গয়া

চঞ্চলকুমার ঘোষ

গয়ার কথা পড়তেই মুহূর্তে কেমন আনমনা হয়ে গেল অমিতাভ।

এক বছর আগে সেও গিয়েছিল গয়ায়, মৃত বাবার পিণ্ডদান করতে। জীবনের সেও এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। স্টেশনে নেমে গাড়িতে করে ভারত সেবাশ্রম সংঘের অাশ্রমে পৌঁছে বিশ্রাম। সেখান থেকে ফল্গু নদীর তীরে বিষ্ণুপাদ মন্দির। সঙ্গী ছিলেন এক ব্রাহ্মণ পূজারি। তঁার মুখেই শোনা মহাতীর্থ গয়ার কাহিনি। বায়ুপুরাণে আছে পুরাকালে এক পরম বিষ্ণুভক্ত অসুর ছিলেন, তঁার নাম গয়াসুর। ভগবান বিষ্ণুর কাছে বর পাবার জন্যে নির্জন প্রান্তরে বসে কঠোর তপস্যা করতে থাকেন। স্বর্গের দেবতাদের মনে হল স্বর্গরাজ্য জয় করার জন্যে গয়াসুর তপস্যা করছেন। তঁারা সকলে বিষ্ণুর কাছে গেলেন এর প্রতিবিধান করবার জন্যে। বিষ্ণু এসে গয়াসুরকে বললেন, তুমি বরপ্রার্থনা করো। গয়াসুর নিজের জন্যে কোনো কিছু প্রার্থনা করলেন না। বললেন, আমার এই দেহ যেন পরম পবিত্র হয়। যে এই দেহ স্পর্শ করবে সে সব পাপ মুক্ত হয়ে বৈকুণ্ঠে চলে যাবে। তাকে আর যমলোক দর্শন করতে হবে না। বিষ্ণু বললেন, তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক। তখন গয়াসুরের স্পর্শে দলে দলে মানুষ স্বর্গে যেতে আরম্ভ করল। যমপুরীতে যাবার লোক নেই। সকলে আবার বিষ্ণুর কাছে গেলেন। বিষ্ণু তখন গয়াসুরের কাছে গিয়ে তঁার শরীর ভিক্ষা করলেন। গয়াসুর সম্মত হতেই বিষ্ণু তঁার দেহকে আবৃত করে বিশাল এক শিলা স্থাপন করলেন। তারপর সেই শিলার উপর পা রেখে বললেন, যতদিন চন্দ্র-সূর্য-পৃথিবী থাকবে ততদিন আমি এখানে অবস্থান করব। মৃত্যুর পর এখানে পিণ্ডদান করলে আত্মার মুক্তি ঘটবে। গয়াসুরের নামেই এই পবিত্র ভূমির নাম হবে গয়াক্ষেত্র।

অন্তঃসলিলা নদী ফল্গুর পাড়ে গড়ে উঠল বিষ্ণুপাদমন্দির। প্রথমে এই মন্দির খুব ছোটো ছিল। পরে ইন্দোরের রানি অহল্যাবাই এই বিষ্ণুপাদমন্দির নির্মাণ করেন। ভারতের বহু তীর্থই নতুন করে সংস্কার করে দেন প্রাতঃস্মরণীয়া অহল্যাবাই। মন্দিরের পূর্ব দিকে বিশাল মূর্তি, উত্তরে অহল্যাবাই-এর মূর্তি। এত বড়ো পাথরের মূর্তি এখানে আর নেই। মূল মন্দিরের সভামণ্ডপটিও সুন্দর। একদিকে যাত্রীরা সারি সারি পিণ্ডদান করছে। পুরুষ ও বিধবাদের মন্ত্র পড়াচ্ছেন ব্রাহ্মণরা। তাদের পাশ দিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করতে হয়। রূপো দিয়ে মোড়া এই মন্দির চূড়া, মন্দিরের মধ্যে রয়েছে বিষ্ণু-পদচিহ্ন যুক্ত বিশাল শিলা। সামনে ফল্গু নদী। শুধু বালি আর বালি। তবে সামান্য খুঁড়লেই জল বার হয়ে আসে। কেন ফল্গু অন্তঃসলিলা ?

রামায়ণে আছে পিতৃসত্য পালনের জন্যে রাম বনবাসে গেলেন। সঙ্গী লক্ষ্মণ আর সীতা। এদিকে পুত্রের বিরহে প্রাণ ত্যাগ করলেন রাজা দশরথ। যখন এই সংবাদ রামের কাছে গিয়ে পৌঁছোল। তখন তঁারা ফন্তু নদীর তীরে বিশ্রাম করছেন। পিতার শোকে একেবারে ভেঙে পড়লেন সকলে। যখন শোক শান্ত হল রাম বললেন, এখানেই আমরা পিতার পারলৌকিক কাজ করে পিণ্ডদান করব। লক্ষ্মণ বললেন, পিণ্ডদানের জন্যে যা যা উপকরণ প্রয়োজন তার কিছুই আমাদের কাছে নেই। কাছাকাছি কোনো গ্রাম বা নগর থেকে ভিক্ষা করে নিয়ে আসতে হবে। রাম বললেন, তাহলে বিলম্ব করার কোনো প্রয়োজন নেই। সূর্যাস্তের আগেই আমাদের পিণ্ডদানের কাজ শেষ করতে হবে। সীতা বললেন, তোমরা ফিরে না আসা পর্যন্ত আমি এখানেই প্রতীক্ষা করছি। রাম-লক্ষ্মণ চলে যেতেই সীতা নদীতীরের জঙ্গল থেকে অল্প কয়েকটি ফল আর কিছু ফুল সংগ্রহ করে নিয়ে এলেন। এদিকে বেলা বেড়ে চলে। রাম-লক্ষ্মণ আর আসেন না। উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন সীতা। হঠাৎ বাতাসে কারও কণ্ঠস্বর শুনে চমকে উঠলেন সীতা। তারপরই দেখলেন নদী থেকে দুটি হাত বার হয়ে এল। আর সেই অদৃশ্য কণ্ঠস্বর বলল, আমি দশরথ। ভীষণ ক্ষুধার্ত, আমাকে পিণ্ডদান করো। সীতা বললেন, মহারাজ আপনার পুত্ররা নগরে গিয়েছেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই তারা ফিরে এসে পিণ্ডদান করবেন। দশরথ বললেন, আমার পক্ষে আর এক মুহূর্ত বিলম্ব করা সম্ভব নয়, তুমিই আমাকে পিণ্ডদান করো। আমি সেই পিণ্ড গ্রহণ করে স্বর্গে চলে যাব। নাহলে আমাকে অনন্ত নরকবাস করতে হবে। নিরুপায় হয়ে সীতা তঁার কাছে যা ছিল তাই দিয়ে পিণ্ডদান করলেন। তৃপ্ত দশরথ সীতাকে আশীর্বাদ করে স্বর্গে চলে গেলেন। এদিকে খানিক পরেই ফিরে এলেন রাম-লক্ষ্মণ। তঁারা দশরথের পারলৌকিক কাজ শেষ করে পিণ্ডদান করতেই দেখলেন কেউ তঁাদের সেই পিণ্ড গ্রহণ করলেন না। তখন সীতা সব কথা বলতেই রাম বললেন, এ অসম্ভব, পিতা কখনোই তোমার হাত থেকে পিণ্ডগ্রহণ করতে পারেন না। তখন সীতা বললেন, আমি সত্য বলছি, তার সাক্ষী পাঁচ জন এক ব্রাহ্মণ, একটি গোরু, ফল্গু নদী, আগুন আর একটি বট গাছ। সীতা তাদের বললেন, তোমরা যা দেখেছ সত্য বলো। ব্রাহ্মণ, গোরু, ফল্গু নদী আর আগুন ইচ্ছে করেই বলল, আমরা কিছু দেখিনি। বট যা সত্য তাই প্রকাশ করল। তখন ক্ষুব্ধ সীতা প্রথম চার জনকে অভিশাপ দিয়ে বললেন, ফল্গুর সব জল শুকিয়ে যাবে। সে হবে অন্তঃসলিলা। আগুন সব কিছুকে শুধু দহন করবে। গোরু যে-মুখে মিথ্যা কথা বলেছে সেই মুখে কখনো পুজো হবে না। লোকে তার পিছন দিকে পূজা দেবে। আর যে-লোভের বশবর্তী হয়ে ব্রাহ্মণ মিথ্যা কথা বলল, ব্রাহ্মণের লোভ কখনো পূর্ণ হবে না আর বট যে সত্য কথা বলেছে সে হবে অক্ষয়, অমর। যুগ যুগ ধরে লোকে তার পূজা করবে।

হিন্দুশাস্ত্রে বলা হয় মানুষের মৃত্যুর পর তার আত্মা মুক্তির জন্য আকাশে-বাতাসে ঘুরে বেড়ায়। পিণ্ডদান না করা পর্যন্ত তঁার মুক্তি ঘটে না। তাই যুগ যুগ ধরে মানুষ আসে এই গয়া তীর্থে। প্রথমে তারা পিণ্ডদান করে ফল্গু নদীর তীরে, তারপর বিষ্ণুপাদ মন্দিরে। সবশেষে তারা যায় সামান্য দূরে ব্রাহ্মযোনী পাহাড়ে। পাহাড়ের চূড়ায় রয়েছে শিবমন্দির। পাহাড়ের নীচে অক্ষয়বট। এই বটের নিচেও পিণ্ডদান করা হয়। ব্রাহ্মযোনী, রামশিলা আর প্রেতিশিলা এই তিন পাহাড় ঘেরা গয়া। রামশিলা পাহাড়ের চূড়ায় পাতালেশ্বর মন্দির। আর যারা অপঘাতে মারা যান তঁাদের পিণ্ডদান করা হয় প্রেতশিলা পাহাড়ে।

অমিতাভর মনে পড়ে সেও পিণ্ডদান করে এক গাছের নীচে বসেছিল। চারিদিকে মানুষের কলকোলাহল। পাশে বসা ব্রাহ্মণ পূজারি কত কথা বলেন। ইতিহাস, পুরাণ, জীবনকথা। শ্রীচৈতন্যের কথা বলতেই অমিতাভ জিজ্ঞাসা করল, প্রভু শ্রীচৈতন্য এখানে কবে এসেছিলেন ?

ব্রাহ্মণ বললেন, সে এক আশ্চর্য কাহিনি। নবদ্বীপের নিমাই তখন শ্রীচৈতন্য হননি। তিনি তখন নবদ্বীপে টোল খুলে ছাত্র পড়াচ্ছেন। এর আগে প্রথম স্ত্রী লক্ষ্মী দেবীর মৃত্যু হয়েছে। নিমাইয়ের মা পুত্রের আবার বিবাহ দিলেন বিষ্ণুপ্রিয়ার সঙ্গে। সুখের সংসার। এমন সময় একদিন ঠিক হল পিতৃপুরুষের পিণ্ডদানের জন্যে নিমাই গয়াধামে যাবেন। তা ছাড়া সাপের কামড়ে লক্ষ্মী দেবীর মৃত্যু হয়েছে। তার জন্যেও পিণ্ড দিতে হবে। মায়ের অনুমতি নিয়ে কয়েক জন আত্মীয়-বন্ধুর সঙ্গে নিমাই রওনা হলেন গয়ার দিকে। পায়ে হাঁটা পথ। কয়েক সপ্তাহ চলার পর তঁারা এসে পৌঁছলেন গয়ায়। প্রথমে পিণ্ডদানপর্ব শেষ করে নিমাই গেলেন বিষ্ণুপাদ মন্দিরে।

মন্দিরগর্ভে ভক্তজনের ভিড়। সুগন্ধে ভরে আছে চারিদিক। পুজারীর মন্ত্র উচ্চারণে গমগম করছে মন্দির কক্ষ। সকলের সঙ্গে মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করলেন নিমাই। তঁার দৃষ্টি পড়ল বিষ্ণুপাদ শিলায়। পলকে তঁার ভেতর অজানা এক আবেগ জেগে উঠল। দিব্য এক ভাবাবেশে আবিষ্ট হয়ে পড়লেন। ভক্তিরসে ভরে উঠল তঁার সমস্ত অন্তর। আবেগে কেঁপে উঠল নিমাইয়ের সমস্ত শরীর। দু-চোখ বেয়ে জলের ধারা গড়িয়ে পড়ল। তঁার কানে এল পণ্ডিতদের স্তবগান। তারা বিষ্ণুর স্তুতি করে বলছে তোমার পাদপদ্মে জগৎ লীন হয়ে আছে। মহালক্ষ্মী এই চরণবন্দনা করছেন। দেবাদিদেব নিজের হৃদয়ে এই চরণ ধারণ করে আছেন। যুগ যুগ ধরে সাধু মহাজনরা এই পদযুগলে সব পুজো নিবেদন করছেন। এই চরণ থেকেই জন্ম হয়েছে জগতের মুক্তিদায়িনী গঙ্গার।

পূজারিদের স্তব শুনছেন নিমাই আর ভক্তির আবেগে পূর্ণ হয়ে উঠছে তঁার দেহ-মন। দু-চোখ বেয়ে ঝরে পড়ছে অশ্রুধারা। মনে হল ধন্য তঁার জীবন। যে পাদপদ্ম দর্শনের জন্যে মানুষের অন্তর ব্যাকুল হয়ে ওঠে, তিনি তা দর্শন করছেন। এই চরণপদ্মই জগতের সার। একমাত্র স্থির বস্তু। এ ছাড়া এই জীবজগতের জড়জগতের সব কিছুই মিথ্যা। মিথ্যা সব জ্ঞান-বিদ্যার অহংকার। যে জ্ঞান-বিদ্যা মানুষ মৃত্যুর পর কোথায় যায় তা নিঃসংশয়ে বলে দিতে পারে না, যে জ্ঞান জীবন-মৃত্যু, বিশ্ব রহস্যের প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করতে পারে না, সে জ্ঞান-বিদ্যা মিথ্যা ছাড়া আর কী!

ঘন কুয়াশার আবরণ ভেদ করে যেমন সূর্যের আলো প্রবেশ করে পৃথিবীতে, নিমাইয়ের মনে হল কেউ যেন তঁার অন্তরেও সব অন্ধকার কাটিয়ে আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে। যা সত্য, যা নিত্য এবার তারই সন্ধানে বার হতে হবে। এখানে অসংখ্য মানুষ তঁাদের প্রিয়জনদের আত্মার মুক্তির জন্যে পিণ্ডদান করছেন। এই পাদপদ্ম দর্শন করে ভুলে যাচ্ছে সব শোক তাপ অন্তরের বেদনা। এবার তিনিও জীবনের সব মোহপাশ মুক্ত হয়ে এই নারায়ণের পাদপদ্মকেই অবশিষ্ট জীবনের সার হিসেবে গ্রহণ করবেন।

সেইসময়ে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন মহান বৈষ্ণবসাধক ঈশ্বরপুরী। তিনিও বিষ্ণু পাদপদ্মের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে ভক্তিভাবে লীন হয়ে গিয়েছিলেন। ধীরে ধীরে চেতনার জগতে ফিরে আসতেই প্রথমে দৃষ্টি পড়ল নিমাই-এর দিকে, করজোড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন দেবকান্তি এক যুবক। দু-চোখে অশ্রুধারা।নিজের অন্তরদৃষ্টি দিয়ে অনুভব করলেন ইনি সাধারণ কেউ নন। সমস্ত শরীরে ফুটে উঠেছে এক দৈবভাব। পরম বৈষ্ণব ছাড়া কারও মধ্যে এই দিব্যপ্রকাশ ঘটে না।

কিছুক্ষণ দেখতেই ঈশ্বরপুরী চিনতে পারলেন নিমাইকে। মনে পড়ল নবদ্বীপে পরিচয় হয়েছিল তঁাদের। তখন মনে হয়েছিল নিমাই একজন শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত ছাড়া কিছু নয়। আজ তঁাকে দেখে মনে হচ্ছে সে জ্ঞান নয়, ভক্তি ভাবের পথিক। এগিয়ে গেলেন নিমাইয়ের দিকে। দু-জনেই দু-জনকে চিনতে পারলেন।

অপ্রত্যাশিতভাবে ঈশ্বরপুরীকে দেখে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন নিমাই। বললেন, ভগবান কৃষ্ণের কী অপার করুণা। বিষ্ণু পাদপদ্ম দর্শন করতে এসে পরম বিষ্ণুভক্তের দর্শন পেয়ে গেলাম। ঈশ্বরের কৃপায় যখন দেখা হয়েই গেল তখন আর ছাড়ছি না। আমি আপনার কাছে সমর্পণ করলাম নিজেকে। দয়া করে আমায় মন্ত্রদান করুন। আপনার পায়ে আশ্রয় দিয়ে আমাকে উদ্ধার করুন।

ঈশ্বরপুরী বললেন, নিমাই, নবদ্বীপে তোমায় দেখেছি এক রূপে, আজ দেখলাম অন্য রূপে। আমার সমস্ত অন্তর বলছে তোমার ভক্তিরসের জোয়ারে বিশ্বজগৎ ভেসে যাবে। আমি তোমাকে সেই ভক্তিরসের মন্ত্র দেব।

এর কয়েক দিন পরেই ঈশ্বরপুরী দীক্ষা দিলেন নিমাইকে। গয়ার মহাক্ষেত্রে নিমাইয়ের মধ্যে ভক্তিবীজ বপন করলেন শ্রীপাদ ঈশ্বরপুরী। এর পরই শুরু হল তঁার নতুন জীবন।

ব্রাহ্মণ পূজারির কথা শুনতে শুনতে কেমন আনমনা হয়ে গিয়েছিল অমিতাভ। মনে পড়ল এই গয়া মহাতীর্থের সঙ্গে আরেক মহামানবের জন্মসূত্র জড়িয়ে রয়েছে। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণ। তখনও জন্ম হয়নি তঁার। একদিন পিতা ক্ষুদিরাম গিয়েছেন বড়োমেয়ে কাত্যায়নীর শ্বশুরবাড়িতে। সেখানে মেয়েকে দেখে মন খারাপ হয়ে গেল ক্ষুদিরামের। মেয়ের হাবভাব স্বাভাবিক নয়। সবাই বলল ভূতে ধরেছে। সমস্ত মনকে একাগ্র করে জানতে চাইলেন পরম ধার্মিক ক্ষুদিরাম, কে তুমি অশুভ শক্তি, আমার মেয়েকে কষ্ট দিচ্ছ। কাত্যায়নীর গলায় সেই অশুভ শক্তি জবাব দিল, আমি মুক্তির জন্যে ছটফট করছি। কোথাও আশ্রয় না পেয়ে তোমার মেয়ের শরীরে ভর করেছি। ক্ষুদিরাম বললেন, কী করলে তোমার মুক্তি হবে ?

‘যদি গয়ায় গিয়ে আমার পিণ্ড দাও।’

ক্ষুদিরাম বললেন, আমি পিণ্ড দেব।

তৎক্ষণাৎ সুস্থ হয়ে উঠল কাত্যায়নী।

১২৪১ সাল, ক্ষুদিরাম গয়া রওনা হলেন, উদ্দেশ্য সেই অতৃপ্ত আত্মা এবং তঁার সঙ্গে পিতৃপুরুষেরও পিণ্ডদান। পৌঁছোলেন চৈত্রের শুরুতে। অন্তরের সব ভক্তি উজাড় করে বিষ্ণু পাদপদ্মে পিণ্ড দিলেন। সেই রাতেই আশ্চর্য স্বপ্ন দেখলেন, তিনি যেন ওই পাদপদ্মে আবার পিণ্ড দিচ্ছেন, আর তঁার পিতৃপুরুষরা সেই পিণ্ডদান গ্রহণ করছেন। তঁারা অদৃশ্য হতেই এক জ্যোতির্ময় দিব্যপুরুষ, হাতে শঙ্খচক্রগদাপদ্ম_সামনে এসে দাঁড়ালেন। তারপর ক্ষুদিরামের দিকে চেয়ে বললেন, তোমার ভক্তিতে আমি প্রসন্ন হয়েছি। এবার তোমার পুত্র হয়ে জন্ম নেব। সেবা নেব তোমার হাতে।

আনন্দে কেঁদে ফেললেন ক্ষুদিরাম, প্রভু আমি যে দীনদরিদ্র। কেমন করে তোমার সেবা করব ?

সেই দিব্যপুরুষ বললেন, কোনো ভয় নেই তোমার। যা জুটবে তাই দিয়ে আমার সেবা করবে, তাতেই আমি তৃপ্ত হব।

ঘুম ভেঙে গেল ক্ষুদিরামের। তারপর ফিরে এলেন কামারপুকুর। চন্দ্রমণির কোলে জন্ম নিলেন নররূপী নারায়ণ গদাধর। পূর্ণ হল গয়াধামের স্বপ্ন।

শ্রীচৈতন্য ও শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মের বহু আগে এই পবিত্রভূমিতে এসেছিলেন হিউ-এন-সাঙ।

নৈরঞ্জনা নদী অতিক্রম করে গয়া নগরে প্রবেশ করলেন হিউ-এন-সাঙ। সেইসময়ে এখানে কোনো বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর বাস ছিল না। এখানে থাকতেন কয়েক সহস্র ব্রাহ্মণ পরিবার, তঁারা সকলেই মহান কোনো ঋষির বংশধর। তারা কেউ রাজার শাসনভুক্ত নন। নগরের উত্তরে রয়েছে পবিত্র এক ঝরনা, আশপাশে কয়েকটি পাহাড়। এর মধ্যে একটি পাহাড় ‘ধর্ম পাহাড়’ হিসেবে গণ্য। রাজা থেকে সাধারণ মানুষ অনেকেই ওই পাহাড়ের উপর উঠে নিজেদের সব পাপ স্বীকার করে নেয়। হিউ-এন-সাঙ সেই পাহাড়ে যাননি। তবে শুনেছিলেন দূর অতীতে সেখানে একটি চৈত্য ছিল। বর্তমানে সেটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।

গয়া পরিক্রমা শেষ করে হিউ-এন-সাঙ গেলেন সমস্ত বৌদ্ধ জগতের পবিত্রভূমি বুদ্ধগয়ায়।

সকল অধ্যায়
১.
গভীর গহন এক রাত
২.
আলোর পথে
৩.
প্রথম সকাল
৪.
রাত্রি শেষ
৫.
যাত্রা হল শুরু
৬.
সীমান্ত পথ
৭.
মৃত্যু উপত্যকা
৮.
মরুদ্যান
৯.
হামি
১০.
তুরফান
১১.
কুচা
১২.
বরফের দেশে
১৩.
ইশিক কুল
১৪.
সমরখন্দ
১৫.
লৌহকপাট
১৬.
বামিয়ান
১৭.
গান্ধার
১৮.
ছায়াগুহা
১৯.
পুরুষপুর
২০.
তক্ষশীলা
২১.
কাশ্মীর
২২.
শাকল
২৩.
জলন্ধর থেকে কুলু
২৪.
মথুরা
২৫.
কান্যকুব্জ
২৬.
অযোধ্যা থেকে কৌশাম্বী
২৭.
প্রয়াগ
২৮.
শ্রাবস্তী
২৯.
কপিলাবস্তু
৩০.
লুম্বিনী
৩১.
কুশীনগর
৩২.
বারাণসী
৩৩.
সারনাথ
৩৪.
বৈশালী
৩৫.
মগধ
৩৬.
শীলভদ্র বিহার
৩৭.
গয়া
৩৮.
বুদ্ধগয়া
৩৯.
বোধিবৃক্ষ
৪০.
মহাভিক্ষুণী
৪১.
রাজগৃহ
৪২.
মানসলোক
৪৩.
নালন্দা
৪৪.
ভারত পরিক্রমা
৪৫.
আবার নালন্দা
৪৬.
শরণাগত

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%