চঞ্চলকুমার ঘোষ
কুলুতা বা কুলু পরিভ্রমণ শেষ করে সমতলে নেমে এলেন হিউ-এন-সাঙ। এখানকার সব কিছুই তঁার কাছে নতুন। তবুও যেখানে যা দেখেন নিজের বুদ্ধি বিবেচনা অনুভব দিয়ে বিচার করবার চেষ্টা করেন। বুঝতে পারেন বৌদ্ধ ধর্মের সেই গৌরবোজ্জ্বল দিন আর নেই। বৌদ্ধ স্তূপ, চৈত্যে, বিহার অধিকাংশই ভগ্ন বা ধ্বংসস্তূপ হয়ে রয়েছে। ভিন্ন ধর্মের মানুষরা বৌদ্ধধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়। মাঝে মাঝে নিজের মধ্যেই জিজ্ঞাসা ওঠে, কেন এমন হল। উত্তর খোঁজার বৃথা চেষ্টা করেন না। যা অনিবার্য তাকে স্বীকার করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
এগিয়ে চলেন হিউ-এন-সাঙ। শতদ্রু ও পারিয়া রাজ্য পার হয়ে এবার গন্তব্যস্থল যমুনার তীরে মথুরা।
বৈষ্ণবতীর্থ মথুরার অধিকাংশ মানুষ হিন্দু হলেও সেই সময়ে বেশ কয়েক হাজার বৌদ্ধ শ্রমণ এখানে বাস করতেন। এঁদের মধ্যে বৌদ্ধদের সব সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন। হিউ-এন-সাঙ লিখেছেন তখনকার মথুরা রাজ্যের আয়তন ছিল পাঁচ হাজার লি। রাজধানী নগরের আয়তন কুড়ি লি। এখানকার জমি উর্বর। মথুরার জনগণের বেশিরভাগ মানুষই কৃষিকাজ করেন। রাজ্যের সর্বত্রই আম বাগান। এইসব বাগানের আম অত্যন্ত সুস্বাদু। নগরবাসীর আচার-আচরণও যথেষ্ট ভালো। যাঁরা জ্ঞান বিদ্যার চর্চা করেন, তঁারা সকলের কাছেই শ্রদ্ধেয়। তিনি আরও লিখেছেন, মথুরা নগরে কুড়িটির মতো বৌদ্ধ বিহার রয়েছে। নগরের আরেক প্রান্তে পাঁচটি দেবমন্দির। যেখানে অবৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করে।
হিউ-এন-সাঙ-এর জীবনচরিত পড়তে পড়তে এইখানে এসে বইটা বন্ধ করে অমিতাভ। মথুরার কথা মনে হতেই মন থেকে সব ভাবনাগুলো কেমন ঝাপসা হয়ে যায়। আজন্ম পরিচিত একটি মুখ চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। শ্রীকৃষ্ণের সম্পর্কে একটি কথাও লিখে যাননি হিউ-এন-সাঙ। আসলে হিন্দুশাস্ত্র, পুরাণ, বেদ, উপনিষদ বিষয়ে কোনো আগ্রহই ছিল না তঁার। অর্জুনের পাখির চোখের মতো তঁার দৃষ্টি একান্তই নিবদ্ধ ছিল বৌদ্ধশাস্ত্রের দিকে।
চুপ করে ভাবে অমিতাভ। দূরদর্শনের দৌলতে কৃষ্ণের কথা জানা হলেও মথুরার কথা প্রায় কিছুই জানে না। কোনো একটা বইতে পড়েছিল অজ্ঞানতাই অন্ধকার। জ্ঞানই আলো। জীবনের এই অন্ধকার কাটিয়ে আলো চায় অমিতাভ। উঠে গিয়ে কম্পিউটার খোলে। ছোট্ট এই যন্ত্রটা পৃথিবীর জ্ঞানের জগৎকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে। মথুরার কত তথ্য এসে যায়। ইতিহাস আর পুরাণ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। পুরাণে বলে দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপুর পুত্র মধুদানব এই নগরের প্রতিষ্ঠা করেন। তঁার নাম থেকে নগরের নাম হয় মধুরা। তপস্যায় মহাদেবকে তুষ্ট করে মধুদানব ভয়ংকর এক শূল লাভ করেন। বলা হয় এই শূল যাঁর হাতে থাকবে সে হবে অবধ্য। মধুদৈত্য বহুদিন রাজত্ব করার পর সেই শিবদত্ত শূল তঁার পুত্র লবনকে দিয়ে যান। এদিকে লবন রাজা হয়েই সকলের উপর অত্যাচার শুরু করে দিল। ব্রাহ্মণরা সকলে শ্রীরামচন্দ্রের কাছে এসে বলল, এই দুষ্ট দানবের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করুন প্রভু। রামচন্দ্র কিছু বলবার আগেই শত্রুঘ্ন বললেন, আপনারা সকলে অনেক বড়ো কাজ করেছেন, আমি কিছু করিনি। আমাকে এই সুযোগটুকু দিন। রামচন্দ্র তঁাকে অনুমতি দিলেন। শত্রুঘ্ন তখন চললেন মধুরায়। সঙ্গে মহাঋষি ভার্গব। তিনি বললেন, লবন মহাশক্তিশালী। তা ছাড়া তঁার সঙ্গে রয়েছে শিবের ত্রিশূল। তোমাকে কৌশলে তাকে বধ করতে হবে। প্রতিদিন সকালে সে শিবের মন্দিরে ত্রিশূল রেখে নদীতে স্নান করতে যায়। সেই সময়ে তাকে বধ করবে।

পরদিন যখন স্নান সেরে নদী থেকে উঠে আসছে লবন সেইসময় তাকে বিষ্ণুবাণে হত্যা করলেন শত্রুঘ্ন। তারপর শত্রুঘ্ন সেখানে নতুন এক নগর প্রতিষ্ঠা করলেন। মধুরা থেকে নতুন নগরের নাম হল মথুরা। পরবর্তীকালে মথুরার রাজা হন কংস। তারই কারাগারে জন্ম হয় কৃষ্ণের। পরে অত্যাচারী কংসকে হত্যা করে মথুরার রাজা হন কৃষ্ণ। কিন্তু জরাসন্ধের ক্রমাগত আক্রমণে শেষপর্যন্ত মথুরা ত্যাগ করে দ্বারকায় নতুন রাজত্ব স্থাপন করেন। বলা হয় সপ্ততীর্থের অন্যতম তীর্থ মথুরা।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকে বৌদ্ধ ধর্মের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। গড়ে উঠেছিল বেশ কিছু বৌদ্ধ বিহার। বাস করতেন বহু বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। বৌদ্ধ ধর্মের যথেষ্ট প্রভাব এখানে। জৈন তীর্থঙ্কর মল্লিনাথ ও নেমিনাথের জন্ম ও কর্মভূমি এই মথুরায়। পবিত্র এই ভূমিতে প্রথম আঘাত হানে গজনির সুলতান মামুদ। পরবর্তীকালে সিকান্দার লোধি। মথুরার বহু মন্দির ধ্বংস হয়ে যায়। পরে শ্রীচৈতন্যের প্রভাবে নতুন করে জেগে ওঠে মথুরা। মুগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের হাতে আবার ধ্বংস হয় মথুরা। এত ধ্বংসের মধ্যেও মথুরা আবার নতুন করে জেগে ওঠে। গড়ে ওঠে অসংখ্য মন্দির। শুধু বৈষ্ণবদের কাছেই নয়, সকল ভারতবাসীর কাছেই পরম পবিত্র তীর্থক্ষেত্র।
মথুরার প্রসঙ্গে এইটুকু জেনেই কম্পিউটার বন্ধ করল অমিতাভ। আসলে হিউ-এন-সাঙ-এর চলার পথ ধরে তারও যে পথ চলা। সেই পথের যতটুকু জানা যায়। আবার বই খোলে।
মথুরার পথ ধরে চলেছেন হিউ-এন-সাঙ। তঁার আগমনের সংবাদ ইতিমধ্যে পৌঁছে গিয়েছে বৌদ্ধ বিহারে। প্রধান আচার্য এবং বিহারের সকল ভিক্ষু তঁাকে স্বাগত জানায়। পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন হিউ-এন-সাঙ। সামান্যক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বললেন, আচার্য, শুনেছি সম্রাট অশোক এখানে তিনটি স্তূপ নির্মাণ করেছিলেন।
আচার্য বললেন, আপনি ঠিকই শুনেছেন ধর্মগুরু। তবে বর্তমানে সব কটি স্তূপই ভগ্নপ্রায়।
‘তবু আমি সেগুলি দর্শন করবার জন্যে উদগ্রীব হয়ে আছি। আপনি একজন সঙ্গীর ব্যবস্থা করুন।’
আচার্য বললেন, আমরা আপনার সেবার আয়োজন করেছি।
সামান্য হাসলেন হিউ-এন-সাঙ।
‘নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া আমি কারও সেবা গ্রহণ করি না।’
‘আপনি পরিশ্রান্ত।’
‘আমি দেহের পরিশ্রমের কথা ভাবি না।’
আচার্য অনুভব করলেন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি অন্য সকলের চেয়ে আলাদা। বললেন, চলুন ধর্মগুরু আমি আপনার সঙ্গী হব। এখানে অশোকের স্তূপ ছাড়াও ভগবান বুদ্ধের পাঁচ শিষ্যের পাঁচটি স্তূপ রয়েছে।
হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমি সেই পাঁচটি স্তূপও দর্শন করতে চাই।
বৌদ্ধ বিহার থেকে সামান্য দূরে বিরাট এক উদ্যান। দেখে বোঝা যায় এই উদ্যানের নিয়মিত পরিচর্যা হয়। গাছপালার মধ্যে দিেয় পথ গিেয়ছে। উদ্যানের মাঝামাঝি একটি স্তূপ। হিউ-এন-সাঙ কিছু জিজ্ঞাসা করবার আগেই আচার্য বললেন, ধর্মগুরু সামনে যে-স্তূপটি দেখছেন সেটি বুদ্ধ-শিষ্য সারিপুত্রর স্মৃতিতে নির্মাণ করা হয়।
সারিপুত্রর স্তূপের পিছনে আর একটি স্তূপ চোখে পড়ছিল। হিউ-এন-সাঙ বললেন, পিছনের ওই স্তূপটি কার ?
‘ওই স্তূপটি মৌদ্গল্যায়নের।’
একে একে দুটি স্তূপের কাছে গিয়ে প্রণাম জানালেন হিউ-এন-সাঙ। একটি আম গাছের নীচে পাথরের বেদি, সেখানে দু-জনে বসলেন। মৃদু বাতাস বইছে। হিউ-এন-সাঙ বললেন, আচার্য আমি ভগবান বুদ্ধের এই শিষ্যদের নাম শুনেছি, তঁাদের জীবনকথা বিশেষ জানি না।
আচার্য বললেন, আমি সামান্য যা জানি আপনাকে বলছি। ভগবান বুদ্ধ তখন রাজগৃহে অবস্থান করছেন। মহারাজা বিম্বিসার তঁার কাছে দীক্ষাগ্রহণ করেছেন। নগরের মানুষজনের কাছে বুদ্ধ প্রতিদিন ধর্মকথা প্রচার করছেন। তঁার এক শিষ্য অশ্বজিৎ একদিন নগরের পথে ভিক্ষা করছেন। সেই সময় পথের ধারে এক প্রাসাদে দাঁড়িয়েছিলেন সুদর্শন এক যুবক। কিছুদিন ধরে নিজের মধ্যে এক অস্থির যন্ত্রণা অনুভব করছিলেন যুবক। অনেকের কাছেই গিয়েছেন, কেউ তঁার মনকে শান্ত করতে পারেনি। অশ্বজিৎকে দেখামাত্রই যুবকের মনে হল এই সন্ন্যাসী নিশ্চয়ই তঁার সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছেন। তাই তঁার চোখে-মুখে এমন পবিত্রতা আর প্রজ্ঞার আভা ফুটে উঠেছে। ইতিপূর্বে যেসব সন্ন্যাসীদের দেখেছেন তঁাদের কারও মধ্যেই এমন ভাবের প্রকাশ দেখতে পাননি। তঁার সামনে গিয়ে নত হয়ে বললেন, হে মহাত্মন, আপনাকে দেখে আমার সমস্ত অন্তর শ্রদ্ধা আর ভক্তিতে পূর্ণ হয়ে গিয়েছে।
অশ্বজিৎ প্রসন্ন কণ্ঠে বললেন, যুবক তুমি আমার মধ্যে যা-কিছু দেখছ তার কিছুই আমার নয়, সবই আমার গুরুর। তঁার অধ্যাত্মসম্পদের কণামাত্রও আমার মধ্যে নেই।
কৌতূহলী হয়ে উঠলেন যুবক। বললেন, কে আপনার গুরু ?
অশ্বজিৎ বললেন, ভগবান তথাগত। মহান শাক্যবংশে তঁার জন্ম। তিনি বোধিলাভ করে এখন বুদ্ধ। তিনি সকলকে শিক্ষা দেন এই জগতে বিভিন্ন বস্তুর যেসব অস্তিত্ব আমরা দেখি তা সব অন্য থেকে পৃথক বলে মনে হয়। প্রকৃতপক্ষে তারা পৃথক বা পরস্পর বিছিন্ন নয়। সকলেই এক কার্যকারণ তত্ত্বের দ্বারা আবদ্ধ এবং সকলেই অভিন্ন। বস্তুর এই ভিন্নতার উৎপত্তি হয় মানুষের অজ্ঞতা আর মায়ার প্রভাব থেকে। মানুষ যখন মূল ঐক্যের সত্যতা জানতে পারে তখন তার মধ্যে থেকে ভেদজ্ঞান চলে যায়।
যুবকের মনে হল সন্ন্যাসীর সব কথার অর্থ না বুঝলেও অনুভব করতে পারছেন জীবন ও জগৎ সম্পর্কে পরম এক সত্য এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে।
অশ্বজিৎ বললেন, যুবক তোমার মধ্যে জ্ঞানের প্রবল পিপাসা অনুভব করছি। কী নাম তোমার ?
‘আমার নাম সারিপুত্র।’
অশ্বজিৎ বললেন, সারিপুত্র তুমি আমার গুরু ভগবান বুদ্ধের কাছে চলো। একমাত্র তিনিই তোমার সব জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে পারবেন।
সারিপুত্র বললেন, মহাশয় আপনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন। আমার বন্ধু মৌদ্গল্যায়ন আমার মতোই জ্ঞানপিপাসু, সেও প্রকৃত গুরুর সন্ধান করছে, আমি তাকে সংবাদ দিচ্ছি। সে নিশ্চয়ই ভগবান বুদ্ধের কাছে যাবে।
অশ্বজিৎ বললেন, আমি তোমাদের জন্যে প্রতীক্ষা করছি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সারিপুত্র বন্ধু মৌদ্গল্যায়নকে নিয়ে আসতেই অশ্বজিৎ তঁাদের নিয়ে গেলেন ভগবান বুদ্ধের কাছে। বুদ্ধ তখন শিষ্যদের উপদেশ দিচ্ছিলেন। দু-জনকে দেখামাত্রই বুদ্ধ বললেন স্বাগত, আমি তোমাদেরই জন্যে প্রতীক্ষা করছিলাম।
দু-জনেই বিস্ময়ে অভিভূত। বুদ্ধ বললেন, তোমরা দু-জনে হবে আমার প্রধান শিষ্য। একজন হবে মহাজ্ঞানী আর একজনের মধ্যে নানান শক্তির পূর্ণ প্রকাশ ঘটবে।
তারপর দু-জনকে দীক্ষা দিলেন বুদ্ধদেব।
দীর্ঘক্ষণ সারিপুত্র আর মৌদ্গল্যায়নের কথা বলে নীরব হলেন আচার্য।
বেলা শেষ হয়ে এসেছিল। উপালি, আনন্দ আর রাহুলের স্মারকস্তূপ দর্শন করে বৌদ্ধ বিহারে ফিরে এলেন হিউ-এন-সাঙ। রাত্রিতে বৌদ্ধ বিহারের সকলে এসে বসেন। তঁারা হিউ-এন-সাঙ-এর কাছে তঁার দীর্ঘ পথযাত্রার কাহিনি শুনতে চায়। প্রসন্ন মনেই হিউ-এন-সাঙ বলেন কী প্রবল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে এইখানে আসতে হয়েছে।
রাত বাড়ে। সকলে যে যার কক্ষে চলে যান। প্রথম রাতটুকু বিশ্রাম নেন হিউ-এন-সাঙ। যখনই ঘুম ভেঙে যায়, ধ্যানে বসেন। এই ধ্যানই তঁার শক্তি।
কয়েক দিন মথুরায় কাটিয়ে আবার পথে বার হলেন হিউ-এন-সাঙ। যমুনা নদীর উজান পথ ধরে এলেন স্থানেশ্বর রাজ্যে। (বর্তমান নাম থানেশ্বর)।
বলা হয় এই থানেশ্বর শব্দের অর্থ ঈশ্বরের আবাস। একসময় এর অদূরেই বয়ে চলত সরস্বতী নদী। প্রকৃতির বিচিত্র খেয়ালে চিরদিনের জন্যে শুকিয়ে গেল সরস্বতী। এই থানেশ্বরেরই আরেক প্রান্তে মহাভারত প্রসিদ্ধ কুরুক্ষেত্র।
হিউ-এন-সাঙ যখন থানেশ্বরে আসেন তার আগে এখানকার রাজা ছিলেন মহারাজ প্রভাকরবর্ধন। প্রভাকরবর্ধন ছিলেন বীর ও সুযোগ্য শাসক। তিনি হূন, গুর্জর, মালবদের যুদ্ধে হারিয়ে শুধু রাজ্যের সীমাকে বাড়াননি, বিদেশি লুণ্ঠনকারীদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করেন। নিজের কন্যা রাজশ্রীর সঙ্গে মৌখরিরাজ গ্রহবর্মনের বিয়ে দেন। প্রভাকরবর্ধনের মৃত্যুর পর তার পুত্র রাজ্যবর্ধন থানেশ্বরের সিংহাসনে বসেন। সেই সময় মালবরাজ দেবগুপ্ত আর গৌড়ের রাজা শশাঙ্কের মিলিত সৈন্যবাহিনীর আক্রমণে গ্রহবর্মনের মৃত্যু হয় এবং রাজ্যশ্রী কারারুদ্ধ হলেন। ভগ্নীর এই দুঃসংবাদে বিচলিত হয়ে রাজ্যবর্ধন তাকে উদ্ধার করবার জন্যে দেবগুপ্তের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। দেবগুপ্ত পরাজিত হলেও শশাঙ্কের হাতে নিহত হলেন রাজ্যবর্ধন।
রাজ্যবর্ধন নিহত হওয়ার পর থানেশ্বরের সিংহাসনে বসলেন তঁার ভাই হর্ষবর্ধন। প্রথমেই হর্ষবর্ধন ভ্রাতৃহত্যার প্রতিশোধ নেবার জন্যে শশাঙ্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করলেন। এরই মধ্যে রাজ্যশ্রী কারাগার থেকে পালিয়ে বিন্ধ্যপর্বতের অরণ্যে আশ্রয় নেন। হর্ষবর্ধন যখন তঁার সন্ধান পেলেন রাজ্যশ্রী আগুনে ঝাঁপ দেবার উদ্যোগ করছিলেন। হর্ষবর্ধন তঁাকে উদ্ধার করে থানেশ্বরে নিেয় এলেন। যদিও শশাঙ্কের বিরুদ্ধে একাধিক বার যুদ্ধ করেছিলেন হর্ষবর্ধন, কোনোবারই সফল হননি। শশাঙ্কের মৃত্যুর পর হর্ষবর্ধন সমস্ত উত্তর ভারত দখল করে সাম্রাজ্য স্থাপন করেন এবং তঁার রাজধানী কনৌজে স্থানান্তরিত করেন।
শশাঙ্ক শৈব ধর্মাবলম্বী ছিলেন। যদিও হিউ-এন-সাঙ তঁাকে বৌদ্ধ ধর্ম বিদ্বেষী বলে উল্লেখ করেছেন, তা মোটেই সত্য নয়। কারণ হিসেবে বলা যায় হিউ-এন-সাঙ গৌড়ে এসে দেখেছিলেন গৌড়ের রাজধানী কর্ণসুবর্ণ ও রাজ্যের বহু জায়গায় একাধিক বৌদ্ধ বিহার রয়েছে। তা ছাড়াও বৌদ্ধ ধর্মের যথেষ্ট মর্যাদা ছিল সেই সময়।
হিউ-এন-সাঙ যখন থানেশ্বরে আসেন তখন এই অঞ্চল ছিল খুবই সমৃদ্ধিশালী। তিনি লিখেছেন, এখানকার আবহাওয়া গরম হলেও রাতের বেলায় বেশ মনোরম। নগরে ধনী লোকের সংখ্যা যথেষ্ট, তারা গুণী মানুষের মর্যাদা দিতে জানে। এখানকার বৌদ্ধরা হীনযানী। নগরের একদিকে বহু দেবমন্দির রয়েছে। এখানে ভিন্নধর্মের লোকেরা পুজোপাঠ করে। নগরের অদূরে বিস্তৃত এক স্থানকে স্থানীয় মানুষরা ধর্মক্ষেত্র (কুরুক্ষেত্র) বলে। সেখানে অতীত কালে দুই রাজায় যুদ্ধ হয়েছিল।
থানেশ্বরে কয়েক দিন কাটিয়ে হিউ-এন-সাঙ এলেন স্রুগনা রাজ্যে। সম্ভবত বর্তমান রোহতকের উত্তরে কোথাও ছিল এই রাজ্যের অবস্থান। এর পূর্ব দিকে ছিল গঙ্গানদী, উত্তরে পর্বতমালা, মাঝে যমুনা। এখানে পাঁচটি বৌদ্ধ বিহারে বহু শ্রমণ বাস করেন।
এবার হিউ-এন-সাঙ এসে পৌঁছোলেন গঙ্গার তীরে, সম্ভবত হরিদ্বারে। প্রসারিত গঙ্গা। চারদিকে মনোরম দৃশ্য। গঙ্গার জলের রং নীলাভ। দিনের বিভিন্ন সময়ে এর রং পরিবর্তন হয়। প্রচণ্ড জলস্রোত তীরে এসে আছড়ে পড়ছে। রাক্ষসের মতো আঁশওয়ালা কোনো জীব এই নদীতে দেখা যায়, তারা মানুষের কোনো ক্ষতি করে না। হিউ-এন-সাঙ গঙ্গার প্রসঙ্গে বলেছেন, ভারতীয়রা এই নদীকে পরম পবিত্র বলে মনে করে। তারা বিশ্বাস করে এই নদীতে স্নান করলে সব পাপ দূর হয়। এই জল পান করলে মৃত্যুর পর মানুষ স্বর্গে যায়। সেই কারণে দলে দলে মানুষ গঙ্গাস্নান করবার জন্যে এখানে আসে।
হিউ-এন-সাঙ এই ধর্মবিশ্বাসকে কিছুটা অশ্রদ্ধার চোখেই দেখেছেন। তিনি বলেছেন, বিধর্মীরা এই ভ্রান্ত বিশ্বাসের দ্বারাই এতদিন পরিচালিত হয়েছিল। পরে দেব বোধিসত্ত্ব এসে তাদের সত্য পথের সন্ধান দেন। একদিন দেব বোধিসত্ত্ব গঙ্গাতীরে দাঁড়িয়ে আছেন। দেখলেন কিছু লোক সূর্যের দিকে তাকিয়ে জলের অঞ্জলি দান করছেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কী করছ ?
লোকগুলি জবাব দিল, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের জলদান করছি।
বোধিসত্ত্ব আবার জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের পূর্বপুরুষেরা কোথায় ?
‘তঁারা স্বর্গে আছেন।’
‘স্বর্গ কত দূর ?’ প্রশ্ন করলেন বোধিসত্ত্ব।
‘সে বহুদূর। মর্ত্য থেকে লক্ষ লক্ষ মাইল।’
‘অত দূরে তোমাদের জল গিয়ে পৌঁছোবে ?’
লোকগুলি জোরের সঙ্গে বলল, নিশ্চয়ই পৌঁছোবে। আমাদের শাস্ত্রে সেকথা লেখা আছে।
বোধিসত্ত্ব তখন জলের মধ্যে নেমে তার স্রোতকে উলটো দিকে ঘোরাবার চেষ্টা আরম্ভ করলেন। লোকগুলি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, এ আপনি কী করছেন ?
বোধিসত্ত্ব বললেন, আমার পিতা মাতা দূর দেশে থাকেন। সেখানে জল পাওয়া যায় না। পিতা মাতা ভীষণ তৃষ্ণার্ত হয়ে আছেন। আশা করি এই জল তঁাদের তৃষ্ণা মেটাবে।
লোকেরা সকলেই হেসে ফ্যালে, ‘আপনি বোকার মতো কাজ করছেন। এখানে জল ঠেলে কি দূর দেশে আপনার বাবা-মায়ের তেষ্টা মেটানো সম্ভব ?’
বোধিসত্ত্ব বললেন, যদি এখানে জলদান করলে স্বর্গের মানুষের তেষ্টা মেটাতে পারে, তবে দূর দেশে আমার বাবা-মায়ের তেষ্টা মিটবে না কেন ?
সকলেই নিজেদের ভুল বুঝতে পারে। নিজেদের ধর্ম ত্যাগ করে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করল।
এই অঞ্চলে বেশ কয়েক মাস ছিলেন হিউ-এন-সাঙ। এই সময় ত্রিপিটকে পণ্ডিত এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তঁার নাম ছিল জয়গুপ্ত। জয়গুপ্তের কাছে হিউ-এন-সাঙ সৌত্রান্তিক সম্প্রদায়ের বিভাষাশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন।
গঙ্গার পূর্ব তীরে ময়ূর নগর। ছোটো নগর, কিন্তু ঘন লোকবসতিপূর্ণ। নগরের প্রান্তে গঙ্গা। বিশাল জলপ্রবাহ। গঙ্গা থেকে কিছু দূরে বিশাল এক দেবমন্দির। মন্দির সংলগ্ন এক দিঘি। গঙ্গা থেকে জল এনে তাতে পূর্ণ করা হয়। একে লোকে বলে গঙ্গাদার। ধর্মচর্চা ও পাপমোচন করবার জন্যে দূর দূর প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে আসেন। তঁারা গঙ্গাস্নান করেন, মন্দিরে পুজো দিয়ে যে যার ঘরে ফিরে যান।
এই গঙ্গাদার স্থানটি নিয়ে মতভেদ আছে। তবে অধিকাংশ ব্যক্তির অভিমত এই স্থানটি হরিদ্বার কিংবা হৃষিকেশ সংলগ্ন কোথাও।
এখান থেকে যাত্রা করে একে একে ব্রহ্মপুর, গোবিসন, অহিচ্ছত্র, ভিলশান রাজ্য পার হয়ে এলেন কপিথ বা সাংকাশ্য রাজ্যে। চিনা ভাষায় কাহ-পি-ত। বর্তমানে এটি উত্তরপ্রদেশের এটোয়া জেলার বসন্তপুর অঞ্চল। এখানে একইসঙ্গে বৌদ্ধ ও শৈব সম্প্রদায়ের বাস করত। নগরের প্রান্তে বিরাট এক বৌদ্ধ বিহার। কয়েক-শো বৌদ্ধ ভিক্ষু এখানে বাস করতেন। বিহারের প্রধান আচার্য হিউ-এন-সাঙ-এর আগমনবার্তা শোনামাত্রই তঁাকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে এলেন
বিশাল বিহার। বিহার প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতেই হিউ-এন-সাঙ-এর দৃষ্টি পড়ল পাশাপাশি তিনটি উঁচু সিঁড়ির ওপর। প্রতিটি সিঁড়িই কারুকার্য করা, বহু জায়গায় রত্নখচিত। সিঁড়ির উপর ছোটো একটি মন্দির।
কৌতূহলে হিউ-এন-সাঙ জিজ্ঞাসা করলেন, এই মন্দিরে তিনটি সিঁড়ি কীসের ?
বিহারের আচার্য বললেন, এই তিনটি সিঁড়ি ঘিরে সুন্দর এক কাহিনি রয়েছে। বলা হয় স্বর্গের দেবতা ও ভগবান বুদ্ধের স্বর্গগতা মায়ের ইচ্ছা হল বুদ্ধের কাছে ধর্মোপদেশ শুনবেন। মায়ের ইচ্ছার কথা শুনে বুদ্ধ স্বর্গে গেলেন। দীর্ঘ তিন মাস ধরে ধর্মকথা শুনিয়ে মর্তে ফিরে আসবার সময় দেবতারা তঁার জন্যে সিঁড়ি প্রস্তুত করে দিলেন। মাঝের সিঁড়ি দিয়ে বুদ্ধ অবতরণ করলেন, ডান দিকের সিঁড়ি দিয়ে শ্বেত চামর হাতে নামলেন ব্রহ্মা। বাঁদিকের সিঁড়িতে ছত্র নিয়ে ইন্দ্র। মাঝের সিঁড়িটি ছিল সোনার, দুই ধারের দুটি সিঁড়ি রুপোর।
বিস্মিত হিউ-এন-সাঙ জিজ্ঞাসা করলেন, সেই সিঁড়ি কি কেউ দেখেছেন ?
আচার্য বললেন, শোনা যায় দূর অতীতে যাঁরা প্রকৃত ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন তঁারা দর্শন করেছিলেন। পরে সেই সিঁড়ি মাটির মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যায়। তখন রাজারা তার পরিবর্তে নতুন করে তিনটি সিঁড়ি তৈরি করে দেন। তার উপর মন্দির নির্মাণ করলেন।
‘কত দীর্ঘ এই সিঁড়ি ?’
‘সত্তরটি ধাপ রয়েছে এখানে।’
‘উপরে যে মন্দির রয়েছে আমি কি তা দর্শন করতে পারি ?’
আচার্য তাড়াতাড়ি বললেন, আপনার দর্শনের জন্যে এখানকার সব কিছুই উন্মুক্ত। এখন আপনি বিশ্রাম করুন। তারপর মন্দিরে গিয়ে ভগবান তথাগতকে প্রণাম করবেন ধর্মগুরু।
হিউ-এন-সাঙ বললেন, না আচার্য, আগে তথাগতকে প্রণাম জানাব, তারপর বিশ্রাম করব। চলুন মন্দিরে যাই।
সিঁড়ির সর্বোচ্চ ধাপে গিয়ে মন্দির। ছোটো মন্দির। ভিতরে কারুকার্য করা বেদির উপর বুদ্ধের মূর্তি। তার দু-পাশে ব্রহ্মা ও ইন্দ্রের মূর্তি।
মন্দিরের পাশে একই উচ্চতায় একটি স্তম্ভ রয়েছে। এটি সম্রাট অশোক নির্মাণ করেছিলেন। মন্দিরে কিছুক্ষণ প্রার্থনা করে নেমে এলেন হিউ-এন-সাঙ। দিন ফুরিেয় এসেছিল। আচার্য বললেন, চলুন আপনার বিশ্রামের আয়োজন করি।
পরদিন সকালে প্রার্থনা শেষ হতেই আচার্য বললেন, ধর্মগুরু, চলুন ভগবান বুদ্ধের চরণচিহ্ন দর্শন করে আসি।
মুহূর্তে হিউ-এন-সাঙ-এর সমস্ত শরীর জুড়ে বিচিত্র এক অনুভূতি জেগে ওঠে। অস্ফুটে বলে ওঠেন, চলুন আচার্য, সেই মহা পবিত্র ভূমি দর্শন করে আমার জীবন ধন্য হবে।
অশোক স্তূপের সামান্য দূরে প্রাচীর-ঘেরা একটি পাথরের বেদি, তার মাঝে দুটি চরণচিহ্ন। বেদির সামনে এসে আভূমি নত হলেন হিউ-এন-সাঙ। কোনো জিজ্ঞাসা তঁার মনে জেগে উঠল না। পাথরের উপর সত্যিই কি পদচিহ্ন পড়ে ? যুগ-যুগান্তরের বিশ্বাস। তিনি জানেন এই বিশ্বাসের শক্তি সুদূর চিন থেকে কত দুর্গম পথ পেরিয়ে তঁাকে এই ভারতবর্ষে পৌঁছে দিল।
একসময় উঠে দাঁড়ালেন হিউ-এন-সাঙ। তঁার দু-চোখে অশ্রুবিন্দু। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে থাকেন, তারপর পাথরে উৎকীর্ণ একটি ফলক দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, এটি কীসের ফলক ?
আচার্য বললেন, এটি ভিক্ষুণী উৎপলবর্ণার স্মৃতিফলক।
‘কে উৎপলবর্ণা ?’ জিজ্ঞাসা করলেন হিউ-এন-সাঙ।
আচার্য বললেন, উৎপলবর্ণা ছিলেন ভগবান বুদ্ধের শিষ্যা। কী বেদনাময় ছিল তঁার জীবন। সেই জীবন থেকে কর্মবলে অর্হৎ হয়েছিলেন।
‘আপনি বলুন তঁার জীবনকাহিনি।’
সামনে একটি গাছের নীচে পাথরের বেদির উপর বসলেন দু-জন। আচার্য শুরু করলেন ভগবান বুদ্ধের সেই মহান শিষ্যার জীবন কথা।
‘শ্রাবস্তীর কোনো এক ধনী পরিবারে উৎপলবর্ণার জন্ম। অসাধারণ ছিল তঁার সৌন্দর্য। এক শ্রেষ্ঠী যুবক নিয়মিত তঁাদের গৃহে আসা-যাওয়া করত। রূপবান সেই যুবককে দেখে ভালো লাগে উৎপলবর্ণার। দুই পরিবারের ইচ্ছায় উৎপলবর্ণার বিবাহ হয় সেই যুবকের সঙ্গে। এই বিবাহের অল্পদিন পরেই উৎপলবর্ণার পিতা মারা গেলেন। উৎপলবর্ণার মা ছিলেন অসাধারণ সুন্দরী। পিতার মৃত্যুর কিছুদিন যেতেই উৎপলবর্ণা জানতে পারেন তঁার মা আর স্বামীর মধ্যে অবৈধ প্রণয় গড়ে উঠেছে। এক রাতে নিজের চোখে তা প্রত্যক্ষ করতেই প্রচণ্ড মানসিক ক্ষোভ, ঘৃণা, যন্ত্রণায় গৃহত্যাগ করে বেরিয়ে পড়লেন। ঘুরতে ঘুরতে পরিচিত এক বণিকের গৃহে আশ্রয় নিলেন। বণিকের স্ত্রী আগেই মারা গিয়েছে। এক কন্যারও বিবাহ হয়ে গিয়েছে। শুধুমাত্র আশ্রয় আর জীবনধারণের জন্যে সেই বণিককে বিবাহ করলেন উৎপলবর্ণা। মানুষের জীবনে যখন দুঃখ আসে কোন পথে তা আসবে কেউ তা জানে না। বিবাহের কয়েক মাস যেতেই বণিকের কন্যার স্বামী মারা গেলেন। পিতার গৃহে এসে উঠলেন বণিককন্যা। কিছুদিন যেতেই উৎপলবর্ণা জানতে পারলেন বণিকের সঙ্গে তার কন্যার অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে। প্রচণ্ড মানসিক আঘাতে গৃহত্যাগ করলেন উৎপলবর্ণা। নিরাশ্রয় উৎপলবর্ণা ঘুরতে ঘুরতে এসে আশ্রয় নিলেন ভগবান বুদ্ধের কাছে। বুদ্ধ তঁাকে দীক্ষা দিয়ে ভিক্ষুণী সংঘে আশ্রয় দিলেন। কিছুদিনের মধ্যেই উৎপলবর্ণা নিজের সাধনার শক্তিতে অহত্ত্ব লাভ করলেন। পরবর্তীকালে উৎপলবর্ণা হয়ে ওঠেন বুদ্ধের অন্যতম প্রধান শিয্যা। তিনি বুদ্ধের বাঁ-দিকে বসতেন বলে বামহস্ত শ্রাবিকা বলে পরিচিত হন।’

আচার্যের কাহিনি শেষ হতেই হিউ-এন-সাঙ বললেন, উৎপলবর্ণার জীবন সার্থক, তিনি ভগবান বুদ্ধের করুণা পেয়েছিলেন।

কপিথ নগরে কয়েক দিন কাটিয়ে উত্তর-পশ্চিম পথে যাত্রা করলেন হিউ-এন-সাঙ। এবারের গন্তব্যস্থল গঙ্গার তীরে কান্যকুব্জ। হর্ষবর্ধনের রাজধানী। বর্তমান নাম কনৌজ। সম্ভবত ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে হিউ-এন-সাঙ কনৌজে পৌঁছলেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন