চঞ্চলকুমার ঘোষ
সমরখন্দ নামটা দেখেই থমকে গেল অমিতাভ।
হিউ-এন-সাঙ তার আগে গিয়েছিলেন তাসখন্দ। তখন অবশ্য এর নাম তাসখন্দ ছিল না। পুরোনো নাম কী ছিল জানা নেই।
হিউ-এন-সাঙ-এর জীবনীটা বন্ধ করে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে ভাবে অমিতাভ। বিচিত্র সব ভাবনা। মধ্য এশিয়ার এই পথ দিয়ে হাজার বছর ধরে কত মানুষ এসেছে। এসেছে তৈমুরলং, চেঙ্গিস খান। এসেছে হূন নেতা অ্যাটিলা, রক্তের ধরিত্রী গিয়েছে, ধ্বংস হয়েছে গ্রাম, নগর, জনপদ, কিন্তু শেষপর্যন্ত মৃত্যুর কালো গহ্বরে হারিয়ে গেছে মানুষগুলো। অথচ তারা চেয়েছিল অমরত্ব, ভেবেছিল চন্দ্র-সূর্যের মতো বেঁচে থাকবে পৃথিবীতে। সেই কাহিনিটা মনে পড়ে অমিতাভর।
চেঙ্গিস খানের দূত এসেছেন মহাজ্ঞানী চান চুনের কাছে। সেই তাসখন্দ থেকে বহুদূরে চিনের পাহাড়ের এক গুহায় থাকেন চান চুন। পরনের ছিন্নবস্ত্রে লজ্জানিবারণ করাই দায়। কোনো কিছুতেই ভ্রূক্ষেপ নেই তার। দূত বললেন, মহামান্য চেঙ্গিস খান আপনাকে আমন্ত্রণ করেছেন। পর্বতবাসী চান চুন বললেন, আমি বৃদ্ধ জরাগ্রস্ত। মহাশক্তিধর চেঙ্গিস খানের কোনো প্রয়োজনই আমার পক্ষে পূর্ণ করা সম্ভব হবে না।
‘খান আপনার সঙ্গে গুরুতর কোনো বিষয়ে পরামর্শ চান।’
অনিচ্ছাসত্ত্বেও শেষপর্যন্ত সম্মতি দিলেন চান চুন। দীর্ঘ পথ। পথে প্রতিটি শহরেই তঁার জন্যে ভূরিভোজের আয়োজন হল। ভিক্ষু চান চুন সবই প্রত্যাখ্যান করলেন। শুধু ফল আর দুধ খেয়ে পথ চলতে লাগলেন।
দীর্ঘ যাত্রার পর চান চুন এসে পৌঁছোলেন চেঙ্গিস খানের ছাউনিতে। সোনার সিংহাসনে বসেছিলেন চেঙ্গিস খান। নগ্ন পদের অতি সাধারণ পোশাক পরা বৃদ্ধ শ্রমণ অবিচলিত ভঙ্গিতে মহাত্রাস চেঙ্গিস খানের দিকে তাকালেন, কেবল হাতজোড় করলেন, সামান্য ঝুঁকে সম্মান জানালেন, তারপর গালিচার ওপর আসন গ্রহণ করলেন।

কিছুক্ষণ নীরব থেকে চান চুন বললেন, এই দীর্ঘপথ পার হয়ে কী কারণে আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন খান ?
চেঙ্গিস খান বললেন, আমি বৃদ্ধ হয়ে পড়েছি। যে শক্তিতে একদিন আমি শত শত মাইল ছুটে বেড়িয়েছি, একাই শত শত শত্রুকে ধ্বংস করেছি, আজ আর সেই শক্তি নেই। তারোয়াল ধরলে হাত কাঁপে। ঘোড়ায় চড়লে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। বুঝতে পারি বার্ধক্য আমার শক্তিকে একটু একটু করে কেড়ে নিচ্ছে।
চান চুন বললেন, এই তো প্রকৃতির নিয়ম মহামান্য খান।
মুহূর্তে চেঙ্গিস খান বলে উঠলেন, আমি এই নিয়মকে বদল করতে চাই। আমি জানতে চাই আপনার কাছে কি এমন কোনো ওষুধ আছে যাতে বৃদ্ধ যুবক হতে পারে, দুর্বল নতুন শক্তি লাভ করতে পারে ? যদি আপনি আমাকে সেই ওষুধ তৈরি করে দিতে পারেন, আমি আপনাকে এমন সম্পদ আর ঐশ্বর্য দেব যা পৃথিবীর কেউ কোনোদিন কল্পনাও করতে পারেনি। ইতিপূর্বে অনেকে আমাকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তারা এখন ঘুমিয়ে আছে কবরে। আমি চাই অনেক অনেক বছর ধরে নিজের হাতে যে বিশাল মোঙ্গল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছি তার বিজয় পতাকা বয়ে নিয়ে যেতে।
চান চুন মৃদুস্বরে বললেন, মহামান্য খান, আমার কোনো সম্পদেরই প্রয়োজন নেই। আমি জ্ঞান-বিজ্ঞানের যত পুথি পড়েছি তার থেকে একটি সারসত্য উপলব্ধি করেছি, মানুষের ব্যাধিকে আরোগ্য করে তোলবার, জীবনরক্ষা করবার বহু ওষুধ আছে কিন্তু তাকে অমর করার কোনো ওষুধ কোনোদিন ছিল না, আজও নেই।
চেঙ্গিস খান ভাবনায় ডুবে গেলেন। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, আমাদের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত আছে। সত্যবাদীর মৃত্যু হয় না। হে মহাজ্ঞানী, আপনি দশ হাজার লি পার হয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে এই সত্য কথাটা বলবার জন্যে ভয় পাননি। অমর হওয়ার কোনো উপায় নেই। আপনি সৎ, স্পষ্টবক্তা। আপনাকে কুর্নিশ জানাচ্ছি।
ভাবছিল অমিতাভ, চেঙ্গিস খানের মতো পৃথিবীর সব শক্তিমানরাই তো চেয়েছে অমর হতে। কিন্তু কেউ কি পেরেছে! অনন্তকালের গর্ভে সকলেই হারিয়ে গিয়েছে। অথচ বুদ্ধ, যীশু, নানক, শংকর, চৈতন্য, রামকৃষ্ণ_তঁারা তো কেউ শক্তিমান ছিলেন না। ছিল না রাজত্ব, সৈন্যদল। তঁারা শুধু প্রেমের শক্তিতে বিশ্বমানবকে জয় করে নিলেন অনন্তকালের জন্যে। হিউ-এন-সাঙও সেই প্রেম আর বিশ্বাসের শক্তিতেই পার হয়ে এসেছিলেন দুস্তর মরুভূমি, বরফের প্রান্তর। কিন্তু এখনও আর কতদূর ভারতবর্ষ। ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে আসে অমিতাভ। আস্তে আস্তে আবার বই খোলে।
হিউ-এন-সাঙ তখন সমরখন্দের পথে।
ঐতিহাসিক কানিংহাম লিখেছেন ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে হিউ-এন-সাঙ সমরখন্দ এসে পৌঁছোন।
হিউ-এন-সাঙ যখন সমরখন্দ আসেন সমরখন্দ তখন খুবই সমৃদ্ধ শহর। সেই সময়কার তুরস্কের রাজধানী। তিনি লিখেছেন, এখানে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা যথেষ্ট। লোকজনের ব্যবহার ভালো। এদের চেহারা, আচার-আচরণ দেখে বুঝতে পারি এরা বীর সাহসী। তবে বৌদ্ধ ধর্মের বিশেষ প্রভাব এখানে নেই। প্রায় সকলেই অগ্নি উপাসক।
নগরের প্রান্তে পরিত্যক্ত কিছু বাড়িঘর বহুদিন ধরেই রয়ে গিয়েছে। সেখানেই আশ্রয় নিলেন হিউ-এন-সাঙ। নগরের রাজার কথা জানলেও সামান্যও ইচ্ছে ছিল না তঁার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার। কিন্তু কয়েক দিন পর খানিকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই দেখা হয়ে গেল রাজার সঙ্গে।
প্রতিদিনের প্রার্থনা শেষ করে বিশ্রাম করছিলেন হিউ-এন-সাঙ। অনেক আগেই সকাল হয়েছে। তবু সূর্যের তাপ তেমন প্রবল নয়। এখনও বাতাসে শীত শেষের হিমেল ছোওয়া। হঠাৎ হিউ-এন-সাঙ-এর কানে এল এক অনুচরের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর। সামান্য বিস্মিত হলেন হিউ-এন-সাঙ। তঁার এই অনুচরটি খুবই শান্ত, নম্র, বিনয়ী। কী এমন কারণ ঘটল, সে এতখানি উত্তেজিত হয়ে পড়েছে! ধীর পায়ে তঁাবুর বাইরে এসে দাঁড়ালেন। সকলে তঁাকে দেখামাত্রই শান্ত হয়। মৃদুস্বরে হিউ-এন-সাঙ বললেন, কী হয়েছে ?
যে-অনুচরটি কথা বলছিল তার চোখে-মুখে ভয়ের ছায়া। উত্তেজনার প্রকোপটুকু তখনও পুরোপুরি যায়নি। তবু ধীর কণ্ঠে বলল, আমি নগরপ্রান্তে কয়েক জনের কথা শুনে ভীষণ ভীত হয়ে পড়েছি।
‘কী কথা তারা বলছিল ?’ জিজ্ঞাসা করেন হিউ-এন-সাঙ।
‘এখান থেকে এক লি দূরে নগরের প্রান্তে এক গ্রাম। প্রাতভ্রমণে গিয়েছিলাম সেখানে। দেখলাম কয়েক জন লোক লাঠি, বর্শা হাতে সেখানে দাঁড়িয়ে। আমি ভয় পেয়ে একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়লাম। তাদের কিছু কিছু কথা কানে আসছিল। বুঝতে পারছিলাম সকলেই ওই গ্রামের অধিবাসী। লুঠতরাজই তাদের পেশা। তারা স্থির করেছে রাতের অন্ধকারে সব কিছু লুট করে আমাদের হত্যা করবে। একজন বলল আমাদের হত্যা করে তঁাবুতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হবে যাতে আমাদের দেহের কোনো চিহ্ন না থাকে।’
অনুচরদের সকলের চোখে-মুখেই ভয়ের ছায়া। একজন বলল, এখন কী হবে ধর্মগুরু ?
কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন হিউ-এন-সাঙ। অনুভব করলেন অনুচরটি যা শুনেছে তা মিথ্যে নয়। এই মরুপ্রকৃতিময় অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষই দীনদরিদ্র। এদের অর্থ-উপার্জনের অন্য কোনো সংস্থান নেই তাই লুঠতরাজ করে। মানুষ খুন করে যার কাছে যা আছে কেড়ে নিয়ে যায়। তঁার সঙ্গে সামান্য কয়েক জন মাত্র রক্ষী রয়েছে, তাদের ক্ষমতা নেই গ্রামের মানুষদের বাধা দেয়। অথচ এতগুলো মানুষের জীবনরক্ষার দায়ভার যে তঁারই উপর। বললেন, তোমরা আমাকে একটু ভাবতে দাও। তঁাবুতে গিয়ে কিছুক্ষণ প্রার্থনা করলেন। ভগবান বুদ্ধ নিশ্চয়ই কোনো পথের সন্ধান দেবেন। হঠাৎ মনে হল কেউ যেন অন্তরমধ্যে তঁাকে নির্দেশ দিচ্ছে তুমি রাজার কাছে যাও। একমাত্র তিনিই পারবেন তোমাদের রক্ষা করতে।
উঠে দাঁড়ালেন হিউ-এন-সাঙ। তিনি যাবেন নগরের রাজার কাছে। তঁাবুর বাইরে এসে দাঁড়াতেই সকলে সমস্বরে বলে ওঠে, কী হবে ধর্মগুরু ?
‘আমি নগরের রাজার কাছে যাব। আমার বিশ্বাস তিনি নিশ্চয়ই আমাদের সহায়তা করবেন।’
একজন সামান্য ইতস্তত করে বলল, শুনেছি এদেশের রাজা বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী নয়। তিনি কি আমাদের সহায়তা করবেন ? জানি না তার চেয়ে রাত্রি নামার আগেই আমরা দূরে নিরাপদ কোনো স্থানে চলে যেতে পারব।
সামান্য দূরে দাঁড়িয়েছিল একজন রক্ষী। সে-ই পথপ্রদর্শকের কাজ করছিল। সে এগিয়ে এসে বলল, আমরা যে-পথেই যাই-না কেন, নগরের মধ্যে দিয়েই যেতে হবে। তখন গ্রামের মানুষরা আমাদের বাধা দেবেই। হয়তো পথের মাঝেই আমাদের হত্যা করবে। নাহলে আমাদের অনুসরণ করবে। রাতের অন্ধকার নামলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে। আমার মনে হয় ধর্মগুরু যা বলেছেন তাই একমাত্র বাঁচার পথ।
হিউ-এন-সাঙ বললেন, রাজার আবাস এখান থেকে কতদূর?
‘চার-পাঁচ লি হবে।’
‘তাহলে বিলম্ব করে লাভ নেই। আমরা কয়েক জন সেখানে যাব। বাকি সকলে এখানে প্রতীক্ষা করো। ভয়ের কোনো কারণ নেই। ভগবান বুদ্ধ তোমাদের রক্ষা করবেন।’
ছোটো নগর। অপরিচ্ছন্ন বাড়িঘর। পথে-ঘাটে লোকজন কম। মাঝে মাঝে দু-একজন প্রহরী চোখে পড়ছিল। পথচলতি সকলেরই দৃষ্টি পড়ছিল হিউ-এন-সাঙ-এর দিকে। একটি মানুষও সম্মানসূচক কথা বলে না। অনুমান করতে অসুবিধে হল না এখানকার মানুষজন কেউই বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়। সূর্য এখন মাথার ওপর। নিজের মধ্যে চাপা উদ্বেগ অনুভব করছিলেন হিউ-এন-সাঙ। এতগুলো মানুষের জীবন।
রাজপ্রাসাদ নিতান্তই ছোটো। সামনে একসার প্রহরী। হিউ-এন-সাঙ প্রাসাদের ফটকে গিয়ে পৌঁছোতেই একজন প্রহরী এগিয়ে আসে। হিউ এন-সাঙ বললেন, আমি একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। চিন দেশ থেকে আসছি। মহারাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাই, জরুরি প্রয়োজন।
কিছু ভাবে প্রহরী। আপনি অপেক্ষা করুন, আমি সংবাদ দিচ্ছি।’ বহুক্ষণ পর একজন রাজকর্মচারী আসেন। তাকে অনুসরণ করে প্রাসাদে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। বিরাট এক কক্ষে উঁচু আসনে বসেছিলেন রাজা। সামান্য নত হয়ে তঁাকে অভিবাদন করলেন হিউ-এন-সাঙ।
কিছুক্ষণ তঁার দিকে তাকিয়ে থাকেন রাজা। তারপর কর্কশকণ্ঠে বললেন, আপনি কোথায় চলেছেন ?
‘ভারতবর্ষে। ভগবান বুদ্ধের জন্মভূমিতে।’
বিস্ময়ের সঙ্গে রাজা বললেন, ভারতবর্ষ! সে তো বহু দূরের পথ। কী কারণে আপনি সেখানে চলেছেন ?
‘বৌদ্ধশাস্ত্রের জ্ঞান অর্জনের জন্যে।’
অবজ্ঞার সুরে রাজা বললেন, কয়েক জন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর সঙ্গে কথা বলেছি। তারা মূর্খ। ওই ধর্মের কোনো সারবত্তা নেই।
এতটুকু উত্তেজিত হলেন না হিউ-এন-সাঙ। বললেন, যে-সন্ন্যাসীদের সঙ্গে আপনার সাক্ষাৎ হয়েছিল তঁাদের হয়তো বৌদ্ধশাস্ত্র পড়া ছিল না। তাই তঁারা ভগবান বুদ্ধের মহান ধর্মের কথা আপনাকে শোনাতে পারেনি।
রাজা আগের মতোই বিরক্তি নিয়ে বললেন, আপনি বৌদ্ধশাস্ত্র পড়েছেন ?
‘পড়েছি। যদি আপনি অনুমতি দেন বুদ্ধের ধর্মের কথা শোনাতে চাই।’
রাজা একবার উপস্থিত সকলের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, বলুন বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্রের কথা।
প্রথমে বুদ্ধের জীবনকথা তারপর ধীরে ধীরে তঁার উপদেশ, তঁার ধর্মের মূল কথা বলতে থাকেন হিউ-এন-সাঙ।
রাজা এবং তঁার সভাসদ সকলেই মন্ত্রমুগ্ধের মতো তঁার কথা শুনতে থাকেন।
একসময় শান্ত হলেন হিউ-এন-সাঙ। বিরাট কক্ষে নেমে আসে নীরবতা। বেশ কিছুক্ষণ পর কথা বললেন রাজা, ‘আমার পরম সৌভাগ্য আপনার মতো মহাজ্ঞানীর দর্শন পেলাম। এতদিন শুধু বুদ্ধের নামই জানতাম। আজ তঁার সম্বন্ধে যতটুকু আপনার কাছে শুনলাম তাতে আমি মুগ্ধ। আমি অগ্নি উপাসক। তবু ভগবান বুদ্ধের উদ্দেশ্যে আমার প্রণাম জানাই।’
হিউ-এন-সাঙ অনুভব করলেন এখন মহারাজ তঁার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। বললেন, আমি আপনার কাছে বিশেষ প্রয়োজনে এসেছি।
আসন্ন বিপদের কোনো কথাই গোপন করেন না হিউ-এন-সাঙ। মুহূর্তে নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন রাজা। ক্রুদ্ধস্বরে বলে উঠলেন, সেনাপতি এখনই সৈন্যদের পাঠাও। আমার রাজ্যে যারা এই ধরনের নোংরা কাজ করবে তাদের চরম শাস্তি দেব। হে মহামান্য সন্ন্যাসী, আপনার দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। আপনার সঙ্গীদের কারও কোনো ক্ষতি হবে না। আপনি আমার অতিথিশালায় বিশ্রাম করুন। আগামীকাল আপনার কাছে বৌদ্ধধর্মের আরও কিছু কথা শুনতে চাই।
একজন প্রহরী হিউ-এন-সাঙকে নিয়ে গেল অতিথিশালায়। দিন ফুরিয়ে এসেছিল। তিনি অনুভব করছিলেন সঙ্গীদের সংবাদ না পাওয়া পর্যন্ত অন্তরের দুর্ভাবনা দূর হবে না।
রাত বাড়তে থাকে। দীপ জ্বালিয়ে কক্ষের মধ্যে চুপ করে বসে থাকেন হিউ-এন-সাঙ। সামান্য তন্দ্রা এসেছিল। হঠাৎ বাইরে কলরব। কী হয়েছে দেখবার জন্যে কক্ষের বাইরে আসতেই দেখলেন তঁার কয়েক জন সঙ্গী। সকলেই ক্লান্ত-বিধ্বস্ত, চোখে-মুখে ভয়ের ছায়া।
‘কী হয়েছে?’ উদ্বেগ ভরা কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন হিউ-এন-সাঙ।
‘রাজার সৈন্যরা যদি আর সামান্য কিছুক্ষণ পর পৌঁছোত তবে গ্রামের লোকেরা আমাদের পুড়িয়ে মারত।’
‘তোমরা কী করছিলে ?’
‘রাত নামতেই আমরা সকলে তঁাবুতে বসেছিলাম। হঠাৎ চিৎকার। তঁাবুর বাইরে আসতেই দেখি একদল লোক মশাল আর অস্ত্র নিয়ে আমাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। পালাবার কোনো পথ নেই। বুঝতে পারছিলাম এইবার নিশ্চিত মৃত্যু। আচমকা কানে এল কারা যেন ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে। দেখলাম গ্রামের লোকেরা পালাতে আরম্ভ করল। তার আগেই ঘোড়া থেকে নেমে আসে একদল সৈন্য। গ্রামের অধিকাংশ লোককেই তারা বন্দি করেছে।’
‘আমাদের লোকজন কোথায় ?’
‘সৈন্যরা সকলকে রাজসভার বাইরে অতিথিশালায় নিয়ে এসেছে।’
মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকালেন হিউ-এন-সাঙ। অস্ফুটে বললেন, সবই তোমার ইচ্ছা প্রভু।
নিজের কক্ষে বসে সঙ্গীদের সঙ্গে কথা বলছিলেন হিউ-এন-সাঙ। তঁার ইচ্ছা যত দ্রুত সম্ভব ভারতের সীমানায় প্রবেশ করা। গত রাতের সমস্ত ঘটনাই মন থেকে বিস্মৃত হয়েছেন। কক্ষে একজন রাজপারিষদ এসে দাঁড়াল। হিউ-এন-সাঙ-কে প্রণাম জানিয়ে বললেন, হে মহামান্য ধর্মগুরু, মহারাজ রাজসভায় আপনার জন্যে প্রতীক্ষা করছেন। গত রাতে যে-সমস্ত অপরাধীকে বন্দি করা হয়েছে তাদের বিচার হবে।

হিউ-এন-সাঙ-এর মনে পড়ে যায়, কীভাবে তঁার সঙ্গীরা মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। বললেন, চলুন রাজপারিষদ।
রাজসভায় সিংহাসনে বসে িছলেন রাজা। তঁার দু-ধারে সভাসদ উচ্চপদস্থ কর্মচারী। হিউ-এন-সাঙ সভায় প্রবেশ করতেই সকলে তঁাকে অভিবাদন জানায়। নিজের পাশেই তঁার আসন করে দিলেন রাজা।
এতক্ষণ পর হিউ-এন-সাঙ-এর দৃষ্টি পড়ল রাজসভার একপ্রান্তে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা একদল গ্রাম্য লোকের ওপর। তাদের ঘিরে সশস্ত্র প্রহরী। হিউ-এন-সাঙ অনুমান করলেন, এরাই গত রাতে তঁার সঙ্গীদের আক্রমণ করেছিল।
রাজা আদেশ দিতেই বন্দিদের সভার মাঝখানে নিয়ে আসা হল। সকলের চোখে মুখেই ভয় আর আতঙ্ক। ভয়ংকর ক্রুদ্ধস্বরে রাজা বলে উঠলেন, এরা আমার রাজ্যের প্রজা হয়েও দস্যুদের মতো নিরীহ কিছু মানুষকে খুন করে তাদের সব কিছু লুট করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এই জঘন্য অপরাধের কোনো ক্ষমা নেই। এদের সকলকে আমি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করলাম।
চমকে উঠলেন হিউ-এন-সাঙ। মৃত্যুদণ্ড! ততক্ষণে বন্দিদের মধ্যে কান্নার রোল উঠেছে।
‘আমাদের ক্ষমা করুন মহারাজ। আমরা ভবিষ্যতে আর কখনো এই ধরনের অপরাধ করব না।’
আগের মতোই ক্রুদ্ধভাবে রাজা বললেন, তোমাদের কোনো ক্ষমা নেই। সেনাপতি, এই মুহূর্তে এদের বধ্যভূমিতে নিয়ে গিয়ে আমার আদেশ পালন করো।
বন্দিরা আরও উচ্চৈঃস্বরে কেঁদে ওঠে। ততক্ষণে প্রহরীরা এগিয়ে এসেছে তাদের বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়র জন্য।
বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন হিউ-এন-সাঙ। তিনি তো এদের মৃত্যু চাননি। এতগুলো মানুষের মৃত্যুই যদি কাম্য হয় তবে তো মিথ্যা হয়ে যাবে ভগবান বুদ্ধের প্রেম-অহিংসা-করুণার মন্ত্র। নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। দ্রুত পায়ে নেমে এলেন বন্দিদের পাশে। সকলে বিস্ময়ে হতবাক।
হাতজোড় করলেন হিউ-এন-সাঙ। প্রার্থনার ভঙ্গিতে বললেন, রাজন, ভগবান বুদ্ধের নামে আমি এদের সকলের প্রাণভিক্ষা চাইছি।
বিস্ময়ে রাজা বললেন, কয়েক প্রহর আগে এরাই আপনার সঙ্গীদের হত্যা করতে গিয়েছিল আর আপনি এদের প্রাণভিক্ষা চাইছেন!
হিউ-এন-সাঙ বললেন, ভগবান বুদ্ধ বলেছিলেন, ‘ক্ষমা আর প্রেমই জীবনের শ্রেষ্ঠ ধর্ম। হিংসা দিয়ে কখনো হিংসাকে জয় করা যায় না। নতুন আরেক হিংসার জন্ম দেয়।’ তা ছাড়া আপনি বিবেচনা করুন মহারাজ, এই মানুষগুলো অপরাধ করেছে, কিন্তু এদের বৃদ্ধ পিতা-মাতা, স্ত্রী-সন্তান_তারা তো কোনো অপরাধ করেনি। তারা সকলেই এদের উপর নির্ভরশীল। এদের হত্যার অর্থ তাদেরকেও নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া।
সমস্ত সভা নিস্তব্ধ। বলে চলেছেন হিউ-এন-সাঙ, আমি জানি এরা অপরাধী। এর আগেও হয়তো আরও অনেক অপরাধ করেছে। কিন্তু সকলেই অজ্ঞানী। ভালো-মন্দের জ্ঞান নেই। এদেরকে সংশোধন করে নতুন জীবন গড়ে তোলবার সুযোগ দিন মহারাজ।
সকলে হতবাক। হিউ-এন-সাঙ-এর প্রত্যেকটি কথা সকলের অন্তর ছুঁয়ে যায়। এতদিনের ভাবনার সঙ্গে কোনো মিল নেই।
হিউ-এন-সাঙ উপস্থিত সকলের মনোভাবটুকু উপলব্ধি করে আবার বললেন, রাজন, আপনি নিশ্চয়ই মহান সম্রাট অশোকের কথা জানেন। তিনিও বিশ্বাস করতেন যুদ্ধ-হত্যা-ধ্বংস-মৃত্যু। তঁার সেনাবাহিনী যেখানে গিয়েছে সেখানেই রক্তের নদী বয়ে গিয়েছে। তিনিও একদিন ভগবান বুদ্ধের আদর্শে চণ্ডাশোক থেকে হয়ে উঠলেন ধর্মাশোক। তঁার প্রেম করুণা-অহিংসা আর মানবকল্যাণের মন্ত্রে সমস্ত ভারতবর্ষ উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিল। তিনি শুধু তঁার কালের নন, সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সম্রাট। প্রেম-করুণার মন্ত্রে আপনিও সকলকে উজ্জীবিত করে তুলুন রাজন। যুগ যুগ ধরে মানুষ আপনার বন্দনা করবে।
আবেগগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন রাজা। অনুভব করলেন, হিউ-এন-সাঙ-এর উপদেশ তঁার অন্তরে নতুন এক চেতনার উন্মেষ ঘটিয়ে দিয়েছে। নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, হে মহাপ্রাজ্ঞ সন্ন্যাসী, আপনার অনুরোধ আমি মেনে নিলাম। সেনাপতি, এদের সকলকে মুক্ত করে দাও।
মুহূর্তে বন্দিরা আছড়ে পড়ে হিউ-এন-সাঙ-এর পায়ের সামনে।

‘আপনি আমাদের মার্জনা করুন। ভবিষ্যতে আর কখনো আমরা কোনো অপরাধ করব না।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন