চঞ্চলকুমার ঘোষ
বৌদ্ধদের আট তীর্থস্থানের অন্যতম শ্রাবস্তী। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে ষোড়শ মহাজনপদের অন্যতম ছিল কোশল রাজ্য ও তার রাজধানী শ্রাবস্তী। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে অচিরাবতী নদী, বর্তমান নাম রাপ্তী।
ভগবান বুদ্ধের সময় কোশল রাজ্যের রাজধানী ছিল শ্রাবস্তী (আধুনিক সাকেত মাহেত)। ভগবান বুদ্ধ এখানে চব্বিশ-পঁচিশটি বর্ষা ঋতু কাটান। রাজা প্রসেনজিতের সময় সমৃদ্ধ এই নগর শুধু যে ব্যবসাবাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র ছিল তাই নয়, এটি ছিল ধর্ম-সংস্কৃতির পীঠস্থান। হিন্দু-জৈন-বৌদ্ধ সব ধর্মের মানুষ এখানে আসতেন। নগরে সাতান্ন হাজার পরিবার বাস করত। সমস্ত নগরটাই প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল।
ভগবান বুদ্ধকে যিনি শ্রাবস্তীতে নিয়ে আসেন তিনি হলেন অনাথপিণ্ডদ। শ্রাবস্তীর সবচেয়ে ধনী শ্রেষ্ঠী। তঁার প্রকৃত নাম ছিল সুদত্ত। তিনি অনাথদের পিণ্ড অর্থাৎ অন্নদান করতেন বলে তার নাম হয় অনাথপিণ্ডদ।
একবার অনাথপিণ্ডদ বাণিজ্য করতে রাজগৃহে এসেছিলেন। তঁার সঙ্গে পাঁচশো শকটপূর্ণ দ্রব্য। সেই সময়ে ভগবান বুদ্ধ রাজগৃহে ছিলেন। একদিন অনাথপিণ্ডদ বুদ্ধের কথা শুনে তঁাকে দর্শন করতে গেলেন। বুদ্ধ তখন ধর্ম-উপদেশ দিচ্ছিলেন। তঁাকে দর্শনমাত্রই অনাথপিণ্ডদের অন্তরে এমন এক ভাব জেগে উঠল তিনি বুদ্ধের কাছে গিয়ে বললেন, আপনি শ্রাবস্তীতে এসে ধর্ম-উপদেশ দিন। সম্মত হলেন বুদ্ধ।
রাজগৃহ থেকে শ্রাবস্তী এই দীর্ঘ পথে বুদ্ধের বিশ্রামের জন্য প্রতি যোজন অন্তর বিশ্রামগৃহ তৈরি করলেন অনাথপিণ্ডদ। সেই সময় শ্রাবস্তীতে রাজকুমার জেত-এর একটি বাগান ছিল। বুদ্ধের জন্য সেই বাগান অাঠােরা কোটি স্বর্ণমুদ্রায় কিনে নিলেন অনাথপিণ্ডদ। সেই জেতবনের মাঝখানে তৈরি করলেন ‘গন্ধকুটি’ নামে এক বিহার। তঁাকে ঘিরে আশি জন মহাস্থবিরদের জন্য আশিটা কুটির। প্রতিটি কুটির জুড়ে নানান নকশা করা। এ ছাড়াও তৈরি হল হলঘর মণ্ডপ, জলের কূপ। সব নির্মাণ করা হলে বুদ্ধকে আনবার জন্যে দূত পাঠালেন অনাথপিণ্ডদ।
বুদ্ধ নগরপ্রান্তে এসে পৌঁছোতেই শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডদ বিরাট শোভাযাত্রা করে এগিয়ে গেলেন। সামনে পতাকাবাহী পাঁচশো জন। তাদের পেছনে শ্রেষ্ঠীর দুই কন্যা। তাদের পেছনে পাঁচশো জন কুমারী। তারপর বুদ্ধের জন্যে খাদ্যদ্রব্য নিয়ে শ্রেষ্ঠীর পত্নী। তারপর স্বয়ং মহাশ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডদ ও নগরের পাঁচশো বণিক। সব শেষে শিষ্যদের নিয়ে ভগবান বুদ্ধ। তঁার প্রভায় চারদিক যেন আলো হয়ে আছে। অবশেষে তঁারা এই জেতবন বিহারে প্রবেশ করলেন।
তখন শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডদ জিজ্ঞাসা করলেন, প্রভু, এই বিহার নিয়ে আমার কী করা কর্তব্য ?
বুদ্ধ বললেন, যদি তোমার ইচ্ছা হয় তবে এই বিহার আগত-অনাগত সকল ভিক্ষুসংঘের উদ্দেশ্যে দান করো।
শ্রেষ্ঠী তখন ভগবান বুদ্ধের হাতে জল দিয়ে বললেন, এই বিহার আমি ভিক্ষুসংঘকে দান করলাম।
এরপর দীর্ঘ নয় মাস ধরে এখানে দানপর্ব চলেছিল। জেতবন বুদ্ধের খুবই প্রিয় ছিল। তঁার বহু উপদেশ যা ত্রিপিটকে আছে, এই বিহারেই বলেছিলেন।
অনাথপিণ্ডদ ছাড়া যিনি ভগবান বুদ্ধের জন্য প্রচুর দান করেছিলেন শ্রেষ্ঠী কন্যা বিশাখা। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি বুদ্ধের অনুগামী হন। তঁাকে বলা হত ‘মিগার মাতা’। কারণ তঁার শ্বশুর ছিলেন মিগার শ্রেষ্ঠী। প্রথমজীবনে তিনি ভিন্ন মতে বিশ্বাস করলেও বিশাখার প্রেরণায় বুদ্ধের ধর্ম গ্রহণ করেন। সেই কারণে বিশাখাকে তিনি মাতা বলে সম্বোধন করতেন। এরপর থেকে বিশাখা মিগারমাতা নামে পরিচিত হন। তিনিও অনাথপিণ্ডদের মতো অাঠারো কোটি স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করে শ্রাবস্তীতে পূর্বারাম (মিগার মাতৃ প্রাসাদ) বিহার নির্মাণ করেছিলেন। বুদ্ধ ও তঁার শিষ্যরা দুই বিহারেই অবস্থান করতেন।

রাজা প্রসেনজিৎ এখানে পাথরের বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ করেন। সম্রাট অশোক পরবর্তীকালে পূর্ব তোরণের দু-দিকে দুটি স্তম্ভ নির্মাণ করেন। একটির উপর ছিল ধর্মচক্র অন্যটির উপর বৃষমূর্তি।
কৌশাম্বী থেকে হিউ-এন-সাঙ এসে পৌঁছোলেন শ্রাবস্তী। নগরে প্রবেশ করতেই স্তম্ভিত হয়ে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। কোথায় তঁার স্বপ্নের-কল্পনার শ্রাবস্তী। যেদিকে দৃষ্টি যায় শুধু ধ্বংসাবশেষ। অতীত গৌরবের চিহ্নমাত্র কোথাও আর অবশিষ্ট নেই।
জেতবনের আশেপাশে বহু জীর্ণ সংঘারাম, সেখানে কোনো জনমানব নেই। অল্প দূরে একটি প্রাচীন বিহারে কিছু ভিক্ষু ও শ্রমণ থাকেন। বিহারের প্রধান ইতিপূর্বেই হিউ-এন-সাঙ-এর প্রসঙ্গে কিছু কথা শুনেছিলেন। তিনিই সাদরে আমন্ত্রণ জানালেন। সেখানেই আতিথ্য গ্রহণ করলেন হিউ-এন-সাঙ।
বিহারের সকলেই কুণ্ঠিত। এই মহামান্য অতিথির কীভাবে যত্ন করবেন। তাদের যে কিছুই সামর্থ্য নেই।
হিউ-এন-সাঙ তা অনুভব করেন। বললেন, আপনারা অকারণে বিব্রত হবেন না। আমি সন্ন্যাসী, কোনো কিছুতেই আমার কোনো অসুবিধা হয় না। আপনারা আমার সঙ্গী হন। অতীত শ্রাবস্তীর যেসব সৌধ আজও অবশিষ্ট রয়ে গিয়েছে তার সঙ্গে ভগবান বুদ্ধের জীবনকথা, সেই প্রসঙ্গে আপনারা যা জানেন বলুন।
দু-জন প্রবীণ শ্রমণ বললেন, ধর্মগুরু, আমাদের সামান্য জ্ঞানে যতটুকু জানি আপনাকে বলব।
প্রথমে সকলে গেলেন একটি ছোটো বাড়িতে। বন্ধ দরজা খুলে সকলে তার মধ্যে প্রবেশ করলেন। একটা পাথরের বেদির উপর কয়েক হাত পাথরের বুদ্ধমূর্তি। সোনালি রং করা। বহুদিনের অযত্নে মূর্তিটি জীর্ণপ্রায়। স্পর্শ করলেন হিউ-এন-সাঙ। শরীরের প্রতিটি অণু-পরমাণুতে যেন বিদ্যুৎ প্রবাহ খেলে গেল। গভীর এক আবেশে বহুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকেন। একজন ভিক্ষুর ডাকে চেতনার জগতে ফিরে এলেন।
‘চলুন ধর্মগুরু, আমাদের বহু কিছু দর্শন করতে হবে।’
চারদিকে ধ্বংসস্তূপ। তার মাঝে এক জায়গায় এসে দাঁড়ালেন দুই শ্রমণ। অপেক্ষাকৃত বয়স্ক মানুষটি বললেন, সামনে যে স্মারক স্তূপটি দেখছেন, এখানে বসে সারিপুত্র কাপড় সেলাই করতেন।
সামান্য বিস্মিত হলেন হিউ-এন-সাঙ। বললেন, এখানে কী সেলাই করতেন সারিপুত্র ?
দ্বিতীয় শ্রমণ বললেন, সে এক আশ্চর্য কাহিনি। একদিন ভগবান বুদ্ধ শিষ্যদের উপদেশ দিচ্ছিলেন। হঠাৎ দেখলেন সেখানে সবাই উপস্থিত শুধু সারিপুত্র নেই। তিনি মৌদ্গল্যায়নকে বললেন, সারিপুত্রকে ডেকে আনবার জন্যে। মৌদ্গল্যায়নের মধ্যে যোগশক্তি ছিল। তিনি যোগবলে মুহূর্তমধ্যে জেতবন বিহারে সারিপুত্রের কাছে গিয়ে দেখলেন, তিনি একটি পুরোনো কাপড় সেলাই করছেন। মৌদ্গল্যায়নকে দেখে সারিপুত্র বললেন, এই সেলাইয়ের কাজটুকু শেষ করেই প্রভুর কাছে যাব। বিরক্ত মুখে মৌদ্গল্যায়ন বললেন, এখনই তুমি যদি না যাও আমার যোগবলে তোমাকে এই বাড়িসমেত উড়িয়ে নিয়ে যাব। সারিপুত্র তঁার গায়ের চাদর খুলে মাটিতে পেতে দিয়ে বললেন, এটা যদি নাড়াতে পার আমি তোমার সঙ্গে যেতে পারি। মৌদ্গল্যায়নের যোগশক্তিতে চারদিক কেঁপে উঠল কিন্তু চাদর নড়ল না। পরাজিত মৌদ্গল্যায়ন যোগবলে তখনই বুদ্ধের কাছে ফিরে যেতেই অবাক হয়ে দেখলেন তঁার আগেই সারিপুত্র সেখানে পৌঁছে গিয়েছেন।
সারিপুত্র স্তূপ থেকে তঁারা এলেন জেতবন বিহারের পিছনে এক জায়গায়, সেখানে তিনটি বিরাট গহ্বর।
একজন শ্রমণ বললেন, এই তিনটি গহ্বর তিন মহাপাপীর অন্তিম পরিণতির প্রকাশ। তাদের সকলেরই উদ্দেশ্য ছিল বুদ্ধের অপযশ করে তঁাকে কলঙ্কিত করা। বুদ্ধের খ্যাতিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের কয়েক জন এক রমণীকে বুদ্ধের কাছে পাঠায়। তিন মাস পর সে প্রচার করে বুদ্ধই তার গর্ভসঞ্চার করেছেন। ব্রাহ্মণদের পরামর্শে সেই রমণী বুদ্ধের কাছে এসে বলল, আমার যে সন্তান আসছে তুমি তার পিতা। তুমি এর প্রসবের ব্যবস্থা করো।
বুদ্ধ সামান্যতম বিচলিত হলেন না। শান্তভাবে রমণীর দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন, তারপরই সকলে বিস্ময়ে দেখে রমণীর কৃত্রিম গর্ভ খসে পড়ল এবং মুহূর্তে ভূমিতে বিরাট এক গর্ত সৃষ্টি হল আর সেই গর্তে হারিয়ে গেল রমণী। এইভাবে আরও দু-জন বুদ্ধের নিন্দাবাদ করতে গিয়ে ভূমির অতলে হারিয়ে যায়। তিনটি গর্তই অতলস্পর্শী। বন্যায় এলাকার সমস্ত হ্রদ পুকুর জলে ভরে উঠলেও এই তিনটি গর্তে কখনো জল জমে না।
একের-পর-এক কাহিনি শুনছেন হিউ-এন-সাঙ আর এগিয়ে চলেছেন। জেতবন পার হয়ে অনেকখানি দূরে এসে পড়েছিলেন। সামনে একটি সরোবর। তাতে একবিন্দু জল নেই। হিউ-এন-সাঙ বললেন, এ কোন সরোবর ?
বৃদ্ধ শ্রমণ বললেন, ভগবান বুদ্ধের অভিশাপে বিডুড়কের এখানে মৃত্যু হয়।
বিস্মিত কণ্ঠে হিউ-এন-সাঙ বললেন, বিডুড়ক কে ? আর ভগবান বুদ্ধ কী কারণে তাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন ?
শ্রমণ বললেন, ভগবান বুদ্ধ ছিলেন শাক্যবংশের সন্তান। নিজেদের বংশমর্যাদা নিয়ে শাক্যদের খুব গর্ব ছিল। একবার মহারাজ প্রসেনজিৎ শাক্যকন্যা বিবাহ করতে চান। শাক্যদের চেয়ে প্রসেনজিতের বংশমর্যাদা কম ছিল তাই শাক্যরা এক দাসীকন্যার জন্মবৃত্তান্ত গোপন করে ক্ষত্রিয়কন্যা বলে প্রসেনজিতের সঙ্গে বিবাহ দেন। সেই দাসীকন্যার নাম বাসভক্ষত্রিয়া। তার এক পুত্র জন্মায়। তার নাম বিডুড়ক। বড়ো হয়ে বিডুড়ক মাতুলালয়ে গিয়ে নিজের প্রকৃত পরিচয় জানতে পেরে ভয়ংকর ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন এবং শাক্যদের প্রবঞ্চনার প্রতিশোধ নেবার জন্যে কপিলাবস্তু আক্রমণ করলেন এবং শত শত নারী-পুরুষ-শিশুকে হত্যা করে নিজ রাজ্যে ফিরে এলেন। এই সংবাদ শুনে বুদ্ধ বলেছিলেন, সাত দিনের মধ্যে রাজার অগ্নিদাহে মৃত্যু হবে। একদিন এই সরোবরে প্রমোদবিহারে এসেছিলেন রাজা বিডুড়ক। হঠাৎ প্রমোদতরীতে আগুন জ্বলে উঠল। সেই আগুনে পুড়ে মৃত্যু হয় রাজার।
শুধু রাজা বিডুড়ক নয়, বুদ্ধের অভিশাপে শত বছরের মধ্যেই সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেল শ্রাবস্তী। হারিয়ে গেল তার গৌরবময় অতীত। কালের গর্ভে সব চাপা পড়ে গেল ভূমিগর্ভে।
কালের রথচক্রে আবার একদিন জেগে ওঠে শ্রাবস্তী। ১৮৬৩ সালে লর্ড কানিংহাম এই অঞ্চল খুঁড়ে আবিষ্কার করেন বেশ কিছু ছোটো ছোটো স্তূপ। ১৮৭৬ সালে উদ্ধার হয় জেতবন মনাস্ট্রি, দশটি মন্দির, পঁাচটি স্তূপ ও বহু মূর্তি। এখানে কোনো শিলালিপি পাওয়া যায়নি।
হিউ-এন-সাঙ শ্রাবস্তীতে তিন দিন ধরে সব কিছু দর্শন করে এবার যাত্রা করলেন কপিলাবস্তু। ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দের ২৫ ডিসেম্বর তিনি কপিলাবস্তু এসে পৌঁছোলেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন