চঞ্চলকুমার ঘোষ
দূর থেকে চোখে পড়ছিল বিশাল হ্রদ। টলটল করছে জল। অনেক আগেই বরফের প্রান্তর শেষ হয়ে গিয়েছিল। কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া বইলেও আগের সেই ভয়ংকর প্রকৃতি আর নেই। সকলেই ক্লান্ত পরিশ্রান্ত। মানুষ, ভারবাহী পশুরা, সকলেই ধীর পায়ে এগিয়ে চলে। সূর্য মাঝ আকাশে। শুধু আলোটুকু ছড়িয়ে আছে, কোনো তাপ নেই।
একসময় হ্রদের তীরে এসে পৌঁছলেন হিউ-এন-সাঙ। পেছনে সঙ্গীরা। কারোরই আর চলার ক্ষমতা নেই। বললেন, আমরা এখানেই বিশ্রাম নেব।
পথপ্রদর্শক বলল, আপনি যা আদেশ করবেন তাই হবে ধর্মগুরু।
সকলে মাটির ওপরেই বসে পড়ে। ক্লান্তির মধ্যেও তাদের চোখে-মুখে মৃত্যু উপত্যকা পার হয়ে আসার স্বস্তি। শুধু বিষণ্ণ হয়ে যান হিউ-এন-সাঙ। দুর্গম পথে তঁার চোদ্দোজন সঙ্গীর মৃত্যু হয়েছে। বরফের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছে দশটা ঘোড়া। এত মৃত্যু তিনি চাননি। গভীর বেদনায় ভরে ওঠে তঁার মন। ধীরে ধীরে এসে দাঁড়ালেন হ্রদের তীরে। দীর্ঘক্ষণ প্রার্থনা করলেন। একসময় শান্ত হয়ে আসে মন।

এগিয়ে আসে পথপ্রদর্শক। হিউ-এন-সাঙ জিজ্ঞাসা করলেন, আমরা কোথায় এসেছি ?
ধর্মগুরু এই সমস্ত অঞ্চলই তুরস্ক সম্রাটের রাজত্ব। এখানকার সম্রাট ইয়ারগু তুঙ। অগ্নি উপাসক। একবার তাকে দেখবার সৌভাগ্য হয়েছে আসার। কেমন বর্বর প্রকৃতির। তবে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি তঁার যথেষ্ট শ্রদ্ধা আছে।
মনে মনে নিশ্চিন্ত হলেন হিউ-এন-সাঙ।
‘আপনি কি সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন ?’ কৌতূহলী পথপ্রদর্শক।
শান্তভাবে হিউ-এন-সাঙ বললেন, সম্রাটের সঙ্গে আমার কোনো প্রয়োজন নেই। তা ছাড়া আমি কোনো রাজ-অনুগ্রহ ভিক্ষা করতে চাই না, ভগবান বুদ্ধের আশীর্বাদ ছাড়া আমার কোনো কিছুই আকাঙ্ক্ষা নয়।

পথপ্রদর্শক মাথা নীচু করে মৃদুস্বরে বলল, আপনি ভগবান বুদ্ধের আশীর্বাদ পেয়েছেন। তিনিই আপনাকে এই দুর্গম পথে যাত্রা করবার শক্তি দিয়েছেন।
কোনো কথা বললেন না হিউ-এন-সাঙ। দীর্ঘক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইলেন। দিন ফুরিয়ে এসেছিল। অনুচরেরা সকলেই বিশ্রাম করছে। উঠে দাঁড়ালেন হিউ-এন-সাঙ। হ্রদের তীর ধরে এগিয়ে চললেন। চারিদিক নির্জন কোথাও জনমানুষের দেখা নেই। েছাটো েছাটো গাছ। হরিণের মতো কোনো জন্তু গাছের ফাঁকে ছুটে চলে যায়। হ্রদের ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে বেড়াচ্ছে। কী নিশ্চিন্ত জীবন। কেউ অনিষ্ট করবার নেই।
হ্রদের পাড়ে বালির চর। চলতে চলতে থমকে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। একসার মানুষের পায়ের ছাপ। বালির ওপর দিয়ে দূরে মিলিয়ে গিয়েছে। অবাক হলেন হিউ-এন-সাঙ। এই নির্জন প্রান্তরে মানুষের পায়ের চিহ্ন ! দেখে মনে হচ্ছে খুব বেশি আগের নয়। হয়তো আজ সকালে কিংবা গতকালের।
দু-জন অনুচর, তারই সন্ধানে বার হয়েছিল। দেখামাত্রই ডাক দিলেন। এগিয়ে আসে তারা।
‘কী হয়েছে ধর্মগুরু ?’
‘বালির ওপর মানুষের পায়ের ছাপ।’ মুহূর্তে দুই অনুচরের চোখে মুখে ভয়ের ছায়া ফুটে ওঠে। শুনেছি। এইখানে অসভ্য তাতার-রা থাকে। তারা অচেনা মানুষ দেখামাত্রই লুটপাট করে খুন করে। ওদের কোনো ধর্ম নেই। ওরা যেমন হিংস্র তেমনি বর্বর। ওরা যদি আক্রমণ করে, আমাদের কী হবে ধর্মগুরু ?
এতটুকু বিচলিত হলেন না হিউ-এন-সাঙ। শান্তভাবে বললেন, তোমরা প্রার্থনা করো। ভগবান বুদ্ধ তোমাদের রক্ষা করবেন।
তঁাবুতে ফিরে আসে সকলে। পথপ্রদর্শক বলল, কাল সূর্য উঠবার আগেই আমরা রওনা হব।
হ্রদের তীর ধরেই পথ। বাতাসে শীতের আমেজ। বরফের ভয়ংকর মৃত্যু উপত্যকা পার হয়ে সকলেই এখন সতেজ স্বাভাবিক।
অনেকখানি পথ পার হয়ে এসেছিল সকলে। হঠাৎ চোখে পড়ল সামান্য দূরে একসার তঁাবু। খুঁটিতে বাঁধা পতাকা। পতপত করে উড়ছে।
‘কাদের পতাকা উড়ছে ?’ জিজ্ঞাসা করলেন হিউ-এন-সাঙ।
রাজচিহ্ন যুক্ত পতাকা। হয়তো কোনো সুলতান কিংবা সেনাপতি এসেছেন। তারা নিশ্চয়ই আমাদের সাহায্য করবেন।
হ্রদের ধারেই অনেকখানি উন্মুক্ত প্রান্তরে সার সার তঁাবু। চারদিকে অস্ত্র হাতে সৈনিকরা পাহারা দিচ্ছে। হিউ-এন-সাঙ আর তঁার সঙ্গীদের দেখামাত্রই কয়েক জন সৈনিক এগিয়ে আসে। পথপ্রদর্শক কিছু বলতেই হিউ-এন-সাঙ-এর সামনে এসে বললেন, আপনি অপেক্ষা করুন। আমি সেনাধ্যক্ষকে সংবাদ দিচ্ছি।
অল্পক্ষণ পরে মাঝবয়সি সেনাধ্যক্ষ এসে দাঁড়ালেন। দীর্ঘ দেহ। কোমরে তলোয়ার ঝুলছে, কয়েক পলক হিউ-এন-সাঙ-এর দিকে চেয়ে থাকেন। তারপর বললেন, আপনি কোথা থেকে আসছেন ?
নিজের পরিচয় দিয়ে হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমি ভারতবর্ষে চলেছি। ভগবান বুদ্ধের বাণী আর আদর্শকে জানিবার জন্যে।
সামান্য নত হলেন সেনাধ্যক্ষ। আপনার মতো মহান জ্ঞানী ধর্মগুরুর সাক্ষাৎ পেয়ে আমি ধন্য। সম্রাট ইয়ারগু আপনার দর্শন পেলে খুশি হবেন।
হিউ-এন-সাঙ জিজ্ঞাসা করলেন, কোথায় সম্রাট ?
‘তিনি এখানেই আছেন। আগামীকাল শিকারে যাবেন। চলুন আমি আপনার বিশ্রামের ব্যবস্থা করছি।’
হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমি একা নই। আমার সঙ্গীরাও পথশ্রান্ত।
‘আমি সকলের জন্যেই ব্যবস্থা করছি।’ একটি খালি তঁাবুতে সবার থাকার ব্যবস্থা করা হল। মাটির ওপর পুরু করে গদি পাতা। সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতেই সেনাধ্যক্ষ এসে দাঁড়াল।
‘ধর্মগুরু, মহামান্য সম্রাট আপনার কথা শোনামাত্রই সাক্ষাৎ করবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছেন।’
এই মুহূর্তে সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার কোনো ইচ্ছা ছিল না হিউ-এন-সাঙ-এর। কিন্তু মনে হল সম্রাটের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়ার অর্থই নানান সমস্যার সৃষ্টি হওয়া। বললেন, চলুন আমিও সম্রাটের সাক্ষাৎ পেলে খুশি হব।
পর পর সৈনিকদের বেষ্টনী। দুটি বেষ্টনী পার হয়ে সম্রাটের তঁাবু, চারদিকে ঘিরে রয়েছে সৈন্যরা। পরনে পশমের পোশাক, সকলের হাতেই বর্শা, কাধে ধনুক। সকলের চোখে-মুখেই ভয়ংকর হিংস্রতা ফুটে উঠেছে। সকলের দৃষ্টি হিউ-এন-সাঙ-এর দিকে।
ধীর পায়ে এগিয়ে চলেছিলেন তিনি। সম্রাটের তঁাবুর সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লেন সেনাধ্যক্ষ। আসুন ধর্মগুরু।
একপলক চারদিকে তাকালেন। জমকালো বিরাট তঁাবু। গোটা তঁাবু জুড়ে সোনালি সুতোর কারুকার্যকরা। তার ওপর সূর্যের আলো পড়ে ঝলমল করছে। তাবুর সামনের পর্দাও সোনালি সুতোয় কাজ করা। পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকলেন হিউ-এন-সাঙ। তঁাবুর মধ্যেই রাজকীয় ব্যবস্থা। একদিকে উঁচু গদি পাতা, তার ওপর বসে আছেন সম্রাট। পরনে সবুজ সার্টিনের কোট। বড়ো বড়ো চুল। কপালের ওপর রেশমের কাপড় জড়ানো। সম্রাটের দু-পাশে দাঁড়িয়ে দৈত্যাকার দু-জন দেহরক্ষী, তাদের গায়ে লোমের পোশাক। হাতে বর্শা। সম্রাটকে ঘিরে কয়েক জন মাদুরের ওপর বসে আছেন সকলেই সম্রাটের কর্মচারী।
হিউ-এন-সাঙ সম্রাটকে অভিবাদন করে বললেন, ভগবান বুদ্ধ আপনাকে দীর্ঘজীবী করুন।
সম্রাট বললেন, প্রণাম ধর্মগুরু। মহাজ্ঞানী প্রভাকর-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার পর আপনার মতো ধর্মগুরুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হল এ আমার পরম সৌভাগ্য।
হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমি ভারতবর্ষে চলেছি। বুদ্ধের জ্ঞান ধর্ম আদর্শকে আরও ভালোভাবে জানবার জন্যে।
‘মহাজ্ঞানী প্রভাকরও ভারতবর্ষ থেকে এসেছিলেন। আমার দরবারে কয়েক মাস ছিলেন, তারপর চিনে যান।’
‘কত দিন আগে ?’
‘চার বছর !’
সামান্য বিস্মিত হলেন হিউ-এন-সাঙ। ভারতবর্ষ থেকে চিনে কোনো বৌদ্ধ পণ্ডিত এসেছেন, অথচ তিনি কিছুই জানেন না ! বললেন, প্রভাকর কি এখনও জীবিত ?
‘এক বছর আগে তঁার সংবাদ পাই। তারপর আর কিছু জানি না।’
‘আমি তার সম্বন্ধে কিছুই জানি না।’

সম্রাটের অনুচরদের মধ্যে একজন বললেন, আমি শুনেছি তিনি ভারতবর্ষের কোনো রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পরে নালন্দা নামে কোনো শিক্ষালয়ে বৌদ্ধধর্মের শিক্ষা দিতেন। সেখান থেকে তুর্কিস্থানে আসেন। সেখানকার রাজাকে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা দেন। তারপর মহামান্য সম্রাটের কাছে আসেন। কিছুদিন এখানে থাকার পর চিন দেশে যান।
হিউ-এন-সাঙ বললেন, মহামান্য সম্রাট কি বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী ?
সম্রাট বললেন, আমরা অগ্নি-উপাসক। এই বিশ্বের সমস্ত শক্তির উৎস যে সূর্য তারই প্রকাশ অগ্নির মধ্যে। আমরা তাকে পুজো করি। তবে ভগবান বুদ্ধের আদর্শ আমাদের ভালো লাগে। তঁাকে শ্রদ্ধা করি, মহামান্য প্রভাকর আমাদের ভগবান বুদ্ধের বিষয়ে অনেক কথাই বলেছেন। আমি তঁাকে অনেক অনুরোধ করেছিলাম আমার রাজ্যে থাকবার জন্যে। আমি তঁার জন্যে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করে দিতে চেয়েছিলাম। তিনি বললেন, চিন দেশে ভগবান বুদ্ধের বাণী প্রচার করবার উদ্দেশ্য নিয়ে ভারতবর্ষ থেকে এসেছেন। এখন কোনো কারণেই সেই পথ থেকে বিচ্যুত হতে পারেন না। অবশ্য তঁার প্রধান দুই শিষ্যকে এখানে রেখে যান।

‘তঁারা কোথায় ?’
‘দুর্ভাগ্যবশত দু-জনেই অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছেন।’
মনে মনে সতর্ক হলেন হিউ-এন-সাঙ। আগের সম্রাটদের মতো ইনিও যদি তঁাকে নিজের রাজ্যে ধরে রাখবার চেষ্টা করেন। তখন নিরস্ত করা কঠিন হবে। বললেন, আমার দুর্ভাগ্য সেই ভারতীয় সন্ন্যাসীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হল না। তাহলে এখানেই তাদের কাছে বৌদ্ধধর্মের পাঠ নিতে পারতাম। বৌদ্ধধর্ম বিষয়ে আমার জ্ঞান একান্তই কম।
সম্রাট বললেন, আপনি এখানে বিশ্রাম নিন। আমি কাল শিকারে বার হব। দু- চার দিনের মধ্যেই ফিরে আসব। তখন আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে।
নিজের তঁাবুতে ফিরে এলেন হিউ-এন-সাঙ। সবকিছুই কেমন আশ্চর্য লাগছিল— যেদিন স্বদেশ থেকে বার হয়েছিলেন সম্পূর্ণ একা, সবকিছুই ছিল অনিশ্চিত। সহায় সম্বল কিছুই ছিল না। প্রতি মুহূর্তে শঙ্কা যদি চিন সম্রাটের কোনো অনুচরের হাতে ধরা পড়েন তঁাকে আবার দেশে ফিরে যেতে হবে। ভগবান তথাগতের করুণায় সবকিছুই নির্বিঘ্নে পার হয়ে এসেছেন।
চার দিন পর শিকার শেষ করে ফিরে এলেন সম্রাট। তারপরই ডাক দিলেন হিউ-এন-সাঙকে।
তঁাবুতে নিজের আসনে বসেছিলেন সম্রাট। হিউ-এন-সাঙকে দেখামাত্রই বললেন, আসন গ্রহণ করুন মহামান্য ধর্মগুরু। আজ আমার দরবারে কয়েক জন বিদেিশ দূত এসেছেন, আমার সৈন্যাধ্যক্ষ ও মন্ত্রীরাও এসেছেন। সকলেই আপনার অভিজ্ঞতার কথা শোনবার জন্যে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে।
সংক্ষেপে নিজের যাত্রাপথের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা বললেন হিউ-এন-সাঙ। সকলেই গভীর মনোযোগের সঙ্গে তঁার কথা শোনেন।
তঁার কথা শেষ হতেই সম্রাট বললেন, ধর্মগুরু বিদেশি অতিথিদের সম্মানে আমরা কিছু অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি। আপনি অনুমতি দিন। তারপর আপনার কাছে ভগবান বুদ্ধের কথা শুনব।
হিউ-এন-সাঙ মৃদুস্বরে বললেন, সম্রাটের ইচ্ছাই পূর্ণ হোক।
সম্রাট ইঙ্গিত করতেই কয়েক জন বাজনদার তঁাবুর মধ্যে প্রবেশ করল। হাতে বিচিত্র ধরনের বাদ্যযন্ত্র।
সম্রাট সকলকে বসতে বললেন। বাজনদাররা বাজনা বাজাতে শুরু করল। সৈন্যরা রঙিন গোলাসে মদ নিয়ে আসতে থাকে। বিদেশি অতিথিদের সঙ্গে সম্রাটও মদ পান করতে আরম্ভ করলেন। অল্পক্ষণের মধ্যে সকলেরই মদের নেশা শুরু হল। কয়েক জনের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল, কে কত মদ খেতে পারে। বাজনদাররা আরও জোরে বাজনা বাজাতে আরম্ভ করল। সেই সুরগুলো চড়া মেজাজের হলেও শুনতে খারাপ লাগছিল না। মদ্যপান শেষ হতেই সম্রাটের অনুচরেরা অতিথিদের সামনে পাত্র-ভরতি ভেড়া আর গোরুর মাংস নিয়ে এল।
এতক্ষণ নীরবে বসে সবকিছু দেখছিলেন হিউ-এন-সাঙ। সামনে স্তূপাকার পশুমাংস দেখামাত্রই উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, সম্রাট আমাকে যাওয়ার অনুমতি দিন।
সম্রাট ইয়ারগু করজোড়ে বললেন, আমাকে মার্জনা করবেন ধর্মগুরু। আমার স্মরণে ছিল না ভগবান বুদ্ধের অনুগামীরা নিরামিষ খাদ্য গ্রহণ করেন। আমি সৈন্যাধ্যক্ষকে আদেশ দিচ্ছি আপনার জন্যে অন্য তঁাবুতে আহারের ব্যবস্থা করতে।
সৈন্যাধ্যক্ষের সঙ্গে অন্য একটি তঁাবুতে উঠে এলেন হিউ-এন-সাঙ। কাঠের একখানি আসন পাতা। এখানে আসার পর একটা বিষয় লক্ষ করেছিলেন হিউ-এন-সাঙ। সম্রাট বা তঁার অনুগামীরা কেউ কাঠের আসনে বসেন না, হিউ-এন-সাঙ বললেন, সেনাপতি একটা কথা জিজ্ঞাসা করব, আপনারা কেন কাঠের আসনে বসেন না ?
‘আমরা অগ্নির উপাসক। যার মধ্যে অগ্নির কোনো অস্তিত্ব রয়েছে তাকেই পুজো করি।’
‘কাঠের মধ্যে আগুনের অস্তিত্ব কোথায় ? সামান্য বিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন হিউ-এন-সাঙ।’
‘দুটি কাঠের ঘর্ষণে আগুন জ্বালানো যায়। তার অর্থ কাঠের মধ্যেই সূক্ষ্মভাবে আগুনের অস্তিত্ব রয়েছে।
আশ্চর্য লাগে হিউ-এন-সাঙ-এর। পৃথিবীতে কত মানুষ, কত বিশ্বাস।
দু-জন রাজ অনুচর দুধের পিঠা, সর, চিনি, মধু, মনাক্কা, ফল নিয়ে আসে। এবার পরিতৃপ্তির সঙ্গে আহার গ্রহণ করেন হিউ-এন-সাঙ। খানিক বিশ্রাম নিতেই আবার ডাক আসে সম্রাটের কাছ থেকে।
সেখানে ভোজনপর্ব শেষ হয়েছে। সম্রাট বললেন, মহামান্য ধর্মগুরু আমরা ভগবান বুদ্ধের বিষয়ে কিছু জানতে চাই।
‘বলুন কী জানতে চান ?’ জিজ্ঞাসা করলেন হিউ-এন-সাঙ।
‘আমি শুনেছি ভগবান বুদ্ধ বহু জন্ম ধরে পৃথিবীতে এসেছেন, একথা কি সত্য ?’
কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন হিউ-এন-সাঙ। তারপর বললেন, বুদ্ধদেব প্রায়ই তঁার শিষ্যদের নানান কাহিনি শোনাতেন। এই কাহিনির মধ্যে দিয়ে তাদের নীতিশিক্ষা দিতেন। তিনি বলতেন, তিনি অসংখ্য বার পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছেন, কখনো মানুষ, কখনো পশু, কখনো পাখি হয়ে। প্রত্যেক জন্মেই তিনি সৎ কাজ করেছেন। সেই সৎ কাজের সম্মিলিত সুফলেই আজ বুদ্ধত্ব অর্জন করেছেন।
একজন বললেন, ভগবান বুদ্ধের সেইসব কাহিনির মধ্যে থেকে কোনো একটি কাহিনি আমাদের শোনান।
হিউ-এন-সাঙ বললেন, আপনাদের যে-কাহিনি শোনাচ্ছি তার নাম কোয়েল কাহিনি। একদিন বুদ্ধদেব তঁার শিষ্যদের নিয়ে কোনো জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলেছেন। বেশ অনেকখানি জঙ্গলের পথ। মাঝামাঝি গিয়েছেন, এমন সময় তঁারা দেখলেন জঙ্গলের মধ্যে আগুন জ্বলে উঠেছে। অল্পক্ষণের মধ্যেই দেখতে দেখতে আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। পালাবার কোনো পথ নেই। যারা নবীন সন্ন্যাসী বা সবেমাত্র সন্ন্যাস নিয়েছে তারা সকলেই ভয়ে কাতর হয়ে পড়ল। এখন এই ভয়ংকর দাবানল থেকে কেমন করে রক্ষা পাবে! তারা বুদ্ধের সামনে এসে প্রার্থনা শুরু করল, প্রভু আপনি আমাদের রক্ষা করুন। বুদ্ধ কোনো জবাব দিলেন না। আগের মতোই সহজ স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে চললেন। ক্রমশই আগুন এগিয়ে আসছিল। বুদ্ধ বললেন, সকলে আমার পিছনে যাও। স্থির হয়ে দাঁড়ালেন বুদ্ধ। ভয়ংকর দাবানল উন্মত্তের মতো ছুটে এল তঁার দিকে। কিন্তু ভগবান বুদ্ধের সামনে এসেই জ্বলন্ত মশাল জলে ডোবালে যেমন তা নিভে যায়, তেমনি সেই দাবানল নিভে গেল এক মুহূর্তে। শিষ্যরা বিস্ময়ে হতবাক। সকলে একই সঙ্গে ভগবান বুদ্ধের জয়ধ্বনি করে ওঠে। বুদ্ধ বললেন, তোমরা আমার জয়ধ্বনি কোরো না। এ শক্তি আমার নয়। সকলে বলে ওঠে, আপনার শক্তির প্রভাবেই তো আগুন নিভে গেল। তিনি বললেন, এক কোয়েল পাখির বিশ্বাস থেকেই আমার মধ্যে এই শক্তি জন্ম নিয়েছে।
বুদ্ধের প্রধান শিষ্য আনন্দ বললেন, কেমন করে কোয়েল পাখির কাছ থেকে শক্তি পেয়েছেন আমাদের সে কাহিনি বলুন প্রভু।
বুদ্ধ বললেন, সে বহুদিন আগেকার কথা। এই বনে এক কোয়েল পরিবার ছিল। বাবা-মা আর তার ছোট্ট ছানা। সেই কোয়েলছানা তখনও উড়তে শেখেনি। একদিন হঠাৎ আগুন লাগল সেই বনে। আস্তে আস্তে দাবানলের মতো সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। কোয়েল পাখির বাসার কাছে আগুন এসে পৌঁছোতেই প্রাণ ভয়ে কোয়েলের বাবা-মা উড়ে চলে গেল। আশেপাশে আর যত পাখি ছিল তারাও উড়ে গেল।
এদিকে আগুন এগিয়ে এল সেই বাসার সামনে। কোয়েলছানা বুঝতে পারছিল এবার আগুনের শিখা এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে তার ওপর আর সেই আগুনে তাকে পুড়ে মরতে হবে। মৃত্যুর কথা মনে হতেই তার মধ্যে বিচিত্র ভাবনা জেগে ওঠে। সে তখন ভাবতে লাগল আমি ছোট্ট পাখি, ওড়বার শক্তি নেই, সবাই আমাকে ফেলে চলে গেল। এই অসহায় অবস্থায় কে আমাকে রক্ষা করবে! শুধু আমাকে নয়, আমার মতো আরও যেসব অসহায় শিশুরা রয়েছে তাদের সকলকে রক্ষা করবে। হে পরম শক্তিমান তুমি পরম সত্য। তুমি রয়েছ আমার অন্তরে। আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। যদি আমার বিশ্বাসের শক্তি থাকে, তবে সেই শক্তিতে শুধু নিজেকে নয় সকলকে রক্ষা করব।
কোয়েল শাবক তখন নিজের সমস্ত শক্তিকে একাত্ম করে প্রার্থনা করতে আরম্ভ করল।
আমি এক পক্ষীশাবক।
ডানা আছে, ক্ষমতা নেই ওড়বার।
পা আছে, ক্ষমতা নেই চলবার।
হে আগুন তুমি স্তব্ধ হও।
আর এগিয়ো না।
কোয়েলের সেই প্রার্থনার শক্তিতে কেঁপে উঠল প্রকৃতি। থমকে গেল আগুনের শিখা। একটু একটু করে নিভে গেল সেই আগুন। কোয়েলের সেই বিশ্বাসের শক্তি যদি কারও মধ্যে জেগে ওঠে, তবে তার সামনে সেই আগুন নিভে যাবে।
এই কাহিনি শেষ করে বুদ্ধ বললেন, সেইজন্মে আমি ছিলাম কোয়েল।
কোয়েলের সেই কাহিনি বলে নীরব হলেন হিউ-এন-সাঙ। সম্রাটের দরবারের সকলেই মন দিয়ে সেই কাহিনি শুনছিলেন।
এবার সম্রাট বললেন, ধর্মগুরু আমরা আপনার কাছে ভগবান বুদ্ধের ধর্ম প্রসঙ্গে আরও কথা জানতে চাই। আপনি বলুন।
কয়েক দিন সেখানে রয়ে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। প্রতিদিন সেখানে বুদ্ধের অষ্টমার্গ, অহিংসা পারমিতা ও মোক্ষলাভের উপায় সম্বন্ধে উপদেশ দিতেন। উপদেশ শেষে সম্রাট দু-হাত তুলে সাষ্টাঙ্গে নত হতেন আর বলতেন ধর্মগুরুর জয় হোক।
দেখতে দেখতে সাত দিন কেটে গেল। হিউ-এন-সাঙ বললেন, মহামান্য সম্রাট এবার আমাকে যাওয়ার অনুমতি দিন। ভারতবর্ষে যাওয়ার জন্যে আমার সমস্ত মনপ্রাণ ব্যাকুল হয়ে উঠেছে।
তুরফানের রাজার মতো সম্রাট ইয়ারগু মনে মনে স্থির করে রেখেছিলেন হিউ-এন-সাঙকে ধর্মগুরু হিসেবেই স্থায়ীভাবে নিজের রাজ্যে রেখে দেবেন। বললেন, ধর্মগুরু আপনি ভারতবর্ষে যাবেন না। আমি শুনেছি সেখানকার আবহাওয়া খুবই খারাপ। শীত-গ্রীষ্মের কোনো তফাত নেই। সে-দেশের মানুষজন খুবই কষ্টের মধ্যে বাস করে। তা ছাড়া অধিকাংশ মেয়ে-পুরুষ কোনো পোশাক পরে না। কালো কালো ভূতের মতো চেহারা, সভ্যতা-ভদ্রতা জানে না। তারা আপনার মতো মহাজ্ঞানী মানুষের সঙ্গে মেশবার উপযুক্ত নয়।
হিউ-এন-সাঙ সম্রাটের মনের ভাবটুকু বুঝতে পেরে বললেন, আমি ভারতের সাধারণ মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার জন্যে যাচ্ছি না। আমি যাচ্ছি সেখানে ভগবান বুদ্ধের আদর্শ ধর্ম সম্বন্ধে জ্ঞানলাভ করতে। আমি দেখতে চাই সেইসব পবিত্র তীর্থ, যেখানে একদিন ভগবান বুদ্ধের পদচিহ্ন পড়েছিল। আপনি আমাকে বাধা দেবেন না সম্রাট।
সম্রাট অনুভব করলেন হিউ-এন-সাঙ-এর আন্তরিকতা। বললেন, আমি আপনার যাত্রার সব ব্যবস্থা করছি। আপনার সঙ্গে আমার কয়েক জন অনুচর যাবে, তারা আমার আদেশপত্র নিয়ে যাবে, পথে যেন কোথাও আপনার কোনো অসুবিধে না হয়।
আবার যাত্রা শুরু হল। এবার পশ্চিমে। মাঝে মাঝে চড়াই-উতরাই হলেও প্রায় সমতল পথ। আবহাওয়া বড়ো মনোরম। কয়েক দিন চলবার পর তঁারা এসে পড়লেন বিরাট এক নদীর তীরে; চারদিকে নদীর শাখা-প্রশাখা। মাঝে মাঝে জঙ্গল, বিরাট বিরাট গাছ ছায়া মেলে রয়েছে মাটিতে। মাঝে মাঝেই চোখে পড়ছিল হরিণের পাল আপন মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মানুষ দেখেও তাদের মধ্যে ভয়ের কোনো চিহ্ন নেই। অনেক হরিণের গলায় ঘণ্টা বাঁধা। টুং টুং করে শব্দ হচ্ছে।
আশ্চর্য লাগছিল হিউ-এন-সাঙ-এর। জিজ্ঞাসা করলেন হরিণের গলায় ঘণ্টা বাঁধল কে ?
সম্রাটের এক অনুচর জবাব দেয়, সম্রাটের আদেশে হরিণদের গলায় ঘণ্টা বাঁধা হয়েছে। তঁার হুকুম এই জঙ্গলে কেউ কোনো শিকার করতে পারবে না। কোনো প্রাণী হত্যা করলে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। সেইজন্যে কেউ এখানে এসে পশুপাখিদের বিরক্ত করে না, ওরাও নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ায়।
ভালো লাগছিল হিউ-এন-সাঙ-এর। মনে হল ভগবান বুদ্ধের অহিংসা মন্ত্রের এই পূর্ণরূপ যদি বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ত তাহলে হয়তো পৃথিবীটা স্বর্গরাজ্য হয়ে যেত। শুধু লোভ আর লালসাই সমস্ত মানুষের মনকে কলুষিত করে তুলেছে। কে জানে কবে এর থেকে মুক্তি পাবে মানুষ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন