শ্রীজিৎ সরকার
বাগানটা কি নোংরা হয়ে গেছে৷ অথচ আগে এই বাগানেই কতরকম গাছ ছিল— রকমারি ভেষজের গাছ, রঙিন ফুলের গাছ, সুস্বাদু ফলের গাছ, নানারকম দুর্লভ গুল্মো... কিন্তু তখন সবকিছু কত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ছিল৷
আর এখন?
সবকিছু অচেনা-অজানা গুল্মো আর ছোট-বড় ঘাসে ছেয়ে গেছে, যত্রতত্র বিছুটি-চোরকাঁটা গজিয়ে উঠেছে, বড়-বড় গাছের গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে স্বর্ণলতা; পাতার ফাঁকে-ফাঁকে জাল বুনেছে মাকড়সার দল৷ আগে তো ওসব গাছের ডালে বড়-বড় মৌচাক থাকত৷ সেখান থেকে খাঁটি মধু
সংগ্রহ করা হত৷ সেসব কোথায় গেছে, কে জানে!
দেখলে মনেই হবে না যে, এখানে কোনওকালে মানুষ বাস করত৷
প্রণব খুব হতাশ হল৷ ও অনেক আশা নিয়ে ছুটে এসেছিল৷ ভেবেছিল, হয়তো এখানে সবকিছু আগের মতোই আছে; আর ‘সে’ও আছে— যার খোঁজে ও এসেছে৷
কিন্তু কোথায় কী! সব ফাঁকা৷
ও জানে না, এসব কী করে হয়েছে? আর তার থেকেও বড় প্রশ্ন— এবার ও কোথায় যাবে? এটাই তো ওর শেষ আশা ছিল৷
আজ জায়গাটা পরিত্যক্ত৷ অথচ একসময় এখানে নানা-বয়সের কত ছেলে-মেয়ে ঘোরাঘুরি করত৷ কেউ স্পেল অভ্যাস করছে, কেউ রসায়ন তৈরির জন্য ভেষজ ঝাড়াই-বাছাই করছে, কেউ মাটি খুঁড়ে খুঁতযুক্ত মিশ্রণ চাপা দিয়ে দিচ্ছে, কেউ আবার হয়তো একটা মৃতদেহ নিয়ে
ভূগর্ভস্থ কোনও ঘরের নেমে যাচ্ছে...
তাছাড়া, এই বাগানের যত্নও তো ছাত্রছাত্রীদেরই করতে হত৷
মধু সংগ্রহ করা, জল তোলা, চৌবাচ্চা পরিষ্কার রাখা— এইসব দায়িত্বও ছিল তাদের৷ অনেকটা সেই প্রাচীনকালের আশ্রমিক ব্যবস্থার মতো৷
আর এই সব কর্মকান্ডের মূলে থাকতেন সেই মানুষটি৷ সবার প্রতি তাঁর ছিল সমান নজর৷
প্রণব যেন পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে, ওদেরকে সার বেঁধে তিনি নিয়ে যাচ্ছেন স্নানের জায়গায়৷ ওদের সর্বাঙ্গে মন্ত্রপূত জল ঢেলে দিতে-দিতে বলছেন, ‘তোমরা অনুচ্চার্য, মহান এবং শাশ্বত ঈশ্বরের নামে সঞ্জীবিত হও, পরিচ্ছন্ন হও, বিশুদ্ধ হও৷ সর্বোচ্চ আরাধ্যের আশীর্বাদ নেমে আসুক তোমাদের ওপর৷ অক্ষয় হোক বিশুদ্ধতা৷ এই আশীর্বাদ সর্বদা তোমাদের সঙ্গে থাকুক, যাতে তোমরা নিজেদের অভীষ্ট পূরণ করার জন্য যথেষ্ট শক্তি এবং পরাক্রম লাভ করতে পারো...’
আজ, এতবছর পরেও সেই কন্ঠস্বর প্রণবের কানের মধ্যে বাজছে৷
কী আশ্চর্য ছিল তাঁর ইন্দ্রিয়ের সূক্ষ্মতা! কার মিশ্রণে কী গলদ হয়েছে, কার কোন উচ্চারণে ত্রুটি হয়েছে, কার ঠিক কোন ভঙ্গিটা সঠিক হয়নি— এসব তিনি একজায়গায় দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই নিখুঁতভাবে বলে দিতেন৷
সাধনা... মহাসাধনা...
এখানে কাটানো দিনগুলোর কথা ভেবে প্রণব দীর্ঘশ্বাস ফেলল৷ তখন কি ও একবারও ভেবেছিল যে, মঞ্চে-মঞ্চে খেলা দেখিয়ে ওর জীবন কাটবে? একটা অদ্ভুত ভয় আর আশঙ্কা ওকে সারাজীবন বুকের মধ্যে করে বয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে?
হয়তো প্রণব সাঙ্ঘাতিক সম্ভাবনাময় বা খুব একটা প্রতিভাবান ছিল না৷ কিন্তু ও তো পরিশ্রমী ছিল৷ ভেবেছিল, পরিশ্রম করেই একদিন ঠিক সবকিছু অর্জন করে ফেলবে৷
কিন্তু কোথা থেকে কী হয়ে গেল! সব আশা, পরিকল্পনা ধূলিসাৎ হয়ে গেল৷
প্রণব জঙ্গল ভেদ করে এগিয়ে গেল৷
বাড়িটারও বাগানের মতো একই অবস্থা৷ বট-অশ্বত্থের শিকড় মজবুত দেওয়ালে ফাটল ধরিয়ে ফেলেছে, দরজা-জানালার পাল্লাগুলো সব ভেঙে-চুরে গেছে৷ ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে ভিতরের যেটুকু অংশ দেখা যাচ্ছে— সবটাই পরিত্যক্ত৷
বাড়ি, বাগান— সব মিলিয়ে, পুরো পরিবেশটাই যাকে বলে: Extremely Haunted Place...
আজ প্রণবকে এখান থেকে খালি হাতেই ফিরতে হবে৷
খুব সাবধানে প্রণব একবার বাড়ির আশপাশ ঘুরে দেখল৷ অবশ্য সেটা করার খুব একটা দরকার ছিল না৷ বরং চারদিক যেমন পরিত্যক্ত আর জঙ্গল হয়ে উঠেছে, সাপ বা বিষাক্ত পোকামাকড়ের বাসা কোথায় না কোথায় আছে— কে জানে! তার ওপর একটু এগোতে গেলেই চোখে-মুখে মাকড়সার জাল জড়িয়ে যাচ্ছে৷
তবু খানিকটা মায়ার বশেই প্রণব ঘুরল৷ পুরনো সেই জায়গার সঙ্গে মেলে না আর কিছুই৷ মনে হয়, ও বোধহয় অজানা-অচেনা কোনও জায়গায় ভুল করে এসে পড়েছে৷ তবুও...
ঘুরতে-ঘুরতে হঠাৎ একটা চেনা জিনিস চোখে পড়তে প্রণব থমকে দাঁড়াল৷ অবশ্য সেটাও আর আগের চেহারায় নেই৷ তার পরিচ্ছন্ন শরীর এখন কালচে মসের আস্তরণে ঢেকে এসেছে; তবু পুরনো পরিচয়টা দিব্যি বোঝা যাচ্ছে৷
জিনিসটা একটা বড়সড় চৌবাচ্চা৷
যে জিনিসের চর্চা এখানে হত, তাতে বৃষ্টির জলের খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল৷ অনেক জিনিস এই জলে ধুয়ে শুদ্ধ করতে হত, বহু রাসায়নিক মিশ্রণ বানাতেও এই জল দরকার হত৷
তাছাড়া শুভ আত্মাকে আহ্বান করার সময় কখনও-কখনও চারিদিকে বৃষ্টির জল ছেটানোর দরকার হত৷ তাতে অশুভ এবং অপবিত্র আত্মারা দূরে থাকত৷
এই চৌবাচ্চায় বৃষ্টির জল জমা হয়ে থাকত৷ দেখতে সাধারণ মনে হলেও, আসলে এটা যে কোনও সাধারণ চৌবাচ্চার তুলনায় অনেক-অনেক বেশি গভীর৷ তবে এর ওপর আগে একটা ঢাকনা দেওয়া থাকত— যেটা এখন দেখা যাচ্ছে না৷
প্রণব চৌবাচ্চাটার ভিতরে একবার উঁকি মেরে দেখল৷
চৌবাচ্চার ভিতরে কালচে জল জমে আছে৷ তাতে কিছু শুকনো পাতা ভাসছে, আর কতগুলো ব্যাঙাচি ঘুরঘুর করছে৷ দেখে মনে হচ্ছে, কে বোধহয় খানিকটা ফাউন্টেন পেনের কালো কালি জলে গুলে দিয়েছে৷
কোত্থেকে একটা বুনো-বুনো গন্ধ এসে লাগল প্রণবের নাকে৷ মনে হয় এই জলেরই গন্ধ৷ অথবা কোনও অচেনা জঙ্গুলে গাছ থেকেও গন্ধটা আসতে পারে৷
প্রণব একটা কিছু ভাবল৷ তারপর কাঁধে ঝোলানো সাইড-ব্যাগটা থেকে স্ফটিকের গোলকটা বের করল৷
গোলকটা এখন সম্পূর্ণ অস্বচ্ছ আর ঠান্ডা৷ অবশ্য সেদিনের পর থেকে প্রণব যখনই দেখছে, তখনই এটার এই একই অবস্থা৷
প্রণব এটাকে সঙ্গে করে এনেছিল এর হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য, আর সম্ভব হলে এর রহস্যময় চরিত্র সম্পর্কে কিছু জানার জন্য৷ দ্বিতীয়টা তো আর সম্ভব নয়৷ কিন্তু প্রথমটা করা যেতে পারে৷
আর একমুহূর্তও দেরি করল না প্রণব৷ গোলকটাকে ও সোজা চৌবাচ্চার জলে ফেলে দিল৷ ঝুপ করে শুধু একটা শব্দ হল৷ ভারী গোলকটা নিমেষে তলিয়ে গেল কালচে জলের মধ্যে৷ ব্যাঙাচিগুলো ছিটকে গেল এদিক-ওদিক৷
শান্তি!
কিন্তু সত্যিই কি তাই? তবে যে হঠাৎ সবকিছু কেমন বদলে গেল৷
এই একটু আগেও তো বেশ রোদ ছিল৷ হঠাৎই যেন সেটার উজ্জ্বলতা কমে গেছে৷ নিস্তব্ধ পরিবেশ যেন আরও থমথমে হয়ে উঠেছে৷ আর এসবের সঙ্গে একটা অদ্ভুত শীতলতা প্রণবকে ভিতরে-বাইরে জমিয়ে দিচ্ছে৷
শোঁ-ও-ও-ও...
প্রণব পিছিয়ে আসতে-আসতে অবাক হয়ে শুনল, বাতাসের আওয়াজ হচ্ছে৷ অথচ গাছের পাতা দেখলে বোঝা যাচ্ছে, কোনও বাতাসই বইছে না৷ বরং অদ্ভুত একটা দমচাপা আবহাওয়া— মনে হচ্ছে, এক্ষুনি যেন নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে৷
দেখতে-দেখতে চৌবাচ্চার ধারগুলো কমে যেতে লাগল; তারপর
চোখের সামনেই সেগুলো একেবারে অদৃশ্য হয়ে গেল৷ হু-হু করে জলতল কমে যেতে দেখে প্রণবের মনে হল, ওই জলের গভীরতা যেন ক্রমশ বেড়েই চলেছে... বেড়েই চলেছে...
কতদূর নামবে ওটা? পৃথিবীর কেন্দ্র পর্যন্ত? নাকি একেবারে আরেক মেরু পর্যন্ত?
প্রণব অবাক হয়ে দেখল— গর্তটা শুধু গভীর হওয়ায় সীমাবদ্ধ নেই৷ এবার ওটা ক্রমশ চওড়া হচ্ছে; আর চওড়া হতে-হতে এগিয়ে আসছে প্রণবের দিকে৷
সেই বাতাস বওয়ার শব্দটা এখন আরও জোরালো হয়ে উঠেছে৷ মনে হচ্ছে, যেন একটা প্রকান্ড ঘূর্ণিঝড় প্রণবের খুব কাছাকাছি এসে পড়েছে৷ তার জোর বাড়ছে— বাড়ছে— বাড়ছে... এবার শুধু নিমেষের মধ্যে সবকিছু লন্ডভন্ড করে দেওয়ার পালা!
গর্তের কিনারা এখন প্রণবের পায়ের বুড়ো-আঙুল থেকে হাতখানেক
দূরে৷
প্রণব প্রাণপণে আরও পিছিয়ে আসতে চাইছে, ছুটে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে চাইছে৷ কিন্তু ওর পা-দুটো হঠাৎ করেই যেন পাথর হয়ে গেছে৷ অথবা কোমরের নীচের অংশটার সঙ্গে ওর মস্তিষ্কের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে৷ ও নড়তে পারছে না, চলতে পারছে না; শুধু বিপদের ঘনিয়ে আসাটা দেখতে পাচ্ছে, আর আশঙ্কাটা আন্দাজ করতে পারছে৷
এখন গর্তের কিনারা আর মাত্র আঙুল-খানেক দূরে৷ জলতল এত নীচে নেমে গেছে যে, আর চোখে পড়ছে না৷
প্রণব একবার চিৎকার করে ওঠার চেষ্টা করল৷ যদিও জানে, হয়তো কেউই সাহায্য করতে ছুটে আসবে না৷ কিন্তু কোনও আওয়াজই বের হল না ওর গলা থেকে৷ গর্ত না, ওর কাছে যেন একটা অন্ধকার জগতের দরজা এগিয়ে আসছে৷ সেখানে তারা অপেক্ষা করে আছে— যাদের দেহ সূক্ষ্ম, যারা যে-কোনও সময়ে ব্রহ্মাণ্ডের যে-কোনও স্থানে অবস্থান করতে পারে, যারা জীবিত আর মৃতের মাঝখানে সেতুবন্ধ রচনা করে৷ একবার তাদের সেই জগতের মধ্যে ঢুকে গেলে আর বেরিয়ে আসার উপায় নেই...
হঠাৎ কোত্থেকে একটা কোকিল তীক্ষ্ণস্বরে ডেকে উঠল৷
ডাকটায় কি তীক্ষ্ণতা ছাড়াও আরও কিছু ছিল?
সঙ্গে-সঙ্গে শোঁ-শোঁ শব্দটা থেমে গেল, বাতাসের ভারী ভাব উধাও হয়ে গেল, রৌদ্রের তেজ ফিরে এল, গর্তও তার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে থাকল৷
আর সবচেয়ে বড় কথা— প্রণব ওর হারিয়ে যাওয়া চেতনা ফিরে পেল৷
চৌবাচ্চা এখন অবিকল আগের মতো৷
একটু ধাতস্থ হয়ে আর দেরি করল না প্রণব৷ একদৌড়ে বেরিয়ে পড়ল বাগান থেকে৷ তারপর দ্রুত পায়ে স্টেশনের দিকে হাঁটতে লাগল৷
ব্যাগের ওজনেই টের পাওয়া যাচ্ছে, গোলকটা আবার তার আগের জায়গায় ফিরে এসেছে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন