয়ে ওঠে না৷ আজ সুযোগ পেয়েই ও সঙ্গে-সঙ্গে বাবার সুরে সুর মেলাল, ‘আমি একা-একা যেতে পারব মা৷ স্কুলেও তো একা-একাই যাই৷’
রণজয় ভুরু নাচাল, ‘তবে? এই তো, পাশেই টয়লেট৷’
স্মিতা একটু বিরক্ত হল৷ তবে বেড়াতে যাওয়া হচ্ছে বলে আজ ওর মনটা বেশ ভালো আছে৷ তাছাড়া লোকজনের সামনে দৃশ্যরচনা করাটাও ঠিক না৷ তাই ও বিরক্তিটা আর বাইরে প্রকাশ করল না৷ বরং খানিকটা নিমরাজি মতো হয়ে গেল৷
ছেলেকে টয়লেটে পাঠানোর আগে সাবধান করে দিল স্মিতা, ‘একা যাচ্ছ, ঠিক আছে৷ তবে টয়লেট করেই কিন্তু চলে আসবে— কেমন? আর খবরদার, জল নিয়ে কিন্তু খেলা করবে না৷ জানো তো, ট্রেনে কিন্তু পুলিশ আছে? জল নষ্ট করলেই কিন্তু তারা তোমাকে অ্যারেস্ট করবে৷’
বুবাই মন দিয়ে মায়ের কথা শুনল৷ তারপর বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় নেড়ে চলে গেল৷
স্মিতা পিছন থেকে আরেকবার বলে দিল, ‘তাড়াতাড়ি আসবে বুবাই৷ টিফিন খেতে হবে কিন্তু৷’
সামনের রো-এর যুবকটি খানিকক্ষণ ধরে একটু যেন উশখুশ করছিল৷ বোধহয় কিছু বলতে চায়; কিন্তু বলবে কি বলবে না ঠিক করে উঠতে পারছে না৷ এবার একটু ইতস্ততঃ করে বলেই ফেলল, ‘এক্সকিউজ মি, এই উইন্ডো-সিটটা কি আপনাদের?’
রণজয় মাথা নাড়াল, ‘না-না৷’
‘তাহলে যতক্ষণ না কেউ আসছে, আমি একটু বসি এখানে?’
রণজয় হাসল, ‘শিওর৷’
যুবকটি জানালার ধারে গিয়ে বসে পড়ল৷ আর প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ট্রেনের হর্ণ বেজে উঠল৷ দুদ্দাড় করে দু-জন হকার, আত্মীয়দের সি-অফ করতে আসা কিছু মানুষ আর একজন কুলি কম্পার্টপেন্ট ছেড়ে নেমে গেল৷
তার মানে, এবার গাড়ি ছাড়বে৷
প্লেটে-প্লেটে সিঙাড়া, কেচাপ আর কেক সাজানো শেষ৷ সামনের সিটের বাবা-ছেলেও অ্যারারুট বিস্কুট চিবাতে আরম্ভ করে দিয়েছে৷ মাঝে-মাঝে গলা শুকিয়ে উঠলে একঢোঁক করে জল খেয়ে নিচ্ছে৷
চা, কফি— কোনওকিছু ছাড়াই যে ওই শুকনো বিস্কুট কী করে খাচ্ছে! স্মিতার তো দেখেই গলা শুকিয়ে আসছে৷
স্মিতা অবশ্য বেশিক্ষণ ওদেরকে নিয়ে মাথা ঘামাল না৷ রণজয়কে বলল, ‘দেখো তো, বুবাই কী করছে! টয়লেট করতে কারোর এতক্ষণ লাগে? এইসব কারণে আমি ওকে কোথাও যেতে দিতে চাই না৷ নির্ঘাত জল নিয়ে খেলা করছে...’
বুবাইয়ের সত্যিই খুব জল ঘাঁটার নেশা৷ বাড়িতেও এইরকম গাছে জল দেওয়ার নাম করে, হাত-মুখ ধোওয়ার নাম করে জল নিয়ে খেলা করেই যাবে৷
রণজয় আয়েশ করে বসে, মোবাইল নিয়ে খুটখাট করছিল৷ সেদিক থেকে চোখ না-সরিয়েই উঠে গেল৷
মুখ শুকনো করে রণজয় ফিরে এলো একটু পরেই৷ কতক্ষণ হবে? এই মিনিট-দুয়েক৷ তবে এবার মোবাইলটা পকেটে ঢোকানো৷
‘বুবাই বাথরুমে নেই স্মিতা৷’
স্মিতা একটা রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছছিল৷ রণজয়ের কথা শুনে ওর হাত থেকে রুমালটা পড়ে গেল৷
বুবাই নেই? স্মিতা সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল৷ উত্তেজনা ছিটকে এল ওর গলার স্বর থেকে, ‘কী-ই-ই?’
রণজয় একবার ঢোঁক গিলে বলল, ‘হ্যাঁ৷ ইন্ডিয়ান আর ওয়েস্টার্ন— দুটোই ফাঁকা৷ কোনওটাতেই বুবাই নেই৷ আমি ভাবলাম, ও হয়তো কোনও একফাঁকে এখানে চলে এসেছে৷ তাই আমি আবার ফিরে এলাম৷’
কিছুক্ষণ স্মিতা রণজয়ের মুখের দিকে হাঁ-করে তাকিয়ে থাকল৷ যেন ও ঠিক বুঝতে পারল না, কী করা উচিত আর কী করা উচিত না৷
স্মিতা হঠাৎ রণজয়ের টি-শার্টের কলার ধরে ঝাঁকাতে-ঝাঁকাতে বলল, ‘আমার ছেলে কোথায় রণজয়? আমি কিচ্ছু শুনতে চাই না— নট এ সিঙ্গেল ওয়ার্ড! এটা কেন হল বলো তো? জাস্ট ফর ইওর কেয়ারলেস অ্যাটিচিউড... আমি বলেছিলাম ওকে একা যেতে না-দিতে৷ বলো, বলিনি? আনসার মি...’
হঠাৎ স্মিতা রণজয়ের কলার ছেড়ে দিল৷ নিজের কপালে হাত দিয়ে, ভয়ার্ত গলায় বলল, ‘ও মাই গড! ও যদি কিডন্যাপ হয়ে যায় রণজয়?’
আশপাশের অনেক সহযাত্রীই উঁকি মারছে৷ সামনের সিটের বাবা-ছেলেও বিস্কুট খাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই মন দিয়ে এই দৃশ্য উপভোগ করছে৷ তবে দু-জনের কারোরই মুখে হাসিও নেই, বিরক্তিও নেই৷
রণজয় নরম করে বলল, ‘শান্ত হও স্মিতা৷ বাচ্চা মানুষ, কোথায় আর যাবে! দেখো— হয়তো প্যাসেঞ্জাররাই কেউ ডেকে গল্প-টল্প করছে৷ বাচ্চা দেখলে অনেকেই তো এরকম করে৷ আর বুবাই যা পাকা...’
স্মিতা শান্ত হল না৷ রণজয়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই চোখ বড়-বড় করে বলল, ‘কী করে এত ক্যাজুয়ালি তুমি কথা বলছ রণজয়? তুমি কি আমাকে ছেলেমানুষ পেয়েছ? এসব বলে ভোলাচ্ছ আমাকে? বুবাই কোনও জিনিস না রণজয়৷ বুবাই আমাদের ছেলে! ওকে, ফাইন৷ তোমাকে কিচ্ছু করতে হবে না৷ আমি একাই পুরো কম্পার্টমেন্ট খুঁজে দেখছি৷’
রণজয় তাড়াতাড়ি বলল, ‘চলো, আমিও যাচ্ছি৷’
কিন্তু না৷ খুঁজতে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেও, রণজয় বা স্মিতার যাওয়া হল না৷ কারণ ওদের নড়ার আগেই ট্রেন নিজেই চলতে শুরু করল৷ আর সঙ্গে-সঙ্গে একটা অদ্ভুত আশঙ্কায় যেন তিরতির করে কেঁপে উঠল স্মিতার বুকের ভেতরটা৷ ওর বোধবুদ্ধিগুলো সব কয়েক-মুহূর্তের জন্য হারিয়ে গেল৷
স্মিতা ঢোঁক গিলল৷ চোখ বড়-বড় করে কোনও রকমে বলল, ‘রণজয়, যদি বুবাই প্ল্যাটফর্মে নেমে গিয়ে থাকে?’
এই সম্ভাবনার কথা রণজয়ের মনে অনেক আগে থেকেই আসছিল৷ কিন্তু ও সেটাকে জোর করে চাপা দিয়ে রেখেছিল৷ ভেবেছিল, বুবাই কি ট্রেন থেকে নেমে যাওয়ার মতো দুঃসাহসিক কাজ করবে? নিশ্চয়ই না৷ তাছাড়া বুবাই তো একেবারে অবোধ বাচ্চাও না৷ স্মিতার কথায় ওর শিরদাঁড়া দিয়ে এবার একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল৷
যদি সত্যিই এরকম কিছু হয়ে থাকে? এদিকে প্ল্যাটফর্ম তো ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে, ট্রেনের গতিও বাড়তে শুরু করছে৷
রণজয় তাড়াতাড়ি চেনের দিকে হাত বাড়াল৷
আর ঠিক তখনই...
‘এই তোমার বাবা-মা?’
এক বৃদ্ধের গলা৷ তাঁর মুখ আর গলার চামড়া কুঁচকে গেছে, কিন্তু চেহারাটা এখনও সোজা৷ হাতে একটা বাঁকানো লাঠি নিয়ে, কোট-প্যান্ট পরে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন৷ আর তাঁর পাশেই বুবাই৷
রণজয় হাত গুটিয়ে নিল৷
স্মিতা বোধহয় কিছু বলতে যাচ্ছিল৷ তার আগেই বৃদ্ধ বিরক্তির সুরে বললেন, ‘কেমন বাবা-মা আপনারা? ছেলের প্রতি কোনও খেয়াল রাখেন না কেন? আমার চোখে না-পড়লে ছেলে তো এতক্ষণ শিয়ালদা স্টেশনেই থেকে যেত!’
এর মানে এতক্ষণ স্মিতা যে আশঙ্কা করছিল, ঠিক সেটাই ঘটতে চলেছিল৷ কী সাঙ্ঘাতিক!
বাড়ি থেকে বেরিয়েই এত দুঃসাহস? একটু ফাঁকা পেলেই আজ বুবাইয়ের ব্যবস্থা হবে৷
বৃদ্ধ বললেন, ‘আমি আসছি, খানিক দূর থেকে দেখলাম ও এই কম্পার্টমেন্ট থেকে নামল৷ তারপর হাঁ করে কুকুর দেখছে তো
দেখছেই৷ আমার কীরকম যেন ডাউট হল! আমি শেষটায় জিজ্ঞেস করেই ফেললাম৷ বলল, বাবা-মায়ের সঙ্গে বেড়াতে যাচ্ছি৷ কুকুর
দেখবে বলে নাকি ট্রেন থেকে নেমে পড়েছে৷ যেমন আপনারা, তেমনই আপনাদের ছেলে! মাঝখানে পড়ে— আরেকটু হলে, আমিই ট্রেন মিস করছিলাম৷’
বৃদ্ধ থামলেন৷
রণজয় আর বুবাই— দু-জনের ওপরেই অসহ্য রাগ হচ্ছে স্মিতার৷ কিন্তু এটা পাবলিক প্লেস৷ তাই ও নিজেকে যথাসম্ভব সামলে নিল৷ ভদ্রভাবে হেসে বলল, ‘অনেক ধন্যবাদ আপনাকে৷’
রণজয়ও হেসে ধন্যবাদ জানাল৷
বৃদ্ধ শুধু বললেন, ‘বাচ্চা ছেলেদের মন ওরকম একটু চঞ্চলই হয়৷ না হলে ‘বাচ্চা’ বলে কেন? বাইরে বেরিয়ে একটু চোখে-চোখে রাখতে হয়৷’
স্মিতা আরেকটু হাসল৷ তারপরই টিফিনের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল৷
স্মিতা শুকনো গলায় ডাকল, ‘রণজয় খেয়ে নাও৷ বুবাই আয়, খাইয়ে দিই৷ দাঁড়াও রণজয়, হাতে স্যানিটাইজার নাও আগে...’
ট্রেন আস্তে-আস্তে গতি বাড়াচ্ছে৷
বৃদ্ধ নিজেই নিজের মালপত্র জায়গামতো ঢুকিয়ে দিলেন৷ তারপর জানালার ধারে বসে থাকা যুবকটিকে বললেন, ‘এই যে ভাই, সরে বোসো দেখি৷’
যুবকটির বোধহয় এত তাড়াতাড়ি এত সুন্দর জায়গাটা ছাড়ার ইচ্ছা ছিল না৷ তাই একবার নিশ্চিত হতে চাইল, ‘এটা আপনার সিট?’
বৃদ্ধ বিরক্ত হলেন, ‘হ্যাঁ৷ বিশ্বাস না-হয়, নাম মিলিয়ে নাও— মাই নেম ইজ ডক্টর কুমারেশ চক্রবর্তী৷ বেড়াতে বেরিয়ে সব ভালো ঝামেলা হল!’
যুবকটি বোধহয় এরকম ধমক আশা করেনি৷ জড়সড় হয়ে সরে বসতে-বসতে বলল, ‘না-না৷ বিশ্বাস না-করার কী আছে!’
কুমারেশ চক্রবর্তী নিজের ছোট ব্যাগটা সিটের তলায় ঢুকিয়ে দিলেন৷ তারপর লাঠিটা কোণায় দাঁড় করিয়ে রেখে, নিজের জায়গায় বসে পড়লেন৷
বুবাই বোধহয় মায়ের মেজাজটা ঠিকঠাক আঁচ করতে পারেনি৷ ও মুখ ভর্তি খাবার নিয়ে, সহজ গলায় বলল, ‘জানো মা, ওই দাদুটা কী ভাল...’
স্মিতা ছেলের কথার কোনও উত্তর দিল না৷ ওর রাগ এখনও কমেনি৷ গম্ভীর হয়ে বুবাইকে খাইয়ে যেতে লাগল৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন