চঞ্চলকুমার ঘোষ
মগধের আমলক বিহার দর্শন করে হিউ-এন-সাঙ এলেন তিলোদক বিহারে। বিশাল সংঘারাম। রয়েছে চারটি মহাকক্ষ, একটি সভামঞ্চ। সংঘারামকে ঘিরে তিনটি বিহার। এখানে প্রায় এক হাজার ভিক্ষু বাস করেন, সকলেই মহাযানী। এঁদের মধ্যে অনেকেই শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত। হিউ-এন-সাঙ-এর সান্নিধ্য পেয়ে সকলেই মুগ্ধ। সুদূর চিন থেকে একজন মানুষ এসেছেন শুধু বৌদ্ধশাস্ত্র অধ্যয়ন করবার জন্যে—একথা ভেবে তঁারা বিস্মিত। একজন প্রশ্ন করেন, হে ধর্মগুরু, আপনি এই তরুণ বয়সে যে গভীর জ্ঞান লাভ করেছেন আমরা তার সামান্যও অর্জন করতে পারিনি, তবু কীসের সন্ধানে আপনি ছুটে চলেছেন ?
শান্তভাবে হিউ-এন-সাঙ বললেন, বৌদ্ধশাস্ত্রের যে জ্ঞান সমুদ্রের মতোই বিশাল বিরাট, অতলান্ত তার গভীরতা। আমি সেই সমুদ্রের জল স্পর্শ করেছি মাত্র তাতে স্নান করতে পারিনি। আমার ইচ্ছা নালন্দায় গিয়ে ধর্মশিক্ষা করব।
প্রবীণ একজন সন্ন্যাসী বললেন, নালন্দায় রয়েছেন শাস্ত্রগুরু আচার্য শীলভদ্র। তঁার সমকক্ষ পণ্ডিত ভারতবর্ষে কেউ নেই। আপনি তঁার কাছে শাস্ত্রচর্চা করতে পারেন।
হিউ-এন-সাঙ বললেন, সবই ভগবান তথাগতের ইচ্ছা।
প্রবীণ সন্ন্যাসী বললেন, এখান থেকে নব্বই লি দূরে গুণমতি বিহার। সেখান থেকে আরও দক্ষিণ-পশ্চিমে পাহাড়ের উপর আচার্য শীলভদ্রের একটি সংঘারাম আছে।
হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমি সেই সংঘারাম দর্শন করব।
একজন বললেন, আমি গুণমতি বিহার কয়েক বছর আগে দর্শন করেছি। পাহাড়ের উপর এই বিহার। পথ বলে কিছু নেই। চারিদিকে ঘন জঙ্গল। প্রায় অগম্য সে স্থান। দর্শন করবার মতো কিছু নেই। অল্প কয়েক জন মহাযানী ভিক্ষু সেখানে বাস করেন। শুনেছি ভগবান বুদ্ধ সেখানে এসেছিলেন এবং ধ্যান করতে করতে সমাধিস্থ হয়েছিলেন।
মুহূর্তে হিউ-এন-সাঙ-এর মুখে প্রসন্নতা ফুটে উঠল। ধীর কণ্ঠে বললেন, যেখানে ভগবান বুদ্ধের পদচিহ্ন পড়েছে সে-স্থান তো আমাকে দর্শন করতেই হবে। আমি কালই গুণমতি বিহারের দিকে যাত্রা করব।
দু-দিন পথ চলার পর হিউ-এন-সাঙ এসে পৌঁছোলেন বিরাট এক পাহাড়ের কোলে। সঙ্গী পথপ্রদর্শক ছাড়াও আরও কয়েক জন রয়েছেন। সমস্ত পাহাড় ঘন জঙ্গলে পূর্ণ হয়ে আছে। কোথায় এর পথ কারও জানা নেই। পাহাড়ের একেবারে চূড়ায় বৌদ্ধবিহার। সঠিক পথের সন্ধান না পেলে কেমন করে সেখানে পৌঁছোবেন। পথসঙ্গী সকলেই বললেন, ধর্মগুরু, এই পথে যাওয়া অসম্ভব। তা ছাড়া দেখে মনে হচ্ছে এই পাহাড়ে হিংস্র জন্তু-জানোয়ারের সংখ্যা কম নয়। অনর্থক বিপদের ঝুঁকি নিয়ে কী লাভ ?
কোনো কথা বললেন না হিউ-এন-সাঙ। তঁার জন্যে অন্য কারও কোনো ক্ষতি হোক তিনি তা চান না। মনটা বিষণ্ণ হয়ে গেল। এত কাছে এসেও ভগবান তথাগতের পুণ্যস্মৃতিটুকু দর্শন হল না। ভূমির উপর নতজানু হয়ে অল্পক্ষণ প্রার্থনা করলেন। প্রার্থনা শেষ করে উঠে দাঁড়াতেই সকলের চোখ পড়ল দীর্ঘদেহী গ্রাম্য চেহারার একজন লোকের দিকে। পরনে শুধু লজ্জানিবারণের জন্য একটুকরো কাপড়, ঝাঁকড়া চুল, কাঁধে কুড়ুল। মানুষটি সরাসরি হিউ-এন-সাঙ-এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কোথায় যাবে ?
হিউ-এন-সাঙ বললেন, এই পাহাড়ের উপর যে সংঘারাম রয়েছে সেখানে যাব। চারদিকে জঙ্গল, কীভাবে সেখানে পৌঁছোব জানি না।
গ্রাম্য লোকটি কিছু ভাবল। তারপর বলল, এসো আমার সঙ্গে।
নিঃশব্দে সকলে তাকে অনুসরণ করে। কিছুদূর গিয়েই সরু পায়ে চলা পথ এঁকেবেঁকে জঙ্গলের মধ্যে গিয়েছে। পথের দু-ধারেই এত ঘন জঙ্গল কয়েক হাত ভিতরেও কিছু চোখে পড়ে না। কোথাও কোথাও গাছের ডাল এসে পথের উপর পড়েছে। গ্রাম্য মানুষটি কুড়ুলের আঘাতে পথ পরিষ্কার করে। এলোমেলো অসংলগ্ন পাথর। প্রায় খাড়াই পাহাড়। সকলেই ধীর গতি। বেশ কিছুক্ষণ চলার পর হঠাৎ বাতাসে ভেসে এল প্রার্থনা সংগীতের সুর। গাছপালার ফাঁকে চোখে পড়ল পাহাড়ের একেবারে চূড়ায় বৌদ্ধ বিহার। পথের ক্লান্তি ভুলে সকলে ছুটে চলেন। অনেকখানি সমতল প্রান্তর জুড়ে মাঝারি আকৃতির এক চৈত্য। বোঝা যায় বহুদিন আগে তৈরি হয়েছিল এই চৈত্য। সংস্কারের অভাবে জীর্ণপ্রায়। দু-জন বৌদ্ধ শ্রমণ সেখানে বসে প্রার্থনা করছিলেন। মনে মনে উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন হিউ-এন-সাঙ। শেষপর্যন্ত তিনি এখানে আসতে পারলেন!। সবকিছুই ওই গ্রাম্য মানুষটির জন্যে। ধন্যবাদ দেবার জন্যে মুখ ফেরাতেই আর মানুষটাকে দেখতে পেলেন না। কোথায় গেল সে ! সকলকে জিজ্ঞাসা করলেন। সকলেই বিস্মিত। এক মুহূর্তে কোথায় হারিয়ে গেল মানুষটা। একজন বললেন, ধর্মগুরু আমরা কি তঁার সন্ধান করব ?
হিউ-এন-সাঙ বললেন, তার কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি আমাদের সাহায্যকরবার জন্যে এসেছিলেন, তঁার কাজ শেষ হয়েছে। তিনি ফিরে গিয়েছেন নিজের স্থানে। সবই করুণাময় বুদ্ধের ইচ্ছা।
সকলে এগিয়ে গেলেন। শ্রমণদের সঙ্গে প্রার্থনায় বসলেন। নিস্তব্ধ প্রাস্তরের আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল সেই সুর।
আবার এগিয়ে চলা। এবার আচার্য শীলভদ্রের সংঘারাম। েছাটো একটি পাহাড়ের কোলে এই সংঘারাম। অল্প কয়েক জন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী সেখানে থাকেন। সকলে সাদর আমন্ত্রণ জানালেন হিউ-এন-সাঙকে। একজন বললেন, আপনি এই সংঘারামে আসবেন এই সংবাদ আমরা আগেই পেয়েছি।
সামান্য বিস্মিত হলেন হিউ-এন-সাঙ। বললেন, কার কাছে আপনারা এই সংবাদ পেলেন ?
‘আমাদের মধ্যে একজন স্বপ্নে জানতে পারেন চিন থেকে এক মহাজ্ঞানী বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এখানে আসবেন। তারপর থেকে আমরা আপনার প্রতীক্ষা করছি।’
হিউ-এন-সাঙ-এর সঙ্গীদের মধ্যে একজন বললেন, এই নির্জন প্রদেশে আপনারা কীভাবে থাকেন ?
মৃদু হাসলেন সন্ন্যাসী। সবই ভগবান বুদ্ধের করুণা। আশেপাশে কিছু গ্রাম আছে, সেখানকার মানুষরা আমাদের প্রয়োজনে সাহায্য করেন।
হিউ-এন-সাঙ বললেন, শুনেছি এই বিহার আচার্য শীলভদ্র নির্মাণ করেছিলেন ?
আপনি ঠিকই শুনেছেন ধর্মগুরু। তখন আচার্য শীলভদ্র তরুণ সন্ন্যাসী। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সবেমাত্র তঁার শিক্ষা শেষ করেছেন। বয়সে তরুণ হলেও জ্ঞানে তিনি ছিলেন প্রবীণ। সেই সময়ে দক্ষিণ ভারত থেকে এক পণ্ডিত এসেছিলেন মগধের রাজসভায়। তিনি তর্কযুদ্ধে সকলকে পরাজিত করেছিলেন। মগধে এসে বললেন, মহারাজ, হয় আমাকে জয়পত্র লিখে দিন নয়তো আপনার পণ্ডিতদের বলুন আমার সঙ্গে তর্কযুদ্ধ করতে। ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের খ্যাতির কথা শুনে কেউ তর্কযুদ্ধে এগিয়ে এল না। সেই সময়ে সেখানে এসেছিলেন আচার্য শীলভদ্র আর তঁার গুরু আচার্য ধর্মপাল। ধর্মপাল তখন বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। মগধরাজের সম্মানের কথা বিবেচনা করে শিষ্য শীলভদ্রকে বললেন, তুমি ব্রাহ্মণের সঙ্গে তর্কযুদ্ধ করো। গুরুর আদেশে তর্কযুদ্ধ শুরু করলেন শীলভদ্র। তিন দিন ধরে চলল সেই তর্কযুদ্ধ। শীলভদ্রের গভীর জ্ঞান আর ক্ষুরধার যুক্তির সামনে পিছু হটতে হটতে একসময় পরাজয় স্বীকার করে নিলেন ব্রাহ্মণ। শীলভদ্রকে লিখে দিলেন জয়পত্র। তঁার জয়গানে ভরে উঠল চারদিক। মগধের রাজা বললেন, হে মহামান্য শীলভদ্র, আপনার এই জয় সকলের জয়। বলুন আপনার যা প্রয়োজন, আমি অবশ্যই তা পূরণ করব।
শীলভদ্র শান্তভাবে বললেন, আমি সন্ন্যাসী, আমার সামান্য যা প্রয়োজন ভিক্ষা করেই তা সংগ্রহ করি।
রাজা বললেন, আপনার ভিক্ষার প্রয়োজন নেই। আমি আপনাকে একটি নগর দান করছি।
শীলভদ্রের মধ্যে সামান্যতম অনুভূতি জাগল না। তিনি আগের মতোই শান্তভাবে বললেন, মহারাজ আমি সন্ন্যাসী, এই কাষায় বস্ত্র আর সংঘজীবন নিয়েই তৃপ্ত। নগর নিয়ে কী হবে ?
রাজা বিনীত কণ্ঠে বললেন, ধর্মের সেই সুদিন আর নেই। জ্ঞানের চর্চা করে না কেউ। বৌদ্ধসংঘ, বিহার, জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে।
শীলভদ্র বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন মহারাজ। মানুষ ভগবান বুদ্ধের আদর্শ থেকে ক্রমশই সরে যাচ্ছে। এখন বিশেষ প্রয়োজন সাধারণ মানুষের কাছে ভগবান বুদ্ধের বাণীকে নতুন করে প্রচার করা।
রাজা বললেন, এই নগর থেকে সংগৃহীত অর্থ আপনি ধর্মের কাজে ব্যয় করুন।
শীলভদ্র বললেন, এই অর্থে আপনি নগরের প্রান্তে প্রান্তে সংঘ বিহার প্রতিষ্ঠা করুন, যেখান থেকে ভগবান বুদ্ধের বাণী দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়বে।
নীরব হলেন সন্ন্যাসী।
আচার্য শীলভদ্রের কথা শুনতে শুনতে হিউ-এন-সাঙ-এর মন-প্রাণ জুড়ে বিচিত্র এক অনুভূতি জেগে ওঠে। তিনি যাবেন আচার্য শীলভদ্রের কাছে। সেই মহাজ্ঞানীর পায়ের কাছে বসে শিক্ষালাভ করবেন। জ্ঞানের আলোয় পূর্ণ হয়ে উঠবেন।
শীলভদ্র বিহারে একদিন বিশ্রাম নিয়ে হিউ-এন-সাঙ যাত্রা করলেন তীর্থভূমি গয়ার দিকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন