আবার নালন্দা

চঞ্চলকুমার ঘোষ

ভারতভ্রমণ শেষ করে দীর্ঘ পঁাচ বছর পর অাবার নালন্দায় ফিরে এলেন হিউ-এন-সাঙ। জ্ঞানের তীর্থভূমিতে এসে প্রণাম করলেন গুরু শীলভদ্রকে।

অাচার্য শীলভদ্রের মুখে ফুটে উঠল গভীর প্রসন্নতা। দীৰ্ঘ জীবনে কত অসংখ্য শিষ্য এসেছে, তঁারা সকলেই ছিল নিষ্ঠাবান, একাগ্র চিত্র। উত্তরকালে সকলেই হয়ে উঠেছিলেন জ্ঞানী, মহাজ্ঞানী। িকন্তু হিউ-এন-সাঙ-এর মতো একজনকেও পাননি যিনি জ্ঞানের সন্ধানে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন।

জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি যে উদ্দেশ্য নিয়ে ভারতবর্ষে এসেছিলে, তা কি পূর্ণ হয়েছে ?

হিউ-এন-সাঙ প্রসন্ন কণ্ঠে বললেন, বহু অাচার্যের কাছে অামি গিয়েছি। তঁারা অামাকে বৌদ্ধ ধর্মের নানান বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছেন। অাপনার শিক্ষায় অামার অন্তরে জ্ঞানের অালো জ্বলে উঠেছে। তবু একটি বিষয়ে মনের মধ্যে অপূর্ণতা রয়ে গিয়েছে। সমস্ত ভারতবর্ষ জুড়ে যে প্রাচীন ব্রাহ্মণ্য ধর্ম রয়েছে তার বিষয়ে বিশেষ কিছু জানা হল না

শীলভদ্র বললেন, ব্রাহ্মণ্য ধর্ম বহু প্রাচীন। মুনি ঋষিদের জ্ঞানের অালোয় সমৃদ্ধ হয়েছে এই ধর্ম। ভগবান বুদ্ধও এই ধর্মকে উপেক্ষা করেননি। বহু কিছু জ্ঞান এখান থেকে অাহরণ করেছেন।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, অামিও ব্রাহ্মণ্য ধর্ম সম্পর্কে যতটুকু জ্ঞান অর্জন করতে চাই।

সামান্য কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন অাচার্য শীলভদ্র। তারপর বললেন, কিছু পূর্বে হলে অামিই তোমাকে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম সম্পর্কে শিক্ষা দিতে পারতাম। এখন আর শক্তি নেই, তুমি অামার শিষ্য জয়সেনের কাছে যাও। যে বৌদ্ধ শাস্ত্র ছাড়াও ব্রাহ্মণ্য শাস্ত্রে পণ্ডিত আমি তঁাকে সংবাদ পাঠাচ্ছি।

নালন্দার সামান্য দূের জয়সেনের গৃহ। যেখানে কয়েক মাস রয়ে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। তঁার অাগ্রহ নিষ্ঠা দেখে জয়সেনও মুগ্ধ। নিজের সমস্ত জ্ঞান উজাড় করে দেন শিষ্যকে।

ভালো লাগে হিউ-এন-সাঙ-এর। তবুও মনের মধ্যে চাপা অস্থিরতা। কিছুদিন ধরেই তিনি অনুভব করতে পারছিলেন তিনি যে জ্ঞান অর্জন করেছেন তাকে স্বদেশের মানুষের কাছে প্রচার করতে হবে। তাছাড়া দীর্ঘদিন মাতৃভূমি ত্যাগ করেছেন। ইদানীং মাঝে মাঝেই চোখের সামনে যেন ভেসে ওঠে চান-অান বৌদ্ধ বিহার। সেই প্রার্থনা কক্ষ। প্রশস্ত ছাদ, যেখানে বসে তিনি শুনেছিলেন ভারতবর্ষে অাসার অাহ্বান। হুই-তি-র কথা বড়ো বেশি মনে পড়ে। কত প্রবীণ মানুষ যঁাদের ভালোবাসায় পূর্ণ হয়েছে তার জীবন, তঁারা কি এখনও অাছেন। কেমন অানমনা হয়ে যান। ঘরে ফেরার ব্যাকুলতা তঁার চোখে মুখে ফুটে ওঠে।

অনেকেই প্রশ্ন করে, কি হয়েছে ধর্মগুরু? কোনো কিছুই গোপন করেন না হিউ-এন-সাঙ।

নালন্দার অধ্যাপক পণ্ডিত সকলেই হিউ-এন-সাঙ-কে শ্রদ্ধা করতেন, তঁাকে নালন্দার শ্রেষ্ঠ সম্পদ বলে মনে করতেন। হিউ-এন-সাঙ চিনে ফিরে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করতেই সকলে অনুরোধ করে বলেন, আপনি কীসের জন্যে চিনে ফিরে যাবেন ? ভগবান বুদ্ধ এই ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সমস্ত দেশ জুড়েই ছড়িয়ে রয়েছে তঁার স্মৃতিচিহ্ন। অবশিষ্ট জীবন এখানেই অতিবাহিত করুন। তা ছাড়া চিন দেশে গিয়ে তঁার কোনো লাভ নেই। সেখানকার মানুষ ভগবান বুদ্ধের আদর্শ, ধর্ম কোনো কিছুই উপলব্ধি করতে পারে না। তারা মানুষ হিসেবেও উন্নত নয়।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, ভগবান বুদ্ধ কখনোই তঁার জ্ঞান, আদর্শ, ধর্মকে গুটি কয়েক মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন তঁার বাণী দেশে দেশে সব মানুষের কাছে ছড়িয়ে পড়ুক। তা ছাড়া আরেকটি বিষয় হল চিন দেশের মানুষরা চিন্তাভাবনায় যথেষ্ট উন্নত। আমাদের দেশের রাজারা ন্যায়পরায়ণ। ধর্মের প্রতি তঁাদের গভীর আস্থা রয়েছে। আমাদের দেশের সন্তানরা পিতা মাতাকে শ্রদ্ধা করে। বৃদ্ধ ও জ্ঞানীদের সকলে সম্মান করে। পণ্ডিতরা জ্ঞানের নানান বিষয় নিয়ে চর্চা করেন। তঁারা বহু কিছু উদ্ভাবন করেছেন। কয়েক-শো বছর ধরেই চিন দেশে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার চলছে। সেখানকার মানুষ ভগবান বুদ্ধের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল। সকলেই তঁার জীবন ও ধর্মের কথা জানতে চায়। কত সংঘারাম বিহার গড়ে উঠেছে। ভগবান বুদ্ধ সেদেশে জন্মগ্রহণ না করলেও আমাদের দেশ কারও চেয়ে হীন নয়। তা ছাড়া সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে পরিভ্রমণ করে সব অন্ধকার দূর করবার জন্য।আমিও সেই উদ্দেশ্য নিয়ে স্বদেশে ফিরতে চাই।

উপস্থিত সকলে অনুভব করতে পারেন চিনা পরিব্রাজক তঁার দেশে ফিরে যাবেনই। কোনোভাবেই এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। একমাত্র যদি আচার্য শীলভদ্র আদেশ করেন, তবে হিউ-এন-সাঙ-এর পক্ষে তা উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।

সকলে গেলেন আচার্যের কাছে।

আচার্য শীলভদ্র প্রিয় শিষ্য হিউ-এন-সাঙকে ডেকে বললেন, দেশে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে তুমি কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে ?

হিউ-এন-সাঙ বললেন, যে-দেশে বুদ্ধ জন্মেছেন সেদেশে বাস করার সৌভাগ্য আমি অস্বীকার করতে পারি না। তবে আমি এই দেশে এসেছি ভগবান বুদ্ধের মহান আদর্শের যা-কিছু সত্য আছে তা জানতে। সকল মানুষের কল্যাণের জন্য এই মহাধর্মকে শিক্ষা করতে। এখানে এসে আপনার কাছে যোগাচারভূমি শাস্ত্র শিক্ষা করেছি। এ আমার জীবনে পরম সৌভাগ্যের। আমি ভারতবর্ষের নানা তীর্থ ভ্রমণ করেছি। নানা গুরুর কাছে শাস্ত্রশিক্ষা করেছি। আমি যে শুধু আনন্দ পেয়েছি তা নয়, আমার জ্ঞানের ভাণ্ডার পূর্ণ হয়েছে। আমি চাই আমার এই জ্ঞান স্বদেশের মানুষের কাছে প্রচার করতে। যারা শিক্ষালাভ করতে চায় তাদের শিক্ষা দিতে। এইভাবে আপনার শিক্ষা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়বে। সেইজন্যে আমি আর বিলম্ব করতে চাই না।

শীলভদ্র আনন্দের সঙ্গে বললেন, তুমি যা বলেছ, যা চিন্তা করেছ, ভগবান বুদ্ধের মহান অাদর্শের তাই উপযুক্ত। অামি অন্তর দিয়ে তোমার ইচ্ছাকে সমর্থন করছি। তুমি যে জ্ঞান অর্জন করেছ সেই জ্ঞান তোমার দেশের মানুষের কাছে ছড়িয়ে দাও। ভগবান বুদ্ধের মহান অাদর্শ দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ুক। অামি তোমার যাওয়ার বন্দোবস্ত করছি। কেউ তোমার যাত্রাপথকে বিঘ্নিত করবে না।

আভূমি প্রণত হলেন হিউ-এন-সাঙ।

সকল অধ্যায়
১.
গভীর গহন এক রাত
২.
আলোর পথে
৩.
প্রথম সকাল
৪.
রাত্রি শেষ
৫.
যাত্রা হল শুরু
৬.
সীমান্ত পথ
৭.
মৃত্যু উপত্যকা
৮.
মরুদ্যান
৯.
হামি
১০.
তুরফান
১১.
কুচা
১২.
বরফের দেশে
১৩.
ইশিক কুল
১৪.
সমরখন্দ
১৫.
লৌহকপাট
১৬.
বামিয়ান
১৭.
গান্ধার
১৮.
ছায়াগুহা
১৯.
পুরুষপুর
২০.
তক্ষশীলা
২১.
কাশ্মীর
২২.
শাকল
২৩.
জলন্ধর থেকে কুলু
২৪.
মথুরা
২৫.
কান্যকুব্জ
২৬.
অযোধ্যা থেকে কৌশাম্বী
২৭.
প্রয়াগ
২৮.
শ্রাবস্তী
২৯.
কপিলাবস্তু
৩০.
লুম্বিনী
৩১.
কুশীনগর
৩২.
বারাণসী
৩৩.
সারনাথ
৩৪.
বৈশালী
৩৫.
মগধ
৩৬.
শীলভদ্র বিহার
৩৭.
গয়া
৩৮.
বুদ্ধগয়া
৩৯.
বোধিবৃক্ষ
৪০.
মহাভিক্ষুণী
৪১.
রাজগৃহ
৪২.
মানসলোক
৪৩.
নালন্দা
৪৪.
ভারত পরিক্রমা
৪৫.
আবার নালন্দা
৪৬.
শরণাগত

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%