কপিলাবস্তু

চঞ্চলকুমার ঘোষ

শাক্যবংশের রাজধানী ভগবান গৌতম বুদ্ধের পিতৃভূমি এই কপিলাবস্তু। বলা হয় ঋষি কপিলের নাম অনুসারে এই নগরের নাম হয়।

বুদ্ধের সময় কোশল রাজ্য ছিল নেপালের পার্বত্যভূমি থেকে দক্ষিণে গঙ্গা নদী পর্যন্ত। এই কোশল রাজ্যের অধীনে ছিল শাক্যদের গণরাজ্য। কপিলাবস্তু তার রাজধানী। সেই গণরাজ্যের রাজা ছিলেন মহারাজ শুদ্ধোদন। পিতা সিংহনুর মৃত্যুর পর তঁার জ্যেষ্ঠপুত্র রূপে শুদ্ধোদন রাজা হন। তঁার আরও চার ভাই ছিল, একমাত্র ভগ্নী অমিতা দেবী। অমিতা দেবীর পুত্রের নাম তিস্ম। পরবর্তীকালে তিনি বুদ্ধের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। শুদ্ধোদনের দুই পুত্র বুদ্ধ ও নন্দ। শুদ্ধোদনের আরেক ভাইয়ের পুত্র আনন্দ, যিনি পরবর্তীকালে বুদ্ধের প্রধান শিষ্য হন।

রাজা শুদ্ধোদন দেবদহ নগরের শাক্যাধিপতি সুপ্রবুদ্ধের জ্যেষ্ঠা কন্যা মহামায়া এবং কনিষ্ঠা কন্যা মহাপ্রজাপতি গৌতমীকে একইসঙ্গে বিবাহ করেন।

দেবী মহামায়া সন্তানসম্ভবা হওয়ার পর যখন সন্তান জন্মের সময় উপস্থিত হয় তিনি পিত্রালয়ে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। পথে লুম্বিনী উদ্যান। কপিলাবস্তু থেকে দশ মাইল। বর্তমানে নেপালের অন্তর্গত। বলা হয় মায়া দেবীর পিতামহী রানি লুম্বিনীর নাম অনুসারে এই উদ্যানের নাম হয় লুম্বিনী। এখানে এসে মায়া দেবীর প্রসবযন্ত্রণা শুরু হল। দেবী পালকি থেকে নেমে একটি শাল গাছের ডাল ধরে দাঁড়ালেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বোধিসত্ত্বকে জন্ম দিলেন। সেদিন ছিল বৈশাখী পূর্ণিমা (খ্রিস্টপূর্ব ৬২৪ অথবা ৪৬৩ অব্দ)।

এই জন্মস্থান নিয়ে কিছু বিতর্ক থাকলেও নেপালের তরাই অঞ্চলে ভৈরিহয়া জেলায় অবস্থিত রুম্নিন দৈ এবং লুম্বিনী যে একই স্থান সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সম্রাট অশোক এখানে একটি স্তম্ভ স্থাপন করেন। তাতে লেখা_শাক্যমুনি এখানে জন্মগ্রহণ করেন।

তবে কপিলাবস্তু বুদ্ধের জীবনকালেই ধ্বংস হয়ে যায়। এই কপিলাবস্তুর অবস্থান নিয়েও রয়েছে নানান বিতর্ক। গোরক্ষপুর গোন্ডা ছোটো লাইনের ট্রেনে সিদ্ধার্থনগর স্টেশন, সেখান থেকে শেয়ার ট্রেকারে অতীতের কপিলাবস্তু আজকের পিপরওয়া। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের ফলে জিজরওয়া ও গণবারিয়া অঞ্চল জুড়ে পাওয়া গিয়েছে শাক্যবংশের অতীত রাজপাটের নানান নিদর্শন, ধ্বংসাবশেষ। বিশ্বের সমস্ত বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বিশ্বাস এখানে সিদ্ধার্থের শৈশব ও কৈশোর কেটেছিল।

কপিলাবস্তুর প্রথম বিবরণ পাওয়া যায় ফা-হিয়েনের বিবরণীতে। হিউ-এন-সাঙ-এর দুশো বছর আগে ফা-হিয়েন ভারতবর্ষে এসেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন গৌতম বুদ্ধের জীবনস্মৃতি বিজড়িত যে কপিলাবস্তু নগরী একসময় বহু লোকের কোলাহলে সবসময় মুখর হয়ে থাকত এখন সেই কপিলাবস্তু একেবারে মূক বধির হয়ে গিয়েছে। কোথাও কোনো প্রাণের স্পন্দন নেই। নগরী জনশূন্য বললেই হয়, কয়েকটি মাত্র পরিবার ও কয়েক জন ভিক্ষু এই বিরাট নগরীর ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও বাস করে।

হিউ-এন-সাঙ কপিলাবস্তুতে এসেছিলেন ২৫ ডিসেম্বর। চিনা ভাষায় কপিলাবস্তুর নাম কিয়ে-পিলো-ফ-মঝে-তি। তঁার ভ্রমণবৃত্তান্ত অনুসারে কপিলাবস্তু রাজ্যের সীমানা চার হাজার লি। দশটির মতো জনবসতিযুক্ত নগর রয়েছে। যদিও সবই ভীষণভাবে দুর্দশাগ্রস্ত। অধিকাংশই পরিত্যক্ত, জনবসতি নেই বললেই চলে। নগরের মধ্যে রাজপুরী। ইট দিয়ে তৈরি ভগ্ন ভবনের ভিত রয়েছে। একদা এখানে সহস্রাধিক বিহার ছিল। বর্তমানে সবই ভেঙে পড়েছে।

ম্রিয়মান হিউ-এন-সাঙ। তঁার স্বপ্নের কপিলাবস্তুর কী করুণ পরিণতি! তিনি চাননি এই দৃশ্য দেখতে। তঁার সঙ্গী স্থানীয় এক শ্রমণ সব কিছু ঘুরিয়ে দেখান।

রাজা শুদ্ধোদনের প্রাসাদের ভিতটুকু মাত্র অবশিষ্ট রয়েছে। তার উপর মন্দির। মন্দির মধ্যে রাজার ভগ্ন মূর্তি। এর উত্তরে রানি মহামায়ার শয়নমহল। পাশে ছোটো একটি মন্দিরের দেওয়ালে খোদাই করা চিত্র বোধিসত্ত্ব মাতৃজঠরে প্রবেশ করেছেন। সামান্য দূরে অশোক স্তূপ। অল্প দক্ষিণে সিদ্ধার্থ যশোধরার শয়নমহল। মন্দিরের গায়ে যশোধরা আর পুত্র রাহুলের মুর্তি। আরেক মন্দিরের গায়ে যুবরাজ সিদ্ধার্থের অশ্বারোহণের মূর্তি। নগরের দক্ষিণ প্রান্তে ছোটো একটি স্তূপে ভগবান বুদ্ধের দেহাবশেষ রয়েছে। সামনে সম্রাট অশোকের ত্রিশ ফুট উঁচু স্তম্ভ।

সমস্ত দিন নগর পরিক্রমা করে নিজের আশ্রমে ফিরে এলেন হিউ-এন-সাঙ। বিষণ্ণতার মধ্যেও গভীর এক তৃপ্তি। মনে পড়ে চিনের বৌদ্ধ বিহারে প্রথম স্বপ্ন দেখেছিলেন। যেখানে পড়েছে ভগবান বুদ্ধের পদধূলি, তার স্পর্শে প্রাণ-মন-আত্মা পূর্ণ হয়ে উঠবে একদিন। আজ সেই স্বপ্ন সফল হয়েছে। স্তূপ-প্রাসাদ-মন্দির যেখানেই গিয়েছেন ধূলি স্পর্শ করেছেন।

সঙ্গীরা সকলে অন্য ঘরে ঘুমিয়ে আছে। প্রথম রাতের ঘুম হয়েছে। এবার ধ্যানের সময়। ধীর পায়ে গৃহের বাইরে এসে দাঁড়ালেন। আকাশে পূর্ণচন্দ্র। তার আলোয় চারদিক আলোকময় হয়ে রয়েছে। সামনে যতদূর দৃষ্টি যায় স্তূপ মন্দির। দিনের আলোয় যাকে ধ্বংসস্তূপ মনে হয়েছে রাতের বেলায় মনে হচ্ছে সব যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

ধীর পায়ে এগিয়ে চলেন হিউ-এন-সাঙ। আচমকা কুয়াশার আবরণের মতো সব যেন অদৃশ্য হয়ে যায়। কাছে-দূরে কিছুই চোখে পড়ে না। একটা পাথরের বেদির উপর বসে পড়েন হিউ-এন-সাঙ। গভীর নিস্তব্ধতার মধ্যে ক্ষীণস্বর জেগে ওঠে, জয় ভগবান বুদ্ধের জয়। জয় ভগবান বুদ্ধের জয়।

চমকে উঠলেন হিউ-এন-সাঙ। কারা ভগবান বুদ্ধের জয়ধ্বনি করছে! সামনে চোখ মেলতেই দেখলেন কুয়াশার আবরণ কেটে গিয়েছে। যতদূর দৃষ্টি যায় প্রাসাদ, মন্দির, গৃহ, রাজপথ। রাজপথ ধরে চলেছেন একদল সন্ন্যাসী। সকলের আগে মুণ্ডিতমস্তক পীতবসনধারী ভগবান বুদ্ধ। হাতে ভিক্ষাপাত্র। তঁার দুই দিকে দুই শিষ্য সারিপুত্র আর মৌদ্গল্যায়ন। পথের দুই ধারে দাঁড়িয়ে নগরবাসী। সকলেই করজোড়ে তঁার বন্দনা করছে। চলেছেন বুদ্ধ। প্রতি পদক্ষেপে তঁার মধ্যে থেকে যেন বের হয়ে আসছে এক অমিত জ্যোতি। তিনি এসে দাঁড়ালেন প্রাসাদের আঙিনায়। প্রাসাদ থেকে বের হয়ে এল পুরনারীর দল, রাজপুরুষরা। সকলে অর্ঘ দিয়ে প্রণাম করে। স্মিতহাস্যে তাদের আশীর্বাদ করেন বুদ্ধ। একে একে সকলের প্রণাম গ্রহণ করে নিজের বিহারে ফিরে চলেন বুদ্ধ।

আবার সেই কুয়াশার আবরণ। তার মধ্যে ঢাকা পড়ে যায় দূরে বিলীয়মান ভগবান বুদ্ধ। আরেক দৃশ্য ভেসে ওঠে। কপিলাবস্তুর রাজপ্রাসাদের মধ্যে অপূর্ব সুসজ্জিত এক কক্ষ। সেখানে বসে আছেন যশোধরা। পরনে রাজবধূর বেশ নয়, সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীর মতোই সাধারণ পোশাক। তঁার চোখে-মুখে ক্ষোভ-যন্ত্রণা। যে-সিদ্ধার্থকে তিনি স্বামীরূপে পেয়েছিলেন, যাঁকে নিয়ে জীবনের পূর্ণতার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সে অকালে সব স্বপ্নকে দলিত করে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করে আজ ভগবান বুদ্ধ। সকলে তঁার জয়গান গাইছে। কিন্তু যশোধরা, তঁার জীবন তো মরুভূমির মতোই রুক্ষ। তঁার জীবনে তো নেমে এসেছে চরম বঞ্চনা। অন্তর জ্বালায় মনে হল, এই বঞ্চনার প্রতিশোধ নিতে হবে। সেই প্রতিশোধ নেবে পুত্র রাহুল। সন্তানের প্রতি ন্যূনতম কর্তব্যটুকুও তো পালন করেননি সিদ্ধার্থ। শুধু তো জন্ম দিলেই পিতা হওয়া যায় না, তাকে লালনপালন করতে হয়। সামনে বসে আছে সাত বছরের বালক পুত্র রাহুল। বললেন, তুমি পিতার কাছে যাও।

রাহুল বলল, আমি পিতার কাছে গিয়ে কী বলব ? যশোধরা বললেন, তুমি বলবে আমাকে পিতৃধন দাও। সন্তানকে পথ চলার পাথেয় দেওয়া পিতার কর্তব্য।

এক দাসকে বললেন যশোধরা, রাহুলকে নিয়ে যাও তার পিতার কাছে।

রাজপুত্রের সাজে সেজে রাহুল চলল তার পিতার কাছে। প্রাসাদে প্রতীক্ষা করে থাকেন যশোধরা।

সময় বয়ে চলে। চিন্তার রেখা ফুটে ওঠে যশোধরার চোখে-মুখে। কীসের কারণে রাহুলের এত বিলম্ব। তবে কি মহাভিক্ষু বুদ্ধ তঁার পুত্রকে দেখে বিচলিত হয়ে পড়েছেন। নিজের কাছে রেখে পুত্রকে স্নেহ ভালোবাসা দিচ্ছেন, কিংবা নিজের হাতে তাকে খাবার দিচ্ছেন। শেষপর্যন্ত তাহলে পুত্রের কাছেই পিতার পরাজয় হল।

হঠাৎ দ্বারে করাঘাত ওঠে। ছুটে যান যশোধরা। নিশ্চয়ই রাহুল ফিরে এসেছে। হয়তো একা পুত্র নয়, সঙ্গে পিতাও এসেছেন।

উন্মুক্ত করলেন দ্বার। সামনে সেই দাস, যে রাহুলকে নিয়ে গিয়েছিল তার পিতার কাছে। চারদিকে তাকালেন যশোধরা। জিজ্ঞাসা করলেন, রাহুল কোথায় ?

নতমস্তকে জবাব দেয় দাস। রাজকুমার ন্যগ্রোধারাম বিহারে। আপনার আদেশমতো রাজকুমার রাহুল ভগবান বুদ্ধের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তিনি কিছুক্ষণ পুত্রের দিকে চেয়ে রইলেন।

‘তারপর কী হল ?’ উৎকণ্ঠিত যশোধরা।

‘রাজকুমার বুদ্ধকে প্রণাম করলেন, তারপর বললেন পিতা আমাকে পিতৃধন দান করুন। বুদ্ধ বললেন, হ্যাঁ পুত্র তোমাকে আমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ দান করব। রাজকুমার রাহুল জিজ্ঞাসা করলেন কী সেই শ্রেষ্ঠ সম্পদ পিতা ?’

ভগবান বুদ্ধ বললেন, প্রব্রজ্যা। পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন সারিপুত্র। তঁাকে বললেন, রাহুলকে প্রব্রজ্যা দান করো। সে সন্ন্যাস নেবে।

‘পুত্র রাহুলও আজ সন্ন্যাসী!’ আর্ত চিৎকার করে উঠলেন যশোধরা। অসম্ভব, আমার সন্তানকে সন্ন্যাস নিতে দেব না; ফিরিয়ে আনব তাকে।

ছুটে গেলেন যশোধরা। প্রাসাদ অলিন্দে এসে দাঁড়াতেই দেখলেন রাজপথ ধরে এগিয়ে চলেছেন মহাসন্ন্যাসী বুদ্ধ। তঁার পাশে শিশু রাহুল মুণ্ডিতমস্তক, পীতবস্ত্র পরনে, হাতে ভিক্ষাপাত্র, কণ্ঠে মন্ত্রধ্বনি, বুদ্ধ শরণং গচ্ছামি। আর সহ্য করতে পারলেন না যশোধরা। পাথরের উপরেই জ্ঞান হারিয়ে মূর্ছিত হয়ে পড়লেন।

আবার চারদিকে নেমে আসে কুয়াশার আবরণ, তার মধ্যে রাহুল আর বুদ্ধের ছায়া একটু একটু করে অদৃশ্য হয়ে যায়।

মুহূর্তে চেতনার জগতে ফিরে আসেন হিউ-এন-সাঙ। অল্পক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকেন। ধীরে ধীরে মুখ তুলতেই দেখলেন তিনি যশোধরার কক্ষের সামনে বসে আছেন। ভূমির ওপরে নতজানু হলেন তারপর প্রণাম জানালেন। মহাভিক্ষু বুদ্ধকে নয়, রাহুলমাতা যশোধরাকে।

রাত শেষ হয়। ভোরের আলোয় সমস্ত প্রান্তর আলোকিত হয়ে ওঠে। হঠাৎ কারও মৃদু কণ্ঠস্বরে চেতনার জগতে ফিরে এলেন হিউ-এন-সাঙ।

তঁার সামনে দাঁড়িয়ে দুই শ্রমণ ও কয়েক জন ভিক্ষু। চারদিকে তাকালেন। তিনি ধ্বংসস্তূপের মাঝে যশোধরার প্রাসাদের সামনে পাথরের চাতালে বসে আছেন। মনে পড়ল আগের রাত্রিতে তিনি এখানে এসেছিলেন। এখানে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলেন জানতে পারেননি।

একজন শ্রমণ জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি এখানেই সমস্ত রাত ছিলেন ধর্মগুরু ?

মৃদুস্বরে হিউ-এন-সাঙ বললেন, না ভন্তে, মধ্যরাতে এসেছিলাম। এখানে আসতেই অপূর্ব কিছু দৃশ্য দেখলাম।

‘দৃশ্য!’ বিস্ময়ে সকলে একসঙ্গে বলে ওঠেন, কী সেই দৃশ্য ধর্মগুরু ?

আস্তে আস্তে হিউ-এন-সাঙ বললেন, দেখলাম আমার সামনে যেন হারিয়ে যাওয়া কপিলাবস্তু নতুন করে জেগে উঠেছে। প্রাসাদ-গৃহ-মন্দির-রাজপথ। পথের দু-ধারে কত মানুষ। তার মধ্যে দিয়ে চলেছেন মহাভিক্ষু ভগবান বুদ্ধ। দুই দিকে দুই শিষ্য সারিপুত্র আর মৌদ্গল্যায়ন। পেছনে কত ভিক্ষু। মহাভিক্ষু বুদ্ধের হাতে ভিক্ষাপাত্র। তঁার সমস্ত দেহ থেকে যেন জ্যোতি বার হয়ে আসছে।

উপস্থিত সকলে উচ্ছ্বাসে বলে ওঠে, ধন্য আপনার জীবন ধর্মগুরু। আমরা এতদিন এই পুণ্যস্থানে আছি, স্বপ্নের মধ্যেও ভগবান তথাগতের দর্শন পেলাম না। তারপর কী দেখলেন ?

‘দেখলাম মাতা যশোধরা রাহুলকে পাঠাচ্ছেন তঁার পিতা তথাগতের কাছে পিতৃধন চাইবার জন্য। ভগবান পুত্রকে মহাভিক্ষা দিলেন প্রব্রজ্যা। দেখলাম রাহুলমাতার সে কী করুণ মুখচ্ছবি। জ্ঞান হারিয়ে তিনি লুটিয়ে পড়লেন।’

‘তারপর ?’

‘তারপর আর কিছু জানি না।’

প্রবীণ শ্রমণ ধীর কণ্ঠে বললেন, শুনেছি শুধু রাহুল নন, যুবরাজ নন্দও সন্ন্যাস িনয়েছিলেন।

‘যুবরাজ নন্দ কার পুত্র ?’ জিজ্ঞাসা করলেন হিউ-এন-সাঙ।

সকলেই পরস্পরের মুখের দিকে তাকায়। যুবরাজ নন্দের প্রসঙ্গে এর বেশি কারোরই বেশি কিছু জানা নেই।

কে যুবরাজ নন্দ ? হাতের বইটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল অমিতাভ। হিউ-এন-সাঙ-এর মতো তার মনেও একই জিজ্ঞাসা।

একটু ভাবতেই আচমকা মনে পড়ে গেল কয়েক বছর আগে অজন্তায় গিয়েছিল। সেখানে দেখেছিল সেই অসামান্য ছবি, মরণাহত রাজকন্যা। প্রিয়তমের বিরহ যন্ত্রণায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে জনপদ কল্যাণী।

সেদিন প্রবল বৃষ্টি নেমেছিল। অজন্তা গুহায় মানুষজন ছিল না। তাই গাইড শুনিয়েছিল মরণাহত রাজকন্যার কাহিনি। যাকে ঘিরে এই কাহিনি তিনি যুবরাজ নন্দ।

বুদ্ধদেব তখন রয়েছেন কপিলাবস্তুর ন্যগ্রোধারামে। রাজপ্রাসাদে রয়েছেন মহারাজ শুদ্ধোদন। জ্যেষ্ঠপুত্র সিদ্ধার্থ সন্ন্যাস নিয়ে সংসার ত্যাগ করেছেন এই যন্ত্রণা কিছুতেই ভুলতে পারেননি, তবু ভুলতে হয়েছে। তিনি রাজা, তঁাকে রাজধর্ম পালন করতে হয়। হয়তো সময়ের স্রোতে মনের ক্ষতটুকুও শুকিয়ে এসেছিল। বয়সের ভারে দেহে-মনে ক্লান্তি এসেছে। তাই তিনি স্থির করলেন সিদ্ধার্থের েছাটোভাই মহাপ্রজাপতি গৌতমীর পুত্র কুমার নন্দকে রাজসিংহাসনে বসাবেন। আর রাজ্যভার তিনি বইতে পারছেন না, বার্ধক্য এসেছে, এবার বিশ্রাম। একবার মনে হয়েছিল সন্ন্যাসী হলেও গৌতম তঁার জ্যেষ্ঠপুত্র, তঁার সঙ্গে পরামর্শ করবেন। সংবাদ পাঠিয়েছিলেন, উত্তর এসেছিল পার্থিব কোনো বিষয়েই তিনি নিজের অভিমত দিতে চান না।

মনের সব দ্বিধাটুকু মুছে ফেলে ঘোষণা করলেন শুদ্ধোদন, যুবরাজ নন্দই হবে কপিলাবস্তুর রাজা।

কোথায় যুবরাজ নন্দ ? তিনি তখন নগরপ্রান্তে প্রমোদ-উদ্যানে। সঙ্গে কপিলাবস্তুর শ্রেষ্ঠ সুন্দরী কল্যাণী। দু-জনের গভীর ভালোবাসার কথা নগরের কারোরই অজানা নয়। রাজা শুদ্ধোদনের ইচ্ছা অভিষেকপর্বেই তঁাদের বিবাহের কথা ঘোষণা করবেন।

দিকে দিকে সেই শুভসংবাদ ছড়িয়ে পড়ল। ফুলের সৌরভে যেমন মৌমাছি আসে দলে দলে মানুষ আসতে থাকে কপিলাবস্তু নগরে। চারদিকে আনন্দের জোয়ার।

শুদ্ধোদন সংবাদ পাঠালেন বুদ্ধকে, তুমি রাজা না হও, রাজপ্রাসাদের আতিথ্য গ্রহণ করো।

পিতার সে-অনুরোধ ফিরিয়ে দিলেন বুদ্ধদেব। পরদিন নগরবাসী বিস্ময়ে দেখল আশ্চর্য এক দৃশ্য। যিনি হতে পারতেন কপিলাবস্তুর রাজা, তিনি ভিক্ষাপাত্র নিয়ে নগরবাসীর দরজায় দরজায় ভিক্ষা করছেন।

রাজপ্রাসাদের সকলে ক্ষুব্ধ। এ যে রাজপরিবারের অমর্যাদা। বুদ্ধ বললেন, আমি ভিক্ষু, সন্ন্যাসী। পূর্বাশ্রমে কী ছিলাম তা আজ আমার কাছে মূল্যহীন। সারাদিন ভিক্ষা করে ফিরে এলেন ন্যগ্রোধারাম বিহারে।

হঠাৎ সংবাদ পেলেন যুবরাজ নন্দ এসেছেন। সাদরে তঁাকে আহ্বান করলেন বুদ্ধ। কতদিন পর দেখা হল দুই ভাইয়ের।

আনন্দে উচ্ছ্বাসে ভরপুর নন্দ। শুধু সিংহাসন নয়, পাবে তঁার প্রেমাস্পদ কল্যাণীকে। হঠাৎ বুদ্ধের দিকে তাকিয়ে বললেন, এই সিংহাসন, রাজসুখ, যশোধরার মতো সুন্দরী স্ত্রী, রাহুলের মতো পুত্রকে ত্যাগ করে কী পেলেন ?

বুদ্ধদেব কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকেন কনিষ্ঠ ভ্রাতার দিকে। তারপর বললেন, আমি যা পেয়েছি তা এই সংসার, রাজসুখ, পত্নী, সব কিছুর চেয়ে বড়ো। সব পার্থিব কামনার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।

‘কী সেই বস্তু?’

বুদ্ধ বললেন, যদি তোমার আগ্রহ থাকে আমি বলব।

দ্বার রুদ্ধ হল। সমস্ত রাত দুই ভাইয়ের মধ্যে কি কথা হল কেউ তা জানতে পারলেন না। বাইরে সকলে উৎকণ্ঠায় প্রতীক্ষা করে।

ভোরবেলায় দ্বার খুলে বার হয়ে এলেন বুদ্ধ। সামনে দাঁড়িয়ে সারিপুত্র। তিনি বললেন, নন্দকে প্রব্রজ্যা দান করো। সে সন্ন্যাস নেবে।

অল্পক্ষণের মধ্যে সংবাদ পৌঁছে গেল রাজপ্রাসাদে। ছুটে এলেন গৌতমী, রাজা শুদ্ধোদন। দেখলেন যুবরাজ নন্দকে। দেহে পীতবসন, হাতে ভিক্ষাপাত্র। হায় হায় করে উঠলেন সকলে। কান্নায় ভেঙে পড়লেন গৌতমী। স্থির শাস্ত নন্দ। যিনি ঘরের মোহ ত্যাগ করেছেন, আর তো তিনি ঘরে ফিরবেন না।

এই দুঃসংবাদ পৌঁছোতে বিলম্ব হয় না নন্দপ্রেমিকা কল্যাণীর কাছে। এত বড়ো আঘাত সহ্য করবার ক্ষমতা ছিল না তঁার। একটু একটু করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন।

কেউ মনে রাখেনি কল্যাণীকে। মনে রেখেছিলেন অজন্তার কোনো শিল্পী। তঁার তুলিতেই অমর হয়ে আছেন রাজকন্যা।

কিন্তু এই ঘটনাই তো শেষ নয়। অজন্তার গাইড আর এক কাহিনি শুরু করেন।

প্রথমে সিদ্ধার্থ তারপর নন্দ দুই যুবরাজই সন্ন্যাস নিয়ে চলে গেলেন। প্রথমে ভেঙে পড়লেও নিজের মনকে শক্ত করলেন শুদ্ধোদন। সিংহাসন তঁাকে মুক্তি দেবে না, যতদিন-না রাজপুত্র রাহুল সিংহাসনের উপযুক্ত হয়।

ওদিকে নন্দের কাছে দুঃসংবাদ এসে পৌঁছোতে বিলম্ব হল না। তঁার প্রাণসখা কল্যাণী আর এই জগতে নেই। শোকে বিহ্বল হয়ে গেলেন নন্দ।

‘বুদ্ধ বললেন, কেন তোমার এই বিরহযন্ত্রণা ? তুমি কি আমার উপদেশে কোনো কিছুই শিক্ষালাভ করনি ?’

বিষণ্ণ কণ্ঠে নন্দ বলেন, কল্যাণীর মতো এমন নারী এই জগতে কোথাও নেই। তঁার বিরহযন্ত্রণা আমি কেমন করে ভুলব।

বুদ্ধ বললেন, তোমার এই ধারণা ভ্রান্ত নন্দ। তোমার কল্যাণীর চেয়েও এই বিশ্বে আরও অনেক বেশি সুন্দরী নারী আছে, তাদের দেখলে তোমার মনে হবে কত তুচ্ছ এই কল্যাণী।

মানতে পারেন না নন্দ। বুদ্ধ তঁাকে নিয়ে গেলেন স্বর্গে। দেখালেন কল্যাণীর চেয়েও সুন্দরী অপ্সরার দল চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কী অপরূপ তাদের দেহলাবণ্য।

নন্দ ভুলে গেলেন কল্যাণীকে। বললেন, আমি ওই অপ্সরাদের মতো সুন্দরী রমণীরত্ন চাই।

হাসলেন বুদ্ধ। বললেন, এও তোমার মনের ভ্রান্তি নন্দ। ওই সুন্দরী অপ্সরাদের চেয়েও আরও সুন্দর আরও মহৎ বস্তু আছে, যা পেলে তুমি ওই অপ্সরাদেরও ভুলে যাবে।

‘কী সেই বস্তু ?’ জিজ্ঞাসা করলেন নন্দ।

বুদ্ধ বললেন, যা পরমসত্য তাকে জানো। ত্যাগ আর সাধনার মধ্যে দিয়েই তাকে খুঁজে পাবে।

মুহূর্তে নিজের ভ্রান্তিটুকু উপলব্ধি করলেন নন্দ। বুদ্ধের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে ধর্মের পথে এগিয়ে গেলেন।

ওদিকে রাজপুত্র রাহুল পিতার কাছে এসে পিতৃধন প্রার্থনা করলেন। পুত্রকে সন্ন্যাস দিয়ে পিতার কর্তব্য পালন করলেন ভগবান বুদ্ধ।

রাজপ্রাসাদে ছিলেন শুদ্ধোদন। রাজ প্রতিহারী রাহুলের সংবাদ দিতে আর সহ্য করতে পারলেন না রাজা শুদ্ধোদন। পুত্রের এত বড়ো অন্যায় কিছুতেই মেনে নেবেন না। রাজা হিসেবে তঁার কর্তব্য স্থির করে নিলেন। বললেন, এখনই রথ বার করো, আমি যাব আমার পুত্রের কাছে।

বিহারে নিজের আসনে বসে ছিলেন ভগবান বুদ্ধ। রাজা শুদ্ধোদন সামনে এসে দাঁড়ালেন। ক্রুদ্ধস্বরে প্রশ্ন করলেন, কীসের অধিকারে তুমি শিশু রাহুলকে প্রব্রজ্যা দান করলে ?

এতটুকু বিচলিত হলেন না বুদ্ধ। শান্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, রাহুলের মাতা আমার কাছে তঁার সন্তানকে পাঠিয়েছিল পিতৃধন চেয়ে নেবার জন্য।

তীক্ষ্ণস্বরে শুদ্ধোদন বললেন, কীসের পিতৃধন ? তুমি সংসারত্যাগী সন্ন্যাসী। তুমি সংসারের কারও পিতা নও, কারও পুত্র নও, কারও স্বামী নও।

বুদ্ধ নতমস্তকে বললেন, যে-পুত্রকে আমি এই পৃথিবীতে নিয়ে এসেছি তার সম্পর্ক অস্বীকার করি কী করে পিতা। সে যখন আমার কাছে পিতৃধন চাইল তাকে দান করার মতো আর তো কোনো সম্পদ নেই। যা আছে তাই দান করলাম।

স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ পুত্রের দিকে চেয়ে রইলেন রাজা শুদ্ধোদন। অকস্মাৎ তঁার মধ্যে প্রবল ক্ষোভ আর ক্রোধ জেগে উঠল। বললেন, তুমি বিশ্বের মানুষের কাছে ভগবান বুদ্ধ হতে পারো, আমিও রাজা শুদ্ধোদন। তোমার কথার জালেই তোমাকে বন্দি করব। তোমার পুত্র কি তোমার দান গ্রহণে বাধ্য ?

বুদ্ধ বললেন, বাধ্য মহারাজ। পুত্র কখনো পিতার আদেশ, তার দান অস্বীকার করতে পারে না।

পুত্র-পৌত্রের বিচ্ছেদ বেদনায় কঠিন হয়ে উঠেছে রাজা শুদ্ধোদনের সমস্ত হৃদয়। বজ্রকণ্ঠে বললেন, হে সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী, আমি রাজা শুদ্ধোদন, পুত্র সিদ্ধার্থের উদ্দেশে বলছি সে কি পিতার আদেশ বিনা বিচারে মেনে নেবে ?

নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন বুদ্ধ। করজোড়ে বললেন, পিতা যে-আদেশ দেবেন, কোনো বিচার না করে, কোনো প্রশ্ন না করে নতমস্তকে সেই আদেশ মেনে নেবে তার পুত্র। এ তঁার পিতৃধন, এই পিতৃধন সে নিতে বাধ্য।

চমকে উঠলেন চারপাশে উপস্থিত সকলে। এ কী বললেন ভগবান বুদ্ধ। রাজা শুদ্ধোদন যদি তঁাকে পুনরায় সংসারজীবনে ফিরে যেতে বলেন, তিনি কি তাই করবেন। সকলের চোখে মুখে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা।

শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন তথাগত। কেমন যেন বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছেন শুদ্ধোদন। পুত্র যে এভাবে তঁার কথা মেনে নেবে হয়তো ভাবতে পারেননি।

মুখ তুলে তাকালেন, সামনে করজোড়ে দাঁড়িয়ে তারই পুত্র। গোটা জগৎ আজ যাঁকে দেবতা জ্ঞানে পুজো করছে। সামান্য দূরে নতমস্তকে দাঁড়িয়ে পুত্র নন্দ, পৌত্র রাহুল। কারও পরনে রাজবেশ নেই, তবু কী দীপ্তি ফুটে উঠেছে সকলের মধ্যে। কেমন যেন বিভ্রান্ত হয়ে যান শুদ্ধোদন। মনের ক্ষোভটুকু চেপে রাখতে পারেন না, এই সিদ্ধার্থের জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যুকে বরণ করে নিতে হল জ্যেষ্ঠামহিষী মায়া দেবীর। এই পুত্রকে সংসার-আসক্ত করবার আনন্দই ছিল জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। দেশের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী যশোধরার সঙ্গে বিবাহ দিলেন। মাত্র কয়েকটা বছরের সুখ ছাড়া কী পেল রাজবধূ যশোধরা। শুধুই তো বিরহযন্ত্রণা। আর রাহুল, সে কখনো জানল না পিতার ভালোবাসা কী। প্রজাপতি গৌতমী, যিনি সিদ্ধার্থকে গর্ভে ধারণ না করেও আপন সন্তানের চেয়েও বেশি স্নেহ দিয়েছেন, সন্তান বিরহের যন্ত্রণা কী তঁাকে ভোগ করতে হয়েছে। আর কল্যাণী, তঁার মৃত্যুর জন্যেও তো দায়ী সকলের ভগবান তথাগত বুদ্ধ। যশোধরা, সে বার বার মূর্ছিত হয়ে পড়ছে। এত মানুষের প্রতি অবিচার করেছে মানুষের চোখে যিনি ভগবান।

নিজেকে আরও কঠোর করলেন শুদ্ধোদন। অন্যায় করলে ভগবানেরও ক্ষমা নেই। তিনি রাজা তঁার হাতে রাজদণ্ড। বিচার করে শাস্তি দিতে হবে অবাধ্য পুত্রকে। কী শাস্তি দেবেন সিদ্ধার্থকে ? বলবেন ফিরিয়ে দাও আমার পুত্র নন্দকে, ফিরিয়ে দাও আমার পৌত্র রাহুলকে। তোমরা ফিরে এসো গার্হস্থ্যাশ্রমে। ফিরে যেতে বলবেন সেইসব ভিক্ষু সন্ন্যাসীদের যারা মায়ের কোল খালি করে এসেছে তোমার কাছে। তুমি স্বীকার করেছ পিতৃআজ্ঞা পালন করবে। যেমন ভগবান রাম পিতৃসত্য পালনের জন্যে বনবাসে গিয়েছিল।

নিজেকে প্রস্তুত করলেন শুদ্ধোদন। এবার তিনি আদেশ দেবেন। পুত্রের মুখের দিকে তাকালেন। সামনে দু-হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিশ্বমানবের ভগবান তথাগত বুদ্ধ।

‘আমাকে পিতৃধন দিন পিতা।’

মুহূর্তে কেমন যেন বিহ্বল হয়ে গেলেন শুদ্ধোদন। মনে হল কোথাও কিছু নেই। চারপাশে সব কিছু যেন অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। শুধু এক জ্যোতির্ময় পুরুষ তঁার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

সব যেন কেমন বিস্মৃত হয়ে গেল শুদ্ধোদনের মন থেকে। ক্ষোভ, বিক্ষোভ, ক্রোধ, যন্ত্রণা, অনুযোগ কিছুই আর স্মরণে আসে না। অস্ফুটে বললেন, তুমি পিতৃধন গ্রহণ করো পুত্র। এ শুধু পিতা হিসেবে নয়, রাজা হিসেবেও আমার আদেশ_পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়া আর কোনো শিশু বালককে প্রব্রজ্যা দান করবে না।

শুদ্ধোদনের কথা শেষ হতেই সেই জ্যোতির্বলয় শূন্যে মিলিয়ে যায়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে শিষ্য পরিবৃত ভগবান বুদ্ধ দাঁড়িয়ে রয়েছেন।

পিতার দিকে চেয়ে বুদ্ধ বললেন, আপনার আদেশ আমি মেনে নিলাম পিতা।

সন্ন্যাস গ্রহণের পর জীবনে এই একটি বার মাত্র কারও আদেশ কোনো বিচার ছাড়াই অবনত মস্তকে গ্রহণ করেছিলেন মহামানব বুদ্ধ।

সকল অধ্যায়
১.
গভীর গহন এক রাত
২.
আলোর পথে
৩.
প্রথম সকাল
৪.
রাত্রি শেষ
৫.
যাত্রা হল শুরু
৬.
সীমান্ত পথ
৭.
মৃত্যু উপত্যকা
৮.
মরুদ্যান
৯.
হামি
১০.
তুরফান
১১.
কুচা
১২.
বরফের দেশে
১৩.
ইশিক কুল
১৪.
সমরখন্দ
১৫.
লৌহকপাট
১৬.
বামিয়ান
১৭.
গান্ধার
১৮.
ছায়াগুহা
১৯.
পুরুষপুর
২০.
তক্ষশীলা
২১.
কাশ্মীর
২২.
শাকল
২৩.
জলন্ধর থেকে কুলু
২৪.
মথুরা
২৫.
কান্যকুব্জ
২৬.
অযোধ্যা থেকে কৌশাম্বী
২৭.
প্রয়াগ
২৮.
শ্রাবস্তী
২৯.
কপিলাবস্তু
৩০.
লুম্বিনী
৩১.
কুশীনগর
৩২.
বারাণসী
৩৩.
সারনাথ
৩৪.
বৈশালী
৩৫.
মগধ
৩৬.
শীলভদ্র বিহার
৩৭.
গয়া
৩৮.
বুদ্ধগয়া
৩৯.
বোধিবৃক্ষ
৪০.
মহাভিক্ষুণী
৪১.
রাজগৃহ
৪২.
মানসলোক
৪৩.
নালন্দা
৪৪.
ভারত পরিক্রমা
৪৫.
আবার নালন্দা
৪৬.
শরণাগত

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%