চঞ্চলকুমার ঘোষ
সারনাথ বৌদ্ধদের কাছে এক পরম পবিত্র তীর্থভূমি। কারণ ধর্মপ্রচারের জন্যে যখন বুদ্ধ বারাণসীর দিকে চলেছেন এই সারনাথেই দেখা হল পাঁচ জন তপস্বীর সঙ্গে, একদিন যাঁরা তঁাকে পায়েস খেতে দেখে উপহাস করেছিলেন। বুদ্ধ চলতে চলতে এলেন মৃগ-উদ্যানে। দেখলেন গয়ার অরণ্যের মতোই পাঁচ তাপস কঠোর সংযম আর আত্মনিগ্রহের মধ্যে দিয়ে সাধনা করে চলেছেন। সেই পাঁচ তাপসও বুদ্ধকে দেখতে পেয়েছিলেন। তঁারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে আরম্ভ করলেন গৌতম তপস্যার কোনো নিয়ম মানে না। ও ভণ্ড তপস্বী। বুদ্ধ কোনো কথা না বলে তঁাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তঁারা চমকে উঠলেন। যে-মানুষটিকে তঁারা আগে দেখেছিলেন তিনি এখন এক অন্য মানুষ। তঁার সর্বশরীরে দিব্যেজ্যোতি। প্রজ্ঞার আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে তঁার মুখমণ্ডল। দুই চোখে করুণা আর প্রেম। মুহূর্তে তঁাদের অন্তর মধ্যেকার সব ক্ষোভ বিরক্তি অবজ্ঞা দূর হয়ে গেল। অনুভব করতে পারলেন তঁাদের সামনে যিনি এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি আর সাধারণ কেউ নন, এক মহামানব ; যাঁকে দর্শন করলে সকল দুঃখ দূর হয়ে যায়, অখণ্ড অনন্তের মহাসমুদ্রের মধ্যে স্তব্ধতায় বিলীন হয়ে যায় ক্ষুদ্র খণ্ড আত্মা।
তঁারা সকলে বুদ্ধের পায়ের উপরে লুটিয়ে পড়লেন। তঁাদের দীক্ষা দিলেন বুদ্ধ। শুধু দীক্ষা নয়, তঁার জ্ঞানের আলো এখান থেকেই প্রজ্বলিত হয়ে উঠল_শুধু ভারতবর্ষ নয়, সমগ্র বিশ্বের দিকে দিকে।
বারাণসীর তেরো কিলোমিটার দূরে গঙ্গা আর গোমতী নদীর সঙ্গমের কাছেই সারনাথ। প্রাচীন কালে এর নাম ইশিপাতন বা ঋষিপত্তন। এর অর্থ এখানে কোনো ঋষিতুল্য ব্যক্তি পদার্পণ করেন। তা ছাড়া এখানে ছিল বারাণসী রাজের মৃগক্ষেত্র। স্বাধীনভাবে মৃগের দল এখানে বিচরণ করত বলে একে বলা হত মৃগদাব। ভগবান বুদ্ধ তঁার পাঁচ জন শিষ্যের কাছে প্রথম যে-ধর্ম উপদেশ দেন তা ‘ধম্রচক্রপ্রবর্তনসূত্র’ নামে খ্যাত হয়ে আছে। এই পাঁচ জন শিষ্যকে নিয়ে এখানে অবস্থান করতে থাকেন বুদ্ধ। দিবাভাগে তারা ভিক্ষার জন্যে বারাণসীর পথে লোকালয়ে যেতেন, অন্য সময় সাধনা করতেন। এখানে তঁাকে দেখে বারাণসীর শ্রেষ্ঠীপুত্র যশ-সহ আরও অনেকে বুদ্ধের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন। এর পর আরও চুয়ান্ন জন বুদ্ধের কাছে দীক্ষা নিয়ে প্রব্রজ্যার গ্রহণ করলেন। বুদ্ধ তখন তঁার শিষ্যদের উদ্দেশ্যে বললেন, তোমরা দেশে দেশে ভ্রমণ করে ধর্ম দীক্ষা দান করবে। এর পর বুদ্ধ লোকহিতসাধনের উদ্দেশ্য নিয়ে মৃগদাব ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন।
ভগবান বুদ্ধের মৃত্যুর প্রায় দুশো বছর পর এখানে আসেন সম্রাট অশোক। বুদ্ধের এই পবিত্র স্থানে গড়ে তোলেন একাধিক স্তুপ বিহার চৈত্য। এর মধ্যে প্রধান ছিল ধর্মরাজিকা স্তুপ। এটি ছিল ত্রিশ মিটার উচু। এর উপরে ছিল অপূর্ব কারুকার্য। ১৭৯৪ সালে বারাণসীর এক ধনী ব্যক্তি নিজের প্রাসাদের জন্যে এই স্তূপের বেশিরভাগ অংশই ভেঙে ফেলেন। এর মধ্যে যা-কিছু পাওয়া গিয়েছিল তা সবই গঙ্গার জলে বিসর্জন দেওয়া হয়। শুধুমাত্র স্মারক রাখবার একটি সবুজ পাত্র কলকাতার মিউজিয়ামে রয়েছে। আর বুদ্ধের অস্থি রয়েছে শ্রীলঙ্কায়। এ ছাড়াও সম্রাট অশোক নির্মাণ করেন অশোক স্তম্ভ। কুড়ি মিটার উঁচু এই স্তম্ভের এক দিকে রয়েছে ব্রািহ্ম লিপি অন্য দিকে পালি ভাষায় খোদাই করা বুদ্ধের বাণী। পিলারের উপর চারটি সিংহের মূর্তি। যা বর্তমানে ভারত রাষ্ট্রের প্রতীক। একটি মূর্তি পিছনে থাকায় শুধুমাত্র তিনটি সিংহ দেখা যায়।
সারনাথে বুদ্ধদেব একটি ছোটো কুটিরে থাকতেন। পরে সেখানে একষট্টি মিটার উঁচু মূলগন্ধ্যাকুটি বিহার নির্মিত হয়। এটি নির্মাণ করেন গুপ্তরাজারা। এ ছাড়াও ছোটো বড়ো নানান স্তূপ ছিল। সারনাথের স্তুপগুলির মধ্যে প্রধান হল ধামেক স্তূপ। বিশাল এই স্তূপটি কোন সময়ে নির্মাণ করা হয় সে বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে। বলা হয় বুদ্ধ যেখানে প্রথম ধর্মপ্রচার করেন সেখানে এই স্তূপটি তৈরি হয়। এর চারদিকে আটটি কুলুঙ্গি। প্রত্যেকটিতে একটি বুদ্ধমূর্তি স্থাপিত ছিল। গুপ্ত যুগে সারনাথের অভূতপূর্ব উন্নতি হয়।
হিউ-এন-সাঙ যখন সারনাথে আসেন তখন তার অতীত গৌরবের সব কিছুই ম্রিয়মাণ। এখানকার মৃগদাব বিহারের (লু-ঈ) চারদিকে প্রাচীর ঘেরা। এর ভিতরে ছিল আটটি অংশ। প্রতিটি অংশে ছিল বিহার, সভাগৃহ। প্রতিটি সভাগৃহের সামনে দীর্ঘ বারান্দা। এইখানে বসে সকলে ধ্যান করতেন। প্রকৃতই ধ্যানের পক্ষে উপযুক্ত স্থান। সেই সময়ে এখানে বাস করতেন প্রায় দেড় হাজার বৌদ্ধ ভিক্ষু। এঁরা সকলেই হীনযান মতে বিশ্বাসী। প্রধান বেষ্টনীর মধ্যে ছিল বিরাট এক মন্দির। প্রায় একশো ফুট উঁচু মন্দিরের চাতাল সিঁড়ি সবই পাথরের। গোটা মন্দির জুড়েই স্থাপত্যকলা। মন্দিরের গায়ে ছোটো ছোটো কুলুঙ্গি। প্রতিটি কুলুঙ্গিতে বুদ্ধের স্বর্ণমণ্ডিত মূর্তি। সেইসব মূর্তির মধ্যে দিয়ে তথাগতের বিভিন্ন ভাব ফুটে উঠেছে। মন্দিরের গর্ভগৃহে ছিল ধর্মচক্র প্রবর্তন মুদ্রায় বুদ্ধের বিরাট মূর্তি।
হিউ-এন-সাঙ বারাণসী থেকে যাত্রা করলেন সারনাথ। বাতাসে প্রবল শৈত্যপ্রবাহ। তবে এর চেয়েও প্রবল শীতলতার মধ্যে তিনি পথ চলেছেন। তাই তেমন কোনো কষ্ট অনুভব করছেন না। বারাণসী থেকে কয়েক জন তঁার সঙ্গী হয়েছেন। সকলেই বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। দিগন্তবিস্তৃত প্রান্তর। তার মধ্যে দিয়ে পথ গিয়েছে। দূরে দূরে গ্রাম চোখে পড়ছে। মাঝে মাঝে স্থানীয় মানুষজন চোখে পড়ছে। কাছে এলেই তারা প্রণাম করছে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের। ভালো লাগে হিউ-এন-সাঙ-এর। অনুভব করেন এখানকার মানুষজন ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।

প্রথম সকালে সকলে বার হয়েছিলেন। তখন চারদিকে কুয়াশা। বেলা হতেই কুয়াশা কেটে গিয়ে রোদের আভা ফোটে। দ্রুত পায়ে হাঁটছিলেন সকলে। হঠাৎ দূর থেকে কিছু একটা দেখা যেতেই একজন সন্ন্যাসী বললেন, আমরা সারনাথ পৌঁছে গিয়েছি।
পদক্ষেপ আরও দ্রুত করলেন সকলে। কিছুক্ষণের মধ্যে সকলে পৌঁছে গেলেন। চারদিকে পাঁচিল। এক দিকে প্রবেশ পথ। সকলে ভেতরে যেতেই বাতাসে ভেসে আসে প্রার্থনাসংগীত। একজন শ্রমণ হিউ-এন-সাঙকে বললেন, ভগবান বুদ্ধ এখানেই প্রথম তার ধর্মের বাণী প্রচার করেছেন।

হিউ-এন-সাঙ-এর সমস্ত দেহ-মন জুড়ে বিচিত্র এক আবেশ জেগে ওঠে। ধীরে ধীরে নতজানু হয়ে মাটিতে নতমস্তক হলেন। মনে পড়ল চিনের বৌদ্ধ বিহারের কথা। রাতে স্বপ্ন দেখেছিলেন যে-পথে একদিন ভগবান তথাগত পদচারণা করেছেন, সেই পথের ধূলি মেখে নিজেকে পবিত্র করবেন।
বিন্দু বিন্দু অশ্রু ঝরে পড়ে মাটিতে। কিছুক্ষণ সেইভাবে স্থির হয়ে থাকেন হিউ-এন-সাঙ। সমবেত কলস্বরে মুখ তুলে তাকালেন তিনি। একদল প্রবীণ নবীন শ্রমণ এসে দাঁড়িয়েছেন তার সামনে। সকলেই শুনেছেন হিউ-এন-সাঙ-এর কথা। একসঙ্গে স্বাগত জানান সকলকে।
প্রবীণ সন্ন্যাসী ধর্মকীর্তি মহাস্থবির এগিয়ে আসেন।
স্বাগত ধর্মগুরু। আপনাকে দর্শন করে আমরা ধন্য।
হিউ-এন-সাঙ সকলের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানালেন, ভগবান বুদ্ধের পবিত্র ভূমিতে আপনাদের দর্শন করে আমিও ধন্য।
ধর্মকীর্তি বললেন, চলুন আমরা বুদ্ধমন্দিরে যাই।
সামনে ধর্মরাজিকা স্তুপ। সকলে সেই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসেন। সামনে পাথরের মন্দির। তার মধ্যে বুদ্ধের মূর্তি। কয়েক জন সন্ন্যাসী সেখানে বসে ধ্যান করছেন। পাছে কারও ধ্যানভঙ্গ হয় ভেবে নিঃশব্দে ভূমিতে বসলেন হিউ-এন-সাঙ। পথশ্রমের কোনো ক্লান্তি নেই। অল্পক্ষণে তিনিও ধ্যানস্থ হলেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন