চঞ্চলকুমার ঘোষ
নীরব হয়ে ছিলেন হিউ-এন-সাঙ। ইতিপূর্বে কত বিচিত্র কাহিনি শুনেছেন। এর মধ্যে কোনটি সত্য, কোনটি কল্পনা জানেন না। তবে অনুমান, সাধারণ মানুষ এইভাবেই ভগবান বুদ্ধের স্মৃতিকে জাগিয়ে রাখে। ছায়াগুহার কথা শুনে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কখনো সেই গুহায় গিয়েছেন ?
‘না, ভয়ংকর দুর্গম সেই পথ। তা ছাড়া ওই পথে দস্যুদের ভয়।’
‘কেউ কি ছায়াগুহার ছায়া দর্শন করেছে ?’
কিছুক্ষণ নীরব থেকে বৃদ্ধ শ্রমণ বললেন, শুনেছি বহুদিন আগে দু-জন শ্রমণ ওই গুহায় ভগবান বুদ্ধের ছায়া দর্শন করেছিলেন।
হিউ-এন-সাঙ বললেন, আপনি জানেন ভগবান বুদ্ধ নির্বাণলাভ করেছেন বহু শত বছর আগে। এতদিন পরেও তঁার ছায়া থাকা কি সম্ভব ?
বৃদ্ধ শ্রমণ বললেন, সাধারণ মানুষের পক্ষে তা সম্ভব নয়। ভগবান বুদ্ধ, তিনি তো সাধারণ কেউ নন। তিনি মহাপুরুষ। তঁার জীবনে কতই অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে। তঁার পক্ষে সবই সম্ভব।
হিউ-এন-সাঙ-এর মনের মধ্যে বিচিত্র ভাবনা জেগে ওঠে। বৃদ্ধ শ্রমণ যা বলেছেন তা বাস্তব না কল্পনা নিজের চোখে তা প্রত্যক্ষ করবেন। বললেন, আমি ওই ছায়াগুহায় যেতে চাই।

চারপাশে উপস্থিত ভিক্ষুদের মধ্যে কোলাহল শুরু হল। এক প্রবীণ শ্রমণ বললেন, আপনি অকারণে বিপদের ঝুঁকি নেবেন না। বহুদিন ওই পথে কেউ যায়নি। শুধু যে দুর্গম পথ তা-ই নয়, ভয়ংকর হিংস্র জন্তুরা বাস করে ওখানে। বন্য লোকেরা ওইদিকে শিকার করতে যায় শুনেছি। তারাও ছায়াগুহার দিকে যেতে সাহস পায় না। দু-এক জন যারা গিয়েছিল তারা কেউ আর ফিরে আসেনি।
গম্ভীর মুখে হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। বহুবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছি। ভগবান তথাগতের অসীম করুণায় প্রত্যেকবার রক্ষা পেয়েছি। আমি মনস্থির করেছি সেই ছায়াগুহা দর্শন করব।

মুহূর্তে চারপাশে উপস্থিত সকলের মধ্যে নিস্তব্ধতা নেমে এল। হিউ-এন-সাঙ-এর যে সঙ্গীরা কুচা থেকে এসেছিল তারা সমস্বরে বলে ওঠে, আমরা এবার নিজের রাজ্যে ফিরে যেতে চাই। বহুদিন ঘর ছেড়ে, পরিবার-পরিজন ছেড়ে এসেছি।
হিউ-এন-সাঙ বুঝতে পারছিলেন তারা ছায়াগুহায় যেতে চায় না। তাদের প্রতি কোনো ক্ষোভ প্রকাশ করলেন না। প্রসন্নভাবেই বললেন, তোমরা এতদূর পর্যন্ত আমার সঙ্গ দিয়েছ, তার জন্যে ধন্যবাদ। ভগবান তথাগত তোমাদের কল্যাণ করবেন। আর একটি কথা সম্রাট, রাজা-মহারাজারা আমাকে যেসব ধনসম্পদ দিয়েছেন তার কোনো কিছুই আমার প্রয়োজন নেই। সব কিছুই তোমরা শান্তিতে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নাও।
শ্রদ্ধায় সকলের মাথা নত হয়ে আসে। একজন অশ্রুসজল চোখে বলল, হে ধর্মগুরু, জানি না আর কোনোদিন আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে কি না, তবে আমৃত্যু আপনার কথা মনে থাকবে।
তাকে আশীর্বাদ করে বৃদ্ধ শ্রমণের দিকে তাকালেন হিউ-এন-সাঙ। বললেন, আমি ছায়াগুহায় যাব, আপনার সংঘের কেউ কি আমাকে পথনির্দেশ করতে পারবে ? আমি জানি না কোন পথে গেলে ছায়াগুহায় পৌঁছোতে পারব।
বৃদ্ধ শ্রমণ বললেন, আপনি কি এখনই ওই ছায়াগুহার পথে যাত্রা করতে চান ?
‘অকারণ বিলম্বের কী প্রয়োজন ? সঙ্গী না পেলে আমি একাই রওনা হব।’
উপস্থিত সকলেই কেমন বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। একজন বিদেশি মানুষ ভগবান বুদ্ধের ছায়া দর্শনের জন্যে নিজের মৃত্যুভয় উপেক্ষা করেছেন অথচ, মনের ইচ্ছে থাকলেও এক অদৃশ্য ভয় যেন তাদের পায়ে বেড়ি দিয়ে রেখেছে। হঠাৎ এক কিশোর ভিড়ের মধ্যে থেকে এগিয়ে আসে। হিউ-এন-সাঙ-এর সামনে এসে বলল, আমি আপনার সঙ্গে যাব।
হিউ-এন-সাঙ অল্প কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে সস্নেহে বললেন, ও-পথে কত বিপদ আছে জান ?
‘জানি ধর্মগুরু। আমার বাবা বলতেন, যারা বিপদ আর মৃত্যুকে দেখে ভয় পায় তারা কোনোদিন জয়ী হতে পারে না। যারা সাহসী তারাই সব কিছুকে জয় করতে পারে।’
‘বড়ো সুন্দর কথা বলেছ। তবুও তুমি নিতান্তই বালক। পিতা-মাতার কাছে অনুমতি নিয়ে এসো।’
‘আমার পিতা-মাতা কেউ নেই।’
কিশোরের কথার মাঝেই বৃদ্ধ শ্রমণ বললেন, এক বছর হল ওর পিতা-মাতার মৃত্যু হয়েছে। ওকে আমাদের সংঘে আশ্রয় দিয়েছি।
হিউ-এন-সাঙ বললেন, তোমার নাম কী বালক ?
‘সোম।’
‘তুমি কখনো ছায়াগুহায় গিয়েছ ?’
‘না, ধর্মগুরু। তবে পিতার সঙ্গে জঙ্গলের মধু কাঠ আনবার জন্যে ওই পথে গিয়েছি।’
‘তাহলে চলো আমরা যাত্রা করি।’
বৃদ্ধ শ্রমণ বললেন, সামান্য অপেক্ষা করুন মহাত্মন।
একজন ভিক্ষুকে নিচু গলায় কিছু নির্দেশ দিলেন তিনি। অল্পক্ষণেই সে সংঘ থেকে দু-পাত্র খাবার আর চারখানা কম্বল নিয়ে আসে। বলে, আপনার পথের প্রয়োজনে ধর্মগুরু।
সব কিছু নিজের কাঁধে তুলে নিল সোম। আর অপেক্ষা করলেন না হিউ-এন-সাঙ। সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন। সূর্য মাথার উপর। সবেমাত্র শীত শেষ হয়েছে। রোদের তেমন তাপ নেই। পথ চলতে কোনো কষ্ট হয় না। সোমের সঙ্গে কথা বলছিলেন হিউ-এন-সাঙ। মনে হচ্ছিল নিজের কৈশোরে ফিরে গিয়েছেন। পাহাড়ি পথ। মাঝে মাঝে ছোটো ঝরনা। পথের দু-পাশে গাছপালা থাকলেও ঘন জঙ্গল নেই। অনেকক্ষণ পথ চলেছেন। গোটা পথে একটি মানুষও চোখে পড়েনি। শুধু বন্য ছাগল, কিছু হরিণ আর পাখি নজরে এসেছে। পর পর তিনটি পাহাড় পার হতেই সন্ধে হয়ে এল। অন্ধকারে পাহাড়ি পথে চলা সম্ভব নয়। তা ছাড়া পথও ক্রমশই দুর্গম হয়ে আসছে। একটা উঁচু গুহায় আশ্রয় নিলেন দু-জন। পাছে কোনো হিংস্র জন্তু গুহার মধ্যে ঢুকে পড়ে, পাথর এনে ভেতর থেকে মুখ বন্ধ করে দেয় সোম। রাত শেষ হয়ে সকাল হতেই আবার রওনা হলেন হিউ-এন-সাঙ। পাহাড়ের কোল ধরে এগিয়ে চলেন তঁারা। একটা বাঁকের সামনে আসতেই কানে এল মানুষের কণ্ঠস্বর। হিউ-এন-সাঙ দেখলেন এক ঝরনার পাশে দাঁড়িয়ে চার জন লোক। সকলের পরনে আলখাল্লার মতো পোশাক। মাথায় লাল কাপড় বাঁধা। হাতে বর্শা। চেহারায় ভয়ংকর রুক্ষতা আর হিংস্রতা ফুটে উঠেছে। নিজের অভিজ্ঞতায় অনুমান করতে অসুবিধা হল না যে, এরা দস্যু ছাড়া আর কিছু নয়। বৃদ্ধ শ্রমণ এদের কথাই বলেছিলেন। সোমও দেখতে পেয়েছিল তাদের। সে কিছু বলবার আগেই হিউ-এন-সাঙ বললেন, সোম তুমি কোথাও লুকিয়ে পড়ো।
নিস্তব্ধ প্রান্তরে তঁার কণ্ঠস্বর বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। মুহূর্তে মুখ ফেরাল দস্যুরা। এই ভয়ংকর প্রান্তরে কোনো মানুষ আসবে এ তাদের ভাবনার অতীত। কিছুক্ষণ বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে থাকে হিউ-এন-সাঙ-এর দিকে। সতর্ক হলেন হিউ-এন-সাঙ। নিজের বিপদের কথা ভাবেন না, এই শিশুটির কোনো ক্ষতি হোক তিনি তা চান না। বললেন, তুমি এখনই পালিয়ে যাও। নিশ্চয়ই পথ চিনে সংঘারামে ফিরে যেতে পারবে ?
ইতস্তত করে সোম। আমি আপনাকে ছেড়ে যাব না।
এবার কঠিন হলেন হিউ-এন-সাঙ। সোমের হাতটা ধরে গম্ভীর গলায় বললেন, তুমি এখান থেকে চলে যাও এ আমার আদেশ।
‘আপনিও চলুন।’
হিউ-এন-সাঙ জানেন এই পার্বত্য প্রদেশে ওই দস্যুেদর নজর এড়িয়ে পালানো অসম্ভব। সোমকে প্রায় জোর করে ঠেলে দিলেন পিছনের দিকে। ততক্ষণে দস্যুদের একজন সামনে এগিয়ে এসেছে। বাকি সকলে তার পেছনে। সামনে এগিয়ে আসা মানুষটির দিকে চেয়ে বুঝতে অসুবিধে হয় না দলের সর্দার। কর্কশ স্বরে সে বলে ওঠে, কে তুই ?
হিউ-এন-সাঙ শান্তভাবে বললেন, আমি এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। জ্ঞানার্জনের জন্যে চিন থেকে ভারতবর্ষে এসেছি।
‘এই দুর্গম প্রদেশে কী প্রয়োজন ? এখানে কোনো মন্দির, গুম্ফা নেই।’
হিউ-এন-সাঙ বললেন, শুনেছি এখানে ছায়াগুহা আছে। আমি সেই গুহাদর্শনে চলেছি।
দস্যুরা পরস্পরের দিকে তাকায়। তাদের মধ্যে একজন বলে ওঠে, উত্তর পাহাড়ের নীচে একটা গুহা আছে। সেটাকে লোকে বলে ছায়াগুহা।
সর্দার বলে ওঠে, কাউকে তো সেখানে যেতে দেখিনি !
হিউ-এন-সাঙ বললেন, ঠিকই বলেছ। প্রাণের ভয়ে কেউ সেই দুর্গম গুহায় যেতে চায় না।
হো-হো করে হেসে ওঠে দস্যুসর্দার। ‘তোর প্রাণের ভয় নেই ?’
‘জন্ম নিলে সকলকেই মরতে হবে। যা হবেই, অকারণে তার জন্যে ভয় পেয়ে কী লাভ ?’
সর্দার পোশাকের ভেতর থেকে তলোয়ার বার করে বলল, তাহলে তোকে হত্যা করি ?
এতটুকু বিচলিত হলেন না হিউ-এন-সাঙ। বললেন, আমাকে হত্যা করে তোমাদের কোনো লাভ হবে না। আমার সঙ্গে এই সামান্য খাবার আর দু-খানা কম্বল ছাড়া আর কিছু নেই। প্রয়োজন হলে স্বচ্ছন্দে নিতে পারো। তার পরেও যদি তোমার মনে হয় আমাকে হত্যা করবে, তাহলে একটা অনুরোধ আছে।
‘বলেই ফ্যাল কী অনুরোধ।’
‘আমি ছায়াগুহায় ভগবান বুদ্ধের ছায়া দর্শন করতে চাই। তারপর তোমাদের যা মন চায় কোরো।’
দস্যুদের মধ্যে একজন বলে, আমি শুনেছি বুদ্ধ বলে একজন বড়ো সাধু ছিল। সে কি এখনও বেঁচে আছে ?
হিউ-এন-সাঙ বললেন, তিনি বহুদিন আগেই মারা গিয়েছেন।
দস্যুসর্দার চেঁচিয়ে ওঠে, যে লোকটা মারা গিয়েছে তঁার ছায়া থাকবে কী করে ? তুই মিথ্যে কথা বলছিস।
হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমি মিথ্যে কথা বলি না। যা শুনেছি তাই বলছি। নিজের চোখে সত্যি যাচাই করতে চাই। তোমাদের কাছে অনুরোধ আমায় সেই গুহায় নিয়ে চলো।
একজন দস্যু বলল, আমার মনে হচ্ছে ছায়াটায়া বলে কিছু নেই। ওখানে নিশ্চয়ই গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েছে লোকটা।
হিউ-এন-সাঙ বললেন, যদি গুপ্তধন পাওয়া যায় সব তোমাদের হবে। তখন আর এই পাহাড় পর্বতে কষ্ট করে ডাকাতি করে বেড়াতে হবে না।
কথাটা মনে ধরে সকলের। একজন বলল, এইসব সাধু সন্ন্যাসীরা অনেক মন্ত্রতন্ত্র জানে। গুপ্তধনের সন্ধান পেতেও পারে।
সর্দার বলল, তাহলে লোকটাকে নিয়ে চল। দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখ যাতে পালাতে না পারে।
বাধা দিলেন না হিউ-এন-সাঙ। বেশ কিছু দূর গিয়ে একটা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে এল সকলে। চারদিকে বড়ো বড়ো গাছ। ছোটো নালা দিয়ে তিরতির করে জল বইছে। নালা পার হয়ে পাহাড়ের ধাপ বেয়ে উপরে বিরাট গুহা। সামনে ঝোপ। বোঝা যায় এখানে মানুষের কোনো পায়ের চিহ্ন পড়ে না। একজন দস্যু বলল, এই তোমার ছায়াগুহা।
হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমি এর ভেতরে যাব।

সর্দার বলল, তোকে একা ছাড়ব না। আমরাও তোর সঙ্গে যাব।
তলোয়ার দিয়ে ডালপালা কেটে গুহার পথ তৈরি হয়। গুহার মধ্যে আবছা আলো। তবু গোটা গুহাটাই স্পষ্ট চোখে পড়ছে। অনেকটা বড়ো ঘরের মতো। প্রায় দু-মানুষ সমান উঁচু। মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকেন হিউ-এন-সাঙ। অতীত জীবনে হয়তো এখানে এসেছিলেন বুদ্ধ। মনের মধ্যে কোনো সন্দেহ জাগে না। অটুট বিশ্বাসে জপ করতে থাকেন। দস্যুরা চেঁচিয়ে ওঠে, কোথায় তোর বুদ্ধের ছায়া ? শুধু পাথরের দেয়াল ছাড়া কিছুই তো চোখে পড়ছে না।
হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমি শুনেছি দু-জন শ্রমণ এখানে বুদ্ধের ছায়া দেখেছিলেন।
‘আমরা তো দেখতে পাচ্ছি না।’
‘পবিত্র মনে তঁার কাছে প্রার্থনা করতে হয়।’
সর্দার কিছু ভাবে। ‘ঠিকই বলেছে এ লোকটা। আমরা অনেক পাপ করেছি। আমাদের বুদ্ধ দেখা দেবে না।’
হিউ-এন-সাঙ সর্দারের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমরা প্রার্থনা করো।
‘প্রার্থনা করলে কি আমরা বুদ্ধের ছায়া দেখতে পাব ?’
‘যদি তঁার করুণা হয় নিশ্চয় পাবে।’
‘যত সব বাজে কথা।’ বিদ্রূপ করে ওঠে একজন দস্যু।
হিউ-এন-সাঙ কোনো কথা বললেন না। পাথরের ওপর হাঁটু গেড়ে বসলেন। দস্যুসর্দারের কী মনে হল, হিউ-এন-সাঙ-এর হাতের বাঁধন খুলে দিয়ে বলল, চল আমরা বাইরে গিয়ে বসি ৷ ও প্রার্থনা করুক।
বাইরে আসতেই চমকে উঠল সকলে। অল্পক্ষণ আগে দেখা রোদ-ঝলমলে আকাশ কেমন অন্ধকার হয়ে গিয়েছে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে সবাই। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে আরম্ভ করে। তারপরই মুষলধারায় বৃষ্টি নামে। হুড়মুড় করে গুহার মধ্যে ঢুকে পড়ে সবাই। এক মনে প্রার্থনা করে চলেছেন হিউ-এন-সাঙ। মন্ত্রধ্বনির মতো তঁার প্রার্থনার সুর ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত গুহার মধ্যে। দস্যুরা সকলেই কেমন বিহ্বল। কারও মুখে কোনো কথা নেই। সকলে স্থির। প্রার্থনার সুর তাদের বিবশ করে দিয়েছে।
বাইরে প্রবল বৃষ্টি। ঘন ঘন বজ্রপাত। নিজের অজান্তেই চোখ বুজে আসে দস্যুদের। হিউ-এন-সাঙ প্রার্থনা করে চলেছেন। তার অর্থ বোঝে না কেউ। তবু হিউ-এন-সাঙ-এর প্রার্থনায় গলা মেলায়। সমবেত প্রার্থনায় মুখর হয়ে ওঠে ছায়াগুহা।
কত সময় কেটে যায়। শান্ত হয় বাইরের প্রকৃতি। মেঘ কেটে গিয়েছে। গুহার মধ্যে তখনও হিউ-এন-সাঙ প্রার্থনা করে চলেছেন। হঠাৎ তঁার দৃষ্টি পড়ল সামনের দিকে। একটা ক্ষীণ আলো আর সেই আলোর আভার মধ্যে একটু একটু করে ফুটে উঠছে মানুষের মূর্তি। ক্রমশই স্পষ্ট হয় সেই মূর্তি। আশীর্বাদের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন ভগবান বুদ্ধ। তঁাকে ঘিরে জ্যোতির বলয়। অল্প কিছুক্ষণ, তারপরই আস্তে আস্তে মিলিয়ে যায় বুদ্ধের ছায়ামূর্তি। আবার আলোছায়ায় ভরে ওঠে গুহা। দু-হাত তুলে হিউ-এন-সাঙ বলে ওঠেন, আজ আমার জীবন ধন্য হয়ে গেল।
দস্যুদল বিহ্বল। সর্দার লুটিয়ে পড়ে হিউ-এন-সাঙ-এর পায়ের কাছে, তোমার জন্যেই আমরা এই অপূর্ব দৃশ্য দেখলাম। আমরা তোমাকে আঘাত দিয়েছি। তুমি আমাদের ক্ষমা করো।
হিউ-এন-সাঙ বললেন, তোমরা আর কখনো হিংসা কোরো না। অন্যায় কোরো না। পাপ কোরো না। তোমরা ভগবান বুদ্ধের দর্শন পেয়েছ। তোমাদের সব পাপ মুছে গেছে। এবার নতুন জীবন শুরু করো।
সর্দার মুখ তুলে তাকাল। তুমি যা বলেছ তাই হবে।
হিউ-এন-সাঙ বললেন, এবার আমাকে ফিরতে হবে। এগিয়ে গেলেন তিনি। দস্যুরা উঠে দাঁড়াল। সব অস্ত্র ফেলে দিয়ে নিঃশব্দে তঁাকে অনুসরণ করল।
নগরহারের গুহায় ভগবান বুদ্ধের ছায়া দর্শন করে হিউ-এন-সাঙ-এর মনের মধ্যে বিচিত্র এক ভাব জেগে ওঠে। তঁার মনে হল মহান আত্মার কোনো ক্ষয় নেই, কোনো লয় নেই। ভগবান বুদ্ধ অতীতেও যেমন ছিলেন আজও তেমন রয়েছেন। প্রতিমুহূর্তে তঁার ছায়াসঙ্গী হয়ে আছেন। তঁার করুণার স্পর্শ না পেলে কিছুতেই নিশ্চিত মৃত্যুকে জয় করে ভারতবর্ষে পৌঁছোতেন না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন