চঞ্চলকুমার ঘোষ
ছয়শো উনত্রিশ খ্রিস্টাব্দের এক সকাল।
রাতের অন্ধকার কেটে গিয়েছে। প্রথম সকালের আলো এখন চারদিকে। ক্ষীণ হলেও স্পষ্ট। চারপাশের পাহাড়গুলোর মাথায় আলোর প্রলেপ। এ অঞ্চলে পাখির সংখ্যা নিতান্তই কম। তবুও ধূসরবর্ণের একটি পাখি থেমে থেমে ডেকে চলেছে। খুব কাছ থেকে তার ডাক ভেসে আসছে।
বিহারের সকলেই জেগে উঠেছে। তবুও কোথাও কোনো কলরব নেই। সকলেই নিঃশব্দে যে যাঁর কাজ করে চলেছেন। বালক শ্রমণের দল পাঠ শুরু করেছে। এই বিহারে বালক নবীন প্রবীণ মিলিয়ে প্রায় তিনশো ভিক্ষু শ্রমণ রয়েছেন। বিহারের বাইরে চারদিকে রঙিন পতাকা পতপত করে উড়ছে।
কিছু আগেই ঘুম ভেঙেছিল হুই-তি-এর। হঠাৎ তঁার দৃষ্টি পড়ল কক্ষের আরেক প্রান্তে বিছানার দিকে। খালি বিছানা। রাতে শোয়ার সময় যেমনভাবে দেখেছিলেন সেইভাবে রয়েছে। এ দৃশ্য হুই-তি-এর কাছে নতুন নয়। আর অল্পক্ষণ পরেই সকলে প্রার্থনাকক্ষে আসবেন। তার আগেই তঁাকে খুঁজে বার করতে হবে।
পোশাক পরিবর্তন করে ঘর থেকে বার হলেন হুই-তি। অলিন্দে আবছা আলো। একদিকের কপাট খুললেন। দীর্ঘ অলিন্দপথে দু-জন সন্ন্যাসী চলেছেন। প্রবল শীতের জন্যে সকলেরই গায়ে ভারী গরম পোশাক। প্রার্থনাকক্ষের সামনে এলেন। কপাট বন্ধ। সামান্য ঠেলতেই খুলে গেল। ভেতরে তাকালেন হুই-তি। কেউ এখানে নেই। পাশে আরেকটি কক্ষ। বিশাল কক্ষ। সদ্য আগত শ্রমণদের এখানে শিক্ষা দেওয়া হয়। ভিতরে ঢুকলেন। একদিকে ধ্যানমগ্ন বুদ্ধের মূর্তি। প্রায় অন্ধকার। জানলার কপাট খুললেন। ভোরের আলোয় চারদিক আলোকিত হয়ে উঠল। অতন্দ্র প্রহরীর মতো এ কক্ষে একা ভগবান বুদ্ধ ধ্যানমগ্ন। নতজানু হয়ে প্রণাম করলেন হুই-তি। দু-একটি মাত্র মন্ত্র উচ্চারণ করে বার হয়ে এলেন। একজন প্রবীণ সন্ন্যাসী প্রার্থনা কক্ষের দিকে যাচ্ছিলেন। হুই-তি-এর দিকে চেয়ে মৃদু হাসলেন। ইনি বৌদ্ধ মঠের দ্বিতীয় প্রধান আচার্য। হুই-তি সামান্য নত হলেন, তারপর তঁাকে অতিক্রম করে এগিয়ে গেলেন। সিঁড়ির পথে তখনও সামান্য অন্ধকার। কিছু ভাবলেন হুই-তি। তঁাকে হয়তো সেখানেই পাওয়া যাবে।
কোথাও যেন এক অদৃশ্য ভালোবাসা। এই বিহারে আরও অনেকেই তঁাকে স্নেহ করেন। তাকে ভালবাসেন। তবুও ওই মানুষটি তঁার কাছে সকলের চেয়ে আলাদা। সকলের মধ্যে থেকেও তিনি যেন এক অন্য জগতের মানুষ। বিহারের সকলেই তঁাকে গভীর শ্রদ্ধা করে। এমনকী মঠের প্রধান আচার্যও বহু বিষয়ে তঁার সঙ্গে পরামর্শ করেন। শাস্ত্রের যেকোনো দুরূহ জটিল ব্যাখ্যা তিনি কত সহজ সরলভাবে করেন।
সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে এলেন হুই-তি। সামনেই গ্রন্থাগার। দরজা বন্ধ। জানেন এই সময় কেউ এখানে আসে না। তবুও। সামান্য আঘাত দিলেন। দরজা খুলে গেল। ভিতরে ঢুকলেন হুই-তি। কক্ষটির চারদিকে সাজানো পুথি। প্রতিটি পুথিই লাল কাপড়ে মোড়া। কতদিনের সব পুথি। যুগযুগান্তরের অফুরন্ত জ্ঞানের ভাণ্ডার। পুথির মধ্যে থেকে আসা বিচিত্র গন্ধ সমস্ত কক্ষটিকে পূর্ণ করে রেখেছে। শাস্ত্রচর্চায় কোনোদিনই তেমন আগ্রহ নেই হুই-তি-এর। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া এ কক্ষে আসেন না। কক্ষের বাইরে এসে দরজা বন্ধ করলেন। আর একটিমাত্র স্থান। স্থির জানেন সেখানেই তঁাকে পাওয়া যাবে।
এগিয়ে গেলেন। সামান্য যেতেই দেখলেন ছাদের খোলা দরজা দিয়ে দিনের প্রথম আলো এসে পড়েছে চারদিকে। নিশ্চিন্ত হলেন হুই-তি। যা অনুমান করেছিলেন, তাই সত্য। পাথরের বেদির উপরে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছেন তিনি। পশমের পোশাকে ঢাকা সমস্ত দেহ। শুধু মুখের সামান্য অংশ খোলা। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলেন সেই দিকে। ঘুমের মধ্যেও ফুটে উঠেছে গভীর এক প্রশান্তি। এমনটি আর কারও মুখে দেখেছেন বলে মনে পড়ে না হুই-তি’র।
সামান্য ঝুঁকে ডাক দিলেন, ভদন্ত (পূজ্য মহাশয়) প্রার্থনার সময় হয়েছে।
চোখ মেললেন তিনি। অল্প কয়েক মুহূর্ত। চেতনার জগতে ফিরে এলেন। তারপরই অনির্বচনীয় উল্লাসে বলে উঠলেন, আমি তঁার ডাক শুনেছি হুই-তি।
হুই-তি’র চোখে মুখে জিজ্ঞাসা ফুটে উঠল। বিহারের উন্মুক্ত ছাদের চারদিকে তাকালেন। অস্ফুটে বললেন, এখানে আর কেউ নেই, আপনাকে ডাক দেবে।
উঠে বসলেন তিনি। মুখে প্রসন্ন হাসি। দুই চোখে উদ্ভাসিত দীপ্তি। হাত বাড়িয়ে দিলেন হুই-তি’র দিকে। তঁাকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে এলেন।
হুই-তি সবেমাত্র কৈশোর অতিক্রম করেছেন। এখনও চোখে-মুখে শিশুর সারল্য। ভদন্তের প্রতি তঁার অপরিসীম শ্রদ্ধা।
তিনি মৃদুস্বরে হুই-তি-এর দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমাকে যে কথা বলব আশা করি তা কারও কাছে প্রকাশ করবে না।
মাথা নাড়লেন হুই-তি, আমি চিরদিন আপনার অনুগত থাকব ভদন্ত।
মুখ তুলে তাকালেন তিনি। দূর প্রসারিত দৃষ্টি। সীমা থেকে অসীমে। কল্পনায় ভেসে চলেন। হয়তো বা দীর্ঘক্ষণ সেইভাবে থাকতেন। হুই-তি’র মৃদু স্পর্শে সচেতন হলেন।

‘কী বলবেন ভদন্ত ?’
‘আমি ভগবান তথাগতের দেশে যাব। কাল রাতে স্বপ্নের মধ্যে তঁাকে দেখেছি।’
মুহূর্তে হুই-তি’র সমস্ত শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল। অস্ফুটে বললেন, তথাগতের কী অপার করুণা।
মানুষটি প্রসন্ন মুখে বললেন, ঠিকই বলেছ হুই-তি। কিছুদিন ধরেই আমার সমস্ত অন্তর তথাগতের জন্মভূমি ভারতবর্ষে যাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে।
‘আমি জানি। আপনি স্বয়ং সম্রাটের কাছে আবেদন করেছিলেন। তিনি কি আপনাকে অনুমতি দিয়েছেন ?’
হঠাৎ কেমন বিষণ্ণ হয়ে গেলেন মানুষটি। এতক্ষণের প্রসন্নতা কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। কিছুক্ষণের জন্যে কোনো কথা বললেন না।
আবার প্রশ্ন করলেন হুই-তি, সম্রাট কী বলেছেন ?

গম্ভীর কণ্ঠে মানুষটি বললেন, তিনি আমাকে ভারতবর্ষে যাবার অনুমতি দেননি।
‘কেন ভদন্ত ?’
‘সম্রাট বলেছেন সে বড়ো দুর্গম পথ। যারা যাত্রা করে, পথেই তাদের মৃত্যু হয়।’
হুই-তি অন্তর থেকে চাইছিলেন তঁার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটি তাকে ছেড়ে যেন না যান।
‘ঠিকই বলেছেন সম্রাট। আমিও শুনেছি। ওই পথে যাঁরা গিয়েছেন তঁাদের কেউই আর দেশে ফিরে আসেননি।’
মানুষটি বললেন, এ দেহ নশ্বর। আমি মৃত্যু ভয় করি না। স্থির করেছি আমি ভগবান তথাগতের দেশে যাব।
‘আপনি তথাগতের দেশে যাবেন!’ গভীর এক বিস্ময় ফুটে উঠল হুই-তি’র কণ্ঠস্বরে।
কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে রইলেন মানুষটি। চারপাশের কোনো কিছুই যেন তঁার মনকে বিচলিত করতে পারে না। গভীর এক প্রশান্তিতে বললেন, আমি দর্শন করব সেই পবিত্র ভূমি যেখানে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। নৈরঞ্জনা নদীতীরে বোধিবৃক্ষ, যার নীচে বসে ভগবান তথাগত বোধিলাভ করেছিলেন। সেই কুশিনগর, যেখানে মহানির্বাণ হয়েছিল তথাগতের।
‘সম্রাটের নিষেধ আগ্রাহ্য করবেন ?’ দ্বিধাগ্রস্ত হুই-তি।
মুখ তুলে মানুষটি আকাশের দিকে তাকালেন। পুর্ব আকাশ জুড়ে একটু একটু করে আলোর আভা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। দৃষ্টি ফেরালেন হুই-তি’র দিকে। বললেন, যিনি সম্রাটের বহু ঊর্ধ্বে বসে আছেন, সেই ভগবান বুদ্ধ আমাকে আহ্বান করেছেন। আমি তঁার ডাক শুনেছি। আর কারও নিষেধ মানি না।
‘আমি আপনার সঙ্গী হব’। হুই-তি-এর কণ্ঠে ব্যাকুলতা।
‘জ্ঞানার্জনের পথে কেউ কারও সঙ্গী হতে পারে না। সকলকেই আপন পথে চলতে হয়।’
আর কিছু বলবার আগেই শান্ত হলেন মানুষটি। নীচের প্রার্থনাকক্ষ থেকে সমবেত কণ্ঠস্বর ভেসে আসে।
‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি’।
মুহূর্তে চঞ্চল হয়ে উঠলেন হুই-তি। প্রার্থনা কক্ষে চলুন ভদন্ত।
এই মুহূর্তে প্রার্থনা কক্ষে সমবেত মানুষের মধ্যে যাবার কোনো আগ্রহ অনুভব করলেন না মানুষটি। হুই-তি’র দিকে চেয়ে বললেন, তুমি যাও। আমি পরে প্রার্থনায় যাব।
খানিকটা দ্বিধা নিয়ে ফিরে যান হুই-তি।
হুই-তি ফিরে যেতেই উঠে দাঁড়ালেন তিনি। মুখ ফেরালেন দক্ষিণের সারিবদ্ধ পাহাড়গুলোর দিকে। সূর্যের আলোয় এখন ঝলমল করছে। কী উজ্জ্বল। কী দীপ্ত। এতদিন মনে হত দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর। আজ এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে ওরা যেন তঁার চলার পথের সঙ্গী। পাথরের বেদির উপর নতজানু হলেন। নীচের প্রার্থনাকক্ষ থেকে মন্ত্রধ্বনি ভেসে আসছে। ‘সংঘং শরণং গচ্ছামি’।
বিশ্বময় তার সুর ছড়িয়ে পড়ছে।
তিনি স্থির বিবশ। তঁার চোখে জলের ধারা। চারপাশের সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসে। কোনো মন্ত্রধ্বনিই উচ্চারণ করতে পারেন না। অন্তর জুড়ে শুধু একটি প্রার্থনা জেগে ওঠে_তুমি আমাকে আলোর পথে নিয়ে চল প্রভু।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন