চঞ্চলকুমার ঘোষ
শ্রীনগর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে পাহাড়ি পথ ধরে এগিয়ে চললেন হিউ-এন-সাঙ। পথে পুনাক, রাজপুর, চেহকা। হিউ-এন-সাঙ তঁার ভ্রমণবৃত্তান্তে এইসব জায়গার কথা লিখেছেন। মানুষজন সাহসী স্পষ্টবাদী। তবে বেশিরভাগই রুক্ষ প্রকৃতির। ভাষা অমার্জিত। শিষ্টতাবোধ কম। অসৎ প্রকৃতির। সীমান্ত প্রদেশের অদিবাসীদের চেয়ে ভারতের অভ্যন্তরের মানুষজন কোমল প্রকৃতির। বৌদ্ধরা সংখ্যায় অল্প। অবৌদ্ধরা সংখ্যায় অনেক বেশি। বহু বৌদ্ধ বিহার যেমন রয়েছে তেমনি দেবমন্দিরও রয়েছে। পথিকের বিশ্রামের জন্যে ধর্মশালা রয়েছে। সেখানে আহার মেলে। কোথাও অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা হয়।
কাশ্মীর থেকে যাত্রা করে দু-মাস পরে এসে পৌঁছোলেন শাকল। বর্তমান কালের শিয়ালকোট। এক সময় শাকল ছিল হূন রাজা মিহিরকুলের রাজধানী। শোনা যায় মিহিরকুল একবার বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে কিছু জানবার জন্যে বৌদ্ধ বিহারে একজন শিক্ষক চেয়ে পাঠান। সেই সময়ে রাজপ্রাসাদে এক বৌদ্ধভিক্ষু কাজ করতেন। বৌদ্ধ বিহারের আচার্য সেই ভিক্ষুকে মিহিরকুলের শিক্ষক হিসেবে মনোনীত করেন। একজন ভৃত্য তঁার শিক্ষক হবে। অপমানে ফেটে পড়লেন মিহিরকুল। এই অপমানের শোধ নেবার জন্যে সমস্ত বৌদ্ধ বিহারই শুধু ধ্বংস করলেন না, অসংখ্য বৌদ্ধকে হত্যা করেন। শোনা যায় ষোলোশো বৌদ্ধ বিহার তিনি ধ্বংস করেন।
হিউ-এন-সাঙ শাকলে শুধু ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই দেখেননি। এখানে এক রাত্রি বাস করে আবার এগিয়ে চললেন। খানিক দূর যেতেই জঙ্গল শুরু হল। হিউ-এন-সাঙ-এর সঙ্গীদের মধ্যে একজন বললেন, ধর্মগুরু, শুনেছি এই জঙ্গলে ডাকাতদের আস্তানা।
হিউ-এন-সাঙ বললেন, তথাগতের উপর ভরসা রাখো। তিনি তোমাদের সব বিপদ থেকে উদ্ধার করবেন। চিন থেকে যাত্রা করে বহুবার আমার জীবন বিপন্ন হয়েছে। মৃত্যু ছিল নিশ্চিত। কোন অদৃশ্য পথে ভগবান তথাগতের করুণা আমার উপর এসেছে জানতেও পারিনি।
জঙ্গলের পথ ধরে কিছু দূর যেতেই একটা দিঘি। সামান্য জল। অনেকটা পথ এসে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন সকলে। বিশ্রামের জন্যে দিঘির পাড়ে বসে পড়লেন সকলে। আচমকা প্রবল চিৎকারে চমকে উঠলেন সবাই। মুখ ফেরাতেই দেখতে পেলেন ভয়ংকর চেহারার একদল দস্যু। হাতে তলোয়ার, বর্শা। সকলেই বুঝতে পারে এই ভয়ংকর ডাকাতদলের হাত থেকে নিস্তার নেই। প্রাণ বাঁচাতে অনেকেই দিঘির জলে ঝঁাপিয়ে পড়ল। যারা সঁাতার জানে না তারা লুকিয়ে পড়ল এধারে ওধারে। নিজের কথা ভাবছিলেন না হিউ-এন-সাঙ, এতগুলো মানুষের জীবন বিপন্ন হতে চলেছে সে কথা ভেবেই বিষণ্ণ হয়ে গেলেন। অস্ফূটে বললেন, সকলকে রক্ষা কর তথাগত।
ডাকাতরা লুঠতরাজ করবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। সেই সু্্যোগে কয়েকজন জঙ্গলের প্রান্তে এক গ্রামে এসে পৌঁছায়। সেই গ্রামের পুরুষরা যেমন বলশািল তেমনি সাহসী। তারা িহউ-এন-সাঙ-এর সঙ্গীদের দেখে বলল, কে অাপনাদের এই দুরবস্থা করল। তারা সব কথা বলতেই গ্রামবাসীরা অস্ত্র নিয়ে ছুটে চলল দিঘির দিকে। ডাকাতরা ভাবতে পারেনি এত মানুষ ছুটে অাসবে। যে যা পারল তাই নিয়ে পালিয়ে গেল।
সকলেরই কম বেশি কিছু জিনিস লুট হেয় গিয়েছে, প্রত্যেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। শুধু নির্বিকার হিউ-এন-সাঙ। একজন বলল, ডাকাতরা অাপনার জিনিস নিয়ে চলে গেল, তবু অাপনি কেমন করে এত শান্ত হয়ে অাছেন ?
হিউ-এন-সাঙ হাসিমুখে বললেন, পৃথিবীতে সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু হচ্ছে এই জীবন। সেই জীবন ফিরে পেলে অন্য ক্ষয়ক্ষতির জন্যে বিচলিত হওয়া কেন ?
গ্রামের লোকেরা নিরাপদে সকলকে জঙ্গলের সীমানা পার করে নগরে পৌঁছে দিল। এই নগরে বাস করতেন এক ব্রাহ্মণ। তিনি ছিলেন নাগার্জুনের শিষ্য। তঁার কত বয়স হয়েছিল কেউ জানে না। কেউ বলে দুশো, কেউ বলে তিনশো। যদিও তঁাকে দেখে মনে হয় ত্রিশ বছরের এক যুবা। ব্রাহ্মণের দুই শিষ্য ছিল যাদের বয়েস একশো পেরিয়ে গিয়েছিল। ইতিমধ্যেই হিউ-এন-সাঙ-এর খ্যাতি বহুদূর পৌঁছে গিয়েছিল। ব্রাহ্মণ তঁার কথা আগেই শুনেছিলেন। সাদরে হিউ-এন-সাঙকে নিয়ে এলেন নিজের গৃহে এবং অনুচরদের দিয়ে কাছের গ্রামে খবর পাঠালেন চিন দেশ থেকে এক মহাজ্ঞানী বৌদ্ধ পণ্ডিত এসেছেন। পথে দস্যুরা তঁার বহু কিছু লুঠ করে নিয়ে গিয়েছে। সব বৌদ্ধরা যেন তঁার সেবার ব্যবস্থা করেন।

অল্পক্ষণের মধ্যেই গোটা নগরে ছড়িয়ে পড়ল হিউ-এন-সাঙ-এর আগমনবার্তা। দলে দলে মানুষ এসে জড়ো হতে থাকে ব্রাহ্মণের কুটিরে। সকলের হাতে খাদ্য উপহার।
অল্পক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে তাদের কাছে এলেন হিউ এন-সাঙ। সকলেই তঁার কথা, উপদেশ শুনতে চায়। তিনি জানেন সাধারণ মানুষের জীবন কী যন্ত্রণাময়। তথাগতের উপদেশ এইসব গৃহস্থ মানুষের জীবনে শান্তি নিয়ে আসতে পারে। উপস্থিত মহিলাদের মধ্য থেকে একজন বললেন, হে ধর্মগুরু, সংসারে থেকেও কীভাবে মেয়েরা ধর্মজীবন পালন করতে পারে ?
হিউ-এন-সাঙ বললেন, তোমরা বিশাখার মতো হও।
‘বিশাখা কে ধর্মগুরু ?’
হিউ-এন-সাঙ বললেন, বিশাখা ছিলেন এক ধনী পরিবারের কন্যা। বাবার নাম বামমিত্র। বিশাখা ছিলেন যেমন সুন্দরী তেমনি গুণবতী। সেই সময়ে নগরে মেগারা বলে এক ধনী ব্যক্তি থাকতেন। তঁার ছেলের বিয়ের জন্যে উপযুক্ত পাত্রী খুঁজছিলেন। আর এই কাজের ভার দিয়েছিলেন এক ঘটকের উপর। একদিন ঘটক নগরের পথ দিয়ে চলেছে, এমন সময়ে তার চোখে পড়ল বিশাখা তার সখীদের নিয়ে কোথায় চলেছেন। প্রথম দর্শনেই বিশাখাকে ঘটকের ভালো লাগে। তঁাকে অনুসরণ করে এগিয়ে চলল। কিছু দূর গিয়ে এক সরোবর। সেখানে সবাই স্নান করবার জন্যে এসেছে। বিশাখার সখীরা সবাই আনন্দ-উচ্ছ্বাস করছে। ছোটাছুটি করছে। বিশাখা শান্তভাবে সরোবরের ঘাটে বসে থাকেন। সকলে যখন জলে স্নান করবার জন্যে নামল, বিশাখা তাদের সঙ্গে নামলেন। স্নান সারা হতেই দাসীরা খাবার বার করে। সখীরা আগে যে যার ভাগের খাবার খেয়ে নিয়ে যেটুকু পড়ে থাকল তা দাসীদের মধ্যে বিলিয়ে দিল। বিশাখা আগে দাসীদের খাবার দিয়ে, তারপর নিজে খেলেন। বিশাখার এই আচরণ দেখে ঘটকের খুব ভালো লাগল। কাছে গিয়ে তার পরিচয় জিজ্ঞেস করল। বিশাখা নিজের পরিচয় দিতেই ঘটক বলল, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি সকলে যখন আনন্দ-উচ্ছ্বাস করছিল তুমি তখন কেন শান্তভাবে বসে ছিলে ?
বিশাখা বলল, যদি ছোটাছুটি করতে গিয়ে আমার আঘাত লাগে, হাত-পা ভাঙে, কেউ আমাকে বিবাহ করবে না। সারা জীবন বাবার ঘরেই বোঝা হয়ে থাকতে হবে। সেই ভবিষ্যতের কথা ভেবেই শান্ত হয়ে ছিলাম।
ঘটক বলল, স্নানের আগে সকলে যখন নিজের পোশাক খুলে ফেলল, তুমি তখন কেন নিজের পোশাক খুললে না ? কেন পোশাক পরে জলে নামলে ?
বিশাখা বলল, লজ্জা নারীর শোভা, তার মর্যাদা। নারীদের অনাবৃত দেহ কখনোই বাইরের মানুষের সামনে প্রকাশ করা উচিত নয়। তাই আমি পোশাক পরে জলে নেমেছিলাম।
ঘটক বলল, এখানে তো কেউ ছিল না।
বিশাখা বলল, আপনি তো ছিলেন। তা ছাড়া কে কোথায় আছে আমার পক্ষে দেখা সম্ভব নয়।
ঘটক একটু চুপ করে থেকে বলল, তোমার সখীরা দাস-দাসীদের কথা না ভেবে নিজেরাই সব খেয়ে নিল। তুমি সকলকে খাইয়ে তবে নিজে খেলে।
দ্বিধাহীনভাবে বিশাখা বললেন, দাসীরা সারাদিন কত কাজ করে, আমাদের সেবা করে। তার বিনিময়ে ওরা কতুটুকু পায়। এমনকী দু-বেলা ভালো খাবারও পায় না।
বিশাখার সব কথা শুনে ঘটকের খুব ভালো লাগল। সে তখনই মেগারার কাছে গিয়ে বলল, আপনার ছেলের জন্যে উপযুক্ত পাত্রী পেয়েছি। রূপে গুণে তার কোনো তুলনা নেই।
মেগারার ছেলের সঙ্গে বিশাখার বিয়ে হয়ে গেল। সকলেই সুখী। কিছুদিন যেতেই এক সমস্যা দেখা দিল। মেগারা ছিল ব্রাহ্মণ আর বিশাখা ছিলেন বুদ্ধের ভক্ত। মেগারার বাড়িতে যেসব সাধুরা আসত তারা কেউ বুদ্ধকে পছন্দ করত না। তারা মেগারার উপর চাপ দিতে আরম্ভ করল তোমার ছেলের বউ বুদ্ধের শিষ্য। বুদ্ধ একটা ভণ্ড, ধর্ম মানে না। যারা বুদ্ধকে মানে তারা পাপী। তোমার ছেলের বউও পাপী। ওকে ঘরে রাখলে সমস্ত পরিবারের অমঙ্গল। ওকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দাও।
মেগারা সাধুদের কথা বিশ্বাস করলেও বিশাখাকে ঘর থেকে তাড়াতে পারে না। কারণ তঁার কোনো দোষ খুঁজে পায় না। একদিন মেগারা ঘরে বসে সোনার বাটিতে করে পায়েস খাচ্ছিল, এমন সময় এক সন্ন্যাসী এসে ভিক্ষা চাইল। মেগারা কোনো কথা না বলে খেয়ে যেতে লাগল। সন্ন্যাসী তখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে দেখে বিশাখা বললেন, আপনি অন্য কোথাও যান। বাবা বাসি খাবার খাচ্ছেন।
মুহূর্তে রাগে ফেটে পড়ল মেগারা। ‘কী বললে তুমি, আমি বাসি খাবার খাচ্ছি ? এখনই দূর হয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে। তোমার মতো মিথ্যেবাদীর এখানে কোনো স্থান নেই।’
বিশাখা শান্তভাবে বলল, আপনি আমার কথার অর্থ বুঝতে পারেননি, তাই আমাকে দোষ দিচ্ছেন। মেগারা কোনো কথাই শুনতে চায় না। সে বিশাখাকে বলল, তুমি এখনই আমার ঘর থেকে চলে যাও।
বিশাখা বুঝতে পারলেন এ সবই সন্ন্যাসীদের ষড়যন্ত্র। তিনি বললেন, আমার বাবা বিয়ের সময় আট জন গুণী মানুষকে বলেছিলেন, আমার কোনো ভুল হলে তঁারা বিচার করবেন। আপনি সেকথা মেনে নিয়েছিলেন। এখন যদি আমার কোনো ভুল হয় তঁারাই বিচার করবেন। আপনি তঁাদের কথা না শুনে এভাবে আমাকে তাড়িয়ে দিতে পারেন না।
মেগারা তখন আট জন গুণী মানুষকে ডেকে পাঠাল। তঁারা আসতেই মেগারা সব কথা বলল। বিশাখা তখন বললেন, শ্বশুরমশাই আমার কথার অর্থ বুঝতে পারেননি। একজন সন্ন্যাসী সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও উনি তঁাকে ভিক্ষা না দিয়ে খেতে লাগলেন। এর অর্থ আগের জন্মে তিনি যা পুণ্য অর্জন করেছিলেন তার জেরেই সুখভোগ করছেন। নতুন করে পুণ্য অর্জন করছেন না। আট জনের মধ্যে যিনি বয়স্ক তিনি বললেন, বিশাখা ঠিক কথাই বলেছে।
মেগারা বললেন, তা হলেও ওর অনেক আচরণ আমরা মেনে নিতে পারছি না। ও বলে ঘরের আগুন বাইরে নিয়ে যাবে না। প্রতিবেশী কারও যদি আগুনের প্রয়োজন হয় তাহলে কি আমরা তাকে আগুন দেব না ?
বিশাখা বলল, ঘরের আগুন বলতে আমি পরিবারের দোষত্রুটির কথা বলতে চেয়েছি। কারও কোনো দোষ থাকলে বাইরের কারও কাছে তা প্রকাশ করা উচিত নয়। এতে পরিবারের ক্ষতি হয়।
মেগারা বলল, ও বলে বাইরের আগুন ঘরে আনা উচিত নয়। আমরা এতদিন বহু সময়েই ঘরে আগুন না থাকলে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে আগুন চেয়ে নিয়ে এসেছি।
বিশাখা বলল, আমি অন্য আগুনের কথা বলতে চেয়েছি। বাইরের কোনো লোক যদি ঘরের কারও নিন্দা করে তবে ঘরে এসে তা কখনোই বলা উচিত নয়। তাতে সংসারের শান্তি নষ্ট হয়। আমি আরও একটা কথা শিখেছি আমার মায়ের কাছে। আগুনের পরিচর্যা করো। এর অর্থ শ্বশুর শাশুড়ি স্বামী_তিন জনকেই আগুনের শিখার মতো পবিত্র মনে করতে হবে। মা আরও একটা কথা বলতেন, সুখে ঘুমোও। এর অর্থ সংসারের সব কাজ শেষ করে সকলকে দেখাশোনা করে তারপরে বিশ্রাম নাও। এবার বলুন আমার কোথায় দোষ ?
মেগারা নিজের ভুল বুঝতে পেরে বিশাখার কাছে শুধু ক্ষমা চাইল না, বিশাখার সঙ্গে বুদ্ধের ধর্মমত গ্রহণ করল।
বিশাখার জীবনকথা বলে সকলের দিকে তাকালেন হিউ-এন-সাঙ। সকলেই নিশ্চুপ। একজন মহিলা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমরাও আমাদের মেয়েদের এইরকম শিক্ষা দেব।
উপস্থিত সকলে তার কথায় সায় দেয়।
সভা ভাঙতেই হিউ-এন-সাঙ বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের কাছে গিয়ে যা-কিছু উপহার পেয়েছিলেন সব দিয়ে বললেন, আমি আপনার কাছে শতশ্রাস্ত্র বিষয়ে কিছু জানতে চাই।
বৃদ্ধ সানন্দে রাজি হলেন। সেখানে এক মাস রয়ে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। যে শহরে হিউ-এন-সাঙ ছিলেন তার নাম জানা না গেলেও সেই নগরের কথা তঁার জীবনীগ্রন্থে লেখা আছে। শহরের আয়তন ছিল যথেষ্ট বড়ো। সামান্য দূরে বিপাশা নদী। নানা ধরনের শস্য উৎপাদন হত সেখানে। নগরের চারদিক গাছপালায় ভরা। বেশিরভাগ নগরবাসী কৃষিকাজ করে। অন্যরা কেউ কামার, কেউ ঘরামি। তবে প্রায় সকলেই দুর্বল ভীরু প্রকৃতির। বৌদ্ধ ধর্মের মানুষের সঙ্গে অন্য ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বাস করে। রয়েছে দশটি বৌদ্ধ বিহার। ন-টি মন্দির। এই নগরের অল্প দূরে তোষাসন বিহার। একে বলা হয় িচনাভুক্তি। শোনা যায় সম্রাট কনিষ্কের সময়ে চিনের এক রাজা তার পুত্রকে রাজদরবারে পাঠিয়েছিলেন। সেই চিনা রাজপুত্রের গ্রীষ্মাবাস ছিল এখানে। তখন এই অঞ্চলের নাম হয় ‘চিনাভুক্তি’। সেই রাজকুমার এখানে চিন থেকে পিচ ও নাসপাতি গাছ এনে পুঁতেছিলেন। সেই থেকে এখানে ওই ফলের প্রচলন হয়।
তোষাসন বিহারে থাকতেন ত্রিপিটক বিশেষজ্ঞ আচার্য বিনীতপ্রভ। তিনি প্রাক-সন্ন্যাস জীবনে ছিলেন কোনো রাজ্যের রাজকুমার। যৌবনেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। তঁার সন্নিধ্যে এসে মুগ্ধ হলেন হিউ-এন-সাঙ। আচার্য বিনীতপ্রভও এই তরুণ সন্ন্যাসীর তীব্র জ্ঞানাকাঙ্ক্ষায় মুগ্ধ। সেখানে রয়ে গেলেন হিউ- এন-সাঙ। দীর্ঘ চোদ্দো মাস ধরে অধ্যয়ন করলেন ‘অভিধর্ম সমুচ্চয় ব্যাখ্যা’ আর ‘অভিধর্ম প্রকরণ শাসন শাস্ত্র’।
এত অধ্যয়ন করেও হিউ-এন-সাঙ-এর অন্তরের তৃষ্ণা মিটল না। মনে হতে থাকে এখনও জানার শেখার বহু কিছু বাকি। তা ছাড়া বহু তীর্থ যেখানে ভগবান তথাগতের পদচিহ্ন পড়েছিল, কবে তার ধূলি মাথায় নিয়ে ধন্য হবেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন