কাশ্মীর

চঞ্চলকুমার ঘোষ

বলা হয় কাশ্যপ মুনির নাম থেকে কাশ্মীর নামের উৎপত্তি। মহাভারতে রয়েছে কাশ্মীরের কথা। মধ্যম পাণ্ডব অর্জুন কাশ্মীর জয় করেছিলেন। ইতিহাস বলে সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত প্রথমে গান্ধার তারপর কাশ্মীর জয় করেন। বৌদ্ধ ধর্মের চর্চা শুরু হয় সম্রাট অশোকের সময় থেকে। সম্রাট অশোক কাশ্মীরে এসে এখানকার অপরূপ প্রকৃতির শোভা দেখে মুগ্ধ হয়ে যান। তঁার ইচ্ছায় গড়ে ওঠে অসংখ্য স্তূপ বিহার। বৌদ্ধ পণ্ডিতদের সমাগমে মুখর হয়ে ওঠে এইসব বিহার। কুষাণরাজ কনিষ্ক এখানে এসেছিলেন। প্রধানত তঁারই প্রচেষ্টায় কাশ্মীরে চতুর্থ বৌদ্ধ মহাসম্মেলনের অনুষ্ঠান হয়।

এ ইতিহাস অজানা নয় হিউ-এন-সাঙ-এর কাছে। তিনি শুনেছিলেন কাশ্মীর বৌদ্ধ ধর্ম চর্চার অন্যতম পীঠস্থান। এখানে যেমন আছেন বহু মহাজ্ঞানী পণ্ডিত তেমনি বহু দুর্লভ পুথি। সমস্ত অন্তর জুড়ে আবার নতুন করে ব্যাকুলতা জেগে ওঠে। কবে পৌঁছোবেন কাশ্মীরে।

চোখ বুজে যেন আগামী দিনের সব কিছু দেখতে পান। পাহাড়ের কোলে শান্ত বিহার। চারদিকে চিনার গাছের সার। দিন ফুরিয়ে রাত নামলেই চারদিকে ঝরে পড়ে বরফ। সেই বরফ মাড়িয়ে মাড়িয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন। দেখছেন বৌদ্ধ বিহারের চূড়ায় উড়ছে রং-বেরঙের পতাকা, ভেসে আসছে শ্রমণদের মন্ত্র-উচ্চারণ। তিনি সেখানে প্রবেশ করছেন। সামনে ভগবান বুদ্ধের মূর্তি। নতজানু হয়ে প্রার্থনা করছেন। তোমাকে শরণ করে আমার এই পথ চলা। তোমার ধর্মকে শরণ করেই একদিন যেন এই চলার সমাপ্তি হয়।

৬৩১ খ্রিস্টাব্দের মে মাস। চলেছেন হিউ-এন-সাঙ। এবার গন্তব্যস্থল কাশ্মীর। সমস্ত মন জুড়ে গভীর এক আনন্দ। ইতিমধ্যেই তিনি শুনেছেন সেখানকার রাজা দুর্লভবর্মন বৌদ্ধ ধর্মের পরম অনুরাগী। হিউ-এন-সাঙ-এর মনে হল সবই ভগবান বুদ্ধের ইচ্ছায় ঘটছে।

পিরপাঞ্জাল আর পাঙ্গি গিরিবর্তের মধ্যে দিয়ে পথ। সবেমাত্র বরফ গলেছে, চারদিকে প্রকৃতির অপরূপ শোভা। পাহাড়ের গায়ে নানান গাছের সার। পথপ্রদর্শকের দিকে চেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন হিউ-এন-সাঙ, আমরা যে প্রদেশে চলেছি তুমি কি তার প্রসঙ্গে কিছু জান ?

পথপ্রদর্শক বললেন, সামান্যই জানি। বলা হয় পুরাকালে এখানে ছিল বিরাট এক হ্রদ। একবার ঋষি কাশ্যপ এখানে এলেন তপস্যা করতে। কোথায় বসে তপস্যা করবেন। চারদিকেই জল। বিরক্ত হয়ে পাহাড়ের এক মুখ খুলে দিলেন ঋষি। জলাভূমির সব জল এই পথ দিয়ে বার হয়ে গেল। কাশ্যপ এই ভূমির নাম দিলেন কাশ্মীর। ‘কা’ শব্দের অর্থ জল আর ‘সমীরা’ অর্থ শুকনো প্রান্তর। ভগবান বুদ্ধের জন্মের আগে এখানে হিন্দু ধর্মের প্রভাব ছিল। রাজারা ছিলেন হিন্দু। সকলেরই উদার মন। বুদ্ধের মহানির্বাণের পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই এখানে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার শুরু হয়। জনশ্রুতি আছে বুদ্ধের শিষ্য আনন্দের ভক্ত ছিলেন অর্হৎ মধ্যান্তিক। তিনি থাকতেন বারাণসীতে। বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারের জন্যে তিনি কাশ্মীরে গেলেন। সেখানে তখন নাগরাজাদের রাজত্ব। নিজের অধ্যাত্মশক্তিতে নাগ রাজাকে পরাজিত করলেন মধ্যান্তিক। গড়ে তোলা হল বৌদ্ধ বিহার। এলেন পাঁচশো ভিক্ষু। সম্রাট অশোকের সময়ে বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটে এখানে।

হিউ-এন-সাঙ জিজ্ঞাসা করলেন, এখনও কি কাশ্মীরের অধিকাংশ মানুষ বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাস করেন ?

কুণ্ঠিতভাবে পথপ্রদর্শক বললেন, না ধর্মগুরু, অধিকাংশ মানুষ ব্রাহ্মণ ধর্ম পালন করে। তবে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে তাদের কোনো বিরোধ নেই।

আর কোনো প্রশ্ন করলেন না হিউ-এন-সাঙ। মাঝে মাঝে মনে হয় সম্রাট অশোকের মতো দ্বিতীয় কোনো সম্রাট যদি জন্মাতেন, আবার ভগবান বুদ্ধের বাণী দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ত।

নিঃশব্দে এগিয়ে চললেন হিউ-এন-সাঙ। পিরপাঞ্জাল গিরিপথ পার হয়ে শুরু হয়েছে বারমুলা উপত্যকা। এখান থেকেই আরম্ভ কাশ্মীর রাজ্যের সীমানা। হিউ- এন-সাঙ কাশ্মীরে আসছেন এ সংবাদ পাওয়ামাত্রই কাশ্মীররাজ দুর্লভবর্মন নিজের মাতুলকে বললেন, আপনি মহাজ্ঞানী হিউ-এন-সাঙকে সসম্মানে নিয়ে আসুন রাজধানীতে।

আদেশ পাওয়ামাত্রই রওনা হলেন রাজমাতুল। বারমুলায় কয়েক দিনের জন্যে বিশ্রাম করছিলেন ইউ-এন-সাঙ। এমন সময়ে রাজমাতুল এসে তঁাকে অভিবাদন করলেন। বললেন, মহামান্য কাশ্মীররাজ দুর্লভবর্মন আপনাকে স্বাগত জানাবার জন্যে প্রতীক্ষা করছেন।

প্রসন্ন হলেন হিউ-এন-সাঙ। পরদিন সকালেই রাজধানী প্রবরপুরের (বর্তমান শ্রীনগর) দিকে রওনা হলেন সকলে। দীর্ঘ পাহাড়ি পথ। পথের শোভাও অপরূপ। কয়েক দিন চলার পর তিনি এসে পৌঁছোলেন হুবিস্ক বিহারে। অতিথিশালায় তঁার বিশ্রামের আয়োজন করা হল। হুবিস্ক বিহারের অধিকাংশ শ্রমণ তঁার বিষয়ে কিছুই জানতেন না। এমনকী হিউ-এন-সাঙ বিহারে আছেন সে-সংবাদটুকুও তঁারা জানতেন না। সেই রাতে হুবিস্ক বিহারের শ্রমণেরা এক আশ্চর্য স্বপ্ন দেখলেন, সুদূর চিন থেকে এক মহাজ্ঞানী অতিথি এসেছেন বৌদ্ধ শাস্ত্র অধ্যয়ন করবার জন্যে। তঁার সঙ্গে রয়েছেন নানান দেব দেবী। কেউ যেন তাদের বলল, তঁাকে দর্শন না করে, তঁাকে শ্রদ্ধা নিবেদন না করে তোমরা সকলে ঘুমিয়ে আছ  ? মুহূর্তে সকলের ঘুম ভেঙে গেল। রাতের অন্ধকারে কীভাবে অতিথিকে স্বাগত জানাবেন বুঝে উঠতে পারেন না কেউ। সকলেই অধীর উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করেন কখন ভোর হবে। সকাল হতেই সকলে ছুটে আসেন হিউ-এন-সাঙকে দর্শন করবার জন্যে। একদিন সেখানে থাকার পর রাজধানীর দিকে রওনা হলেন সকলে।

কয়েক দিন চলার পর তঁারা এসে পৌঁছোলেন রাজধানীতে। এক যোজন দূরে ঝিলম নদীর তীরে। সেখানে রাজা দুর্লভবর্মন পাত্রমিত্র নিয়ে মহামান্য অতিথিকে স্বাগত জানালেন। রাজার সঙ্গে এসেছেন নগরবাসী। সকলের হাতে ফুল গন্ধধূপ পতাকা। চারদিকে জয়ধ্বনি ওঠে। স্বয়ং রাজা তঁাকে নানান উপহার দিলেন। বিরাট এক হাতিতে চাপিয়ে হিউ-এন-সাঙকে নিয়ে যাওয়া হল নতুন এক প্রাসাদে। পরদিন হিউ-এন-সাঙ গেলেন রাজপ্রাসাদে। আমন্ত্রণ জানানো হল সমস্ত বৌদ্ধ সন্ন্যাাসীদের। মহারাজ দুর্লভবর্মণ বললেন, ধর্মগুরু, আপনি ধর্মালোচনা শুরু করুন। আমরা সকলেই আপনার উপদেশ শোনবার জন্যে প্রতীক্ষা করছি।

সে-সভায় উপস্থিত ছিলেন মহাজ্ঞানী ধর্মকীর্তি। তবে ধর্মালোচনায় অংশ নিতে এসেছেন মহাজ্ঞানী বৌদ্ধ সুধাসিংহ ও জিনবন্ধু। সর্বাস্তিবাদী বৌদ্ধ সুগতমিত্র ও বসুমিত্র। দু-জন মহাসাঙ্ঘিক বৌদ্ধ সূর্যদেব ও জিনমিত্র। হিউ-এন-সাঙ বৌদ্ধ ধর্মের নানান দিক নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন। তঁার জ্ঞান ও উপলব্ধির প্রকাশ দেখে সকলেই মুগ্ধ। ছয় জন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী নানান প্রশ্ন করলেন। প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিলেন হিউ-এন-সাঙ। আসলে পণ্ডিতদের উদ্দেশ্য ছিল হিউ-এন-সাঙ-এর জ্ঞানের গভীরতা যাচাই করা। তিনি সেই পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হলেন। মহারাজ দুর্লভবর্মন বললেন, ধর্মগুরু আপনার উপস্থতিতে আমার রাজসভা ধন্য হল। বলুন কী আপনার প্রার্থনা। যদি সমর্থ হই অবশ্যই তা পূরণ করব।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমি বৌদ্ধশাস্ত্র অধ্যয়ন করে প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করবার জন্যে ভারতবর্ষে এসেছি। সেই কাজে আপনি আমাকে সাহায্য করুন।

মহারাজ দুর্লভবর্মন বললেন, আপনি মহাজ্ঞানী ধর্মকীর্তির কাছে শাস্ত্র অধ্যয়ন করুন। কুড়ি জন অনুলিপি লেখক আপনাকে বিভিন্ন কাজে সাহায্য করবে। এ ছাড়া আপনার সেবা ও প্রয়োজনের সব ব্যবস্থা রাজভাণ্ডার থেকে করা হবে।

পণ্ডিত ধর্মকীর্তি মহা আনন্দে হিউ-এন-সাঙকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করলেন। যদিও তখন তঁার বয়স সত্তর। বয়সের ভারে দুর্বল ও কাতর হয়ে পড়েছেন। হিউ-এন-সাঙ-এর মতো ছাত্র পেয়ে জ্ঞানদানে কোনো কুণ্ঠা নেই। প্রতিদিন সকালে হিউ-এন-সাঙ অভিধর্মকোষ শাস্ত্র পড়েন। দুপুরে অভিধর্ম ন্যায়নুসারা শাস্ত্রপাঠ, রাতের বেলায় তিনি শিক্ষা নিতেন হেতুবিদ্যা শাস্ত্র। কোনো ক্লান্তি নেই হিউ-এন-সাঙ-এর। তিনি শুধু শাস্ত্রচর্চা করেন না, জিজ্ঞাসা করেন পুরোনো দিনের কথা।

ধর্মকীর্তি বলেন, তুমি বৌদ্ধ ধর্ম সম্মেলনের কথা কিছু জান ?

নতমস্তকে হিউ-এন-সাঙ বললেন, বৌদ্ধ ধর্ম সম্মেলনের কথা আমি কিছুই জানি না।

ধর্মকীর্তি বললেন, ভগবান বুদ্ধের পরিনির্বাণের পর কয়েক বছর কেটে যেতেই বৌদ্ধ সংঘের সন্ন্যাসীদের মধ্যে এক জিজ্ঞাসা জেগে উঠল। ভগবান বুদ্ধের বাণী উপদেশ ধর্মীয় জীবন সম্বন্ধে নানান নির্দেশ উত্তরকালের মানুষ কীভাবে জানবে ? তখন স্বভাবতই বুদ্ধের বাণী বিকৃত হবে। বৌদ্ধ সংঘের প্রধানরা নিজেদের খুশিমতো তার ব্যাখ্যা করবে। ধর্মের ক্ষেত্রে এক প্রবল সমস্যা হবে।

হিউ-এন-সাঙ জিজ্ঞাসা করলেন, সেই সময় কারা বৌদ্ধ সংঘের প্রধান ছিলেন ?

‘মূলত দু-জনের উপর ভগবান বুদ্ধ সব দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন। একজন আনন্দ, অন্যজন মহাকাশ্যপ।’

হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমি আনন্দের কথা জানি। তিনি বুদ্ধের বৈমাত্রেয় ভাই ছিলেন এবং সবচেয়ে প্রিয় শিষ্য ছিলেন। বুদ্ধের সেবা ও পরিচর্যার ভার ছিল আনন্দের উপর। কিন্তু মহাকাশ্যপ কে ?

ধর্মকীর্তি বললেন, মহাকাশ্যপ ছিলেন মগধ রাজ্যের অন্তর্গত এক ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান। তঁার নাম ছিল পিপফলি। পিপফলির স্ত্রীর নাম ছিল ভদ্রা। সংসারে থেকেও দু-জনে ব্রহ্মচর্য পালন করতেন। একদিন পিপফলি স্থির করলেন সন্ন্যাস নেবেন। সব কিছু ত্যাগ করে বনের দিকে রওনা হলেন। খানিক দূর যেতেই চোখে পড়ল ভদ্রা তঁাকে অনুসরণ করছে। ভদ্রা ছিল অসাধারণ সুন্দরী। পিপফলির মনে হল যদি স্ত্রী তঁার অনুগামী হয় লোকে ভাববে প্রব্রজ্যা ধর্ম গ্রহণ করেও পিপফলি আসক্তি ত্যাগ করতে পারেনি। স্ত্রীকে বললেন, আমি গৃহত্যাগ করেছি ভদ্রা, আমাদের পথ এখন ভিন্ন।

ভদ্রা স্বামীর আদেশ মেনে নিয়ে বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন আর্য। আপনার সঙ্গে আমিও প্রব্রজ্যা প্রহণ করলাম। আর আমরা প্রব্রাজিত হয়েও যদি বিচ্ছিন্ন হতে না পারি তবে লোকে আমাদের মন্দ বলবে। আজ থেকে আমাদের সাধনার পথ ভিন্ন। আপনি পুরুষ আপনার পথ হবে দক্ষিণে। আমি স্ত্রীলোক, বামা জাতি। আমার পথ হবে বাম দিকে।

মুহূর্তে দুই মহাত্যাগীর আত্মশক্তির প্রভাবে চারদিকের প্রকৃতি জুড়ে আন্দোলন শুরু হয়ে গেল। আকাশে বাতাসে মেঘগর্জন। দুন্দুভির শব্দ। কেঁপে ওঠে সর্বলোক। ভগবান বুদ্ধ তখন বেণুবনের গন্ধকুটিরে বসে ধ্যান করছিলেন। চারপাশের শব্দতরঙ্গে বুদ্ধ অনুভব করলেন পিপফলি আর ভদ্রা সব বিষয় সম্পত্তি ত্যাগ করে তঁার কাছে আসছে। নিজের আসন ছেড়ে উঠে পড়লেন বুদ্ধ। তারপর তিন ক্রোশ পথ গিয়ে রাজগৃহ আর নালন্দার মাঝে এক গাছের তলায় গিয়ে বসলেন। তঁার সমস্ত শরীর থেকে জ্যোতি বার হতে থাকে।

পিপফলি চলতে চলতে রাজগৃহের কাছে এসে দেখলেন এক বটবৃক্ষের নীচে বসে আছেন ভগবান তথাগত। তঁার দীপ্তিতে চারদিক আলোকিত হয়ে রয়েছে। মুহূর্তে পিপফলির মনে হল ইনিই আমার গুরু হবেন। এর জন্যেই আমি গৃহত্যাগ করেছি। এগিয়ে গিয়ে বুদ্ধের পায়ের উপর লুটিয়ে পড়লেন। বললেন, ভগবান আপনি আমার শাস্তা। আমি আপনার শিষ্য।

বুদ্ধ সমস্তই জানতেন। তিনি তঁাকে শিষ্যত্বে বরণ করে উপসম্পদ দান করলেন । পরবর্তীকালে ভদ্রা বুদ্ধের মহিলা সংঘে যোগদান করেন।

হিউ এন-সাঙ বললেন, মহাকাশ্যপ পরম সৌভাগ্যবান ছিলেন।

ধর্মকীর্তি আগের প্রসঙ্গে ফিরে গিয়ে বললেন, বুদ্ধের পরিনির্বাণের পর মহাকাশ্যপ জানতে পারলেন কয়েক জন শিষ্য বুদ্ধের কঠোর নিয়ম মানতে চাইছে না। তারা বলছে এত নিয়ম মেনে চলার কোনো প্রয়োজন নেই। এঁদের মধ্যে প্রধান ছিলেন সুবদ্ধ।

‘সুবদ্ধ কে ?’ জিজ্ঞাসা করলেন হিউ-এন-সাঙ।

কয়েক মুহূর্ত স্থির থেকে তঁার দিকে তাকিয়ে থাকেন ধর্মকীর্তি। অনুভব করছিলেন কী প্রবল জ্ঞানের তৃষ্ণা এই তরুণ শিষ্যের মধ্যে। এমন শিষ্যকে সব জ্ঞান উজাড় করে দেওয়ার আনন্দই আলাদা। বললেন, সুবদ্ধ থাকতেন কুশীনগরের অল্প দূরে এক গ্রামে। সে কখনো বুদ্ধের সংস্পর্শে আসেনি। যখন শুনতে পেল বুদ্ধ এবার শরীর ত্যাগ করবেন তখন সে উপস্থিত হল বুদ্ধের কাছে। তখন বুদ্ধ খুবই অসুস্থ। শিষ্যরা কেউ সুবদ্ধকে তঁার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দিল না। কোনোভাবে বুদ্ধ জানতে পারলেন সেকথা। বললেন, ওকে আমার কাছে আসতে দাও। সুবদ্ধ এসেই নানান প্রশ্ন করলেন। তঁার সব প্রশ্নের জবাব দিলেন বুদ্ধ। তারপর তঁাকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করলেন।

যখন মহাকাশ্যপ জানতে পারলেন সুবদ্ধ সব নিয়ম মানতে চাইছে না, তখন তিনি আরও কয়েক জন প্রবীণ ভিক্ষু মিলিতভাবে এক সভা আহ্বান করলেন। সম্রাট অজাতশত্রুকে সংবাদ দেওয়া হল। তিনি ছিলেন পিতৃহন্তা। বুদ্ধের সংস্পর্শে এসে হয়ে ওঠেন পরম ভক্ত। রাজগৃহের সৎপান্নি গুহায় সেই সভা পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন মহাকাশ্যপ। আনন্দ বুদ্ধের প্রতিটি উপদেশ নিজের স্মৃতি থেকে বলে যান। কবে কোথায় বলেছিলেন তাও বলেন। প্রবীণ সন্ন্যাসীরা সকলেই তা স্বীকার করে নিলেন। বুদ্ধের উপদেশকে বলা হয় সূত্র। সন্ন্যাসীর অবশ্যপালনীয় নিয়মকে বলা হয় বিনয়। এই সভায় বিনয় এবং সূত্র সংকলন করা হল।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, শুনেছি প্রথম ধর্মসম্মেলনের সাতাশ বছর পর বৈশালীতে দ্বিতীয় সম্মেলন হয়। তৃতীয় সম্মেলন হয় পাটলিপুত্রে সম্রাট অশোকের সময়ে।

ধর্মকীর্তি বললেন, তুমি ঠিকই বলেছ। বুদ্ধের মহানির্বাণের চারশো বছর পর গান্ধারের রাজা কণিষ্ক কাশ্মীরে ধর্মসম্মেলন করেন। মোট পাঁচশো জন এই ধর্মসভায় অংশগ্রহণ করেন। এই সভায় প্রধান ছিলেন আচার্য বসুমিত্র। সহ সভাপতি ছিলেন বুদ্ধচরিত-এর রচয়িতা অশ্বঘোষ। এখানে পণ্ডিতরা বিনয়পিটক ব্যাখ্যার জন্যে এক লক্ষ শ্লোকে ‘বিনয়বি ভাষা শাস্ত্র’ এবং অভিধর্মপিটক ব্যাখ্যার জন্যে ‘অভিধর্মবিভাষা শাস্ত্র’ রচনা করেন। এই সমস্ত শাস্ত্র তামার পাতে লিপিবদ্ধ করা হল। পরে তার উপর স্তূপ নির্মাণ করা হয়। সেই স্তূপের কোনো সন্ধান আজও পাওয়া যায়নি।

এমনি ভাবেই আচার্য ধর্মনীতির নানান বিষয় আলোচনা করেন। গভীর মনোযোগের সঙ্গে শুধু তা শোনেন না হিউ-এন-সাঙ, লিপিবদ্ধও করেন িচনা ভাষায়। মাঝে মাঝে নগরের বাইরেও পরিভ্রমণ করেন। দেখেন সব মানুষকে। লেখেন তাদের কথা। এখানকার মানুষরা প্রায় সকলেই সুন্দর। এরা হাসিখুশি, বিদ্যাশিক্ষায় অনুরাগ আছে। তবে ধর্মের দিক থেকে এরা কপট হলেও উদার মানুষও আছেন। একইসঙ্গে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ মানুষ বসবাস করে।

ধর্ম ছাড়াও প্রাকৃতিক নানান বিষয়ের উল্লেখ করেছেন তিনি। এখানে শীতের সময় ভারী তুষারপাত হয়। প্রচুর ফল উৎপন্ন হয়। পাওয়া যায় পশম তুলার পোশাক।

দু-বছর হিউ-এন-সাঙ কাশ্মীরে রয়ে গেলেন। রাজার আনুকূল্য আর আতিথেয়তায় কোনো কিছুই অসুবিধে হল না। এই সময় একদিকে যেমন শাস্ত্রচর্চা করেছেন, অন্যদিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে শিখেছেন পালি সংস্কৃত। ইতিমধ্যে আচার্য ধর্মকীর্তি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। হিউ-এন-সাঙ মনস্থির করলেন এবার তিনি যাবেন অজানা পথে।

সকল অধ্যায়
১.
গভীর গহন এক রাত
২.
আলোর পথে
৩.
প্রথম সকাল
৪.
রাত্রি শেষ
৫.
যাত্রা হল শুরু
৬.
সীমান্ত পথ
৭.
মৃত্যু উপত্যকা
৮.
মরুদ্যান
৯.
হামি
১০.
তুরফান
১১.
কুচা
১২.
বরফের দেশে
১৩.
ইশিক কুল
১৪.
সমরখন্দ
১৫.
লৌহকপাট
১৬.
বামিয়ান
১৭.
গান্ধার
১৮.
ছায়াগুহা
১৯.
পুরুষপুর
২০.
তক্ষশীলা
২১.
কাশ্মীর
২২.
শাকল
২৩.
জলন্ধর থেকে কুলু
২৪.
মথুরা
২৫.
কান্যকুব্জ
২৬.
অযোধ্যা থেকে কৌশাম্বী
২৭.
প্রয়াগ
২৮.
শ্রাবস্তী
২৯.
কপিলাবস্তু
৩০.
লুম্বিনী
৩১.
কুশীনগর
৩২.
বারাণসী
৩৩.
সারনাথ
৩৪.
বৈশালী
৩৫.
মগধ
৩৬.
শীলভদ্র বিহার
৩৭.
গয়া
৩৮.
বুদ্ধগয়া
৩৯.
বোধিবৃক্ষ
৪০.
মহাভিক্ষুণী
৪১.
রাজগৃহ
৪২.
মানসলোক
৪৩.
নালন্দা
৪৪.
ভারত পরিক্রমা
৪৫.
আবার নালন্দা
৪৬.
শরণাগত

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%