আবার রহস্যময় অঘটন

শ্রীজিৎ সরকার

ঝন-ঝন-ঝন...

যাজ্ঞসেনীর হাত থেকে স্ফটিকের গোলকটা পিছলে পড়ে গেল মেঝেতে৷ আর সঙ্গে-সঙ্গে অমন নিটোল বস্তুটা স্রেফ গুঁড়ো আর গুঁড়ো৷

এই গোলকটা দিয়ে মঞ্চে ‘ম্যাজিক-বল’ -এর খেলা দেখানো হয়৷ একটা টেবিলের ওপর এটা বসানো থাকে৷ টেবিলের নিচটা পুরো ফাঁকা থাকে৷ জাদুকর এর পিছনে দাঁড়িয়ে নানারকম অঙ্গভঙ্গি করেন৷ আর তার সঙ্গে-সঙ্গে কখনও এই গোলকের মধ্যে পাখি উড়ে বেড়ায়, কখনও গোলাপের কুঁড়ি ফুল হয়ে ফুটে ওঠে, আবার কখনও একটা লোমশ, রাক্ষুসে হাত বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করে...

খেলা দেখানোর সময়টুকু বাদ দিয়ে গোলকটা একটা কাঠের বাক্সে, নরম কাপড়ের ভাঁজে রাখা থাকে৷ এটা দিয়ে রোজকার খেলাগুলোর বাইরে আরও কিছু দেখানো যায় কিনা, সেই ব্যাপারে একটু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে বলে প্রণব এটাকে আনতে বলেছিল৷ সাবধানী আর যত্নশীলা বলে দলে যাজ্ঞসেনীর খ্যাতি আছে৷ তাই প্রণব দায়িত্বটা ওকেই দিয়েছিল৷

দৃশ্যটা দেখে প্রণব যেন শক খেল৷

জাদুর অর্ধেক কারিকুরি তো লুকিয়ে ওই গোলকটার মধ্যে৷ তাছাড়া ওটা এক্সক্লুসিভ— একটাই আছে৷ এখন এরকম একটা জিনিস প্রণব আনাতে পারবে কিনা সন্দেহ! দিন-দিন ঠিকঠাক জিনিসপত্র পাওয়া খুবই সমস্যার হয়ে পড়ছে৷ আসলে সবাই তো এসব জিনিস বানায় না৷ যারা আগে বানাত, প্রকৃতির নিয়মে তারা এখন বৃদ্ধ হচ্ছে, মারাও যাচ্ছে৷ আর অধিকাংশের ছেলে-মেয়েরাই এসবের থেকে অন্যান্য ব্যবসা বা চাকরি করতে বেশি আগ্রহী৷

গোলকটার মধ্যে জেলির মতো কিছু একটা ছিল৷ সেটা এখন ছড়িয়ে পড়েছে মেঝেতে৷ তবে জিনিসটা আঠালো আর ঘন বলে গড়িয়ে বেশিদূর যেতে পারছে না৷

যাজ্ঞসেনী নিজেও কম অবাক হয়নি৷ ও একেবারে কাঠ-পুতুলের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে৷ একবার ভাঙা টুকরোগুলোর দিকে দেখছে আর একবার প্রণবের মুখের দিকে... ও তো যথেষ্ট সাবধানেই আসছিল৷ হঠাৎ কী যে হল!

প্রণব ভুরু কুঁচকে বলল, ‘এটা কী হল যাজ্ঞসেনী?’

যাজ্ঞসেনী আমতা-আমতা করে বলল, ‘স্যার মানে... আমি সাবধানেই আসছিলাম৷ হঠাৎ... মানে... আমার হাতটা হঠাৎ করে কেমন যেন... কেমন যেন কেঁপে গেল স্যার৷ আমি বুঝতে পারিনি৷’

প্রণব কিছুটা রুঢ় হয়ে বলল, ‘কতবার তোমাদের বলেছি, এসব জিনিস সিরিয়াসলি হ্যান্ডল করতে! বলিনি? এবার এরকম একটা স্ফিয়ার আমি কোত্থেকে পাব? এত অসাবধানী তোমরা... বিশেষত তুমি— সে আর বলার মতো না৷’

যাজ্ঞসেনী চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল৷ এমনিতেও কদিন আগে যা ঘটল, তার প্রভাব ওর মন থেকে এখনও যায়নি৷ তার উপর আজ আবার এই ঘটনা!

হ্যাঁ, যাজ্ঞসেনীই সেই মেয়ে— যে প্রতিবার ‘দ্বিখন্ডিতা নারী’ খেলাটা দেখানোর সময় দ্বিতীয় টেবিলে ঢোকে এবং পা দুটো বের করে দেয়৷ সেদিনও ও টেবিলে ঢুকেছিল৷ কিন্তু তারপর যে কী হয়েছিল...

এখন তো যাজ্ঞসেনী হাজার চেষ্টা করলেও, মৃত সেই মেয়েটির জীবন বা এইরকম একটা গোলক— দুটোর কোনওটাই ফিরিয়ে আনতে পারবে না৷ অথচ দুটো ভুলই অনিচ্ছাকৃত৷

যাজ্ঞসেনী কী করা উচিত বুঝতে না-পেরে, ভাঙা টুকরোগুলো একজায়গায় করে কুড়োতে যাচ্ছিল৷ প্রণব বারণ করল, ‘থাক৷ আবার কী করতে কী করে বসবে! তুমি যাও, আমি দেখছি৷’

একটু ইতস্ততঃ করে যাজ্ঞসেনী চলে গেল৷

এখানে এখনও আটদিন থাকবে প্রণবরা৷ তারপর আবার একটা অন্য শহর, অন্য লোকজন, অন্য অর্গানাইজার৷ তবে সুখের কথা— দুর্ঘটনা ঘটার পর দর্শকসংখ্যায় যে সাময়িক মন্দা এসেছিল, সেটা কেটে গেছে৷ আবার বেশ লোকজন হচ্ছে৷ তবে সব যেন আসতে হয় তাই আসছে, বসে থাকতে হয় তাই বসে থাকছে; মোট কথা, সময় কাটানোর আর কিছু পাচ্ছে না বলে যেন এটাকে বেছে নিচ্ছে৷ প্রথমদিকের সেই উৎসাহ-উদ্দীপনায় ভাঁটা পড়ে গেছে৷

তবু যে মোটের ওপর লোকসান হচ্ছে না— এতেই প্রণব খুশি৷

কয়েকটা আলো গোলমাল করছিল আর নতুন কিছু প্রপস বসানোর ছিল৷ সলিল সেগুলোর তদারকি করতে গিয়েছিল৷ ঘরে ঢুকতে গিয়ে ও চমকে উঠল৷

তবু সলিল অতিরিক্ত সাবধানী বলে; অন্য কেউ হলে নির্ঘাত কাচে পা কেটে বসত৷ প্রণব তো এত অন্যমনস্ক ছিল যে, ঘরে কে ঢুকল কি না-ঢুকল— সেসব কিছু খেয়ালই করেনি৷

সলিল জিজ্ঞাসা করল, ‘এসব কী করে হল?’

কথা বলতে খুব একটা ইচ্ছা করছে না৷ ছোট্ট করে উত্তর দিল প্রণব, ‘যাজ্ঞসেনীর হাত থেকে পড়ে স্ফিয়ারটা ভেঙে গেছে৷’

মুখ কোঁচকাল সলিল, ‘ইস-স-স৷’

সলিল পা বাঁচিয়ে, খাটের পাশে এসে দাঁড়াল৷

প্রণব এখনও চিন্তায় বিভোর৷ অন্যসময় হলে হয়তো যাজ্ঞসেনীর এই বেখেয়াল এবং তার জন্য হয়ে যাওয়া ক্ষতি নিয়ে এতক্ষণ একটা ঝড় বইয়ে দিত৷

কিন্তু আজ আর প্রণবের অত কথা বলতে ভালো লাগছে না৷ বলেই বা কী হবে? যা ঘটার তা তো ঘটেই যাচ্ছে৷ আর প্রণব পাপেট শো-এর পুতুলের মতো সেসব ঘটনাপ্রবাহের অভিঘাতে নাচছে; যে কিনা ‘জাদুকর অঘোরলাল’ হয়ে কেবল চোখ আর আঙুলের ইশারায় এক-ঘর লোককে প্রতিদিন বোকা বানায়৷

আপাতত একটা অন্য চিন্তা৷ স্ফিয়ারের খেলা তো বাদ হয়ে গেল৷ এবার এর বদলে তবে অন্য কী?

তবে শুধুই কি এই চিন্তা? মাঝেমাঝে এসব চিন্তার সূত্র ধরে তো অতীতও হানা দিয়ে যায়!

নিজের চুল খামচে ধরল৷ নিজের মনেই বলতে লাগল, ‘এবার... এবার কী হবে...’

বেলা হয়েছে৷ স্নান করতে যাবে বলে সলিল জামাকাপড় ছাড়ছিল৷ প্রণবের অবস্থা দেখে তাড়াতাড়ি ওর পাশে বসে পড়ল৷ কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘কী হল স্যার?’

প্রণব হতাশ গলায় বলল, ‘প্রথমে ‘দ্বিখন্ডিতা নারী’ বাদ পড়ল৷ তারপর এখন স্ফিয়ারের খেলাটাও তো চলে গেল সলিল৷ এবার ওটাকে আমি কী দিয়ে রি-প্লেস করব?’

বিষয়টা শুধু চিন্তার নয়, রীতিমতো দুশ্চিন্তার৷ ঘুণ পোকার মতো কুরে কুরে খেয়ে ফেলেছে প্রণবের মানসিক শান্তি৷

সলিল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল৷ তারপর আস্তে আস্তে বলল, ‘আমি বলি কী স্যার, কটাদিন আপনি একটু রেস্ট নিন৷ কোথাও থেকে না হয় ঘুরে-টুরে আসুন৷ আপনার মনটা খুব অশান্ত হয়ে উঠেছে৷’

প্রণব সলিলের চোখে চোখ রাখল, ‘তোমার কী মনে হয় সলিল, আমি এমনি-এমনি উতলা হচ্ছি?’

সলিল দীর্ঘদিন ধরে প্রণবকে দেখছে— কিছু না-হোক, প্রায় বছর তিনেক তো হবেই৷ প্রণব এমনিতে গম্ভীর হলেও, আসলে শান্ত প্রকৃতির মানুষ৷ দলের সবাই ওকে যেমন ভয় পায়, তেমন শ্রদ্ধাও করে৷ কত কঠিন পরিস্থিতি যে প্রণব শুধু নিজের ঠান্ডা মাথা আর উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে সামলে দিয়েছে— তার ইয়ত্তা নেই৷

সলিল বলল, ‘না স্যার, তা নয়৷ কিন্তু এতে তো আপনার শরীরের ক্ষতি হচ্ছে৷ তার চেয়ে এখন শো বন্ধ থাক৷ আপনি দিন-কতক কোথাও থেকে একটু চেঞ্জ করে আসুন৷ দেখবেন— মনটাও ভালো হয়ে যাবে, শরীরটাও অনেকটা ফ্রেশ লাগবে৷’

প্রণব জোরে-জোরে দু-পাশে মাথা নাড়ল, ‘হবে না সলিল... হবে না৷ যেখানে যাব, এই ব্যর্থতা আমাকে সেখানেই তাড়া করে বেড়াবে৷ একমাত্র একটা হিউজ সাকসেসফুল শো-ই আমাকে এর থেকে বের করতে পারবে৷’

সলিল কোনও উত্তর দিল না৷ শুধু মুখটা নিচু করে নিল৷

প্রণব আবার কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল৷ কিন্তু তার আগেই জিতেন ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল৷ যারা মঞ্চের পাশে সবসময় অপেক্ষা করে— জিতেন হল সেই দুই বলশালী লোকেদের একজন৷

জিতেন হাঁফাচ্ছে৷ দেখে মনে হচ্ছে ও খুব উত্তেজিত অবস্থায় দৌড়াতে-দৌড়াতে এসেছে৷ আন্দাজ করা যায়, সাঙ্ঘাতিক কিছু ঘটেছে৷

জিতেন হাঁফাতে-হাঁফাতেই বলল, ‘স্যার শিগগির একটু আসুন৷’

কী হয়েছে, কোথায় যেতে হবে— এসব কিছু না বলেই দ্রুতপায়ে জিতেন ফিরে গেল৷ সলিল আর প্রণবও ওর পিছু নিল৷

জিতেন রুমির ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল৷

রুমি দলের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে৷ তবে সরাসরি পারফরমেন্সে

অংশগ্রহণ করার পক্ষে কিছুটা ধীর৷ ও শো চলাকালীন প্রণবের হাতে-হাতে তলোয়ার, দন্ড, স্ফটিক ইত্যাদি এগিয়ে দেয়৷ এরই মধ্যে ঘরের সামনে প্রায় পুরো দলের লোক জড়ো হয়েছে৷ গুঞ্জনও চলছে নানারকম৷ প্রণবকে দেখে সবাই সরে দাঁড়াল৷

খাটে চোখ বন্ধ করে রুমি শুয়ে আছে৷ চোখে-মুখে জলের ছিটে লেগে আছে৷ পাখা তো ফুল-স্পিডে চলছেই, যাজ্ঞসেনীও ওর মাথার কাছে বসে একটা খবরের কাগজ দিয়ে অনবরত হাওয়া করে চলেছে৷ দলের আরও দুই-তিনজন মেয়ে ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে৷ একজন হাতের তালু দিয়ে ঘষে-ঘষে রুমির পায়ের পাতা গরম করার চেষ্টা চালাচ্ছে৷

প্রণব ঘরে ঢুকেই জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হয়েছে?’

প্রশ্নটা সবাইকে উদ্দেশ্য করেই ছুঁড়ে দেওয়া; যেন যে-কোনও একজন উত্তরটা দিলেই হবে৷ কিন্তু সবাই চুপ করে থাকল৷ মনে হল, কথাগুলো বোধহয় কেউ ঠিকঠাক গুছিয়েই উঠতে পারছে না৷

শেষপর্যন্ত কিছুক্ষণ আগে সাঙ্ঘাতিক অঘটন ঘটিয়ে ফেলা যাজ্ঞসেনীই সাহস করে মুখ খুলল, ‘রুমি সুইসাইড করতে যাচ্ছিল স্যার৷’

‘হো-য়া-ট?’

জিতেন পিছনদিক থেকে বলল, ‘হ্যাঁ স্যার৷ ও ছাদ থেকে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছিল৷ সেইসময় পূর্বাশা ছাদে জামাকাপড় মেলতে গিয়েছিল৷ দেখতে পেয়ে ও-ই আটকিয়েছে৷’

যে মেয়েটা রুমির পায়ের পাতা গরম করার চেষ্টা করছিল, সে বলল, ‘আমি ওকে কিছুতেই আটকাতে পারছিলাম না স্যার৷ কী জোর ওর গায়ে!’

প্রণব এবার পূর্বাশার মুখের দিকে তাকাল, ‘কেন করল ও এরকম? কিছু বলেছে সেসব?’

পূর্বাশা মাথা নাড়ল দু-পাশে, ‘না স্যার৷ ও তখন কোনও কথাই বলছিল না৷ আমি কতবার ডেকেছিলাম! কোনও উত্তর দেয়নি৷ শুধু মুখ দিয়ে কেমন অদ্ভুত একটা গোঁ-গোঁ আওয়াজ করছিল! ঘরে এসেও তো কোনও কথাই বলেনি৷ এইরকম চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে৷’

প্রণব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল৷ তারপর সলিলের দিকে ফিরে বলল, ‘একটা ডাক্তার ডাকলে হত না?’

সলিল কিছু একটা উত্তর দিতে যাচ্ছিল; কিন্তু সেটা আর দেওয়া হল না৷ তার আগেই রুমি চোখ খুলল৷

জোড়া-জোড়া আগ্রহী চোখ আছড়ে পড়ল৷

যাজ্ঞসেনী হাওয়া করা বন্ধ করে ওর মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ল৷ নরম গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘এখন কেমন লাগছে রুমি?’

রুমি খুব আস্তে-আস্তে, ধীর-গলায় বলল, ‘একটু ভালো৷ আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে...’

কথাটা শেষ করেই রুমি আবার আগের মতো চোখ বন্ধ করে ফেলল৷

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে প্রণব বলল, ‘তাহলে ও বরং রেস্ট নিক৷ যাজ্ঞসেনী তো ওর রুম-মেট— ও এই ঘরেই থাক৷ এখানে আর অন্যদের আর ভিড় বাড়িয়ে লাভ নেই৷ তেমন অসুবিধা হলে ও-ই আমাদের ডাকবে৷’

যাজ্ঞসেনী ঘাড় নাড়ল, ‘হ্যাঁ-হ্যাঁ৷ তেমন কিছু হলেই আমি ডাকব৷ আর আমি তো ঘরেই থাকছি৷’

প্রণব চলে যাচ্ছিল৷ কিন্তু ওর হঠাৎ মনে হল— যাজ্ঞসেনীর একার ওপর দায়িত্ব দেওয়াটা বোধহয় ঠিক হচ্ছে না৷ তাই ও পূর্বাশাকে বলল, ‘তুমিও বরং থাকো৷ দু-জন থাকা ভাল৷ যদি ও আবার কিছু করতে-টরতে যায়! তারপর রুমি ঘুম থেকে উঠুক৷ কেমন আছে না-আছে শুনে ডাক্তার ডাকলে হবে৷ ওকে একটু চোখে-চোখে রেখো৷’

আপাতত ডাক্তার ডাকার প্রস্তাব প্রণব ইচ্ছা করেই মুলতুবি রাখল৷ ডাক্তার ডাকলেই তাকে একগাদা কথা বলতে হবে, আর সেখান থেকে কথাটা ছড়িয়ে পড়ারও ভয় থাকবে৷ আর এসব জিনিস শো-এ প্রভাব ফেলতে পারে৷

সলিল বলল, ‘এটাই ভালো হল৷ একজন হয়তো কোনও দরকারে গেল, তখন ঘরে আরেকজন থাকতে পারবে৷’

সবাই যে-যার ঘরে চলে গেছে৷ এখন পরিবেশ বেশ ফাঁকা৷

প্রণব ঘর ছাড়ার আগে আরেকবার বলল, ‘কোনও অসুবিধা হলেই সঙ্গে-সঙ্গে ডাকবে৷ একদম হেজিটেট করবে না৷ আর তুমি নিজেও সাবধানে থেকো৷’

যাজ্ঞসেনী ঘাড় নাড়ল, ‘একদম স্যার৷’

এখনও প্রণব আর সলিলের স্নান হয়নি৷ এদিকে ঘড়ির কাঁটা বলছে, দুপুরের খাওয়ার সময় পার হয়ে যাচ্ছে৷

সলিল তোয়ালে কাঁধে বাথরুমে ঢুকতে-ঢুকতে বলল, ‘তাহলে শো...’

প্রণবের মনের মধ্যে অনেকগুলো চিন্তা জমাট বাঁধছিল৷ সলিলের কথা শুনে ওর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল৷ ও শুধু দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘দ্য শো মাস্ট গো অন৷’

হয়তো কোনও অতীতের ছায়া

ঘরটা আধো-অন্ধকার৷ জানালাগুলো সব বন্ধ৷ কোথাও কোনও একটা রহস্যময় আলো জ্বলছে বটে, তবে তাতে অস্পষ্টতা কিছুই কমছে না৷ কেবল আলো আর অন্ধকার সঙ্গমরত নারী আর পুরুষের মতো জড়াজড়ি করে ছড়িয়ে আছে৷

তবে ঘরটা বদ্ধ বা অন্ধকার হলেও স্যাঁতস্যাঁতে নয়৷ বরং বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন৷ মেঝেতে পাতা পুরোনো, রঙ জ্বলে যাওয়া কার্পেটটাও একদম তকতকে৷

ঘরে কত যে জিনিস! একপাশে কাচের বয়ামে সার-সার সাজানো সমাধির ধুলো, ডায়াগ্রাম খোদাই করা লকেট, খাঁটি লোহার তৈরি চাবি, মানুষের হাড়গোড়— সব যত্ন করে সাজিয়ে রাখা৷

শুধু কি এই?

সলোমনের বৃত্ত খোদাই করা পিতলের বাঁটওলা ছুরি, লাপিস লাজুলি, অ্যামিথিস্ট, নানারকম ওয়ান্ড, কাক আর পেঁচার পালক, শুকনো সামুদ্রিক কচ্ছপের খোলস, কত বিচিত্র সব জীবজন্তুর দেহাবশেষ, রকমারি বই...

ঘরে ঢুকেই সে একবার চোখ বুলিয়ে নিল জিনিসগুলোর ওপরে৷ একবার অসাবধানতায় ভুল হয়ে গিয়েছিল৷ তারপর থেকে সে সাবধান হয়ে গেছে৷

ঠিক নিজের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মতো এখানকার প্রতিটা জিনিস তার অতিপরিচিত৷ কিছু খোয়া গেছে কিনা বোঝার জন্য, একবার আলগোছে চোখ চালানোই তার পক্ষে যথেষ্ট৷

আপাতত সব ঠিকঠাকই আছে৷

সে নিজের মনেই বেশ জোরে হেসে উঠল৷ দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘স্ফিয়ার হারিয়ে এত শোক জাদুকর? তাও তো তুমি নেক্রোম্যান্সার নও৷ স্ফিয়ারের আসল মূল্য আর তুমি কী বুঝবে! ওই স্ফিয়ার তৈরি করতে আমার বুকের রক্ত দেওয়া ছিল৷ ওটা আমার জন্য তৈরি ছিল৷ সাধনার জিনিস ছিল ওটা আমার৷ আর তুমি? চোর একটা... চুরি করেছিলে ওটা তুমি৷ চুরির জিনিস আজ পর্যন্ত কেউ ভোগ করতে পারেনি জাদুকর... কেউ না... তুমিও পারলে না৷’

এতক্ষণ যে কালো চাদরটা দিয়ে সে নিজেকে আপাদমস্তক ঢেকে রেখেছিল— এক-টানে খুলে ফেলল সেটাকে৷ তারপর ছুঁড়ে দিল ঘরের এক-কোণে রেখে দেওয়া চেয়ারটাকে লক্ষ্য করে৷

আশ্চর্য টিপ বলতে হয়! চাদরটা একেবারে ঠিক চেয়ারে গিয়েই পড়ল৷

বাইরে থেকে এসে হাত-মুখ ধোওয়ার বালাই তার নেই৷ খাওয়া-দাওয়ারও তেমন বাহুল্য নেই৷ ফলে সাংসারিক ঝামেলা অনেক কম৷ আর এসব তুচ্ছ কাজ নিয়ে সারাদিন পড়ে থাকলে কি তার চলে?

সে একটা কালো পাথরের তেল-চুকচুকে হামান-দিস্তা টেনে নিল৷ কিছু শিশি-বোতলও নামাল৷ এবার সেই হামান-দিস্তার মধ্যে একে-একে হলুদ, চন্দন, নানারকম গন্ধদ্রব্য, কোহবার, গালা, শুকিয়ে রাখা ল্যাভেন্ডারের কুঁড়ি এবং আরও কয়েকরকম জিনিস মেশাল৷ তারপর দুদ্দাড়িয়ে সেগুলোকে চূর্ণ করতে আরম্ভ করল৷

কবজিতে এখনও তার ভালোই জোর৷

বেশ কিছুক্ষণ ধরে চূর্ণ করার পর তার মনে হল, এবার এটা ঠিকঠাক হয়েছে৷ এবার সে একটা লম্বাটে কাচের বোতল আর চৌকো কাচের বয়াম তাক থেকে টেনে নামাল৷

বোতলটায় রয়েছে কালচে হয়ে আসা রেড ওয়াইন; আর বয়ামে রয়েছে বুনো-মৌমাছির মধু— খুব ঘন আর চিটচিটে৷ দুটোই অনেক বছরের পুরোনো৷ আসলে ইচ্ছা করে ফেলে রেখে-রেখে এগুলোকে পুরোনো বানানো হয়েছে৷ যত বয়স বাড়বে, তত বাড়বে এদের গুণমান৷

সে এই দু-রকম জিনিসই কয়েক ফোঁটা করে ঢেলে দিল চূর্ণের মধ্যে৷ আঙুল দিয়ে খুব ভালো করে মিশিয়ে ফেলল সবকিছু৷ তারপর কোমর থেকে টেনে বের করল একটা ছোরা৷ আধো-অন্ধকারের মধ্যেও সেই অস্ত্রের শাণিত, সুতীক্ষ্ম ফলাটা ঝকমক করে উঠল যেন৷

ছোরাটাকে সে আলতো একবার করে বুলিয়ে নিল ডান হাতের তর্জনীতে৷ পাতলা চামড়া ফাল হয়ে গিয়ে মুহূর্তে সেখানে একটা লাল রেখা ফুটে উঠল৷

সে আবার মিশ্রণের মধ্যে আঙুল ডুবিয়ে দিল৷ বুড়ো-আঙুল দিয়ে তর্জনীর মাথায় হালকা করে চাপ দিতে থাকল সে— যাতে মাঝেমাঝেই রক্ত বেরিয়ে আসে৷

নিজের রক্ত, চূর্ণ— সব একসঙ্গে মেশাতে-মেশাতে সে বলতে থাকল, ‘আমার নিজের রক্ত আমি মহান আত্মার উদ্দেশ্যে সমর্পণ করছি৷ আমি এই মিশ্রণে যে জীবনীশক্তি মিশিয়েছি, আমি মহান আত্মাদের অনুরোধ করছি সেটি খুঁজে নিতে এবং...’

অনেকক্ষণ ধরে খুব যত্ন করে মেশানোর পরে মিশ্রণটা বেশ ভিজে-ভিজে, মসৃণ একটা জিনিসে পরিণত হল; অল্প-অল্প গন্ধও নাকে এসে লাগতে থাকল৷

এর মানে, এটা এবার পুরোপুরি তৈরি৷

সে এবার এটাকে কাঠের ছাঁচে ফেলে, ছোট-ছোট বৃত্তের আকার দিতে লাগল৷ সবগুলো তৈরি হয়ে যাওয়ার পর, সেগুলো যত্ন করে পাতিয়ে দিল একটা থালায়৷

এবার টানা তিনদিন ধরে এগুলো শুকোবে৷ তারপর এই ‘আত্মার ধূপ’ সম্পূর্ণ ব্যবহারযোগ্য হবে৷

সে হাত ধুয়ে ফেলল৷ আঙুলের কাটা জায়গায় একটা ভেষজের প্রলেপ লাগাল৷ তারপর এসে বসল তার প্রিয় ইজিচেয়ারটায়৷ চেয়ারটার নরম গদিটা বড় প্রিয় তার৷

কত অলস অবসর যে সে এটার উপর বসে দুলতে-দুলতে কাটিয়ে দিয়েছে, কত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত যে সে এর ওপর বসে ভাবতে-ভাবতে নিয়েছে, কত নতুন-নতুন কৌশল যে এর উপর আধশোয়া হয়ে উদ্ভাবন করেছে— তার কোনও ইয়ত্তা নেই৷

সে বসতেই কেমন ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ করে দুলে উঠল চেয়ারটা! ঠিক যেন একটা জীবন্ত কেউ— পরিচিত মানুষের ছোঁয়া পেয়েই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করল৷ অবশ্য এসব জড়পদার্থের মধ্যে কেমন করে অন্তত কিছুক্ষণের জন্য জীবনের অনুভূতি সঞ্চার করতে হয়— সেই বিদ্যা তার জানা আছে৷ কিন্তু এসব অকারণ শক্তিক্ষয়ে তার রুচি নেই৷

সে মাথাটা পিছনদিকে হেলিয়ে দিল৷ চোখ বন্ধ করে হাতদুটো জড়ো করে রাখল বুকের উপর৷

কী বলল জাদুকর? The show must go on?

পায়ের ধাক্কায় চেয়ারটাকে দোলাতে দোলাতে বলল, ‘শো তো চলবেই জাদুকর৷ শো চলতেই হবে৷ গোটা পৃথিবীটাই তো একটা অডিটোরিয়াম, আর আমরা সবাই সেখানে এক-একজন পারফর্মার৷ তাই তোমারও শো চলবে, আমারও শো চলবে৷ বলো না, কী-ই বা ঘটেছে এখনও পর্যন্ত? নাথিং স্পেশাল! এই তো সবে শুরু...’

কবিতা তার বড় প্রিয়; বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের কবিতা৷ কত দিন-রাত সে একা-একাই শুধু সঞ্চয়িতা পড়ে কাটিয়ে দিয়েছে৷

সে আপনমনে আবৃত্তি করতে থাকল:

‘যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে,

যদিও সব সঙ্গীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া৷

যদিও সঙ্গী নাহি অনন্ত অম্বরে,

যদিও ক্লান্তি আসিছে অঙ্গে নামিয়া৷

মহা-আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্থরে,

দিক দিগন্ত অবগুন্ঠনে ঢাকা—

তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,

এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা৷’

কবিতা বন্ধ করে সে বলে উঠল, ‘এখনও যে আমার স্ফিয়ারের হিসেবটাই পুরো তোলা হল না জাদুকর! সবে তো তোমার তামাশা ভাঙলাম...’

সে হেসে উঠল৷ ঘর-কাঁপানো, বুকের রক্ত জল করে দেওয়া হাসি৷ দেওয়ালের টিকটিকিটা পর্যন্ত সেই হাসির শব্দ শুনে কোথায় যেন লুকিয়ে পড়ল! হাসতে-হাসতে সে দুমড়ে-মুচড়ে গেল, চোখ থেকে ফোঁটা-ফোঁটা জল বেরিয়ে এল৷

হাসি থামলে, হাতের চেটো দিয়ে চোখ মুছে সামনের দেওয়ালে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল সে৷ কিছুক্ষণ স্থির হয়ে থাকল৷ তারপর চেয়ারের হাতল মুঠোয় ধরল শক্ত করে, বাঁ-পায়ের বুড়ো-আঙুল দিয়ে কার্পেটের ওপরেই চেপে-চেপে কিছু একটা লিখল৷ আর তার সঙ্গে-সঙ্গে আধো-অন্ধকার ঘরের মধ্যেই, বাতাসে ভেসে উঠল রক্ত দিয়ে লেখা জ্বলজ্বলে কয়েকটা বর্ণ—

‘THE SHOW MUST GO ON...’

সকল অধ্যায়
১.
ম্যাজিক শো থেকে শুরু...
২.
সকালের হেডলাইন
৩.
দুর্ঘটনার পরে
৪.
‘সে’ আছে আড়ালে
৫.
রাত এবং উপহার
৬.
আবার রহস্যময় অঘটন
৭.
নিঝুম দুপুরের আগন্তুক
৮.
একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব
৯.
শান্তির স্নান
১০.
কেমন আছে অনুরাধা?
১১.
নতুন দিনের প্রস্তুতি
১২.
স্বাগত আমার ঘরে
১৩.
আবার ম্যাজিক-শো
১৪.
বুবাই কোথায়
১৫.
আবার বাড়িতে ফেরা
১৬.
আয়না, ওয়াইন, পুতুল এবং...
১৭.
বিভীষিকাময় রাত
১৮.
কোকিল মানে বসন্ত; কোকিল মানে...
১৯.
আরেকটি ‘কেন’
২০.
সাফারি টাইম
২১.
ক্রিস্টাল-ক্লিয়ার ক্রিস্টাল বল শপ
২২.
ত্রুটি সংশোধন
২৩.
নখ কেন কালো
২৪.
স্বচ্ছ স্ফটিক; ঘোলা স্ফটিক
২৫.
ঢাকা থাক, থাক ঢাকা...
২৬.
বেড়ানোর ছবি
২৭.
বহুদিন পর; আবার!
২৮.
নিষ্ফলতার আক্রোশ
২৯.
একটুর জন্য...!
৩০.
অ-সাক্ষাৎ এবং সাক্ষাৎ
৩১.
‘সে’ ছিল, ‘সে’ আছে...
৩২.
একটা অন্যরকম রবিবার
৩৩.
প্রচেষ্টা এবং অভিজ্ঞতা
৩৪.
অন্তিম প্রস্তুতি
৩৫.
দৃশ্য এবং অদৃশ্য
৩৬.
কোন সে সুদূর অতীত হতে...
৩৭.
রইল বাকি এক
৩৮.
জানা এবং অজানা
৩৯.
সময় এসেছে কাছে
৪০.
ইট’স ফাইন
৪১.
ঘন হয়ে উঠেছে অন্ধকার
৪২.
শব্দটীকা
৪৩.
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জী

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%