প্রথম সকাল

চঞ্চলকুমার ঘোষ

ছোটো নদী। বছরের এই সময়টায় জল কম। এপার-ওপার িতর ছোড়া দূরত্ব। স্থানীয় লোকেরা বলে ওয়ে। ওয়ের কোল ঘেঁষে পাহাড়। তেমন উঁচু নয়। অল্প দূর গিয়ে পাহাড় যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে এসে মিশেছে জিং নদী। দুই নদী মিশে অনেকখানি চওড়া জলধারা। প্রতিদিন ভোরের প্রার্থনা শেষ করে মহাবোধি বিহার থেকে এই সংগমে আসেন হিউ-এন-সাঙ। দূরত্ব তেমন বেশি নয়। পথের ধারে দু-একটি েছাটো গ্রাম। শান্ত নির্জন পরিবেশ।

নদীর ধারে একটা পাথরের উপর বসে ছিলেন হিউ-এন-সাঙ। অনেক আগে সূর্য উঠলেও তেমন তাপ নেই। পুবদিকে মাটি থেকে আকাশ পর্যন্ত হালকা কুয়াশা। দূরের সব কিছুই অস্পষ্ট। নদীর ঘাটে বাঁধা একটা সাম্পান। ঢেউয়ের তালে তালে দুলছে। সামনে কয়েক হাত নীচে নদীর জল পাথরের গায়ে এসে ছপছপ করে আছড়ে পড়ছে। অবশ্য কোনো শব্দই স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলেন না হিউ-এন-সাঙ। একটা ভাবনা তঁার মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। ঝিরঝিরে বাতাসে তঁার পোশাকের প্রান্তটুকু কাঁপছিল।

কুয়াশার আড়াল থেকে একটু একটু করে সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ছিল দুই নদীর সংগমের প্রশস্ত জলরাশির ওপর। ওপারের গাছপালা এখন স্পষ্ট। দু-জন মানুষ নদীতে স্নান করছিলেন। তঁারা সাম্পানের মাঝি। স্নান সেরে ঘাটে উঠে আসেন। ভিজে চুল থেকে জল গড়িয়ে পড়ছিল।

একজন এগিয়ে এলেন হিউ-এন-সাঙ-এর কাছে। বয়স্ক মাঝি।

‘প্রণাম ভন্তে।’

মৃদুস্বরে হিউ-এন-সাঙ বললেন, ভগবান তথাগত আপনার মঙ্গল করুন। কয়েক দিন আপনাকে দেখিনি ?

‘আমার স্ত্রী অসুস্থ ছিলেন।’

‘এখন কেমন আছেন ?’

‘ভালো। একদিন আমাদের গ্রামে যাবেন ভন্তে ?’

‘যেতে পারি। তোমাকে আমার বড়ো ভালো লাগে। বড়ো চমৎকার তোমার জীবন। সারাদিন নদীর বুকে ঘুরে বেড়াও। কোনো কিছুতেই তোমার বেশি চাওয়া নেই।’

সামান্য হাসলেন মাঝি। বললেন, আমি যা পাই তাতেই সন্তুষ্ট থাকি। এতেই আমার আনন্দ।

কেমন যেন আশ্চর্য লাগে হিউ-এন-সাঙ-এর। কী সহজ সরল অকপট মনের কথা। বললেন, তুমি কোথায় পেলে এই মহৎ শিক্ষা ?

মাঝি একটা পাথরের উপর বসলেন। কিছুক্ষণ পর বললেন, অনেক দিন আগে নৌকা নিয়ে দূরের এক শহরে যাচ্ছিলাম। তখন আমার প্রথম যৌবন। সবেমাত্র বিয়ে করেছি। অর্থ উপার্জনের জন্য সারাদিন পরিশ্রম করতাম। মনে হত আরও অর্থের প্রয়োজন। নয়তো সংসারে সুখ নেই। হঠাৎ কানে এল আমরা যে শহরে যাচ্ছি সেখানে বিদ্রোহ শুরু হয়েছে। নগর থেকে সব লোকজন পালিয়ে আসছে। রাত হয়ে এসেছিল। নদীর ধারে এক গ্রামে গিয়ে উঠলাম। দেখলাম আমাদের আগে আরও অনেকে এসেছে। একটা খালি চালা। তার তলায় সকলে আশ্রয় নিয়েছে। বেশিরভাগই ধনী, কয়েক জন জমিদার। তাদের সব ধনরত্ন লুঠ হয়ে গিয়েছে। সকলের সে কী হাহাকার। শুধু একজন গরিব চাষি। তার মুখে হাসি। জিজ্ঞেস করলাম, তুমি হাসছ কেন? সে বলল, এই মানুষগুলোকে দেখে হাসছি। আগে এদের কত কিছু ছিল তখন হাসত। আজ কিছু নেই তাই কাঁদছে। আমার আগেও কিছু ছিল না, এখনও কিছু নেই। যা আছে তাতেই সুখে থাকি। তাই আমার কোনো দুঃখ নেই।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, ভগবান বুদ্ধ এই কথাই বলেছেন। কামনা থেকেই মানুষের সব দুঃখ যন্ত্রণা।

মাঝি বললেন, মাঝে মাঝে বড়ো দুঃখ হয়। লেখাপড়া জানি না। কোনো পুথি পড়তে পারি না। কত ধর্মকথা লেখা আছে।

মাঝির পিঠে হাত রাখলেন হিউ-এন-সাঙ। বললেন, তুমি পরম জ্ঞানী। জীবন থেকে যে জ্ঞান অর্জন করেছ সমস্ত জীবন পুথি পড়েও লোকে তার কণামাত্রও লাভ করতে পারে না।

কয়েক জন চাষি এসেছে। নদী পার হবে।

মুখ ফেরালেন মাঝি। চলি ভন্তে। আবার দেখা হবে।

হিউ-এন-সাঙ মৃদুস্বরে বললেন, আজকের সকালটা বড়ো ভালো কাটল তোমার সঙ্গে।

মাঝি চলে যায়। পাহাড়ের গায়ে লেপটে থাকা কুয়াশা সরে গিয়েছে। একেবারে ন্যাড়া পাহাড়। কোনো গাছ নেই। গায়ের লোকেরা দু-একজন করে আসতে আরম্ভ করেছে। তারা ওপারে যাবে। সকলেই চাষি। নয়তো খেতের কাজ করে। উঠে পড়লেন হিউ-এন-সাঙ। এবার তঁাকে বিহারে ফিরতে হবে।

পায়ে চলা মাটির রাস্তা। ভোরের শিশিরে তখনও ভেজা। ধীর পায়ে হাঁটছিলেন হিউ-এন-সাঙ। প্রতিটি পদক্ষেপেই ফুটে উঠছিল সাতাশ বছরের তারুণ্যের দৃপ্ততা। নদী তীর ধরে সামান্য গিয়েই পথ ভাগ হয়েছে। একটি মহাবোধি বিহার পার হয়ে নগরের দিকে গিয়েছে। আরেকটি উত্তরে কিছু পাহাড়ি গ্রাম আছে সেই দিকের পথ। কোনোদিন সেই পথে যাননি হিউ-এন-সাঙ। হঠাৎ মনে হল দূর থেকে কারও কণ্ঠস্বর। কিছুটা উপেক্ষা করেই এগিয়ে গেলেন। আবার সেই কণ্ঠস্বর। এবার স্পষ্ট শুনতে পেলেন।

‘ভদন্ত দাঁড়ান।’

মুখ ফেরাতেই দেখতে পেলেন একজন শ্রমণ পাহাড়ি পথ ধরে নেমে আসছেন। দেখামাত্রই চিনতে পারলেন, সাও-শি। কয়েক মাস আগে এক বৌদ্ধ বিহারে ধর্মালোচনার সময় পরিচয় হয়েছিল। সবেমাত্র কৈশোর অতিক্রম করেছেন। মুখে এখনও শিশুর সারল্য। সামনে এসেই নতজানু হলেন সাও-শি।

মৃদুস্বরে আশীর্বাদ করলেন হিউ-এন-সাঙ।

‘ভগবান তথাগত তোমার কল্যাণ করবেন।’

‘ভদন্ত আমি দূর থেকে আপনাকে দেখামাত্রই চিনতে পেরেছি।’ সাও-শি’র চোখে-মুখে চাপা উচ্ছ্বাস।

‘তুমি কোথায় চলেছ ?’ প্রশ্ন করলেন হিউ-এন-সাঙ।

‘আপনার কাছেই চলেছি। স্থবির তাও-তি এসেছেন।’

‘আচার্য তাও—তি! কোথায় তিনি ?’ উত্তেজনায় সাও-শির দু-হাত চেপে ধরলেন হিউ-এন-সাঙ।

‘তিনি আমাদের সংঘারামে এসেছেন। আপনার সঙ্গে দেখা করতেন। কয়েক দিন হল তঁার শরীর ভালো নেই।’

‘আচার্য অসুস্থ ? আমি তঁার কাছে যাব।’

সাও-শি অনুভব করলেন আচার্যের অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে ব্যাকুল হয়ে উঠেছেন হিউ-এন-সাঙ। বললেন, আপনাকে সংবাদ দেবার জন্যই মহাবোধি বিহারে যাচ্ছিলাম।

‘ভালোই হল। পথেই আমাদের দেখা হয়ে গেল।’

‘স্থবির আপনাকে স্নেহ করেন। আপনার প্রসঙ্গে উনি খুবই শ্রদ্ধাশীল।’

চলতে চলতেই জবাব দিলেন হিউ-এন-সাঙ, আমি জানি। শৈশব থেকে উনি শুধু আমাকে ধর্মশিক্ষা দেননি, আমার জীবনকেও গড়ে তুলেছেন।

আর কোনো কথা বললেন না হিউ-এন-সাঙ। ছেলেবেলা থেকেই প্রয়োজনের বেশি কথা বলেন না। নিঃশব্দে দু-জন হাঁটতে থাকেন। অসমতল পথ। ছোটো ছোটো টিলা। চড়াই-উতরাই। রুক্ষ প্রকৃতি। ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ঝোপঝাড়। বড়ো গাছ নেই। দু-এক জন গ্রাম্য মানুষ পিঠে ঝুড়ি নিয়ে চলছিল। দু-জন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে দেখামাত্রই তারা দাঁড়িয়ে পড়ল। মাথা নীচু করে বিড়বিড় করে কিছু বলল। হাত তুলে তাদের আশীর্বাদ করলেন হিউ-এন-সাঙ।

সামনে উঁচু চড়াই। অনেকটা পথ গিয়েছে। সহজভাবেই পথ চলেন দুজন। পাহাড়ি পথে চলাচলে তারা অভ্যস্ত। কারও কোনো কষ্ট হয় না। চড়াই পার হয়ে অনেকখানি সমতল প্রান্তর। আগে কখনো এদিকে আসেননি হিউ-এন-সাঙ। সামনে তাকাতেই চোখে পড়ল একটি সংঘারাম। সামনে নানান বর্ণের পতাকা উড়ছে। পাথরের পাঁচিল, পাথরের দেওয়াল। মহাবোধি বিহারের তুলনায় নিতান্তই ছোটো। এতক্ষণ পর কথা বললেন সাও-শি।

‘আসুন ভদন্ত। এই আমাদের সংঘারাম।’

পাথরের প্রাচীর পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন। পর পর কয়েকটি কক্ষ। এক প্রান্তে পাথরের বেদির উপর ভগবান বুদ্ধের প্রতিকৃতি। অভয়মুদ্রায় বসে আছেন। প্রণাম করলেন দু-জন। সামনে প্রশস্ত বারান্দা। অনেকখানি লম্বা। সংলগ্ন প্রতিটি কক্ষেই শ্রমণরা রয়েছেন। বেশিরভাগই জপ করছেন। পর পর ধর্মচক্র। শেষ কক্ষের সামনে এসে দাঁড়ালেন সাও-শি।

‘আপনি ভেতরে যান ভদন্ত। স্থবির তাও-তি এখানেই আছেন।’

পশমের আসনে বসে ছিলেন স্থবির তাও-তি। বৃদ্ধ হলেও এখনও সুঠাম সুন্দর শরীর। নিবিষ্ট মনে কোনো পুথি পড়ছিলেন। পায়ের শব্দে মুখ তুলে তাকালেন। হিউ-এন-সাঙকে দেখামাত্রই তঁার চোখ দুটো আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। মৃদুস্বরে বললেন, এস। বহুদিন পর তোমাকে দেখলাম।

‘পথে সাও-শি’র সঙ্গে দেখা হল। সে আপনার অসুস্থতার কথা বলল।’

স্থবির মন্ত্রপাঠ করে পুথি বন্ধ করলেন। সামান্য হাসি ফুটে উঠল তঁার মুখে। হিউ-এন-সাঙ-এর দুটি হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বললেন, দেহ থাকলে ব্যাধি হবে। জরা আসবে। একদিন দেহের বিনাশ ঘটবে। যা অবশ্যম্ভাবী তাকে রোধ করা সম্ভব নয়। ও নিয়ে অনর্থক ভাবনা করে কী লাভ।

একটুখানি চুপ করলেন স্থবির। তারপর আবার বললেন, এখন তোমার কথা অনেকের কাছেই শুনতে পাই। ধর্মগুরু হিসেবে, শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত হিসেবে তোমার খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।

সামান্য লজ্জিত হলেন হিউ-এন-সাঙ। প্রসঙ্গান্তরে যাবার জন্যে বললেন, যতটুকু জ্ঞান লাভ করেছি সবই আপনার জন্য। ভগবান বুদ্ধের জীবনকথা আপনার মুখেই প্রথম শুনেছিলাম।

স্থবিরের মুখে প্রসন্নতা ফুটে উঠল।

‘তখন তোমার বয়েস সম্ভবত দশ। লো-ইয়াং মঠে তোমার দাদার সঙ্গে আসতে। তোমাকে দেখামাত্রই মনে হয়েছিল গভীর এক ধর্মভাব তোমার চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে। তোমার জ্ঞানস্পৃহা এত ছিল আচার্যেরা সকলেই তোমার কথা বলতেন।’

‘আমি জানি। আচার্যদের স্নেহ, শিক্ষাদান আমাকে সমৃদ্ধ করেছে। বড়ো সুন্দর ছিল লো-ইয়াং মঠের সেইসব দিনগুলি। দেশ জুড়ে রাজনৈতিক বিক্ষোভ সৃষ্টি না হলে কোনোদিনই ওই বিহার ত্যাগ করতে হত না।’

সামান্য বিচলিত হয়ে পড়লেন স্থবির। অতীতের তিক্ত স্মৃতিটুকু মনকে বিক্ষিপ্ত করে দিয়েছিল। সামান্যক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, বড়ো ভয়ংকর ছিল সেইসব দিনগুলি।

‘ভগবান তথাগতের আশীর্বাদে দুঃস্বপ্নের দিন শেষ হয়েছে।’ ধীর কণ্ঠে বললেন হিউ-এন-সাঙ।

স্থবির কিছু ভাবলেন। তারপর বললেন, এখন অনেকেই যারা, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিলেন ফিরে গিয়েছেন লো-ইয়াং মঠে। তুমিও সেখানে যেতে পারো। তোমাকে পেলে লো-ইয়াং মঠের খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে।

হিউ-এন-সাঙ কিছুক্ষণ স্থবিরের দিকে তাকিয়ে স্থিরভাবে বসে থাকেন। তারপর শান্তভাবে বললেন, আচার্য আমি ভগবান তথাগতের দেশ ভারতবর্ষে যাবার জন্য মনস্থির করেছি।

চমকে উঠলেন স্থবির। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকেন প্রিয়তম শিষ্যের দিকে। নিজের অভিজ্ঞতায় জানেন আবেগ বশবর্তী হয়ে কখনো কথা বলে না সে। তবুও প্রশ্ন করলেন, তুমি িক জান ভারতবর্ষের যাত্রা পথ কি দুর্গম আর কত ভয়ংকর ?

নিঃশব্দে মাথা নাড়লেন হিউ-এন-সাঙ।

স্থবির উদ্বেগভরা কণ্ঠে বললেন, যারা ভারতবর্ষে গিয়েছিলেন মহাস্থবির ফা-হিয়েন ছাড়া আর কেউ স্বদেশে ফিরে আসতে পারেননি। অধিকাংশই যাত্রা পথের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে অর্ধেক পথ থেকেই ফিরে এসেছেন।

হিউ-এন-সাঙ-এর মধ্যে কোনো চাঞ্চল্য দেখা গেল না। যথাসম্ভব শান্তভাবেই বললেন, আমি জানি আচার্য। তবুও আমি মনস্থির করেছি।

‘কীসের কারণে তুমি ভারতবর্ষে যেতে চাইছ ? কয়েক বছরের মধ্যেই তুমি মহাস্থবিরের দুর্লভ পদ পাবে। সমস্ত দেশ জুড়ে তোমার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে।’

সামান্য আনমনা হয়ে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। আচার্যের প্রতি তঁার অকৃত্রিম শ্রদ্ধা। তবুও মনে হল তিনি যেন প্রলোভিত করতে চাইছেন। যেমন ‘মার’ স্বয়ং বুদ্ধকে প্রলোভিত করতে চেয়েছিলেন। নিজের মনকে শক্ত করে বললেন, আচার্য, কোনো পদ বা খ্যাতির প্রতি আমার কোনো মোহ নেই। আমি জ্ঞানার্জনের জন্যে ভগবান তথাগতের দেশে যেতে চাই।

‘এখানেও বহু জ্ঞানীগুণী মানুষ রয়েছেন। বহু শাস্ত্র, পুথি রয়েছে। তার থেকে তুমি জ্ঞান অর্জন করতে পার। বহু জ্ঞানী ভিক্ষু রয়েছেন। তঁাদের জ্ঞানেও তুমি নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পার।’

‘না আচার্য, প্রকৃত জ্ঞানের সন্ধান পাবার জন্যই আমি ভারতবর্ষে যেতেই চাই। এখানে আচার্যেরা সকলেই যে-যার মতো শাস্ত্র ব্যাখ্যা করেন। একজনের অভিমতের সঙ্গে আর একজনের কোনো মিল নেই। তা ছাড়া মূল সংস্কৃত, পালি থেকে চিনা ভাষায় বৌদ্ধ শাস্ত্রের যেসব অনুবাদ হয়েছে তাও কতখানি নির্ভুল, সে বিষয়েও আমার সন্দেহ আছে। ভারতবর্ষে গিয়ে আমি মূল গ্রন্থ পড়তে চাই। শুনেছি সেখানে অসামান্য জ্ঞানী আচার্যেরা আছেন, তঁাদের কাছে বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্র, দর্শনের জ্ঞান লাভ করতে চাই।’

আচার্য তাও-তি অনুভব করছিলেন প্রবল জ্ঞানাকাঙ্ক্ষায় ব্যাকুল হয়ে উঠেছে তঁার শিষ্য। তঁার মুখে যে কথা শুনলেন এ সত্যকে নিজেও যে অনুভব করেননি এমন নয়। তবে দুস্তর হিমালয়, বিস্তৃত মরুভূমি পেরিয়ে ভগবান বুদ্ধের দেশে যাবার কথা স্বপ্নেও কোনোদিন ভাবতে পারেননি। বললেন, তুমি কি মনস্থির করে ফেলেছ ?

‘হ্যাঁ আচার্য, শুধু জ্ঞানার্জনের জন্য নয় তথাগতের পবিত্র জন্মভূমি দর্শনের আকাঙ্ক্ষাও আমার বহুদিনের। কপিলাবস্তু, রাজগৃহ, উরুবিল্ব, সারনাথ, শ্রাবস্তি যেখানে তথাগতের পায়ের ধূলা পড়েছিল, আমি সেই ধূলা স্পর্শ করতে চাই।’

আচার্য নিশ্চুপ। শিষ্যের প্রতিটি কথা, তঁার প্রাণের আকুতি মনকে দোলা দিয়ে যাচ্ছিল। একজন শ্রমণ মাটির পাত্রে সামান্য ফল আর জল নিয়ে আসে। হিউ-এন-সাঙ-এর সামনে রেখে বললেন, আপনি অনেকখানি পথ এসেছেন এই সামান্য প্রসাদটুকু নিন।

আচার্য তাও-তি নিজেই পাত্র থেকে একটি ফল হিউ-এন-সাঙ-এর হাতে তুলে দিলেন।

‘তুমি কবে যাত্রা করবে মনস্থির করেছ?’

‘এখনও দিনস্থির করিনি। তবে যত শীঘ্র সম্ভব বার হব।’

‘ভগবান তথাগত নিশ্চয়ই তোমাকে আশীর্বাদ করবেন। বহুদিন পর তোমাকে কাছে পেয়ে আজ আমার যেমন আনন্দ হচ্ছে, তেমনি দুঃখ হচ্ছে তুমি পবিত্র ভারতভূমি দর্শন করে যথার্থ জ্ঞানী হয়ে যেদিন স্বদেশে ফিরে আসবে সেদিন আমি বেঁচে থাকব না। তবে প্রতিমুহূর্তে আমার আশীর্বাদ তোমার সঙ্গে থাকবে।’

হিউ-এন-সাঙ অস্পষ্টস্বরে বললেন, আমি জানি আচার্য। আপনাদের সকলের আশীর্বাদ আমাকে যাত্রাপথের শক্তি দেবে।

আবেগে তাও-তির দুই চোখ বেয়ে জলের ধারা গড়িয়ে পড়ে। বেলা বাড়ে।

আচার্যকে প্রণাম করলেন হিউ-এন-সাঙ। জানেন এই বৃদ্ধ মানুষটাকে এই তঁার শেষ প্রণাম। তঁার চোখেও জল ভরে এসেছিল। উঠে পড়লেন। ধীর পায়ে সংঘারামের বাইরে এসে দাঁড়ালেন। বিহারের কোনো কক্ষ থেকে শ্রমণদের সমবেত মন্ত্রধ্বনি ভেসে আসছে। চারপাশের নির্জন পরিমণ্ডলে বড়ো সুমধুর লাগে। এগিয়ে যান হিউ-এন-সাঙ। এখন আর চড়াই বেয়ে ওঠা নয়। নীচে নামা। হাঁটার গতি সামান্য বাড়ালেন। বেলা বাড়ছে। প্রখর সূর্যের তাপ। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে ওঠে। পাহাড়ি পথ পার হয়ে সমতলে নামলেন। পথের ধারে ছোটো ছোটো খেত। স্থানীয় গ্রামের মানুষরাই এই সব খেত তৈরি করেছে। গমের চারাগুলো সবেমাত্র মাটি ফুঁড়ে বার হয়েছে। আর কয়েক মাসের মধ্যেই পাকা ফসলে ভরে উঠবে খেত। ধরিত্রীর প্রাণরসের ধারাকে বয়ে নিয়ে যাবে ওই শস্য।

মাঝে মাঝে সব কিছুই কেমন আশ্চর্য লাগে হিউ-এন-সাঙ-এর। প্রকৃতির সব কিছুই এক নিয়মের শৃঙ্খলায় বাঁধা। শুধু মানুষের জীবন, তার মধ্যে কোথাও শৃঙ্খলা নেই। জীবনের যা কিছু স্বাভাবিকতাকে ত্যাগ করে শুধুমাত্র পার্থিব কামনায় নিজেকে রিপুর দাস করে তুলেছে। গোটা জীবনটাই তার দুঃখময়। সে ভুলে যায় সব কিছুই ক্ষণিকের। আজ যা আছে কাল তা অবলুপ্ত হয়ে যাবে। তবুও প্রতিমুহূর্তে সেই অনিত্য মোহের আকর্ষণে ছুটে চলেছে।

আচমকা ভাবনার রেশটুকু ছিন্ন হয়। পেছনে ঘোড়ার গাড়ির শব্দ। তাড়াতাড়ি পথ ছেড়ে দূরে গিয়ে দাঁড়ালেন। পথের বাঁক পেরিয়ে ঘোড়ার গাড়ি সামনে আসতেই আরোহীকে চিনতে পারলেন হিউ-এন-সাঙ। চাঙ-আন শহরের নগরপাল ওয়ান-পো। প্রায় শৈশব থেকে মানুষটিকে চেনেন। তঁাকে শ্রদ্ধা করেন, ভালোবাসেন। সরকারি পদে থেকেও উদার মনের মানুষ।

কোচোয়ানের পেছনে বসে ছিলেন ওয়ান-পো। প্রবীণ রাজকর্মচারী। সামনে আসতেই তিনি দেখতে পেলেন পথের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন হিউ-এন-সাঙ। সঙ্গেসঙ্গে কোচোয়ানকে গাড়ি থামাবার নির্দেশ দিলেন।

গাড়ি থামতে নিজেই এগিয়ে এলেন হিউ-এন-সাঙ। মাথা নিচু করে অভিবাদন করলেন।

ওপর থেকেই তঁার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন ওয়ান-পো। আসুন ভন্তে।

গাড়িতে উঠে আসেন হিউ-এন-সাঙ। সামান্য সরে গিয়ে তঁাকে বসার আসন করে দিলেন ওয়ান-পো।

‘এই দিকে কোথায় গিয়েছিলেন ?’

‘আমার এক আচার্যের কাছে। লো-ইয়াং বিহারে তিনিই আমাকে প্রথম শিক্ষা দিয়েছিলেন।’

সামান্য হাসলেন ওয়ান-পো।

‘লো-ইয়াং বিহারেই আপনাকে প্রথম দেখেছিলাম। তখন আপনি কত ছোটো।’

হিউ-এন-সাঙ-এর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে ওঠে। বললেন, সব মনে আছে। ভগবান তথাগতের হয়তো ইচ্ছা ছিল।

কোচোয়ান গাড়ি ছাড়ে। ধুলো উড়িয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায় ঘোড়ার গাড়ি। কয়েক মুহূর্তের জন্য পিছনের পথে ফিরে যান হিউ-এন-সাঙ।

লো-ইয়াং-এ তাদের গ্রামের বাড়ির সামান্য দূরেই বৌদ্ধ বিহার। বাড়ির অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। মা সংসারের কাজ করতেন। বাবা চাষ করতেন। বাড়ির সকলেই ছিলেন বৌদ্ধ। দাদা ছেলেবেলাতেই সন্ন্যাস নিয়ে বৌদ্ধ বিহারে চলে গিয়েছিলেন। ছেলেবেলা থেকেই মনে হত তিনিও একদিন ওই বিহারে যাবেন। ঘর ছেড়ে মাঝে মাঝেই দাদার কাছে চলে যেতেন। সেখানকার ধর্মীয় পরিমণ্ডলে কখন যে গভীর এক আকর্ষণ মনের মধ্যে জেগে উঠেছিল নিজেই জানেন না। অনুভব করতেন সংসারের আকর্ষণ ক্রমশই শিথিল হয়ে যাচ্ছে। মন চাইত দাদার মতো তিনিও শ্রমণ হবেন। দেশের রাজনৈতিক অবস্থা ভালো ছিল না। রাজকোষ থেকে সব সাহায্য বন্ধ। যাঁরা বিহারে আছেন তঁাদের নিয়ে বিহারের স্থবির, মহাস্থবির চিন্তিত। কেমন করে এদের প্রতিদিনকার খরচ মেটাবেন। এই অবস্থায় নতুন কাউকে কী করে নেওয়া হবে ? অথচ অনেকেই আসছেন। তাদের মনের ইচ্ছা সন্ন্যাস নেবেন। সকলকেই ফিরিয়ে দিতে হয়। অপ্রত্যাশিত এক সংবাদ এল। লো-ইয়াং বিহারে যোগ্যতার ভিত্তিতে চোদ্দোজন ভিক্ষুকে সরকারি খরচে প্রতিপালন করা হবে। ভরতির ন্যূনতম বয়েস পনেরো। যারা ইচ্ছুক নির্দিষ্ট দিনে বিহারে উপস্থিত হতে হবে।

হিউ-এন-সাঙ সবেমাত্র বারোয় পা দিয়েছেন। জানেন তঁার ভরতির কোনো সুযোগ নেই। অথচ মনের ইচ্ছে যদি এই সুযোগটুকু পাওয়া যেত। বিহারের প্রবেশদ্বারের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ এসেছে। চারদিকে ভিড়। সকলেরই মনের ইচ্ছে যদি সরকারি সাহায্যে ভরতি হওয়া যায়। একে একে সকলকে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে। উচ্চপদস্থ একজন রাজকর্মচারী সবকিছু তত্ত্বাবধান করছেন। হঠাৎ তঁার দৃষ্টি পড়ল হিউ-এন-সাঙ-এর দিকে। বহুক্ষণ আগে একবার নজর পড়েছিল। এখনও কী কারণে ছেলেটি দাঁড়িয়ে আছে। কৌতূহলে কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কে তুমি ? বহুক্ষণ ধরে এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন ?

রাজকর্মচারীর প্রশ্নে বিচলিত হলেন না হিউ-এন-সাঙ। স্পষ্টভাবে বললেন, আমার নাম হিউ-এন-সাঙ। আমার দাদা এই বিহারের শ্রমণ।

‘তুমি কি দাদার সঙ্গে দেখা করবার জন্যে এসেছ ?’

মাথা নাড়লেন হিউ-এন-সাঙ, আমি দাদার মতো শ্রমণ হতে চাই।

‘তুমি তো নিতান্তই বালক।’

‘আমি মনস্থির করেছি, সন্ন্যাস গ্রহণ করব।’

বিস্মিত হলেন রাজকর্মচারী। অনুভব করলেন বালক হলেও সে অন্য সকলের চেয়ে আলাদা। তবুও প্রশ্ন করলেন, কী উদ্দেশ্যে তুমি শ্রমণ হতে চাও ?

হিউ-এন-সাঙ দ্বিধাহীনভাবে রাজকর্মচারীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ভগবান তথাগতের বাণী দেশে দেশে, সকল মানুষের মধ্যে প্রচার করাই আমার জীবনের উদ্দেশ্য।

চমকে উঠলেন রাজকর্মচারী। মুগ্ধ চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন হিউ-এন-সাঙ-এর দিকে। কী গভীর আত্মপ্রত্যয় আর দীপ্তি ফুটে উঠেছে তঁার চোখে-মুখে ! এমনটি আর কোথাও দেখেননি। বললেন, আমি তোমাকে শ্রমণ হবার অনুমতি দিচ্ছি। এখানে তোমার চেয়ে যোগ্যতম আর কেউ নেই।

বারো বছরেই শুরু হল শ্রমণের জীবন। তারপর এক যুগ পেরিয়ে গিয়েছে। সেই রাজকর্মচারী আজ চাঙ-আনের সর্বময় কর্তা।

‘ভন্তে।’ ওয়ান-পো’র ডাকে কল্পনা থেকে বাস্তবে ফিরে এলেন হিউ-এন-সাঙ। হাসি মুখে বললেন, অনেক দিন পর আপনার সঙ্গে দেখা হল। তবে সর্বত্রই এখন আপনার পাণ্ডিত্যের কথা শুনতে পাই।

কারও প্রশংসায় বিচলিত হন না হিউ-এন-সাঙ। শান্তভাবে বললেন, আমার জ্ঞান সামান্য।

গাড়ি মহাবোধি বিহারের সামনে এসে পড়েছিল। ওয়ান-পো বললেন, ভন্তে আপনার কি সময় হবে, তাহলে আমার নতুন প্রাসাদে যেতেন ?

সামান্য ভাবলেন হিউ-এন-সাঙ। এই মুহূর্তে কোনো ব্যস্ততা নেই। তা ছাড়া এই মানুষটির প্রতি তঁার অগাধ শ্রদ্ধা। বললেন, না আমার কোনো ব্যস্ততা নেই।

‘আসলে বহুদিন ধরেই মনে হয়েছিল আপনাকে আমার নতুন প্রাসাদে নিয়ে যাব। কাজের এত চাপ। তা ছাড়া এত বড়ো নগরের সব দায়িত্ব।’

‘আপনাকে যোগ্য বিবেচনা করেই সম্রাট এই দায়িত্ব দিয়েছেন।’

কোনো জবাব দিলেন না ওয়ান-পো। এতক্ষণের নির্জন পথ পার হয়ে গাড়ি নগরে প্রবেশ করেছে। পথের দু-ধারে বাড়িঘর দোকান। লোকজনের তেমন ভিড় নেই। মাঝে মাঝে বাগান। একটি বাগান পেরিয়ে অনেকখানি পাঁচিল ঘেরা অঞ্চল। সামনে বন্ধ ফটক। ফটকের সামনে গাড়ি আসতেই প্রহরী ফটক খুলে দিল। ভেতরে প্রবেশ করে গাড়ি। দু-ধারে বাগান, মাঝখানে প্রাসাদ। কোচোয়ান গাড়ি থামায়। ওয়ান-পো বললেন, আসুন ভন্তে।

গাড়ি থেকে নেমে আসেন দু-জন। প্রাসাদের প্রশস্ত আঙিনা পেরিয়ে বিশাল কক্ষ। গোটা কক্ষ জুড়ে রঙিন গালিচা পাতা। একদিকে পর পর সাজানো আসন। মুখোমুখি আসনে বসলেন দু-জন। ওয়ান-পো বললেন, ভন্তে কয়েক দিন আগে আমার কাছে একটি সংবাদ এসেছে আপনি মহামান্য চিন সম্রাট থাই- চুঙের কাছে গিয়েছিলেন ?

হিউ-এন-সাঙ বললেন, আপনি সঠিক সংবাদ শুনেছেন।

‘মহামান্য সম্রাটের কাছে আপনার কী প্রয়োজন ছিল যদি গোপন কোনো বিষয় না হয় আমাকে জানাতে পারেন। সম্ভব হলে আমি নিশ্চয়ই আপনাকে সাহায্য করব।’

কিছুক্ষণ কোনো কথা বললেন না হিউ-এন-সাঙ। জানেন ওয়ান-পো তঁার একান্ত শুভানুধ্যায়ী। নিজের সামর্থের বাইরে গিয়েও তঁাকে সাহায্য করবেন। কিন্তু তিনি যা মনস্থির করেছেন সেই প্রসঙ্গে কোনো সাহায্যই করবেন না। সম্ভব হলে বাঁধা দেবেন।

ওয়ান-পো কিছু ভাবলেন। তারপর বললেন, যদি আপনার অসুবিধা থাকে তাহলে প্রকাশ করবার প্রয়োজন নেই।

‘না। আমার পক্ষে অসুবিধার কিছু নেই। তবে এই ব্যাপারে আপনার কাছেও আমি কোনো সাহায্য পাব না।’

কিছুটা বিস্ময়ের সুরে ওয়ান-পো বললেন, আমি আপনার কথার সঠিক অর্থ বুঝতে পারছি না। কী এমন বিষয় যা আমরা কেউ আপনাকে সাহায্য করব না।

কিছুক্ষণ স্থির হয়ে থাকেন হিউ-এন-সাঙ। তারপর বললেন, আমার ইচ্ছা ভারতবর্ষে যাব।

চমকে উঠলেন ওয়ান-পো। কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন হিউ-এন-সাঙ-এর দিকে।

‘আপনি ভারতবর্ষে যাবেন!’

হিউ-এন-সাঙ অনুভব করলেন ওয়ান-পো’র মানসিক অবস্থা। সহজভাবেই বললেন, ভারতবর্ষ ভগবান বুদ্ধের দেশ। তঁার ধূলিকণাও পবিত্র।

সামান্য উত্তেজিতভাবে ওয়ান-পো বলে উঠলেন, হিমালয়ের ওপারে বহুদূর সে দেশ। শুনেছি ভয়ংকর দুর্গম পথ। কী কারণে আপনি সেখানে যেতে চান ?

‘ভগবান বুদ্ধের সেই পবিত্র ভূমি দর্শন করব।’

ওয়ান-পো জানেন সকল বৌদ্ধেরই পরম কামনা ভগবান তথাগতের পবিত্র জন্মভূমি দর্শন করবার। শুধু এই কামনা পূরণ করবার জন্যে নিজের জীবন বিপন্ন করবার কোনো অর্থ তিনি খুঁজে পান না। বললেন, আপনি কি জানেন ভারতবর্ষ কতদূর ?

‘জানি। কয়েক হাজার লি।’ (১ লি = ১

কিলোিমটার)

ওয়ান-পো গম্ভীর মুখে বললেন, আমি শুধু দূরত্বের কথা বলছি না। তার চেয়েও প্রধান বিষয় হল, মাঝখানে হিমালয় পর্বত। কোথাও ভয়ংকর মরুভূমি। কোনো মানুষ নেই। গাছপালা নেই। খাদ্য নেই। পানীয় নেই। যেখানে জনপদ আছে সেখানকার অধিবাসীরা সকলেই হিংস্র। তুচ্ছ কারণে মানুষ খুন করে। তারপরে বরফে ঢাকা পর্বত। সেই পর্বত অতিক্রম করতে হবে। এ মানুষের অসাধ্য।

হিউ-এন-সাঙ আগের মতই শান্তভাবে বললেন, আমি সমস্তই জানি।

‘তবুও আপনি ভারতবর্ষে যেতে চান ?’

‘সেই কারণেই মহামান্য সম্রাটের কাছে গিয়েছিলাম।’

‘কী বললেন সম্রাট ?’

‘তিনি আমাকে ভারতবর্ষে যাবার অনুমতি দেননি। বললেন, তঁার রাজ্যের সীমানা পর্যন্ত তিনি সব দায়িত্বভার নিতে পারেন। সীমান্তের ওপারে তঁার কোনো অধিকার নেই। সেখানে আমার নিরাপত্তার দায়িত্ব কে গ্রহণ করবে।’

ওয়ান-পো’র মনের ইচ্ছা হিউ-এন-সাঙ যেন ভারতবর্ষে না যান। সম্রাটের আদেশে মনে মনে সস্তুষ্ট হলেন। সেই ভাব গোপন করে বললেন, ঠিকই বলেছেন মহামান্য সম্রাট। এই তরুণ বয়েসে আপনার জ্ঞানের খ্যাতি সমস্ত চিন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। পণ্ডিতসমাজের সকলেই স্বীকার করেন উত্তরকালে আপনিই হবেন চিন দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী পুরুষ। সম্রাটও সে বিষয় জানেন। তঁার ইচ্ছা নয় আপনার কোনো ক্ষতি হোক। সে ক্ষতি সমগ্র দেশের।

হিউ-এন-সাঙ অনুভব করছিলেন কোনোভাবেই তিনি ভারতে যাওয়ার অনুমতি পাবেন না। তবু বললেন, জ্ঞান অর্জনের জন্যে যুগ যুগ ধরেই মানুষ ভারতবর্ষ থেকে চিনে, চিন থেকে ভারতবর্ষে গিয়েছেন। কোনো বাধাই তঁাদের সেই যাত্রাপথকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। আপনি স্মরণ করুন সেইসব মহান বৌদ্ধ পণ্ডিত যাঁরা ধর্ম প্রচারের জন্যে কত কষ্ট স্বীকার করেও আমাদের দেশে এসেছেন। তঁাদের জন্যেই ভগবান বুদ্ধের বাণী আজ দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে।

‘এই দুর্গম পথে বহু মানুষের মৃত্যুও ঘটেছে।’

সামান্য হাসলেন হিউ-এন-সাঙ। বললেন, মৃত্যুর ভয়ে মানুষের জ্ঞানপিপাসা কখনো থেমে থাকেনি। আপনি নিশ্চয়ই মহান চিন সম্রাট মিং-এর কথা শুনেছেন।

ওয়ান-পো মৃদুস্বরে বললেন, আমি শুনেছি মাত্র। বিশেষ কিছুই জানি না।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, হান বংশের মহান সম্রাট ছিলেন মিং। প্রায় ছ-শো বছর আগে তিনি রাজত্ব করেছিলেন। (৫৭-৭৫ খ্রিস্টাব্দ) জনশ্রুতি একদিন ঘুমিয়ে ছিলেন সম্রাট। এমন সময় স্বপ্ন দেখলেন এক দিব্যপুরুষ তঁার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। তঁার দেহ থেকে জ্যোতি বেরিয়ে আসছে। চোখে-মুখে আশ্চর্য এক প্রশান্তি। দিব্যপুরুষ যেন তঁাকে কিছু বলল। তারপরই অদৃশ্য হয়ে গেলেন সেই দিব্যপুরুষ। ঘুম ভেঙে গেল সম্রাটের। বার বার মনে হল কে এই দিব্যপুরুষ। কী বললেন তিনি। সকাল হতেই সমস্ত পণ্ডিতদের ডেকে পাঠালেন। জিজ্ঞাসা করলেন এই স্বপ্নের অর্থ কী। সকলেই নিশ্চুপ। একজন পণ্ডিত বললেন, আমি ভগবান বুদ্ধের কথা শুনেছি। আমার মনে হয় আপনি তঁাকেই স্বপ্নে দেখেছেন।

সম্রাট প্রশ্ন করলেন, কে ভগবান বুদ্ধ ? আপনি কী করে তঁার কথা জানলেন পণ্ডিত ?

পণ্ডিত বললেন, পশ্চিম এশিয়া থেকে যেসব বণিক ব্যবসা করতে মধ্য এশিয়ার আসে, তাদের কয়েক জনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। তাদের কাছেই আমি বুদ্ধের কথা শুনেছি। তিনি বহুদিন আগে ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বুদ্ধ মানুষকে সব দুঃখ যন্ত্রণা থেকে মুক্তির পথ দেখিয়েছেন।

সম্রাট মিং বললেন, আমি ভগবান বুদ্ধের কথা আরও জানতে চাই।

পণ্ডিত বললেন, তাহলে ভারতবর্ষের বৌদ্ধ পণ্ডিতদের সন্ধান পেতে হবে।

সম্রাট মন্ত্রীদের ডেকে বললেন, আপনারা যেভাবেই হোক ভারতবর্ষ থেকে বৌদ্ধ পণ্ডিতদের চিনে নিয়ে আসবার ব্যবস্থা করুন।

ওয়ান-পো মনোযোগ দিয়ে হিউ-এন-সাঙ-এর কথা শুনছিলেন, বললেন, সম্রাট কি বৌদ্ধ পণ্ডিতদের সন্ধান পেয়েছিলেন ?

হিউ-এন-সাঙ বললেন, হ্যাঁ, পেয়েছিলেন। সম্রাটের আদেশে কয়েক জন রাজদূত ভারতবর্ষের দিকে রওনা হলেন। সেই সময় ভারতবর্ষ থেকে দু-জন বৌদ্ধ ভিক্ষু পশ্চিম এশিয়ায় এসেছিলেন বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের উদ্দেশে। তঁাদের দেখা হয়ে গেল রাজদূতদের সঙ্গে। সম্রাটের ইচ্ছার কথা শুনে দু-জনেই সম্মত হলেন চিন দেশে গিয়ে সম্রাটকে ভগবান বুদ্ধের কথা বলবেন। প্রচুর পুথি আর বুদ্ধের কিছু মূর্তি নিয়ে তঁারা এসে পৌঁছলেন চিন দেশের সেই সময়কার রাজধানী লোয়াঙ-এ। সম্রাট সাদরে তঁাদের অভ্যর্থনা জানালেন।

ওয়ান-পো বললেন, সেই বৌদ্ধ ভিক্ষুদের নাম কি জানা যায় ?

হ্যাঁ, একজনের নাম ছিল কাশ্যপ মাতঙ্গ আর একজনের নাম ছিল ধর্মরক্ষ। সম্রাট বুদ্ধের মূর্তি দেখে বললেন এই দিব্যপুরুষকেই তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন। সম্রাটের আদেশে তৈরি হল মঠ। সেখানে বুদ্ধের মূর্তি স্থাপন করা হল। কাশ্যপ আর ধর্মরক্ষ সাদা ঘোড়ায় চড়ে এসেছিলেন বলে, মন্দিরের নাম রাখা হল শ্বেতাশ্ব মঠ।

ওয়ান-পো বললেন, আমি শ্বেতাশ্ব মঠে গিয়েছি। শ্বেতপাথরের বিশাল মন্দির। ভগবান বুদ্ধের মূর্তির সামনে দাঁড়ালে প্রসন্নতায় মন ভরে ওঠে।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, এর পরবর্তীকালে আরও অনেকে ভারতবর্ষ থেকে এসেছেন। যেমন কুমারজীব, গৌতম সংঘদেব, বুদ্ধভদ্র_এরা সকলেই ভগবান বুদ্ধের মহান বাণীকে ছড়িয়ে দিয়েছেন চিনের নানান প্রান্তে।

ওয়ান-পো এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে হিউ-এন-সাঙ-এর কথা শুনছিলেন। হঠাৎ গম্ভীর মুখে বললেন, চিন দেশ থেকে ভারতবর্ষে গিয়ে আবার দেশে ফিরে এসেছেন এমন কারও কথা শুনিনি।

হিউ-এন-সাঙ-এর চোখে-মুখে প্রসন্ন আলো ফুটে উঠল। মৃদুস্বরে বললেন, মহাত্মা ফা-হিয়েন ভারতবর্ষে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে শুধু বৌদ্ধ বিহার পরিদর্শন করেননি, তিনি বৌদ্ধশাস্ত্র শিক্ষা করেছেন। বহু পুথি নিয়ে এসেছেন এবং চিনা ভাষায় তার অনুবাদ করেছেন।

মনে মনে লজ্জিত হলেন ওয়ান-পো। রাজকাজের বাইরে নিজের দেশের ইতিহাস ধর্ম সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানেন না। বললেন, ভন্তে, যদি আপনার কোনো অসুবিধা না হয় ফা-হিয়েনের কথা বলুন।

কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন হিউ-এন-সাঙ। তারপর বললেন সম্ভবত ৩৩৫ খ্রিস্টাব্দে শানসি প্রদেশের ওয়াং নগরে তঁার জন্ম। ছেলেবেলায় তঁার নাম ছিল কুৎ। তঁার জন্মের আগে তঁার পিতা মাতার তিনটি সন্তান হয়। তিনজনেরই শৈশবে মৃত্যু হয়। একজন সন্ন্যাসী বলেন যদি কুৎকে কোনো বৌদ্ধ বিহারে সন্ন্যাস গ্রহণের জন্যে দান করা হয় তবেই এই শিশু অকালমৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাবে। তখন শিশুর তিন বছর বয়স। কুৎকে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত করা হল। তঁার নতুন নাম হল ফা-হিয়েন। কৈশোরে এবং প্রথম যৌবনেই যা কিছু বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্র ছিল সব পাঠ করে তার মনে হল অধিকাংশ অনুবাদই সঠিক নয়। এর থেকে বৌদ্ধ ধর্মের প্রকৃত রূপের মর্মবোধ করা সম্ভব নয়। তিনি মনস্থির করলেন ভগবান বুদ্ধের দেশ ভারতে যেতে হবে। সে দেশ থেকে অবিকৃত বিনয়পিটক সংগ্রহ করে এনে চিনের মানুষের কাছে প্রচার করতে হবে। এতে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জীবনের পালনীয় নিয়ম আর কর্তব্য সম্পর্কে বিশদ বিবরণ লেখা আছে। তখন মহাত্মা ফা-হিয়েন ষাট বছর অতিক্রম করে গিয়েছেন। চার সঙ্গীকে নিয়ে ভারতবর্ষের দিকে রওনা হলেন। পথে ভয়ংকর গোবী মরুভূমি। প্রায় পাঁচ-শো মাইল দীর্ঘ পথ। সেই পথ পার হয়ে এলেন খোটান। সেখানে তখন অসংখ্য বৌদ্ধ বিহার। বৌদ্ধ ধর্ম শিক্ষার জন্যে রয়ে গেলেন খোটানে। কিছুদিন পর আবার বেরিয়ে পড়লেন। এলেন কাশনগর। ভয়ংকর বর্ষা শুরু হয়েছে। কোথাও যাবার উপায় নেই। বেশ কয়েক মাস কেটে গেল। আবার যাত্রা করলেন। এবার দুর্গম পামির পর্বতমালা। বছরের বেশিরভাগ সময়েই এখানে বরফে ঢাকা থাকে। প্রতি পদক্ষেপে মৃত্যুর হাতছানি। এক মাসে সেই দুর্গম পথও পার হলেন। তারপর কাবুলের মধ্যে দিয়ে এসে পৌঁছলেন ভারতবর্ষে। দেখলেন তক্ষশীলায় ভগবান বুদ্ধের ভিক্ষাপাত্র। তারপর প্রায় দশ বছর ধরে ভারতবর্ষের নানান প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন।

ওয়ান-পো জিজ্ঞাসা করলেন, যে উদ্দেশ্যে ফা-হিয়েন ভারতবর্ষে গিয়েছিলেন সেই বিনয়পিটক কি সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন ?

হিউ-এন-সাঙ বললেন, না তিনি কোনো লিখিত বিনয়পিটক সংগ্রহ করতে পারেননি। কারণ তিনি দেখেছিলেন সেখানকার আচার্যেরা শ্রুতিধর। বিনয়পিটক তঁাদের কণ্ঠস্থ। এই কণ্ঠস্থ বিদ্যাই তঁাদের শিষ্যদের দিয়ে যান। তিনি তিন বছর ধরে পাটলিপুত্রে বাস করে পালি ও সংস্কৃত শিক্ষা লাভ করেছিলেন এবং সমগ্র বিনয়পিটক আত্মস্থ করেন।

‘ফা-হিয়েনের সঙ্গীদের কী হয় ?’

‘তঁার সঙ্গীদের মধ্যে একমাত্র তাও-চেঙ তঁার সঙ্গে দীর্ঘ দিন ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ভারতের এক বিহারে রয়ে যান। তিনি চেয়েছিলেন ভারতের মাটিতে যেন তঁার মৃত্যু হয়। আবার যদি জন্ম নিতে হয় ভগবান বুদ্ধের দেশেই যেন তঁার জন্ম হয়। আচার্য ফা-হিয়েন নিজের মুক্তি চাননি। ব্যক্তিগত স্বার্থ কিংবা নির্বাণ তঁার আকাঙ্ক্ষা ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন নিজের দেশে ফিরে এসে মানুষের কাছে ভগবান বুদ্ধের মহান আদর্শকে তুলে ধরবেন। ভারত থেকে তিনি যান সিংহলে। বৌদ্ধ ধর্মের আরেক পীঠস্থান। প্রায় চোদ্দো বছর প্রবাসে থাকার পর স্বদেশের পথে রওনা হন।’

‘তিনি কি আবার সেই আগের পথ ধরেই ফিরে আসেন ?’ উৎসুক ওয়ান-পো।

দীর্ঘক্ষণ কথা বলছিলেন হিউ-এন-সাঙ। সামান্য বিশ্রাম নিয়ে বললেন, সিংহল থেকে ফা-হিয়েন সমুদ্র পথে জাহাজে করে যবদ্বীপে এসে ওঠেন। সেখান থেকে আরেকটি জাহাজে করে চিনের উপকূলে এসে পৌঁছন। শোনা যায় তিনি যখন মাঝ সমুদ্রে হঠাৎ প্রবল ঝড় ওঠে। জাহাজের নাবিকরা সকলকে তাদের সব জিনিসপত্র সমুদ্রে ফেলে দেবার আদেশ দিল। ফা-হিয়েন তঁার সব পুথি বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরে বাকি সব কিছু সমুদ্রে ফেলে দেন। ৪১৪ খ্রিস্টাব্দে ফা-হিয়েন যখন প্রায় ত্রিশটি দেশ পরিভ্রমণ করে চিনে ফিরে আসেন, তখন তঁার বয়েস উনঅাশি বছর।

‘আশ্চর্য জীবন!’ আপন মনেই বলে ওঠেন ওয়ান-পো।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, এই মহান আচার্যের লেখা পড়েই আমার মনে হয়েছিল ভারতবর্ষে যাব।

ওয়ান-পো অনেকক্ষণ নীরব হয়ে থাকেন। একজন কর্মচারী ফল পানীয় নিয়ে আসে। নিঃশব্দে দু-জনে গ্রহণ করলেন। নিজের অন্তরে কিছুতেই যেন স্বাভাবিক হতে পারেন না ওয়ান-পো।

‘ফা-হিয়েন যে পথ ধরে ভারতবর্ষে গিয়েছিলেন, এই কয়েকশো বছরে সে পথের কত পরিবর্তন হয়েছে, সে সবই তো আপনার অজানা।’

‘আমি জানি।’

ওয়ান-পো সামান্য গম্ভীরভাবে বললেন, আপনি জানেন সম্রাটের আদেশে সীমান্তে প্রতি কুড়ি কিলোমিটার অন্তর প্রহরী রয়েছে। অনুমতিপত্র ছাড়া তারা কাউকে এক পাও যাবার অনুমতি দেয় না।

কোনো ভাবান্তর হল না হিউ-এন-সাঙ-এর। শান্তভাবে বললেন, পথের বাধার কথা আমি ভাবি না।

‘সে বাধা আপনি কী করে অতিক্রম করবেন ?’

হিউ-এন-সাঙ অনুভব করলেন ওয়ান-পো-এর অন্তরের উদ্বেলতা। বললেন, সময় অবস্থা অনুসারে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কখন কী বাধা আসবে তা আগে থেকে জানা সম্ভব নয়। তা ছাড়া জীবনে মহৎ কোনো কিছু অর্জন করতে গেলে সবসময়েই প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়। ভগবান তথাগতের জীবনকথা চিন্তা করুন। বুদ্ধত্ব অর্জনের জন্যে তঁাকে কী কঠোর সাধনা করতে হয়েছে। রাজপুত্র হয়েও সবকিছু বিসর্জন দিয়েছেন।

হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন হিউ-এন-সাঙ। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন। দেওয়ালের গায়ে ভগবান তথাগতের বিশাল প্রতিকৃতি। কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন। আশ্চর্য এক অনুরণন। বুকের মধ্যে গভীর প্রশান্তি নেমে আসে। আবার ফিরে আসেন। আসনে বসে ওয়ান-পোর দিকে তাকালেন। বললেন, আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি ভগবান তথাগত আমাকে সকল বিপদ থেকে রক্ষা করবেন। তিনিই আমাকে যাত্রা পথের নির্দেশ দেবেন।

ওয়ান-পো অনুভব করছিলেন সামনে বসে থাকা মানুষটির মধ্যে কী গভীর এক বিশ্বাস। কোনোভাবেই তঁার সেই বিশ্বাসকে টালানো সম্ভব হবে না। কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন হিউ-এন-সাঙ-এর দিকে। কোনো চঞ্চলতা নেই। গভীর এক প্রজ্ঞা ফুটে উঠেছে তঁার দুই চোখে। সেখানে কোনো দ্বিধা নেই। সংশয় নেই। হিমালয়ের মতো অটল আত্মপ্রত্যয়।

মুহূর্তে গভীর এক আনন্দের অনুভূতি জেগে ওঠে মনের মধ্যে। এই মানুষটিকে তিনি একদিন হাত ধরে বৌদ্ধ বিহারে নিয়ে এসেছিলেন। ধীর কণ্ঠে বললেন, আপনি কি এই যাত্রার জন্যে মনস্থির করে ফেলেছেন ?

‘হ্যাঁ, আমি মনস্থির করেছি।’

‘আপনার সিদ্ধান্তের কি কোনো পরিবর্তন হবে না ?’ শেষ বারের মতো প্রশ্ন করলেন ওয়ান-পো।

‘ভগবান তথাগতের ইচ্ছা আমি ভারতবর্ষে যাব।’ নিরাসক্ত উত্তর ধ্বনিত হল হিউ-এন-সাঙ-এর কণ্ঠে।

গভীর এক নিস্তব্ধতা নেমে আসে কক্ষের মধ্যে। বাইরের বাতাসে বয়ে আসে ফুলের সুগন্ধ। মুখোমুখি দু-জন। একজন নবীন আর একজন প্রবীণ। দুজনেই আত্মমগ্ন। হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন ওয়ান-পো। মনে হল সামনে বসে থাকা মানুষটি এরই মধ্যে তাদের সকলকে ত্যাগ করে বহু দূরে চলে গিয়েছেন। তঁার দৃষ্টির সীমানা অতিক্রম করে ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে ভগবান বুদ্ধের দেশে।

আশ্চর্য এক অনুভূতিতে অস্ফুটে ওয়ান-পো বললেন, আমি আপনার প্রতীক্ষা করব।

সকল অধ্যায়
১.
গভীর গহন এক রাত
২.
আলোর পথে
৩.
প্রথম সকাল
৪.
রাত্রি শেষ
৫.
যাত্রা হল শুরু
৬.
সীমান্ত পথ
৭.
মৃত্যু উপত্যকা
৮.
মরুদ্যান
৯.
হামি
১০.
তুরফান
১১.
কুচা
১২.
বরফের দেশে
১৩.
ইশিক কুল
১৪.
সমরখন্দ
১৫.
লৌহকপাট
১৬.
বামিয়ান
১৭.
গান্ধার
১৮.
ছায়াগুহা
১৯.
পুরুষপুর
২০.
তক্ষশীলা
২১.
কাশ্মীর
২২.
শাকল
২৩.
জলন্ধর থেকে কুলু
২৪.
মথুরা
২৫.
কান্যকুব্জ
২৬.
অযোধ্যা থেকে কৌশাম্বী
২৭.
প্রয়াগ
২৮.
শ্রাবস্তী
২৯.
কপিলাবস্তু
৩০.
লুম্বিনী
৩১.
কুশীনগর
৩২.
বারাণসী
৩৩.
সারনাথ
৩৪.
বৈশালী
৩৫.
মগধ
৩৬.
শীলভদ্র বিহার
৩৭.
গয়া
৩৮.
বুদ্ধগয়া
৩৯.
বোধিবৃক্ষ
৪০.
মহাভিক্ষুণী
৪১.
রাজগৃহ
৪২.
মানসলোক
৪৩.
নালন্দা
৪৪.
ভারত পরিক্রমা
৪৫.
আবার নালন্দা
৪৬.
শরণাগত

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%