চঞ্চলকুমার ঘোষ
দীর্ঘ পথ পদব্রজে এসে হিউ-এন-সাঙ পৌঁছোলেন গঙ্গার তীরে। এখান থেকে নদীপথে যাবেন প্রয়াগ। একটি বিশাল নৌকা এই পথে যাত্রী নিয়ে যাতায়াত করে। হিউ-এন-সাঙ তঁার অল্প কয়েক জন সঙ্গী আর স্থানীয় মানুষ সব মিলিয়ে আশি জন যাত্রী। ধীর গতিতে নৌকা এগিয়ে চলে। বেশ কিছু দূর যাওয়ার পর গঙ্গার দুই তীরে ঘন জঙ্গল শুরু হল। এত ঘন যে সামান্য ভেতরেও কিছু চোখে পড়ে না। হঠাৎ হিউ-এন-সাঙ লক্ষ করলেন, যাত্রী, মাঝি সকলেরই চোখে-মুখে আতঙ্কের ছায়া ফুটে উঠেছে। জিজ্ঞাসা করতেই একজন বলল, এখানে দস্যুেদর ভীষণ উৎপাত। তারা শুধু লুঠপাট করেই ক্ষান্ত হয় না। বহু মানুষকে বন্দি করে নিয়ে গিয়ে তাদের দেবীর সামনে বলি দেয়।

হিউ-এন-সাঙ-এর সঙ্গীরা প্রাণভয়ে বলে ওঠে, এখন কী হবে ধর্মগুরু ?
হিউ-এন-সাঙ বললেন, ভগবান তথাগতের কাছে প্রার্থনা করো, তিনি আমাদের রক্ষা করবেন।
হিউ-এন-সাঙ-এর অন্তরে কোনো ভয় জাগে না। একাগ্র মনে বুদ্ধের নাম জপ করতে আরম্ভ করলেন। আচমকা প্রবল কলরবে চমকে উঠলেন। চোখ মেলতেই দেখলেন ছোটো ছোটো নৌকায় চেপে হিংস্র চেহারার কিছু মানুষ চারদিক থেকে তঁাদের ঘিরে ফেলেছে। সকলের হাতেই ভয়ংকর অস্ত্র। অনুমান করতে অসুবিধা হল না এরাই ডাকাতদল।
নৌকার মানুষদের মধ্যে কান্নার রোল ওঠে। অনেকে প্রাণভয়ে চিৎকার করতে আরম্ভ করে। দস্যুসর্দারের আদেশে মাঝিরা নৌকা তীরে নিয়ে যেতেই ডাকাতরা ঝাঁপিয়ে পড়ল যাত্রীদের উপর। যার যা ছিল সর্বস্ব লুঠ করেও ক্ষান্ত হয় না। বেশ কিছু যাত্রীকে তীরে নামিয়ে আনে। এদের মধ্যে থেকে কাউকে দেবীর সামনে বলি দেওয়া হবে। হিউ-এন-সাঙকে দেখামাত্রই দস্যু দলের সর্দার বলে ওঠে এই মানুষটিই বলির উপযুক্ত। একেই দেবীর কাছে বলি দেওয়া হবে।

দস্যুরা ছিল দেবী দুর্গার উপাসক। দেবীর সামনে মানুষ বলি দেওয়া হত। এই বছর তারা মনোমতো বলি পায়নি। গঙ্গাতীরেই বলির আয়োজন করা হল।
এইসব দেখেও সামান্যতম বিচলিত হলেন না হিউ-এন-সাঙ। শান্তভাবে বললেন, এই দেহের কোনো মোহ আমার নেই। বলির জন্যে নিজেকে উৎসর্গ করতেও কোনো দ্বিধা নেই। তবে আমি দূরদেশ থেকে তীর্থযাত্রা করতে এসেছি। মনের ইচ্ছা ধর্মশিক্ষা করবার আর ভগবান বুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলি দর্শন করবার। আমার সেই ইচ্ছাগুলি অপূর্ণ রয়ে গিয়েছে। তা ছাড়া আমি একজন সন্ন্যাসী। আমার নিজের চেয়ে তোমাদের জন্যেই বেশি ভাবনা হচ্ছে। অপূর্ণ বাসনার জন্যে বলি হিসেবে আমি শুভ কি না তাও ভেবে দেখা উচিত।
দস্যুরা কেউ তঁার কথায় কান দিল না। যাত্রীদের মধ্যে অনেকেই হিউ-এন-সাঙ-এর সৌম্য শান্ত রূপ দেখে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন। একজন বিদেশি সন্ন্যাসীকে এদেশে এসে বধ হতে হবে এটাও তঁারা মানতে পারছিলেন না। দস্যুদের কাছে গিয়ে বললেন, তোমরা বিদেশি সন্ন্যাসীকে মুক্ত করে দাও, তার বদলে আমাদের মধ্যে কাউকে হত্যা করো।
দস্যুরা হিউ-এন-সাঙ-এর বদলে কাউকেই নিতে চাইল না। তখন হিউ-এন-সাঙ দস্যুদের বললেন, তোমরা যখন মনস্থির করেছ আমাকে দেবীর কাছে বলি দেবে, আমার কোনো দুঃখ নেই, শুধু আমাকে কিছুক্ষণ শান্ত মনে ধ্যান করতে দাও তারপর তোমাদের যা ইচ্ছা তাই করো।
দস্যুরা তঁার কথায় সম্মত হল। হিউ-এন-সাঙ ধ্যানস্থ হয়ে বোধিসত্ত্বদের নাম জপ করতে আরম্ভ করলেন। প্রথমে মৈত্রেয় বোধিসত্ত্বের কাছে প্রার্থনা করলেন মৃত্যুর পর তৃষিত স্বর্গে যেন তঁার দেখা পান। পুনর্জন্মে যেন তিনি এই পুণ্যাত্মাদের দেবলোকে জন্মগ্রহণ করে ওই বোধিসত্ত্বকে আরাধনা করতে করতে বোধিলাভ করতে পারেন। তারপর দশ দিকের দেবতাদের শ্রদ্ধা জানিয়ে আবার একাগ্রচিত্তে মৈত্রেয় বোধিসত্ত্বের প্রতি মনোনিবেশ করলেন, বললেন, আবার যেন পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করতে পারেন এবং সকল মানুষকে ধর্মশিক্ষা দিতে পারেন যাতে তারা নিজেদের হীনবৃত্তি ত্যাগ করে পুণ্যকাজ করতে পারেন এবং সমস্ত জীবন মানুষের সুখ ও শান্তির জন্যে ধর্মপ্রচার করতে পারেন।
এরপর সব চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে ধ্যানের গভীরে ডুবে গেলেন। ধীরে ধীরে তিনি অনুভব করলেন এই পৃথিবীর প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্বর্গ পার হয়ে মৈত্রেয় বোধিসত্ত্বের দর্শন পেলেন। তিনি রত্নখচিত সিংহাসনে বসে আছেন, তঁাকে ঘিরে দেবতারা, চারদিকে আনন্দের জোয়ার বইছে।
হিউ-এন-সাঙ ধ্যানস্থ হয়ে আছেন। তঁার সঙ্গীরা কান্নাকাটি করছে। এমন সময় আচমকা প্রবল ঝড় উঠল। বড়ো বড়ো গাছের ডাল ভেঙে পড়তে আরম্ভ করল। আকাশে ঘন ঘন বিদ্যুতের চমক, তার সঙ্গে বজ্রপাত। নদীতে যতগুলো নৌকা ছিল সব উলটে গেল। সকলে আতঙ্কে থরথর করে কাঁপতে থাকে। একজন সাহস করে দস্যুদের সামনে এগিয়ে এসে বলল, ইনি মহাধার্মিক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হিউ-এন-সাঙ। সুদূর চিন থেকে এদেশে এসেছেন ধর্মশিক্ষার জন্যে। এঁকে সবসময় রক্ষা করছেন ভগবান বুদ্ধ। যদি তোমরা এঁর সামান্যতম ক্ষতি কর, তঁার ক্রোধ থেকে নিস্তার পাবে না।
আচমকা চারপাশের প্রকৃতির এই পরিবর্তন দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিল দস্যুরা। তারা বুঝতে পারছিল ইনি সাধারণ কেউ নন। হিউ-এন-সাঙ এসব কিছুই জানতে পারছিলেন না।
এদিকে দস্যুসর্দার তঁার পায়ের উপর লুটিয়ে পড়তেই হিউ-এন-সাঙ-এর ধ্যান ভেঙে গেল। তিনি বললেন, তোমাদের বলির সময় হয়েছে ?
দস্যুরা হাতজোড় করে বলল, না ধর্মগুরু আমরা ভুল করেছি। আপনাকে কষ্ট দিয়েছি। আমাদের মার্জনা করুন।
হিউ-এন-সাঙ তাদের ক্ষমা করে ধর্ম উপদেশ দিলেন। তখন তারা নিজেদের সমস্ত অস্ত্র নদীর জলে ভাসিয়ে ভগবান বুদ্ধের ধর্ম গ্রহণ করল।
যাত্রীরা সকলে যে যার লুণ্ঠিত দ্রব্য ফিরে পেতেই আবার নৌকায় করে সকলে যাত্রা করলেন। গঙ্গায় দীর্ঘ পথ পেরিয়ে হিউ-এন-সাঙ এসে উপস্থিত হলেন প্রয়াগে।
গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতীর সংগমে মহাতীর্থ এই প্রয়াগ। পতিতপাবনী গঙ্গা সর্বত্রই পুণ্যদায়িনী। তারই মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রয়াগের এই মহাসংগম। এখানে কোনো দেবতা নেই, আছেন মা গঙ্গা। বলা হয় সমুদ্রমন্থনের সময় উঠে এসেছিল অমৃতকুম্ভ। দেবতা-দানব সকলেই চায় সেই অমৃত পান করে অমর হতে। দেবতারা বিপন্ন বোধ করলেন। দানবরা যদি অমরত্ব লাভ করে তবে স্বর্গ-মর্ত-পাতাল জুড়ে শুরু হবে তাদের তাণ্ডব। দানবরা যাতে অমৃত পান করতে না পারে, তাই দেবতারা অমৃতকুম্ভ চুরি করে পালিয়ে গেলেন। তাদের তাড়া করল দানবের দল। পালাতে পালাতে ক্লান্ত হয়ে যে চার জায়গায় অমৃতপাত্র নামানো হয়। সেই চারক্ষেত্রের প্রধান এই প্রয়াগ। এখানে একবিন্দু অমৃত পড়েছিল।
মহাভারতের ঋষি পুলস্ত্য বলছেন, ব্রহ্মা এখানে বিশাল যজ্ঞ করেছিলেন, সেই থেকে এর নাম হয় প্রয়াগ। রামায়ণের যুগে এখানে ছিল গভীর অরণ্য। তার মাঝে ছিল ভরদ্বাজ মুনির আশ্রম। বনবাসের সময় রামচন্দ্র এখানে এসেছিলেন। কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধে শত শত মানুষের মৃত্যুতে বেদনাহত হয়ে পড়েছিলেন রাজা যুধিষ্ঠির। ঋষি মার্কণ্ডেয় তঁাকে প্রয়াগে যাবার উপদেশ দেন। এই পুণ্যস্থানে এসে স্নান করলে শুধু নরহত্যার পাপ দূর হবে না, মনের শান্তিও ফিরে পাওয়া যাবে। বলা হয় ৫১ পীঠের এক পীঠ এই স্থান। এখানে দেবীর ছিন্ন আঙুল পড়েছিল।
হিউ-এন-সাঙ যখন প্রয়াগে আসেন তখন এখানে দুটি মাত্র বৌদ্ধ বিহার দেখেছিলেন। এ ছাড়া শতাধিক দেবমন্দির ছিল। তার মধ্যে একটি মন্দির ছিল কারুকার্যময়। বলা হত সেখানে কেউ এক কড়ি দান করলে পাঁচশো স্বর্ণমুদ্রা দানের পুণ্য অর্জন করতে পারে। এই মন্দিরের পাশেই রয়েছে এক অতি প্রাচীন বটবৃক্ষ। নীচে যমুনা বয়ে চলেছে। বহু মানুষের বিশ্বাস সেই বটবৃক্ষ থেকে যমুনায় ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুবরণ করলে অক্ষয় স্বর্গবাস হয়। স্বর্গবাসের জন্যে বহু মানুষ সেইখান থেকে আত্মাহুতি দেয়। হিউ-এন-সাঙ লিখেছেন নরমাংসের লোভে সেখানে এক রাক্ষস বাস করত।
নগরের একপ্রান্তে চম্পক কাননে সম্রাট অশোক স্তূপ নির্মাণ করেছিলেন। এখানে তথাগত বুদ্ধ বিধর্মীদের পরাস্ত করেছিলেন। পাশে আরেকটি স্তূপে রয়েছে বুদ্ধের কেশ ও নখ।
নগরের পূর্বে সঙ্গমের পশ্চিম বালুতটে বিরাট প্রান্তর, এখানে রাজা, দাতারা আসেন। গরিব-দুঃখী ব্রাহ্মণদের দান দেন। তাই এর নাম মহাদানক্ষেত্র। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর রাজা শিলাদিত্য (হর্ষবর্ধনের আরেক নাম) এখানে ধনসম্পদ বিতরণ করতেন।
নদীর তীরে ছিল একটি উঁচু স্তম্ভ। বহু সন্ন্যাসী সূর্যাস্তের আগে ওই স্তম্ভে উঠে এক হাত এক পা দিয়ে আঁকড়ে ধরতেন, তারপর শরীরটাকে শূন্যে ঝুলিয়ে সূর্যের দিকে চেয়ে থাকতেন। তারপর অন্ধকার নেমে এলে তারা স্তম্ভ থেকে নেমে আসতেন। বিশ্বাস ছিল এতে জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া যায়।
হিউ-এন-সাঙ দু-বার প্রয়াগে এসেছিলেন। দ্বিতীয় বার আসেন মহারাজ হর্ষবর্ধনের আতিথ্যে এবং ধর্মসভায় যোগদান করতে। এরপর তিনি স্বদেশের দিকে প্রত্যাবর্তন করেন।
প্রথম বার তিন দিন ছিলেন প্রয়াগে। এখান থেকে তিনি যাত্রা করেন কৌশাম্বীতে। প্রাচীন কালে এর নাম ছিল বৎস রাজ্য।
হিউ-এন-সাঙ লিখেছেন, কৌশাম্বীর আয়তন যথেষ্ট বড়ো। এখানে প্রচুর পরিমাণে ধান ও ইক্ষু জন্মায়। মানুষদের আচার-ব্যবহার রুক্ষ হলেও তারা সৎ-ধার্মিক। নগরে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যা কম। বৌদ্ধ বিহারগুলি অধিকাংশই ধ্বংসপ্রায়। দেবমন্দিরের সংখ্যা প্রচুর।
ভগবান বুদ্ধের সময় কৌশাম্বীর রাজা ছিলেন উদয়ন। সন্ন্যাসজীবনের দশম বর্ষে বুদ্ধ শিষ্যদের নিয়ে কৌশাম্বীতে আসেন। অল্পদিন পর তঁার শিষ্যদের মধ্যে বিবাদ শুরু হয়। বুদ্ধ চেষ্টা করেও সে-বিবাদ মেটাতে পারনেনি। ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি নিকটস্থ এক গ্রামে কিছুদিন থাকেন, তারপর শ্রাবস্তীতে ফিরে যান।
এদিকে কৌশাম্বীর নগরবাসীরা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ভিক্ষা বন্ধ করে দেন। তখন ভিক্ষুরা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে শ্রাবস্তীতে গিয়ে বুদ্ধের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
হিউ-এন-সাঙ অল্প কয়েক দিন মাত্র কৌশাম্বীতে থাকেন। এইসময় এখানে রাজপ্রাসাদের মধ্যে অপূর্ব সুন্দর এক চন্দনকাঠের মূর্তি ছিল। সেই মূর্তি দেখে অভিভূত হয়ে যান হিউ-এন-সাঙ। তঁার সঙ্গী পথপ্রদর্শক এই মূর্তির প্রসঙ্গে সুন্দর এক কাহিনি বলেন। ভগবান তথাগত একবার স্বর্গে গিয়েছিলেন তঁার মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তঁাকে ধর্ম-উপদেশ দিতে। সেইসময় রাজা উদয়ন বুদ্ধকে দর্শনের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। তখন তিনি মৌদ্গল্যায়নকে অনুরোধ করেন কোনো শিল্পীকে পাঠাতে যিনি ভগবান বুদ্ধের মূর্তি নির্মাণ করতে পারবেন। সেইমতো এক শিল্পী এই মূর্তি নির্মাণ করেন। যখন ভগবান বুদ্ধ স্বর্গ থেকে নেমে আসেন এই মূর্তি নত হয়ে তঁাকে প্রণাম করে।
হিউ-এন-সাঙ কৌশাম্বী এসে চারদিকে ধ্বংসস্তূপ দেখে ব্যথিত হন এবং ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বিদায় নেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন