শ্রীজিৎ সরকার
আপাতত ঘরের সমস্ত আসবাব সে অন্য জায়গায় সরিয়ে ফেলেছে৷ তারপর মেঝে খুব ভালোভাবে ঝাঁট দিয়েছে, ঝাড়ু দিয়ে দেওয়াল ঝেড়েছে৷ শেষে পুরো ঘর সে তকতকে করে মুছেছে৷ কোনও কোণায় এতটুকু ময়লা সে থাকতে দেয়নি৷
এরপর সে ঘরের ঠিক মাঝখানে চক দিয়ে একটা ন-ফুট ব্যাসের বৃত্ত এঁকেছে৷ না, নিখুঁত এই বৃত্তটা আঁকার জন্য তার কোনও যন্ত্রের দরকার হয়নি৷ এত বছরে তাহলে আর কী অভ্যাস করল...
বড় বৃত্তের ঠিক ছয় ইঞ্চি ভিতর দিয়ে আরেকটা বৃত্ত আঁকা হয়েছে৷ সেটার রঙ সবুজ৷ আর দুটো বৃত্তের মাঝখানে যে বলয়ের মতো ফাঁকা অংশ— সেখানে উজ্জ্বল লাল রঙ দিয়ে, হিব্রু ভাষায় লেখা হয়েছে পবিত্র আত্মাদের নাম৷
ওই নামই তো অনন্ত শক্তির আধার! ক্রিয়া চলাকালীন ওই নামগুলোই আহ্বায়ককে সমস্ত বাহ্যিক অপশক্তি এবং আগত আত্মার রোষ থেকে রক্ষা করবে৷
বৃত্ত থেকে দু-ফুট দূরে, পূর্বদিক ঘেঁষে চক দিয়ে আরেকটা ত্রিভুজ আঁকা হয়েছে৷ ত্রিভূজটার প্রতিটা বাহু ঠিক তিনফুট করে৷ ত্রিভূজের ভিতরে আর বাইরে হিব্রুতে আরও কিছু শক্তিশালী শব্দ লেখা আছে৷
বাঁদিকে ANAPHAXETON
ডানদিকে TETRAGAMMATION
নীচে PRIMEUMATON
মাঝখানে MI-CHA-EL
এছাড়া ত্রিভূজের ঠিক মাঝখানে রূপোর তৈরি একটা সীলমোহর রাখা আছে— যাতে আমনের চিহ্ন আর পবিত্র পঞ্চভূজ খোদাই করা রয়েছে৷
সে আজ পরে আছে একটা ফ্রক৷ ফ্রকটা দেখতে একেবারে সাধারণ; কিন্তু ফ্রকের ফিতেটা দেখলেই তার অসাধারণত্ব টের পাওয়া যায়৷
সেখানে একটা বিশেষ ষড়ভূজ আঁকা আছে৷
তার কোমরে জড়ানো রয়েছে একটা সিংহের চামড়ার কোমরবন্ধ৷ দুই বৃত্তের মাঝের অংশে যেসব আত্মাদের নাম লেখা আছে, কোমরবন্ধতেও ঠিক সেগুলোই সেলাই করে-করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে৷
এই আজকের বিশেষ পোশাক৷ ‘সেরিমোনিয়াল অ্যাটায়ার’৷
সে ত্রিভূজের মাঝখানে একটা পিতলের পাত্র রাখল৷ পাত্রে ভরা রয়েছে ছোট-ছোট ‘আত্মার ধূপ’— যেগুলো সে কিছুদিন আগেই বানিয়েছে৷ এর গন্ধে আত্মা পরিতৃপ্ত হবেন৷
এইবার ধূপগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিল সে৷ অবিকল শিকারকে ক্রমাগত পেঁচিয়ে ধরতে থাকা সাপের মতো কুন্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া বেরিয়ে এল৷
সে ওয়ান্ড হাতে নিয়ে দাঁড়াল ঠিক বৃত্তের মাঝখানে৷
এখন তার প্রথম কাজ, ‘নেক্রোম্যান্সি’ শাস্ত্রের পঞ্চভূত, অর্থাৎ— পৃথিবী, বাতাস, জল, আগুন আর আত্মার নামে পবিত্র শপথ নেওয়া৷
উদাত্ত কন্ঠে সে বলতে থাকল, ‘আমি তাঁকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি— যাঁর জন্ম-মৃত্যু নেই, যিনি পৃথিবী আর আকাশ নির্মাণ করেছেন, দিন এবং রাত সৃষ্টি করেছেন, আলো এবং অন্ধকারের উদ্ভব করেছেন... রা-হুর-খ্যুত... ইয়া-বেসজ...’
‘... পৃথিবীর উপরিভাগের এবং পাতাললোকের সমস্ত আত্মাগণ, যাঁরা শুষ্ক বাতাসের মধ্যে অথবা জলের গভীরে অবস্থান করছেন; বেগবান বাতাস এবং তীব্র আগুনের মতো তাঁরা...’
‘আর-ও-গো-গো-রু... রু-আব্রা-ইয়া ও-ম্রি ওডোম ব্যাবালন-ব্যাল-বিন... মা ব্যারারিড ইওএল... সা-বা-ওট... অব্রাসাক্স সাব্রিয়াম ও-ও উ-উ আড-অন-আ-ই...’
কী আমোঘ শক্তি এই শব্দের! প্রকৃতির কোন গোপন গহ্বর থেকে নিঙড়ে বের করে নিয়ে আসছে শক্তি, জীবিত বা মৃত মানছে না, একজায়গায় জড়ো করছে তাদের; বিন্দু-বিন্দু শক্তি মিলে সাগর হয়ে যাচ্ছে৷ কী অদ্ভুত অনুভূতি!
শক্তির প্রভাবে আস্তে-আস্তে তার চারপাশের বৃত্ত অত্যুজ্জ্বল আর উষ্ণ হয়ে উঠল৷ সে জানে, এই তাপ আর আলোর উৎস তার নিজের শক্তি— যেটার উপস্থিতি সে নিজে টের পেতে শুরু করেছে৷
তার মনে হচ্ছে, তার আর তার আরাধ্যের মধ্যে আর কোনও পার্থক্য নেই৷ তারা এক এবং অদ্বিতীয়৷ এক শরীর, এক মন৷ কী অত্যাশ্চর্য্য এক অনুভূতি বয়ে চলেছে গোটা শরীর জুড়ে!
সে তার ওয়ান্ড ত্রিভূজের দিকে নির্দেশ করল এবং বলল, ‘হে আমন, আমার কথা শুনুন এবং এই ত্রিভূজের মধ্যে সাধারণ মানুষের বেশে আবির্ভূত হোন৷ দৃশ্যমান হোন...’
এই একই কথা সে পরপর সাতবার বলল৷
কিন্তু কিছুই বদলাল না৷ অথচ সীলমোহরের পঞ্চভূজ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে৷ অর্থাৎ— ‘সে’ এসে গেছে৷
অবশ্য এটাতে সে খুব একটা আশ্চর্য হল না৷ আত্মারা অধিকাংশ সময়ই জাদুকরের আদেশ মানতে অনিচ্ছুক হন৷ মন্ত্রের বশে এসে তো যান, কিন্তু ধরা দিতে চান না৷ আসলে তাঁদের শক্তি ব্যবহার করে কেউ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করুক— এটা তাঁরা চান না৷
এরও উপায় তার জানা আছে৷
সে সামান্য হাসল৷ তারপর গম্ভীর গলায় বলল, ‘যদি আপনি আমার বিরুদ্ধাচারণ করেন এবং এই মুহূর্তে আমার আদেশ না-মানেন; আমি আপনার এই সীলমোহর আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেব৷ এবং তার ফলাফল হিসাবে আপনার অস্তিত্ব ব্রহ্মান্ড থেকে চিরতরের জন্য মুছে যাবে৷’
সাধারণত এতেই কাজ হয়ে যায়৷ আজও হল৷ সীলমোহরে খোদাই করা পঞ্চভূজ আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল; ধূপের ধোঁয়ার মধ্যে খুব আবছাভাবে আমনের চেহারা দেখা গেল৷
ওই তো একটা নেকড়ের অবয়ব, যার লেজটা আবার সাপের মতো৷ নেকড়ের মুখ দিয়ে অনবরত আগুনের শিখা বের হচ্ছে৷
সবাই এই আদল দেখতে পায় না৷ তারা শুধু ধোঁয়াই দেখে৷ কিন্তু ‘সে’ তো অন্য সবার মতো স্থূল নয়৷ তার দৃষ্টি, অনুভূতি— সবই খুব সূক্ষ্ম, খুব স্পর্শকাতর৷
দেখতে দেখতে নেকড়েটা মানুষের মতো হয়ে গেল৷ অবশ্য সম্পূর্ণ মানুষের মতো নয়; মানুষের শরীর আর দাঁড়কাকের মাথা, দাঁতগুলো কুকুরের শ্বদন্তের মতো৷
এবার ওঁকে বশ করার পালা৷
‘হে আত্মা, আমি আপনাকে সনির্বন্ধ আমন্ত্রণ জানাচ্ছি; অনুরোধ করছি সর্বোচ্চ স্তরের শক্তি দ্বারা পরিবেষ্টিত হতে; বেরাল্যানেসিস, বাল্ড্যাচিয়েনসিস, পউমেশিয়া এবং অ্যাপোলোজিয়েট সেডেসের দ্বারা... অ্যাডোনাই, এল, ইলোমি, ইলোহির নামে...’
চোখ বন্ধ করে সে স্পষ্ট উচ্চারণে এবং দৃঢ় স্বরে দীর্ঘ বক্তব্য পড়ে গেল৷ এতটুকু বাঁধল না, উচ্চারণ করতে গিয়ে কোত্থাও হোঁচট খেতে হল না৷
এটা হল আত্মাকে পুরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার প্রথম ধাপ৷
দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করার আগে সে একবার চোখ খুলল৷ আর সঙ্গে-সঙ্গে তার গোটা শরীর জুড়ে একটা শিহরণ বয়ে গেল৷
এ কী!
বৃত্ত অনুজ্জ্বল, ত্রিভূজ-পঞ্চভূজ অন্ধকার, ক্রমশ আরও ঘনীভূত হতে থাকা ধোঁয়ার কুন্ডলীর মধ্যে থেকে আত্মার চেহারা অদৃশ্য হয়ে গেছে৷
তার মাথার মধ্যেটা যেন টলে উঠল৷
সে তো আত্মাকে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি৷ তবে সে গেল কী করে? তাছাড়া বৃত্ত জুড়ে এতক্ষণ ধরে যে শক্তিক্ষেত্র সক্রিয় ছিল, সেটাই বা অন্তর্হিত হল কী করে?
প্রচন্ড রাগে আর ক্ষোভে তার মাথার মধ্যেটা যেন তোলপাড় হয়ে উঠল৷
এইভাবে বৃথা গেল পরিশ্রম? তার ইচ্ছা করছে সবসুদ্ধু আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে৷ অসহ্য...
কিন্তু হঠাৎ তার পেটের মধ্যেটা যেন চিনচিন করতে শুরু করল৷ আর অবাক বিস্ময়ে সে দেখল— তার মাসিক শুরু হয়েছে৷
হ্যাঁ, ঋতুমতী হওয়ার বয়স সে হয়তো বহুদিন আগেই পার হয়ে এসেছে ৷ কিন্তু যৌবন দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য যে মিশ্রণ সে খায়, সেটা তো যৌবনের সঙ্গে-সঙ্গে যৌবনের চিহ্নগুলোও টিকিয়ে রেখে দেয়৷
কিন্তু এটা কীভাবে হল? সে তো দিনক্ষণ হিসাব করেই আজকে সবকিছুর আয়োজন করেছিল৷ তার হিসাবে...
আরেকবার মনে-মনে দিন গুনল সে৷
নাহ! কোনও ভুল নেই৷ তার মাসিক শুরু হতে এখনও অন্তত দিন-দশেক তো দেরি আছেই ৷ এরকম শারীরিক গোলমাল তো তার কোনওদিন হয় না!
একটামাত্র দুর্ঘটনা— এই একটা দুর্ঘটনা তার এতদিনের এত পরিশ্রম নিমেষে নিষ্ফল করে দিল৷ ‘আমন’ সেই আত্মা, অতীত আর ভবিষ্যতের সব তথ্য যাঁর নখদর্পণে থাকে৷ সে ভেবেছিল তাঁর কাজকর্মের ভবিষ্যত সম্পর্কে কিছু আভাস নিয়ে নেবে৷
আবার যে কবে এইরকম লগ্ন, নক্ষত্রের এইরকম অবস্থান আসবে!
সে জানে, এটা কিন্তু কারোর ষড়যন্ত্র নয়৷ এটা কারোর ষড়যন্ত্র হতেই পারে না৷ কারণ সে এখনও বৃত্তের মধ্যেই আছে, আর ওই নামগুলো এখনও তাকে ঘিরে রেখে দিয়েছে৷ আর ওগুলোকে টপকে এই পৃথিবীর কোনও জাদুর সাধ্য নেই ভিতরে ঢোকে এবং নিজের শক্তি ব্যবহার করে৷
এটা তারই শারীরিক ত্রুটি৷
তার শিক্ষিকা বলতেন, ‘জাদু চর্চা করো, রসায়ন তৈরি করো, মৃতদেহ থেকে শক্তি সংগ্রহ করো, প্রয়োজন মতো সেই সংগৃহীত শক্তি আর আয়ত্ত করা ক্রিয়াকৌশলের প্রয়োগ করো... সব করো৷ কিন্তু প্রকৃতিতে যা স্বাভাবিক— তার বিরুদ্ধাচরণ বেশি না-করাই ভাল৷ কারণ যেমন আমরা একদিন প্রকৃতি থেকে এসেছি, তেমন আবার একদিন প্রকৃতিতেই ফিরে যাব৷ আমাদের সব শক্তি, সব কৌশলই তার দান৷’
কিন্তু যৌবনের লোভ যে বড় ভয়ংকর...
এই একটা ব্যাপারে সে তার পুরুষ সহ-জাদুকরদের থেকে পিছিয়েই থাকল৷ ইচ্ছা করলেই সে যখন-তখন, যে কোনও ক্রিয়াকলাপ করতে পারবে না৷ কারণ রজস্বলা নারীর মন্ত্র শক্তিহীন!
সে ওয়ান্ডটা ছুঁড়ে ফেলে দিল, হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল মাটিতে৷ তারপর দু-হাতে মুখ ঢেকে প্রচন্ড জোরে চিৎকার করে উঠল৷
সেই চিৎকারের কোনও অর্থ নেই, তাতে কোনও শব্দ নেই, কোনও ভাষা নেই৷ তাতে মিশে আছে শুধু দুর্দমনীয় ক্রোধ আর নিদারুন হতাশা৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন