গান্ধার

চঞ্চলকুমার ঘোষ

দুই পাহাড়ের মাঝে সরু পথ দিয়ে হাঁটছিলেন হিউ-এন-সাঙ। সামনে-পিছনে তঁার সঙ্গীরা। অনেক আগেই তঁারা বামিয়ান পার হয়ে এসেছিলেন। রুক্ষ পথ। দু-ধারে জনবসতির কোনো চিহ্ন নেই। কিছু দূর গিয়ে পাহাড়ের পথ শেষ হয়েছে। সামনে ধুধু প্রান্তর। সকলেই ক্লান্ত। তঁারা সেই সূর্যোদয়ের আগে রওনা হয়েছেন, এখন দিন ফুরিয়ে এসেছে। কনকনে হাওয়া বইতে আরম্ভ করেছে। যত রাত নামবে চারপাশের প্রকৃতি আরও ঠান্ডা হয়ে আসবে। একজন বলল, ধর্মগুরু আজ রাতের মতো এখানে কোথাও বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হোক।

হিউ-এন-সাঙ-এর ইচ্ছা ছিল আর দশ লি পথ পার হয়ে কাপিশা প্রদেশের সীমান্ত অঞ্চলে বিশ্রাম নেবেন। সঙ্গীদের দিকে চেয়ে মনে হল তাদের পক্ষে আর পথ চলা সম্ভব নয়। বললেন, আজ এখানেই যাত্রা শেষ হোক। কাল সূর্য ওঠার আগেই রওনা হব।

পথের পাশে বিশাল কিছু পাথরখণ্ড, সেখানেই তঁাবু ফেলা হল। সঙ্গে যেটুকু খাবার অবশিষ্ট ছিল, সকলে ভাগ করে নেয়। সন্ধে নামতেই সকলে ঘুমিয়ে পড়ে। শুধু ঘুম আসে না হিউ-এন-সাঙ-এর। সমস্ত মন জুড়ে শুধু এক ভাবনা, কবে ভারতবর্ষের ভূমি স্পর্শ করবেন। আচমকা ভাবনার জগৎটুকু ছিন্ন হয়ে যায়। বাইরে প্রবল বাতাসের গর্জন। তঁাবুর ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকালেন হিউ-এন-সাঙ। চাঁদের আলোয় চোখে পড়ল বৃষ্টিধারার মতো আকাশ থেকে তুষার ঝরে পড়ছে। তঁাবুর সামনে কিছুটা অঞ্চল জুড়ে বরফ পড়ে সাদা হয়ে আছে। কিছুক্ষণ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকেন হিউ-এন-সাঙ। একসময় নিজের শয্যায় ফিরে এলেন। সারা রাত ধরে বরফ পড়ে। তার সঙ্গে ঝোড়ো বাতাসের তাণ্ডব। প্রার্থনায় বসলেন হিউ-এন-সাঙ।

সকালের আলো ফুটতেই সকলে তঁাবু থেকে বার হয়ে আসে। বরফে সাদা হয়ে আছে চারদিক। কেউ যেন রুপালি চাদর বিছিয়ে দিয়েছে মাটিতে। আবার যাত্রা শুরু হল। পথের কোনো চিহ্ন নেই। সঙ্গীদের সকলেই কেমন বিভ্রান্ত। পথপ্রদর্শক চিন্তিত স্বরে বলে, পাঁচ বছর আগে এই পথে এসেছিলাম। সব স্মরণে নেই। একটা ছোটো নদী পার হয়ে পুব দিকে গিয়েছিলাম।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, চিন্তার কিছু নেই। কিছু দূর গেলে নিশ্চয়ই পথের সন্ধান পাব।

অনেকক্ষণ পথ চলে সবাই। বেলা বাড়ে। সঙ্গের খাবার ফুরিয়ে গিয়েছে। গত রাতের পর আর কিছু খাওয়া হয়নি। উদভ্রান্তের মতো সকলে এদিক-ওদিক চায়। মাঝেমাঝে ঝোপঝাড়, ছোটো ছোটো টিলা। দূরে দৃষ্টি যায় না। উদবিগ্নভাবে পথপ্রদর্শক বলে, মনে হচ্ছে আমরা পথ হারিয়েছি। এতক্ষণ আমাদের কাপিশা নগরে প্রবেশ করার কথা। একটি মানুষও চোখে পড়ল না যাকে জিজ্ঞাসা করব।

সকলে কিছুক্ষণ সেখানে অপেক্ষা করে। হঠাৎ একজনের নজর পড়ে দূরে বিন্দুর মতো কিছু যেন এগিয়ে চলেছে। দ্রুত এগিয়ে যায় সে। এবার চোখে পড়ে দু-জন অশ্বারোহী। একসঙ্গে সকলে চিৎকার করে ওঠে, এ ঘোড়সওয়ার এদিকে এসো।

নিস্তব্ধ প্রান্তর পেরিয়ে সে ডাক পৌঁছোয় অশ্বারোহীর কাছে। মুখ ফেরাতেই তারা দেখতে পায় অচেনা কয়েক জন মানুষ। কিছু অনুমান করে এগিয়ে আসে। হাতে বর্শা। পিঠে তির-ধনুক। চেহারা দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, শিকার করতে চলেছে সকলে।

পথপ্রদর্শক বলে, আমরা কাপিশা নগরে যাব। পথের সন্ধান করছি।

‘এ তো নগরের পথ নয়। আপনারা ভুল পথে এসেছেন।’

‘কোন্ দিকে নগরের পথ ?’

কিছু ভাবে অশ্বারোহী। বলে, আমাদের সঙ্গে চলো। কাছেই নগরের পথ।

নিঃশব্দে সকলে তাদের অনুসরণ করে। কিছুদূর এগোবার পর পথের চিহ্ন চোখে পড়ে। অশ্বারোহী বলে, এই পথ ধরে এগিয়ে গেলেই কাপিশার সীমান্তচৌকি।

ফিরে যায় অশ্বারোহীর দল। কিছু দূর যেতেই সকলের চোখে পড়ে সীমান্তচৌকি। পাশেই রাজচিহ্নযুক্ত পতাকা উড়ছে। কয়েক জন সৈনিক সেখানে প্রহরায় রয়েছে। হিউ-এন-সাঙ ও তঁার সঙ্গীদের দেখে একজন প্রহরী এগিয়ে আসে। কয়েক পলক বিস্ময়ে হিউ-এন-সাঙ-এর দিকে তাকিয়ে থেকে বলেন, আপনি কোথা থেকে আসছেন  ?

‘সুদূর চিন থেকে। যাব ভগবান বুদ্ধের দেশ ভারতবর্ষে। এ কোন দেশ ?’

‘এ গান্ধার প্রদেশ। ভারতবর্ষের পশ্চিম প্রান্ত।’

চমকে উঠলেন হিউ-এন-সাঙ। উত্তেজিতভাবে বললেন, তবে কি আমি পবিত্র ভারতভূমিতে এসেছি ?

পথপ্রদর্শক বলে ওঠে, হ্যাঁ ধর্মগুরু, আপনি এখন ভারতভূমিতে এসে পৌঁছোছেন।

গভীর আবেগ আর প্রবল উত্তেজনায় হিউ-এন-সাঙ-এর সমস্ত শরীর থরথর করে কেঁপে ওঠে। ধীরে ধীরে মাটির ওপরে নতজানু হলেন। দু-চোখে জলের ধারা নামে। সৈনিকরা বিস্ময়ে হতবাক। জিজ্ঞাসা করে, কে এই মহাত্মন ?

‘ইনি চিনের মহাজ্ঞানী হিউ-এন-সাঙ। স্বয়ং তুরস্ক সম্রাট এঁকে গুরুর মতো সম্মান করেন। ইনি যেখানে যান রাজা-মহারাজা থেকে সাধারণ মানুষ সকলেই পরম শ্রদ্ধায় এঁর কাছে আসেন।’

বিদ্যুতের মতো সংবাদ পৌঁছে যায় নগরে। চিন থেকে এক মহাজ্ঞানী এসেছেন কাপিশায়। স্বয়ং রাজা আসেন পাত্র-মিত্র নিয়ে। ক্ষত্রিয় হলেও বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল রাজা। তঁার ইচ্ছা হিউ-এন-সাঙ রাজপ্রাসাদে আতিথ্য গ্রহণ করেন। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা মনে রেখে হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমি সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী। রাজগৃহে রাত্রিবাস নিষিদ্ধ। শুনেছি এই নগরে অনেক সংঘারাম আছে, সেখানেই কোথাও আশ্রয় নেব।

পথপ্রদর্শক বললেন, নগরের প্রান্তে পনজশির নদীর তীরে প্রাচীন এক সংঘারাম আছে, সেখানে সকলেই আমার পরিচিত। আপনি স্বচ্ছন্দে সেখানে আশ্রয় নিতে পারেন।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, সেখানেই চলো।

সংঘারামের প্রধান ভিক্ষু কাশ্যপ সাদরে অভ্যর্থনা জানালেন হিউ-এন-সাঙকে, ‘আপনার মতো মহাজ্ঞানীকে পেয়ে আমরা ধন্য।’

হিউ-এন-সাঙ বললেন, এই পবিত্র ভারতভূমিতে এসে আমিও ধন্য। এর প্রতি ধূলিকণায় ভগবান বুদ্ধের স্পর্শ। আমার কৈশোরের, যৌবনের স্বপ্ন, এখানে এসে বৌদ্ধ ধর্মের মহান শিক্ষকদের কাছে শিক্ষালাভ করব।

‘ভগবান তথাগত নিশ্চয়ই আপনার ইচ্ছা পূর্ণ করবেন। আপনি এখন বিশ্রাম করুন। কাল আপনার যাত্রাপথের বিবরণ শুনব।’

রাত্রি হয়। সঙ্গীরা সকলেই পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। হিউ-এন-সাঙ অনুভব করছিলেন তঁার দেহে-মনে কোনো ক্লান্তি নেই। শুধুই অপার এক আনন্দের অভিব্যক্তি।

কয়েক দিন কেটে যায়।

হিউ-এন-সাঙ-এর কয়েক জন সঙ্গী ফিরে গিয়েছে। সকালের প্রার্থনা সেরে নিজের কক্ষে বসেছিলেন হিউ-এন-সাঙ। ভিক্ষু কাশ্যপ তার কক্ষে প্রবেশ করে বললেন, মহাত্মন, আপনি এই সংঘারামের বাইরে কোথাও যাননি। এই কাপিশা নগরে ভগবান বুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বহু স্থান আছে।

তৎক্ষণাৎ হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমি সেইসব পবিত্র স্থান দর্শন করতে চাই। আপনি অনুগ্রহ করে যদি একজন সঙ্গী দেন যিনি আমাকে সব কিছুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারবেন তাহলে আমার বহুদিনের ইচ্ছা পূর্ণ হবে।

প্রসন্নভাবে কাশ্যপ বললেন, আমি আপনার সঙ্গী হব। আপনি প্রস্তুত হন। অল্পক্ষণের মধ্যে আপনাকে নিয়ে নগর পরিভ্রমণে বের হব।

ছোটো নগর কাপিশা। গান্ধার প্রদেশের এই অংশ একসময় ছিল ইরান সাম্রাজ্যের অংশ। আলেকজান্ডার এই সমস্ত অঞ্চল জয় করেন। এখানে গড়ে ওঠে গ্রিক আধিপত্য। সেই সময় মগধে চন্দ্রগুপ্ত তারপর বিন্দুসার প্রতিষ্ঠা করলেন মৌর্য সাম্রাজ্য। বিন্দুসারের পুত্র অশোক যুবরাজ অবস্থায় গান্ধারে বহুদিন ছিলেন। বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্যে দিকে দিকে গড়ে তুললেন সংঘারাম, স্তূপ, বৌদ্ধবিহার।

আলেকজান্ডারের সঙ্গে যে সমস্ত গ্রিক সৈন্যরা এদেশে এসেছিল তাদের মধ্যে অনেকেই আর দেশে ফিরে যায়নি। ধীরে ধীরে বেশিরভাগই বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নেন। তারা যেসব শিল্পকর্ম করেছিলেন তার মধ্যে একই সঙ্গে গ্রিক ও ভারতীয় শিল্পের অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছিল। একে বলা হত গান্ধার শিল্পশৈলী। এই শিল্পশৈলীতেই গান্ধারে সমস্ত স্থাপত্য গড়ে ওঠে।

হিউ-এন-সাঙ ভারতে আসার দুশো বছর আগে এদেশে আসে হূন ও তাতাররা। এরা ছিল যেমন হিংস্র-নৃশংস তেমনই বর্বর। এরা যেমন খুন, লুঠতরাজ করত অন্যদিকে মন্দির, স্তূপ, সংঘারাম ধ্বংস করে তার মধ্যে লুকিয়ে রাখা ধনসম্পদ লুঠ করত।

চারদিকে এত ধ্বংস দেখতে দেখতে কেমন বিষণ্ণ হয়ে গিয়েছিলেন হিউ-এন-সাঙ। বললেন, এইসব বৌদ্ধ স্তূপ কি নতুন করে সংস্কার করা যায় না ? কিছুক্ষণ চুপ করে কাশ্যপ বললেন, তার জন্যে অনেক অর্থের প্রয়োজন। আগে সম্রাটরা সাহায্য করতেন। তঁারা সকলেই ছিলেন ভগবান বুদ্ধের উপাসক। সম্রাট অশোকের পর সম্রাট কনিষ্কও এখানে বহু সংঘারাম, স্তূপ তৈরি করেছিলেন। খুব কাছেই একটা স্তূপ আছে। শোনা যায় ভগবান বুদ্ধের অস্থি এখানে স্থাপন করা হয়েছিল।‘কতদূরে সেই স্তূপ ?’ হিউ-এন-সাঙ-এর চোখে-মুখে তীব্র ব্যাকুলতা ফুটে ওঠে।

‘আমাদের সংঘারামের কাছেই।’

‘আমি সেই পবিত্র স্থান দর্শন করতে চাই।’

নদীর তীর ধরে নির্জন প্রান্তর। পায়ে চলা সরু পথ ধরে এগিয়ে চলেন দু-জন। আশপাশে লোকালয় নেই। ইতস্তত কিছু গাছ, ছোটো নদী, বালির ওপর দিয়ে তিরতির করে জল বয়ে চলেছে। কিছু দূর যেতেই চোখে পড়ল ভাঙা প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ চারদিকে ছড়িয়ে আছে। বিশাল বিশাল কয়েকটা স্তম্ভ অতীতের সাক্ষী হয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে। এখানে-ওখানে ঝোপঝাড়_প্রাণহীন পরিমণ্ডল। হিউ-এন-সাঙ জিজ্ঞাসা করলেন, এ কার প্রাসাদ ?

কাশ্যপ বললেন, যতদূর জানা যায়, সম্রাট কনিষ্ক বহু রাজা-রাজপুত্রকে যুদ্ধে হারিয়ে এখানে বন্দি করে রেখেছিলেন। তাদের সঙ্গে যা-কিছু রত্ন-অলংকার ছিল, সব এখানেই কোথাও মাটির নীচে পোঁতা আছে।

রত্ন অলংকারের প্রতি কোনো কৌতূহল ছিল না হিউ-এন-সাঙ-এর। বললেন, সেই পবিত্র স্তূপ কোথায় ?

প্রাসাদ পেরিয়ে কিছুদূর পর্যন্ত উন্মুক্ত প্রান্তর। তার মাঝে পাঁচ মানুষ সমান উঁচু গোলাকার পাথরের স্তূপ। স্তূপের গায়ে নানান কারুকার্য। মাঝে মাঝে বুদ্ধের মূর্তি খোদাই করা। বেশিরভাগই জীর্ণ, অস্পষ্ট। বোঝা যায় না কীসের মূর্তি। হিউ-এন-সাঙ অনুভব করলেন, নির্মাণের পর আর কখনো এটির সংস্কার হয়নি। এগিয়ে গিয়ে স্তূপ ম্পর্শ করে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন। তঁার সমস্ত শরীর জুড়ে নেমে আসে গভীর এক আবেশ। একসময় প্রশ্ন করলেন, ভগবান বুদ্ধ কি গান্ধারে এসেছিলেন ?

কিছু ভাবেন কাশ্যপ, তারপর বললেন, সম্ভবত তিনি এখানে আসেননি। তবে পুথিতে লেখা আছে বুদ্ধত্ব লাভ করার আগের কোনো এক জন্মে তিনি এখানে ছিলেন। একদিন বালক অবস্থায় পথের পাশে মাটি দিয়ে স্তূপ তৈরি করছিলেন। সেই সময় নগরের পথ দিয়ে চলতে চলতে রাজার দৃষ্টি পড়ল বালকের দিকে। জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি এখানে কী করছ ? বালক বললেন, আমি ভবিষ্যৎ বুদ্ধের উদ্দেশ্যে এই স্তূপ নির্মাণ করছি। উত্তরকালে কনিষ্ক নামে এক সম্রাট এই স্তূপ নির্মাণ করবেন।

ভগ্নস্তূপের দিকে গভীর মনোনিবেশে তাকিয়ে থাকেন হিউ-এন-সাঙ। এক জিজ্ঞাসা তঁার মনের মধ্যে জেগে ওঠে। বললেন, এই ভগ্নস্তূপ কি নতুন করে নির্মাণ করা যায় না ?

পাশেই ভগ্ন রাজপ্রাসাদের দিকে মুখ ফেরালেন, কাশ্যপ। বললেন, ওখানে আছে অতুল ঐশ্বর্য। একমাত্র যদি ওই ঐশ্বর্য উদ্ধার করা যায় তবেই স্তূপ নির্মাণ করা সম্ভব।

কৌতূহল জাগছিল হিউ-এন-সাঙ-এর। জিজ্ঞাসা করলেন ঐশ্বর্য উদ্ধারে বাধা কোথায় ?

গম্ভীর মুখে কাশ্যপ বললেন, যক্ষের দল ওই ঐশ্বর্য পাহারা দেয়। কারও সাধ্য নেই তা স্পর্শ করে। কয়েক বছর আগে এক দুষ্ট রাজা সৈন্য নিয়ে এসেছিল সব রত্নভাণ্ডার লুঠ করতে। আমাদের ক্ষমতা ছিল না তাকে বাধা দিই। বেশ কয়েক হাত মাটি খোঁড়া হতেই বিরাট চেহারার একটা পাখি কর্কশ স্বরে চিৎকার করে উড়ে এল। যারা মাটি খুঁড়ছিল সোজা গিয়ে তাদের মুখে আঘাত করল। মুহূর্তে মাটি থরথর করে কেঁপে উঠল। আকাশ জুড়ে অন্ধকার নেমে এল। রাজার লোকজন প্রাণের ভয়ে যে যেদিকে পারল ছুটে পালাল। তারপর সেই দুষ্ট রাজা আর কোনোদিন এখানে আসেনি।

হিউ-এন-সাঙ বললেন আমি কি চেষ্টা করতে পারি ?

হতবুদ্ধির মতো কাশ্যপ বললেন, যদি আপনি এই প্রাসাদের ধনসম্পদ উদ্ধার করতে পারেন তবে ভগবান বুদ্ধের এই স্তূপ নতুন করে নির্মাণ করা সম্ভব হবে।

কিছু ভাবলেন হিউ-এন-সাঙ। ভগ্ন প্রাসাদের সামনে এসে মাটির ওপর হাঁটু গেড়ে বসলেন। তারপর প্রার্থনা শুরু করলেন।

বাতাসের মতো চারদিকে খবর ছড়িয়ে পড়ল। দলে দলে মানুষ এসে ভিড় করে ভগ্ন প্রাসাদের চারপাশে। সকলেই বলে, ধর্মগুরু আপনি এই অভিশপ্ত প্রাসাদ থেকে ধনসম্পদ উদ্ধার করে দিন।

সংঘারামের সব ভিক্ষুরা সমবেতভাবে বলে, হে ধর্মগুরু, আপনার পক্ষেই এই সম্পদ উদ্ধার করা সম্ভব। তাই হয়তো ভগবান তথাগত আপনাকে এখানে পাঠিয়েছেন।

হিউ-এন-সাঙ আত্মসমাহিতের মতো ভূমি স্পর্শ করে প্রার্থনা করেন, হে ভূমিদেবতা, তুমি প্রসন্ন মনে এই ধনরত্ন উদ্ধার করার অনুমতি দাও। ভগবান বুদ্ধ তোমার কল্যাণ করবেন। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, উদ্ধার হওয়া ধনরত্ন পবিত্র কাজেই ব্যয় করা হবে।

চারপাশের মানুষজন কারও মুখে কোনো কথা নেই। সকলে বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে থাকে হিউ-এন-সাঙ-এর দিকে। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। বললেন, ধর্মাত্মা কাশ্যপ, আপনি মাটি খোঁড়ার ব্যবস্থা করুন।

কয়েক জন এগিয়ে আসে। সাত-আট হাতের মতো খুঁড়তেই বিরাট একটা পাত্র উঠে আসে। পাত্রভরতি সোনা-রুপা মণিমাণিক্য। উল্লাসে ফেটে পড়ে সকলে। চারদিকে হিউ-এন-সাঙ-এর নামে জয়ধ্বনি ওঠে। নির্বিকার হিউ-এন-সাঙ। ধীর পায়ে ফিরে যান নিজের কক্ষে। মনের সাময়িক উত্তেজনাটুকু দূর করবার জন্যে প্রার্থনায় বসলেন।

আরও কয়েক দিন কেটে যায়। হিউ-এন-সাঙ-এর ইচ্ছা ছিল নগরহারের পথে এবার যাত্রা করবেন। দীর্ঘ পথ এসে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন যে, কিছুদিন সেখানে রয়ে গেলেন। মাঝে মাঝে নগর পরিক্রমায় বার হন। স্থানীয় বৌদ্ধ পণ্ডিতদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। একদিন নগরের পথে এক নগ্ন সাধুকে দেখে থমকে গেলেন। সারা গায়ে ছাইমাখা, গলায় হাড়ের মালা। আগে কোনোদিন এইরকম সাধু দেখেননি হিউ-এন-সাঙ। সঙ্গীকে জিজ্ঞাসা করলেন, এ কোনো সাধু ?

সঙ্গী ভিক্ষু জবাব দিলেন, এরা শৈব সম্প্রদায়ের সাধু।

ইতিপূর্বে কখনো শিবের কথা শোনেননি হিউ-এন-সাঙ। বললেন, এরা কার উপাসনা করে ?

ভিক্ষু বললেন, ভারতবর্ষে অনেক মানুষ আছে, অনেক দেবতা। যারা ভগবান বুদ্ধকে বিশ্বাস করে না তারা এইসব দেবতার পুজো করে।

আর কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না হিউ-এন-সাঙ।

পরবর্তীকালে যখন তিনি সমস্ত ভারতবর্ষ পরিক্রমা করেন তখনও অন্য ধর্মের প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখাননি। তবে অন্য ধর্মের প্রতি অশ্রদ্ধাও প্রকাশ করেননি। তবে একটা বিষয় তিনি অনুভব করেছিলেন যে, ভগবান বুদ্ধের বাণী দিকে দিকে প্রচারিত হলেও ভারতবর্ষ ব্রাহ্মণের দেশ। তিনি লিখেছেন, এদেশের পরিবারগুলি নানান জাতিতে বিভক্ত। তার মধ্যে ব্রাহ্মণরাই পবিত্রতা আর মহত্ত্বে সবচেয়ে শ্রদ্ধেয়। তঁারা এখনও এদেশের প্রাচীন ধর্মকে পালন করেন।

কাপিশার সংঘারামে এক মাস রয়ে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। এর মধ্যে স্থানীয় ভাষাও অনেকখানি রপ্ত করেছেন। এবার যাত্রা শুরু করলেন কাবুল নদীর তীর ধরে নগরহারে (আধুনিক নাম জালালাবাদ)।

তঁার পাণ্ডিত্যের কথা ছড়িয়ে পড়েছিল নগরহারে। নগরের বৌদ্ধ শ্রমণরা তঁাকে সাদরে অভ্যর্থনা জানাল। ছোটো নগর। চারদিক ঘিরে উঁচু পর্বত। এখানে কোনো রাজা নেই। শাসনকার্য পরিচালনা করেন কাপিশার রাজা। মনোরম পরিবেশ। সাধারণ মানুষ চাষ-আবাদ করে। প্রচুর শস্য ও ফলমূল জন্মায়। মানুষজনের অভাব-অনটন নেই। নগরে কিছু সংঘারাম থাকলেও বেশিরভাগই জনশূন্য। সামান্য কয়েকটি সংঘারামে অল্প কিছু বৌদ্ধ ভিক্ষু থাকেন। নগরে পাঁচটি মন্দিরও রয়েছে। এক প্রান্তে অশোকের শিলাস্তূপ। প্রায় তিনশো ফুট উঁচু। অপরূপ স্থাপত্য। হিউ-এন-সাঙ ইতিপূর্বেই এই স্তূপের কথা শুনেছিলেন। প্রথমেই তিনি এলেন এই স্তূপ দর্শনে। প্রদক্ষিণ করে দীপ জ্বালিয়ে দিলেন।

পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন এক বৃদ্ধ শ্রমণ। তিনি বললেন, এই শিলাস্তূপকে ঘিরে এক সুন্দর কাহিনি আছে। দ্বিতীয় কল্পে এখানে বোধিসত্ত্বের সঙ্গে দীপঙ্কর বুদ্ধের সাক্ষাৎ হয়। সেদিন এখানে বৃষ্টি হয়েছিল। সমস্ত ভূমি কর্দমাক্ত। দীপঙ্কর বুদ্ধ এসে দাঁড়াবেন বলে, বোধিসত্ত্ব ভূমির ওপর নিজের পরনের বস্ত্র আর মাথার চুল বিছিয়ে দিলেন। দীপঙ্কর বুদ্ধ এসে তঁার ওপর দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, হে প্রিয় বোধিসত্ত্ব, একদিন তুমিও বুদ্ধত্ব লাভ করবে, আর বিনাশকল্প শেষ হলেও এই স্থানের মাহাত্ম্য লুপ্ত হবে না।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, আর কোনো কল্পে কি দীপঙ্কর বুদ্ধ এই পবিত্র স্থানে এসেছিলেন?

বৃদ্ধ শ্রমণ বললেন, হ্যাঁ এসেছিলেন। এখান থেকে কুড়ি কিলোমিটার দূরে নাগরাজ গোপালের আশ্চর্য এক গুহা আছে। সেই গুহায় বাস করত ভয়ংকর এক নাগ। সে মাঝে মাঝেই গ্রাম, নগরে গিয়ে মানুষজনকে হত্যা করত। সেই নাগরাজকে নিজের যুক্তি-উপদেশে হিংসা ত্যাগ করান দীপঙ্কর বুদ্ধ। তার প্রার্থনায় প্রসন্ন হয়ে সেখানে নিজের ছায়া রেখে যান, তাই ওই গুহার নাম হয় ছায়াগুহা, আজও সেই গুহা রয়েছে।

সকল অধ্যায়
১.
গভীর গহন এক রাত
২.
আলোর পথে
৩.
প্রথম সকাল
৪.
রাত্রি শেষ
৫.
যাত্রা হল শুরু
৬.
সীমান্ত পথ
৭.
মৃত্যু উপত্যকা
৮.
মরুদ্যান
৯.
হামি
১০.
তুরফান
১১.
কুচা
১২.
বরফের দেশে
১৩.
ইশিক কুল
১৪.
সমরখন্দ
১৫.
লৌহকপাট
১৬.
বামিয়ান
১৭.
গান্ধার
১৮.
ছায়াগুহা
১৯.
পুরুষপুর
২০.
তক্ষশীলা
২১.
কাশ্মীর
২২.
শাকল
২৩.
জলন্ধর থেকে কুলু
২৪.
মথুরা
২৫.
কান্যকুব্জ
২৬.
অযোধ্যা থেকে কৌশাম্বী
২৭.
প্রয়াগ
২৮.
শ্রাবস্তী
২৯.
কপিলাবস্তু
৩০.
লুম্বিনী
৩১.
কুশীনগর
৩২.
বারাণসী
৩৩.
সারনাথ
৩৪.
বৈশালী
৩৫.
মগধ
৩৬.
শীলভদ্র বিহার
৩৭.
গয়া
৩৮.
বুদ্ধগয়া
৩৯.
বোধিবৃক্ষ
৪০.
মহাভিক্ষুণী
৪১.
রাজগৃহ
৪২.
মানসলোক
৪৩.
নালন্দা
৪৪.
ভারত পরিক্রমা
৪৫.
আবার নালন্দা
৪৬.
শরণাগত

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%