কুচা

চঞ্চলকুমার ঘোষ

একটানা অনেকক্ষণ হিউ-এন-সাঙ-এর জীবনী পড়ছিল অমিতাভ। বইটা বন্ধ করে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে।

একটা ভাবনা মনকে নাড়া দেয়। কোনো মানুষ যখন মহৎ কোনো উদ্দেশ্য সাধন করবার জন্যে এগিয়ে চলেন কোন শক্তি তার পেছনে কাজ করে ? সে কি শুধুই আত্মবল আর নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলিবার সংকল্প ! রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ সকলের জীবনই সেই অটল সংকল্পের পূর্ণ প্রকাশ। কোনো এক বিজ্ঞানীর লেখায় পড়েছিল মানুষ যখন অবিচল লক্ষ্যে এগিয়ে চলে অদৃশ্য কোনো শক্তি তখন তার মধ্যে কাজ করে।

হিউ-এন-সাঙ-এর জীবনকথা পড়তে পড়তে সেকথাই বার বার মনে হয়। নয়তো মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও কেমন করে মানুষ অবিচলিত থাকেন। হয়তো বিশ্বাসের শক্তি।

আবার বই খোলে অমিতাভ, এবার হিউ-এন-সাঙ-এর যাত্রা কুচা শহরে। হঠাৎ মনে পড়ে যায় একালের এক পর্যটকের কথা যিনি হিউ-এন-সাঙ-এর পথ ধরে গিয়েছেন। ইন্টারনেট থেকে তঁার যাত্রাপথের পুরো বিবরণীটাই বার করে। একটা মিল খুঁজে বার করা একাল আর সেকাল।

একালের পর্যটক লিখছেন, আমি ইয়ান-কি থেকে কুচা শহরের বাসে উঠলাম। লোক ভরতি না হওয়া পর্যন্ত বাস ছাড়ল না। একজন মোটা চেহারার মহিলা, ড্রাইভারের আসনে বসে গাড়ি ছাড়লেন। কিছু দূরে যেতেই চোখে পড়ল েছাটো েছাটো জলস্রোত। হিউ-এন-সাঙও তঁার বিবরণীতে এইসব জলস্রোতের কথা লিখেছেন। বড়ো নালার মতো জল বয়ে চলেছে। খানিক দূর গিয়ে পাহাড় শুরু হল। এদিকটা রুক্ষ মরুভূমির মতো। এই পথটা প্রায় ৩৬০ কিলোমিটার। বিরক্তিকর বাসযাত্রা। আমার পাশে এক অধ্যাপক ভদ্রলোক বসেছিলেন। কুচায় থাকেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, কুচা একসময় মধ্য এশিয়ার সবচেয়ে সমৃদ্ধ শহর ছিল। তখন এর নাম ছিল কুচি। বিরাট অঞ্চল জুড়ে ছিল শহরের বিস্তৃতি। এখানকার লোকেরা ভারতবর্যের মতোই ব্রাহ্মী লিপি ব্যবহার করত। এখানে নানান ফলের চাষ হত। শিল্প সংগীতের ব্যাপক চর্চা করতেন নগরের মানুষরা। মাটি খুঁড়ে বহুকালের শিল্পসামগ্রী, পোড়া ইটের বাড়ি, মূর্তি, পোশাক, অস্ত্রশস্ত্র পাওয়া গেছে। স্থানীয় মানুষদের আচার ব্যবহার ইরানিদের মতো হলেও সকলে বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাস করত। কুচাতে একসময় সংস্কৃত শাস্ত্রের ব্যাপক চর্চা হত। এর পেছনে যে মানুষটির সবচেয়ে বড়ো অবদান তিনি বৌদ্ধ পণ্ডিত কুমারজীব।

জিজ্ঞাসা করলাম, কুমারজীবের কথা কিছু জানেন ?

‘হ্যা, তিনি চতুর্থ শতকে ভারতের কোনো সম্রান্ত বংশে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ছিলেন বৌদ্ধ পণ্ডিত কুমার যান। মা ছিলেন কুচার রাজকুমারী জীবা। অল্প বয়সে সন্ন্যাস নিয়ে কাশ্মীরে চলে যান কুমারজীব। সেখানে বেদবেদান্ত ছাড়াও বিভিন্ন বৌদ্ধ শাস্ত্র পড়ে মহাপণ্ডিত হয়ে ওঠেন। মায়ের ইচ্ছা অনুসারে কুচায় এসে ধর্মপ্রচার শুরু করেন। পরে চিন সম্রাট যখন কুচায় সামরিক অভিযান করেন। তিনি কুমারজীবকে সে দেশে নিয়ে যান। সম্রাটের আদেশে একশোর বেশি বৌদ্ধ শাস্ত্র চিনা ভাষায় অনুবাদ করেন।’

অধ্যাপক ভদ্রলোকের গন্তব্যস্থল এসে গিয়েছিল। তিনি নেমে গেলেন, আমার বাস এগিয়ে চলল কুচার দিকে।

আবার হিউ-এন-সাঙ-এর জীবনী পড়া আরম্ভ করল অমিতাভ।

হিউ-এন-সাঙ কুচায় আসছেন। এ সংবাদ আগেই পৌঁছে গিয়েছিল। সেইসময় কুচার রাজা ছিলেন তুখারীয় (সংস্কৃতে এর অর্থ ছিল সোনার দেবতা)। তিনি ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী। সারা দেশ জুড়ে ছিল অসংখ্য বৌদ্ধ মঠ, বিহার, কয়েক হাজার সন্ন্যাসী। এদের প্রধান ছিলেন মোক্ষগুপ্ত।

হিউ-এন-সাঙ নগরে প্রবেশ করতেই স্বয়ং রাজা এবং বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর দল তঁাকে অভ্যর্থনা করে নিয়ে এলেন। নগরে প্রবেশ করবার পর একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এগিয়ে এলেন। হাতে ফুলের পাত্র।

‘প্রণাম আচার্য।’

রাজা বললেন, বুদ্ধ মন্দিরে চলুন, সেখানে আপনি পুজো দেবেন।

নগরের দশ প্রান্তে দশটি মন্দির। প্রত্যেক মন্দিরে গিয়ে ভগবান বুদ্ধের মূর্তির সামনে প্রার্থনা করলেন। প্রত্যেকবারই তার হাতে ফুল আর এক পাত্র মদ দেওয়া হল।

পুজো শেষ হলে প্রাসাদে গেলেন হিউ-এন-সাঙ।

খানিক বিশ্রামের পর মহারাজ বললেন, হে ধর্মগুরু, চলুন আহারের সব ব্যবস্থা হয়েছে।

বিরাট আয়োজন। পর পর পাত্রে খাবার সাজানো। দেখতে দেখতে হঠাৎ থমকে গেলেন, একটি পাত্রের দিকে আঙুল তুলে হিউ-এন-সাঙ প্রশ্ন করলেন, ওগুলো কী ?

‘পাখির মাংস।’

চমকে উঠলেন হিউ-এন-সাঙ। বললেন, আপনারা মাংস খান মহারাজ। বৌদ্ধ ধর্মে শুধু প্রাণীহত্যা নিষিদ্ধ নয়, প্রাণীর শরীরের কোনো অংশ খাওয়াও নিষিদ্ধ।

মহারাজের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক বৌদ্ধ ভিক্ষু। তিনি বললেন, হে ধর্মগুরু, কুচায় সকলেই হীনযান সম্প্রদায়ের। হীনযানের মত অনুসারে তিন রকমের মাংস বৌদ্ধরা আহার করতে পারে। যে পশু ভিক্ষুর জন্যে মারা হয়নি, কোনো প্রাণীর হাতে অন্য প্রাণী মারা গেলে, প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিকভাবে কোনো পশুর মৃত্যু হলে।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমি মহাযান সম্প্রদায়ের। ভগবান বুদ্ধের মহান আদর্শের উত্তরাধিকারী। আমি আপনাদের এই মত মেনে নিতে পারলাম না। এই খাবার আমার পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয়।

মহারাজ বিনীতভাবে বললেন, আপনার যা ইচ্ছা ধর্মগুরু। সেই মতোই খাবারের ব্যবস্থা করা হবে।

মহাযান, হীনযান বৌদ্ধ ধর্মের দুই সম্প্রদায়ের ভাবনাচিন্তার বিভেদ থাকা সত্ত্বেও কুচায় রয়ে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। প্রবল শীত শুরু হল। চারদিকের পথ পাহাড় পর্বত বরফে ঢেকে গেল।

বেশিরভাগ সময়েই ধ্যানের মধ্যে ডুবে থাকেন হিউ-এন-সাঙ আর প্রতীক্ষা করেন কবে তঁার স্বপ্নের দেশ ভারতবর্ষে পৌছবেন।

শীত শেষ হয়ে আসে। চারপাশের বরফ গলতে থাকে। যদিও চারদিকের পাহাড়গুলো তখনও বরফে সাদা হয়ে আছে।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, মহারাজ এইবার আমি ভারতবর্ষের পথে রওনা হতে চাই।

রাজা তুখারীয় বললেন, এখান থেকে আপনি কোথায় যাবেন ?

‘শুনেছি, এই পথ তুরস্কের মধ্যে দিয়ে সমরখন্দ গিয়েছে।’

‘আপনি ঠিকই শুনেছেন ধর্মগুরু। মাঝে বোদাল গিরিপথ। তি—এন-শান উপত্যকা, ওখানে বছরের বেশিরভাগ সময়েই বরফ ঢাকা থাকে। যেমন দুর্গম তেমনি ভয়ংকর। ওই পথে যারা যায় তাদের বেশিরভাগই আর প্রাণ নিয়ে ফিরে আসে না।’

সামান্য হাসলেন হিউ-এন-সাঙ। ‘আমি প্রাণের ভয় করি না মহারাজ। পথের বিপদের কথাও ভাবি না। আমি সমস্ত অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করি ভগবান তথাগতই আমাকে রক্ষা করবেন। আপনি আমায় যাত্রার অনুমতি দিন।’

মহারাজ করজোড়ে বললেন, আমি কয়েক দিনের মধ্যেই আপনার যাত্রার ব্যবস্থা করছি।

সকল অধ্যায়
১.
গভীর গহন এক রাত
২.
আলোর পথে
৩.
প্রথম সকাল
৪.
রাত্রি শেষ
৫.
যাত্রা হল শুরু
৬.
সীমান্ত পথ
৭.
মৃত্যু উপত্যকা
৮.
মরুদ্যান
৯.
হামি
১০.
তুরফান
১১.
কুচা
১২.
বরফের দেশে
১৩.
ইশিক কুল
১৪.
সমরখন্দ
১৫.
লৌহকপাট
১৬.
বামিয়ান
১৭.
গান্ধার
১৮.
ছায়াগুহা
১৯.
পুরুষপুর
২০.
তক্ষশীলা
২১.
কাশ্মীর
২২.
শাকল
২৩.
জলন্ধর থেকে কুলু
২৪.
মথুরা
২৫.
কান্যকুব্জ
২৬.
অযোধ্যা থেকে কৌশাম্বী
২৭.
প্রয়াগ
২৮.
শ্রাবস্তী
২৯.
কপিলাবস্তু
৩০.
লুম্বিনী
৩১.
কুশীনগর
৩২.
বারাণসী
৩৩.
সারনাথ
৩৪.
বৈশালী
৩৫.
মগধ
৩৬.
শীলভদ্র বিহার
৩৭.
গয়া
৩৮.
বুদ্ধগয়া
৩৯.
বোধিবৃক্ষ
৪০.
মহাভিক্ষুণী
৪১.
রাজগৃহ
৪২.
মানসলোক
৪৩.
নালন্দা
৪৪.
ভারত পরিক্রমা
৪৫.
আবার নালন্দা
৪৬.
শরণাগত

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%