মগধ

চঞ্চলকুমার ঘোষ

বৈদিক যুগে ভারতবর্ষ জুড়ে ছিল অসংখ্য ছোটো ছোটো রাজ্য। তাদের মধ্যে কোনো ঐক্য ছিল না। সর্বমোট ষোলোটি রাজ্য ছিল। এদের বলা হতো মহাজনপদ। পরবর্তীকালে এদের মধ্যে প্রধান হয়ে ওঠে মগধ। ষোলোটি রাজ্যের বেশিরভাগই মগধের অন্তর্ভুক্ত হয়। ভারত ইতিহাসে মগধ এক অতুলনীয় গৌরব অর্জন করেছিল। প্রাচীন ভারতের যা-কিছু শ্রেষ্ঠত্ব তার সঙ্গে একাত্ম হয়ে রয়েছে এই মগধ। বলা হয় মগধের রাজা ছিলেন বিম্বিসার। তিনি মাত্র পনেরো বছর বয়সে মগধের সিংহাসনে বসেন। তঁার রাজত্বকালে মহাবীর ও গৌতম বুদ্ধ মগধে ধর্মপ্রচার করেন। মহারাজ বিম্বিসার দুই ধর্মের প্রতিই ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। তবে সম্ভবত তিনি ছিলেন ভগবান বুদ্ধের ধর্মমতের অনুগামী। তঁার রাজধানী ছিল রাজগৃহ। বিম্বিসারের মৃত্যুর পর রাজা হন তঁার পুত্র অজাতশত্রু। কারও কারও মতে তিনি পিতাকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেন। তার সময়ে মগধ আর্যাবর্তের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। অজাতশত্রু প্রথমজীবনে ছিলেন প্রবল বৌদ্ধ বিদ্বেষী। প্রচলিত আছে একবার তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাঁচবার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। ক্রমশই তঁার মধ্যে মৃত্যুভয় জেগে উঠতে থাকে। যখন সব চিকিৎসাই ব্যর্থ হয়ে যায় তখন ভগবান বুদ্ধের অনুরোধে মহান চিকিৎসক জীবক অজাতশত্রুর চিকিৎসার দায়িত্বভার নিলেন। অল্পদিনেই সুস্থ হয়ে উঠলেন অজাতশত্রু। এইসময় থেকেই তঁার মধ্যে পিতাকে হত্যা করবার জন্যে শুরু হয় গভীর এক অনুশোচনা। জীবক তঁাকে নিয়ে যান বুদ্ধের কাছে। বুদ্ধের সাহচর্যে এসেই মানসিক পরিবর্তন শুরু হয়ে যায় অজাতশত্রুর। বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি হয়ে উঠলেন গভীর অনুরাগী। পরে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হন। তঁার রাজত্বকালে রাজগৃহে বহু বৌদ্ধ বিহার, চৈত্য প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই সময়ে তিনি নানান যুদ্ধবিগ্রহে জড়িয়ে পড়েন। সব যুদ্ধে জয়ী হয়ে বিরাট এক রাজত্ব গড়ে তোলেন। তখন মগধের রাজধানী ছিল রাজগৃহ। রাজগৃহ নিরাপত্তার দিক থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ নয় ভেবেই গঙ্গা ও শোন নদীর মাঝে পাটলি নামে এক গ্রামে দুর্গের কাজ শুরু করলেন। উদ্দেশ্য ভবিষ্যতে এখানেই রাজধানী স্থানান্তর করবেন। দুই নদীর সঙ্গম হওয়ায় এখানে নিরাপত্তা ছাড়াও কৃষি সেচ পরিবহণেরও সুবিধা বেশি ছিল।

অজাতশত্রুর মৃত্যুর পর তঁার পুত্র উদয়ি (Udayi) পাটলিপুত্র নগরের প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি রাজগৃহ থেকে রাজধানী নিয়ে এলেন পাটলিপুত্রে। (এই পাটলিপুত্রই আজকের পাটনা)। ভিন্ন মতে এখানে প্রচুর পাটলি গাছ ছিল, তার থেকে নগরের নাম হয় পাটলিপুত্র।

এরপর কয়েক-শো বছর ধরে বিভিন্ন রাজবংশ ওইখানে রাজত্ব করেন। সম্রাট আলেকজান্ডার যখন ভারত আক্রমণ করেন তখন মগধের রাজা ছিলেন ধনানন্দ। গ্রিক লেখকদের বিবরণ অনুসারে ধনানন্দের বিরাট এক সৈন্যবাহিনীতে ছিল দু-লক্ষ পদাতিক, কুড়ি হাজার অশ্বারোহী, দু-হাজার হাতি। সম্ভবত বিরাট এই সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত ছিলেন না আলেকজান্ডার। শক্তিশালী রাজ্য গড়ে তুললেও রাজা হিসেবে ধনানন্দ ছিলেন অত্যাচারী। তঁার বিরুদ্ধে গোটা রাজ্যে অসন্তোষ জেগে ওঠে। তারই সুযোগ নিয়ে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য তক্ষশিলার মহাপণ্ডিত ব্রাহ্মণ চাণক্যের সাহায্য নিয়ে ধনানন্দকে হত্যা করে মগধের সিংহাসন দখল করলেন। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যর নাম থেকেই তঁার বংশের নাম হল মৌর্যবংশ। চন্দ্রগুপ্ত সমস্ত ভারতবর্ষ জুড়ে রাজ্য স্থাপন করেন। এই সময় গ্রিক পর্যটক মেগাস্থিনিস ভারতে এসেছিলেন। তঁার বিবরণ থেকে জানা যায়, চন্দ্রগুপ্তের সময়ে মগধ ছিল ভারতের বৃহত্তম রাজ্য। গঙ্গা ও শোন নদীর সঙ্গমস্থলে পাটলিপুত্র এই রাজ্যের রাজধানী ছিল। পাটলিপুত্র সমস্ত ভারতের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো নগর। এর দৈর্ঘ্য নয় মাইল ও প্রস্থ দু-মাইল। নগরের চারদিকে ছিল উঁচু পাঁচিল। পাঁচিলের বাইরে গভীর পরিখা। পঁাচিলের গায়ে মোট চৌষট্টিটি তোরণ আর পাঁচশো গম্বুজ ছিল। রাজপ্রাসাদ ছিল যেমন বিশাল তেমনই কারুকার্যময়। এখানকার শাসনব্যবস্থা ছিল খুব উন্নত। চন্দ্রগুপ্তের পুত্র ছিলেন বিন্দুসার। বিন্দুসারের পর মগধ সাম্রাজ্যের সম্রাট হন অশোক। সম্রাট অশোক শুধু ভারতবর্ষের নন বিশ্বের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ নরপতি। তঁার আমলে পাটলিপুত্রের অতুলনীয় সমৃদ্ধি ঘটে।

হিউ-এন-সাঙ পাটলিপুত্রে আসেন সম্ভবত ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দের ২০ ফেব্রুয়ারি। তিনি পাটলিপুত্রে সাত দিন ছিলেন। এখানে তখন পঞ্চাশটির বেশি বৌদ্ধ বিহার ছিল। সেখানে দশ হাজার ভিক্ষু শ্রমণ বাস করতেন। তঁারা সকলেই ছিলেন মহাযানপন্থী। গঙ্গার উত্তর তীরে ছিল প্রাচীন নগরের ধ্বংসাবশেষ। সেখানে কয়েক হাজার মানুষ বসবাস করতেন। তারই মধ্যে রয়েছে প্রাচীন নগরের কিছু চিহ্ন। সেগুলি ধ্বংসের পরেও লোকেদের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল ছিল এগুলি কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে তৈরি করা অসম্ভব, কোনো দানব বা অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন মানুষের সৃষ্টি।

সেখানে অদ্ভুত আকারের একটি বিরাট স্তম্ভ ছিল। স্তম্ভটির বিচিত্র আকার দেখে কৌতূহলী হয়ে ওঠেন হিউ-এন-সাঙ। তঁাকে ঘিরে স্থানীয় কিছু বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। সকলেই হিউ-এন-সাঙ-এর সঙ্গী। তঁাদের মধ্যে একজন বললেন, এখানে সম্রাট অশোকের কারাগার ছিল। লোকে বলত অশোকের নরক।

‘এমন অদ্ভুত নাম হওয়ার কারণ কী ?’ জিজ্ঞাসা করলেন হিউ-এন-সাঙ।

সন্ন্যাসী বললেন, সে এক আশ্চর্য কাহিনি। সম্রাট অশোক প্রথম জীবনে ছিলেন ভীষণ অত্যাচারী। যারাই তঁার বিরোধিতা করত তাদের যন্ত্রণা দেবার জন্যে বিরাট এক কারাগার তৈরি করলেন। সেখানে অত্যাচারের নানানরকম ব্যবস্থা ছিল। তাদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল বিরাট এক চুল্লি। সেই চুল্লির মধ্যে সবসময় আগুন জ্বলত এবং সেই চুল্লির উপর বিরাট এক লোহার কড়াই বসানো থাকত। সেই কড়াইয়ের মধ্যে গলিত ধাতু টগবগ করে ফুটত। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদের সেই কড়াই-এর মধ্যে ফেলে দেওয়া হতো। সম্রাট অশোক আদেশ দিলেন যে এই কারাগারে আসবে তাকেই এই গলিত ধাতুর মধ্যে ফেলে দিতে হবে। ফলে বহু নিরপরাধী মানুষের মৃত্যু হত। একদিন এক বৌদ্ধ শ্রমণ এখানে এসেছিলেন। রক্ষী তঁাকে দেখতে পেয়ে বন্দি করে নিয়ে এল। রক্ষী যখন তঁাকে কড়াইতে নিক্ষেপ করতে যাবে তিনি অন্তিম প্রার্থনা করবার জন্যে কিছু সময় চেয়ে নিলেন। যখন তিনি প্রার্থনা করছেন হঠাৎ এক কাতর আর্তনাদে চমকে উঠলেন। দেখলেন এক পথিককে রক্ষীরা বন্দি করে নিয়ে এসেছে। সেই অগ্নিচুল্লির সামনে নিয়ে এসে তার হাত-পা কেটে তাকে খণ্ড খণ্ড করে ফেলা হল। তারপর সেই খণ্ড-বিখণ্ড দেহ জ্বলন্ত কড়াইয়ে ফেলে দেওয়া হল। সেই দৃশ্য দেখে নিজের জন্যে এতটুকু ভয় অনুভব করলেন না সন্ন্যাসী। পথিকের জন্যে তঁার সমস্ত অন্তর করুণায় পূর্ণ হয়ে গেল। তিনি অনুভব করলেন জীবন-মৃত্যুর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এই জগতে সবই অনিত্য। এতদিন যা ছিল শুধু জ্ঞানের মধ্যে, এবার তা হল অনুভবের মধ্যে। মুহূর্তে তিনি অর্হৎ পদ লাভ করলেন। জীবন-মরণের সূক্ষ্ম সীমারেখা মুছে গেল তঁার অন্তর জগতে। তিনি তখন নিজেই গিয়ে বসলেন সেই জলন্ত কড়াইয়ের মধ্যে। রক্ষীরা বিস্ময়ে দেখল সেই উতপ্ত কড়াই পলকে শীতল হয়ে গেল। চুল্লির আগুন স্পর্শও করেনি সন্ন্যাসীকে। তারা তখনই সংবাদ পাঠাল সম্রাট অশোকের কাছে। এলেন অশোক। সবকিছু দেখে তিনি যখন প্রাসাদের দিকে ফিরে চলেছেন তঁার পথরোধ করে দাঁড়াল রক্ষী। বলল, মহারাজ আপনাকে এবার মরতে হবে।

বিস্মিত অশোক বললেন, আমাকে কেন মরতে হবে ? রক্ষী বলল, আপনার আদেশ যে এখানে আসবে তাকেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। সম্রাট এলে তঁার ক্ষেত্রেও সেই আদেশ মানা হবে না এমন কোনো কথা তো ছিল না।

সম্রাট তৎক্ষণাৎ বললেন, তাহলে রক্ষী এখানে বহুদিন ধরে রয়েছে। সে তো আমার আদেশ থেকে মুক্তি পেতে পারে না। সৈন্যদের হুকুম দিলেন রক্ষীকে জ্বলন্ত কড়াই-এর মধ্যে নিক্ষেপ করা হোক।

নির্দেশ পালন হতেই সম্রাট অশোকের মধ্যে এক পরির্বতন হল। তিনি সেই কারাগার ধ্বংস করে চিরদিনের জন্যে নরহত্যা বন্ধ করে দিলেন।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, ভগবান তথাগতের করুণার ধারা নেমে এসেছিল সম্রাট অশোকের উপর।

সন্ন্যাসী বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন ধর্মগুরু। পৃথিবীর সকল রাজা-মহারাজা সম্রাটরা চিরদিন যুদ্ধ করেন। নরহত্যা করেন। ভোগবিলাসে দিনযাপন করেন। তঁারা সাধারণ মানুষের চেয়ে নিজেদের সুখের ভাবনাতেই সব অর্থ ব্যয় করেন। আর সম্রাট অশোক কলিঙ্গ যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে এমনই বিভ্রান্ত হলেন যে চণ্ডাশোক থেকে হয়ে গেলেন ধর্মাশোক।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, শুনেছি বৌদ্ধ সন্ন্যাসী উপগুপ্তই তঁাকে ধর্মপথে নিয়ে আসেন ?

একজন প্রবীণ সন্ন্যাসী বললেন, সন্ন্যাসী উপগুপ্তের সঙ্গে সাক্ষাতের আগেই তঁার মধ্যে পরিবর্তন ঘটে গিয়েছিল। রাজ্য-অভিষেকের আট বছর পর তিনি কলিঙ্গ আক্রমণ করেন। কলিঙ্গ যুদ্ধে বহু মানুষ মারা যায়। শোনা যায় যুদ্ধ জয়ের পর তিনি যখন যুদ্ধস্থল পরিদর্শন করছেন তখন প্রিয়জনকে হারিয়ে শত শত নারী শিশুর কান্না শুনতে শুনতে অশোকের হৃদয় গভীর অনুতাপে পূর্ণ হয়ে গেল। তিনি শপথ করলেন আর যুদ্ধ করবেন না। এই ঘটনার পর তিনি বৌদ্ধ সন্ন্যাসী উপগুপ্তের কাছে দীক্ষা নেন। একদিন উপগুপ্তকে জিজ্ঞাসা করলেন, সর্বশ্রেষ্ঠ দান কী ?

সন্ন্যাসী উপগুপ্ত বললেন, সর্বশ্রেষ্ঠ দান ধর্মদান। একমাত্র ধর্মের আলোতেই মানুষের অন্তর আলোকিত হয়ে ওঠে। তুমি সেই ধর্মদান করো। গুরুর আদেশ নতমস্তকে মেনে নেন সম্রাট অশোক। তঁার অনুপ্রেরণায় ভারতবর্ষের দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল বৌদ্ধ ধর্মের সুমহান বাণী। অশোকের মধ্যে ছিল না কোনো ধর্মীয় গোঁড়ামি। তিনি কোনো আচার-অনুষ্ঠান আড়ম্বরেও বিশ্বাস করতেন না। তিনি ধর্মের নামে যে সব নির্দেশ দিতেন তা চিরকালের মানবসত্য; সব ধর্মের, সব বর্ণের মানুষের ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য। যে অনুশাসনগুলিকে তিনি ধর্মের অঙ্গ হিসেবে প্রচার করেছেন তার মধ্যে রয়েছে_

১. যথাসম্ভব পাপ পরিহার করবে। ২. পরোপকারে ব্রতী হবে। ৩. প্রত্যেককে দয়া করবে। ৪. সামর্থ্য অনুসারে দান করবে। ৫. সদা সত্য কথা বলবে। ৬. সর্বদা শুচিতা রক্ষা করবে। ৭. প্রত্যেকের প্রতি বিনীতভাবে প্রকাশ করবে। ৮. সাধু স্বভাব অর্জনের জন্যে চেষ্টা করবে। ৯. অন্তর থেকে হিংসা দ্বেষ দূর করবে। ১০. সংযমী জীবনযাপন করবে। ১১. যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু ব্যয় করবে। ১২. মাতা-পিতা, উচ্চপদস্থ ব্যক্তি, গুরুজনের প্রতি বাধ্য থাকবে। ১৩. অপ্রয়োজনীয় ব্যয় করবে না। ১৪. জীবহিংসা ও জীবহত্যা করবে না।

সম্রাট অশোক তঁার এই অনুশাসনগুলি শুধু প্রচার করেই নিজের কর্তব্য শেষ করেননি। এগুলি যাতে যুগ যুগ ধরে মানুষ জানতে পারে, এর থেকে শিক্ষালাভ করতে পারে সে জন্যে পাথরের গায়ে তা উৎকীর্ণ করে রেখেছিলেন। এই অনুশাসনগুলি যে শুধু মানুষের মঙ্গলের জন্যে প্রচার করা হয়েছিল তাই নয়, পশুপাখি জীবজন্তুদের রক্ষার জন্যেও করা হয়েছিল। এই শিলালিপিগুলিতে প্রাকৃত ভাষা ব্যবহার করা হত। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে এই অনুশাসনগুলি পাওয়া গিয়েছে।

শুধু ভারতবর্ষ নয় সম্রাট অশোক ভগবান বুদ্ধের বাণীকে ছড়িয়ে দিয়েছেন ভারতের বাইরেও। তঁার মনে হল সকল মানুষই আলো পাওয়ার অধিকারী। তারই জন্যে একদিন নিজের পুত্রদের ডেকে পাঠিয়ে বললেন, তোমাদের মধ্যে কে যাবে প্রতিবেশী দেশ সিংহলে ?

সকলে নীরব। এগিয়ে এলেন যুবরাজ মহেন্দ্র। বললেন, আমি যাব পিতা।

আনন্দে সম্রাট অশোকের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। রাজবেশ ত্যাগ করলেন মহেন্দ্র, মুণ্ডিত মস্তক হলেন। দেহে তুলে নিলেন পীত বসন, ভিক্ষাপাত্র। একদিন পাটলিপুত্রের মহেন্দ্র ঘাট থেকে তঁারা রওনা হলেন সিংহলের দিকে। সেইসময় সিংহলের রাজা ছিলেন তিষ্য। তঁার রাজসভায় গিয়ে দাঁড়ালেন পাঁচ জন। রাজা বিস্মিত কোথা থেকে এল এই পাঁচ সৌম্যদর্শন ভিক্ষু! মহেন্দ্র নিজের পরিচয় দিতেই চমকে উঠলেন তিষ্য। ভারত সম্রাটের পুত্র, যিনি হতে পারতেন আগামী দিনের ভারত সম্রাট, তিনি সব কিছু তুচ্ছ করে ভিক্ষাপাত্র তুলে নিয়েছেন। শ্রদ্ধায় তঁার মাথা নত হয়ে গেল। তিনি বললেন, আমি ভগবান বুদ্ধের মহান ধর্ম গ্রহণ করব। শুধু রাজা তিষ্য নন, রাজপ্রাসাদের সকলেই বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করলেন। রাজপ্রাসাদের নারীরাও এগিয়ে এসে বললেন, শুধু পুরুষরা কেন ভগবান বুদ্ধের আশীর্বাদ পাবেন। আমরাও সেই ধর্মপথ অনুসরণ করতে চাই।

সম্রাট অশোকের কাছে সংবাদ পাঠালেন মহেন্দ্র। এবার এগিয়ে এলেন কন্যা সংঘমিত্রা। বললেন, পিতা, আমিও দাদার সঙ্গে সিংহলে ধর্মপ্রচার করব।

সিংহলে গেলেন সংঘমিত্রা। তঁার পরম ত্যাগের বেশভূষা, মুখমণ্ডলের পবিত্রতা দেখে মুগ্ধ সিংহলের মানুষ। কয়েক বছরের মধ্যেই সমস্ত সিংহলবাসী বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নিল। শুধু সিংহল নয়। আরও বহু দেশে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করাবার জন্যে লোক পাঠালেন অশোক। তিনি চেয়েছিলেন বুদ্ধের অহিংসা আর প্রেমের বাণী বিশ্বের সকল মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক। শোনা যায় তঁার দূত পশ্চিম এশিয়ায় এমনকী সুদূর মিশর ও গ্রিস দেশেও গিয়েছিল ধর্মপ্রচার করবার জন্যে।

তঁার সময়ে ব্রাহ্মণরা বৌদ্ধ ধর্মের এই প্রচার প্রসারকে মেনে নিতে পারেননি। তা ছাড়া অশোকের এক রানিও বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন না। তঁারা যড়যন্ত্র করতে আরম্ভ করলেন। প্রথমে রাজা অশোক কিছুই জানতেন না। পরে যখন জানতে পারলেন প্রচণ্ড ব্যথিত হলেন অশোক। যে-আদর্শকে তিনি এতদিন প্রচার করছেন আজ পরিবারের মানুষরাই তার বিরোধিতা করছে। মনের দুঃখে রাজসিংহাসন ত্যাগ করে বৌদ্ধ বিহারে আশ্রয় নিলেন। অশোকের অবর্তমানে সিংহাসনে বসলেন তঁার নাতি সম্পতি। তিনি বৌদ্ধধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন না। সম্রাটের আমলে ধর্মপ্রচারের জন্যে, নাগরিকদের কল্যাণে যে ব্যয় করা হত তা কমিয়ে দিলেন। ভোগবিলাস বাড়তে লাগল। এই সময়ে বৌদ্ধ বিহারে এক ধর্ম সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে বহু সন্ন্যাসীর সমাগম হল। এতদিন প্রতিটি ধর্ম সম্মেলনের ব্যয়ভার বহন করেছেন সম্রাট অশোক। তাই তিনি পৌত্র সম্পতির কাছে পত্র পাঠালেন অর্থের জন্যে। সম্পতি উত্তর পাঠালেন রাজকোষ শূন্য, কোনো অর্থ পাঠানো সম্ভব নয়। পৌত্রের কাছে এই উত্তর আশা করেননি অশোক। এতদিন তিনি ছিলেন ভারতের সম্রাট। আজ তিনি রিক্ত। বুঝতে পারলেন পৃথিবীতে তঁার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। এবার বিদায় নিতে হবে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন মহামতি অশোক।

মুগ্ধবিস্ময়ে সম্রাট অশোকের কথা শুনছিলেন হিউ-এন-সাঙ। গভীর এক আবেগে বললেন, ভারতে এসে একটি কথাই আমার বারংবার মনে হয়, আবার যদি সম্রাট অশোকের মতো মহানুভব একজন সম্রাট জন্ম নিতেন...।

একজন প্রবীণ সন্ন্যাসী বললেন, তথাগতের ইচ্ছা হলে সবই সম্ভব। আসুন ধর্মগুরু আপনাকে ভগবান তথাগতের পবিত্র স্মৃতি দর্শন করাই।

সামান্য দূরেই একটি স্তূপ। তার উপরে অর্ধভগ্ন একটি গম্বুজ। তার পাশেই মন্দির আকারের একটি কক্ষ। তার সামনে গিয়ে সকলে কিছুক্ষণ নতমস্তকে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর প্রবীণ সন্ন্যাসী বললেন, আসুন ধর্মগুরু। এখানে রয়েছে ভগবান তথাগতের পবিত্র পদচিহ্ন।

বুকের মধ্যে অনুরণন। ধীরে কক্ষের মধ্যে প্রবেশ করলেন হিউ-এন-সাঙ। খোলা দরজা দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়েছে। কোথাও অন্ধকার নেই। প্রথমেই হিউ-এন-সাঙ-এর দৃষ্টি পড়ল কক্ষের মাঝখানে কয়েক হাত লম্বা একটি পাথর খণ্ডের প্রতি। তার উপর স্পষ্ট চোখে পড়ছে পায়ের চিহ্ন। প্রায় দেড় ফুট লম্বা ছয় ইঞ্চি প্রস্থ। সন্ন্যাসীরা সকলেই সেই পায়ের চিহ্নের উপর মাথা ঠেকালেন। কয়েক জন অস্ফুট স্বরে মন্ত্রধ্বনি করেন।

হিউ-এন-সাঙ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন সেই পদচিহ্নের উপর। তারপর ধীরে ধীরে নত হয়ে তার উপর মাথা ঠেকালেন। তার দুই চোখ বেয়ে অশ্রুধারা ঝরে পড়ে। অল্পক্ষণ পর মুখ তুলে পোশাকের মধ্যে থেকে একটুকরো কাপড় বার করে সেই পদচিহ্ন পরিষ্কার করলেন।

সন্ন্যাসীরা সকলেই স্থির। হিউ-এন-সাঙ জিজ্ঞাসা করলেন, ভগবান বুদ্ধ কি পাটলিপুত্রে এসেছিলেন ?

প্রবীণ সন্ন্যাসী বললেন, ভগবান বুদ্ধের সময়ে পাটলিপুত্র বলে কোনো নগর ছিল না। তখন এখানে ছিল ছোটো একটি গ্রাম। মনে হয় ভগবান তথাগত চলেছিলেন বৈশালীর দিকে। চলতে চলতে এখানে এসে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। যাওয়ার সময় তিনি এই পাথরখণ্ডের উপর এসে দাঁড়িয়ে পিছনে মুখ ফিরিয়ে কিছু দেখতেই তঁার সঙ্গী আনন্দ জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কী দেখছেন প্রভু?

ভগবান বুদ্ধ বললেন, এখান থেকে শেষ বারের মতো রাজগৃহ দর্শন করলাম। আর কোনোদিন এই পথে আসা হবে না।

আনন্দ বললেন, কেন প্রভু ?

কোনো জবাব দিলেন না বুদ্ধ। নিঃশব্দে এগিয়ে গেলেন সামনের দিকে। কারণ তিনি জানতেন এবার তঁার যাত্রা মহাপরিনির্বাণের দিকে।

হিউ-এন-সাঙ স্থির নির্বাক হয়ে ছিলেন। একটি প্রশ্ন তঁার মনকে বিব্রত করছিল। জানেন কোনো মানুষের পদচিহ্ন এত বিশাল হয় না। মৃদুস্বরে প্রশ্ন করলেন, এই পায়ের চিহ্ন তো স্বাভাবিক নয়।

প্রবীণ সন্ন্যাসী বললেন, যে-মহান শিল্পী এই পদচিহ্ন খোদাই করছেন তঁার কল্পনায় ভগবান বুদ্ধ কোনো সাধারণ মানব নন, তিনি মহামানব। সকলের চেয়ে স্বতন্ত্র। সমস্ত কিছুতেই তিনি বিশাল, মহীয়ান। সেই বিরাটত্বের কল্পনাতেই এই পায়ের রূপ ফুটে উঠেছে।

হিউ-এন-সাঙ-এর মনে হল সন্ন্যাসী যথার্থই বলেছেন। বুদ্ধ তো মানব নন_তিনি মহামানব। নয়তো কেনই-বা তিনি বুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত স্থান দর্শনের জন্যে মৃত্যু কে তুচ্ছ করে সুদূর চিন থেকে ভারতবর্ষে আসবেন। একজন সন্ন্যাসী অল্প ফুল নিয়ে আসেন। পরম যত্নে সেই ফুল পদচিহ্নের উপর ছড়িয়ে দিলেন হিউ-এন-সাঙ।

সেখান থেকে সকলে বার হয়ে এলেন আমলক চৈত্যে। আমলক চ্যৈত্যের উত্তর-পশ্চিমে ঘণ্টা চৈত্য। সমস্তই প্রায় ধ্বংসস্তূপ। তারই মধ্যে সামান্য উঁচু একটি স্তম্ভ। হিউ-এন-সাঙ কিছু জিজ্ঞাসা করবার আগেই একজন শ্রমণ বললেন, দূর অতীতে এখানে কয়েক-শো সংঘারাম ছিল। সেখানে থাকতেন বহু জ্ঞানীগুণী ভিক্ষু। তঁাদের সঙ্গে স্থানীয় ভিন্ন ধর্মের মানুষরা যুক্তিতর্কে কখনোই জয়ী হত না। তাদের জ্ঞানও ছিল সামান্য। সেই কারণে তারা নিজেদেরকে প্রকাশ করত। না। ধীরে ধীরে বৌদ্ধ ধর্মের পতন হল। ভিন্ন ধর্মের মানুষদের পরাক্রম শুরু হল। তখন যেসব বৌদ্ধরা সংঘারামে থাকতেন তঁাদের মধ্যে জ্ঞানবিদ্যার চর্চা ছিল না বললেই চলে। তর্কযুদ্ধে বৌদ্ধরা পরাজিত হত। নতুন রাজার আদেশ চালু হল। বৌদ্ধ সংঘারামে ঘণ্টা বাজানো নিষিদ্ধ হল। সব কিছুই নীরবে মেনে নিলেন বৌদ্ধরা। এর পর দীর্ঘ বারো বছর কেটে গেল। একদিন হঠাৎ এক সংঘারামে ঘণ্টা বেজে উঠল। চারিদিকে সাড়া পড়ে গেল। হঠাৎ এতদিন পর সংঘারামে ঘণ্টার ধ্বনি ? ব্রাহ্মণরা ছুটে এল, কার এত সাহস!

সংঘারাম থেকে বেরিয়ে এলেন এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। বললেন, আমি ঘণ্টা বাজিয়েছি।

ব্রাহ্মণরা জিজ্ঞাসা করলেন, কে তুমি ? সন্ন্যাসী বললেন, আমি গুরু নাগার্জুনের শিষ্য আচার্যদেব। আমি আপনাদের সকলকে তর্কযুদ্ধে আহ্বান করছি। যদি আমাকে পরাজিত করতে পারেন আমি আমার ধর্ম ত্যাগ করে আপনাদের ধর্ম গ্রহণ করব। আর যদি আপনারা পরাজিত হন, আবার সংঘারামে ঘণ্টা বাজবে।

ব্রাহ্মণরা সম্মত হলেন। শুরু হল তর্কযুদ্ধ। শেষপর্যন্ত জয়ী হলেন আচার্যদেব। আবার সংঘারামে নিয়মিত ঘণ্টা বাজতে থাকে। এই ঘটনার স্মরণে পরবর্তীকালে মগধরাজ তৈরি করেন ঘণ্টাৈচত্য বিহার।

সকল অধ্যায়
১.
গভীর গহন এক রাত
২.
আলোর পথে
৩.
প্রথম সকাল
৪.
রাত্রি শেষ
৫.
যাত্রা হল শুরু
৬.
সীমান্ত পথ
৭.
মৃত্যু উপত্যকা
৮.
মরুদ্যান
৯.
হামি
১০.
তুরফান
১১.
কুচা
১২.
বরফের দেশে
১৩.
ইশিক কুল
১৪.
সমরখন্দ
১৫.
লৌহকপাট
১৬.
বামিয়ান
১৭.
গান্ধার
১৮.
ছায়াগুহা
১৯.
পুরুষপুর
২০.
তক্ষশীলা
২১.
কাশ্মীর
২২.
শাকল
২৩.
জলন্ধর থেকে কুলু
২৪.
মথুরা
২৫.
কান্যকুব্জ
২৬.
অযোধ্যা থেকে কৌশাম্বী
২৭.
প্রয়াগ
২৮.
শ্রাবস্তী
২৯.
কপিলাবস্তু
৩০.
লুম্বিনী
৩১.
কুশীনগর
৩২.
বারাণসী
৩৩.
সারনাথ
৩৪.
বৈশালী
৩৫.
মগধ
৩৬.
শীলভদ্র বিহার
৩৭.
গয়া
৩৮.
বুদ্ধগয়া
৩৯.
বোধিবৃক্ষ
৪০.
মহাভিক্ষুণী
৪১.
রাজগৃহ
৪২.
মানসলোক
৪৩.
নালন্দা
৪৪.
ভারত পরিক্রমা
৪৫.
আবার নালন্দা
৪৬.
শরণাগত

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%