মরুদ্যান

চঞ্চলকুমার ঘোষ

ধুধু করা মরুভূমির মধ্যে বিন্দুর মতো এক মরুদ্যান। সামনে এসেই একটি গাছের ছায়ায় লুটিয়ে পড়লেন হিউ-এন-সাঙ। নিজের ক্ষমতার শেষ বিন্দুটুকু উজাড় করে দিয়ে এখানে এসে পৌঁছেছেন।

সবেমাত্র সকাল হয়েছে। রোদের তাপ নেই। অল্প কিছুক্ষণ আচ্ছন্নের মতো পড়ে থাকেন হিউ-এন-সাঙ। হঠাৎ মনে হল কেউ তঁাকে তুলে ধরবার চেষ্টা করছে। অনেক কষ্টে মুখ তুলে তাকালেন। এক বৃদ্ধ। বুক অবধি সাদা দাড়ি। বড়ো বড়ো চুল। কালচে রঙের আলখাল্লায় গোটা শরীর ঢাকা। মানুষটার হাতে একটা মাটির পাত্র। তাতে সবুজ বর্ণের কোনো পানীয়। হিউ-এন-সাঙ-এর পিঠের ওপর হাত রেখে বৃদ্ধ বললেন, এইটুকু পান করুন, ঠিক হয়ে যাবে শরীর।

অতি কষ্টে হাত বাড়িয়ে পাত্রটা মুখের সামনে নিয়ে আসতেই থমকে গেলেন হিউ-এন-সাঙ। কয়েক হাত দূরে চুপ করে দাঁড়িয়ে ঘোড়াটা। মুহূর্তে মনে হল অবোধ জীব, কথা বলতে পারে না। আমার চেয়ে ওর বেশি তেষ্টা পেয়েছে। পাত্রটা ঘোড়ার দিকে এগিয়ে দিতেই বৃদ্ধ বললেন, আপনি নিন। আমি ওর খাবার দিচ্ছি।

উঠে যান বৃদ্ধ। একটু পরেই কয়েকটা বড়ো বড়ো পাতা এনে দিলেন। চিনতে পারেন হিউ-এন-সাঙ। পান্থপাদপ গাছ। মাটির গভীর থেকে জল এনে পাতায় সঞ্চয় করে রাখে। সেই জলে মানুষ পশু তেষ্টা মেটায়। এবার সবুজ পানীয়টুকু এক চুমুকেই শেষ করে ফেললেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই মনে হল সব ক্লান্তিটুকু যেন কোথায় মিলিয়ে গেল। আকাশের দিকে মুখ তুলে অস্ফুটে বলে উঠলেন, সবই তোমার করুণা তথাগত।

আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালেন। এবার ভালো করে তাকালেন। বেশ কিছুটা অঞ্চল জুড়ে মরুদ্যান। মোটামুটি অনুমান করে নিলেন এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত এক লি-র বেশি হবে না। ছড়িয়ে ছিটিয়ে গাছ। এক জায়গায় ঝোপঝাড় কাঁটাগাছের স্তূপ। এতক্ষণ পর বৃদ্ধের দিকে চেয়ে বললেন, কে আপনি আমার জীবন রক্ষা করলেন ?

বৃদ্ধ বললেন, আমার নাম হাজি খান।

‘আপনি কি এখানেই থাকেন ?

মাথা নাড়লেন হাজি খান। বললেন, আপনি ঠিকই অনুমান করেছেন হুজুর।

অবাক গলায় হিউ-এন-সাঙ বললেন, জনমানবহীন নির্জন প্রান্তরে আপনি একা থাকেন ?

অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল হাজি খানের মুখে।

‘একা কেন হুজুর। আমার সঙ্গে এখানকার গাছ, আলো, হাওয়া, আকাশ সবাই রয়েছে। তা ছাড়া মাঝে মাঝেই তো মরুভূমির পথ ধরে যেসব যাত্রী যান তঁারা আসেন। বণিকরা আসেন। আমার যতটুকু সামর্থ্য সেবা করি। আপনি আসুন। আমার ঘরে এসে বিশ্রাম করুন। আমি আপনার খাবার বন্দোবস্ত করি।’

সামনে একটা গাছের পাতায় ছাওয়া কাঠের ঘর। তিনদিকে উঁচু পাথরের দেওয়াল।

মাথা নীচু করে হাজি খানের পেছনে ঘরের ভেতরে ঢুকলেন হিউ-এন-সাঙ। মাটির ওপর কম্বল পাতা। তার ওপরেই শুয়ে পড়লেন হিউ-এন-সাঙ। এত ক্লান্তি অনুভব করছিলেন যে শুতে শুতেই ঘুমিয়ে পড়লেন। যখন হাজি খানের ডাকে ঘুম ভাঙল সূর্য মাঝ আকাশে।

খাবার নিয়ে এসেছেন হাজি খান। রুটি আর দুধ।

‘খেয়ে নিন হুজুর। এখন কেমন অনুভব করছেন ?’

মানুষটির অকৃত্রিম সরলতা ভালো লাগে হিউ-এন-সাঙ-এর। বললেন, আগের চেয়ে ভালো আছি।

খাওয়া শেষ করে িজজ্ঞাসা করলেন, এখান থেকে হামি কতদূর ?

‘দু-দিনের পথ। আপনি হামিতে কার কাছে যাবেন ?’

হিউ-এন-সাঙ বললেন, হামি নয়, আমার যাত্রাপথ ভারতবর্ষ।

হাজি খান অবাক গলায় বললেন, কোথায় ভারতবর্ষ ?

হিউ-এন-সাঙ বুঝতে পারলেন হাজি খান ভারতবর্ষের নাম শোনেননি। বললেন, হিমালয়ের ওপারে এক দেশ। সেখানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ভগবান বুদ্ধ।

মাথা নাড়লেন হাজি খান। আমি তঁার নাম শুনিনি।

সামান্য বিস্মিত হলেন হিউ-এন-সাঙ। পরমুহূর্তে মনে হল সভ্য জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই নির্জনে যে মানুষটি বাস করছেন কেমন করে বুদ্ধের কথা জানবেন। কেউ হয়তো তঁাকে তথাগতের কথা বলেনি। বললেন, আমি আপনাকে বুদ্ধের কথা বলব।

হাজি খান উৎফুল্লভাবে বললেন, আমি তঁার কথা শুনব।

হিউ-এন-সাঙ বুদ্ধের জীবনকথা বলেন। তঁার জন্ম থেকে মৃত্যু। তঁার উপদেশ। মুগ্ধ হয়ে শোনেন হাজি খান। মাঝে মাঝে প্রশ্ন করেন। তার মনে হয় কোনোদিন কেউ এমন করে তাকে ধর্মের কথা বলেনি।

গোটা দিন কেটে যায়। মাঝে একবার হাজি খান উঠে জল নিয়ে আসেন। সঙ্গে যান হিউ-এন-সাঙ।

খানিক দূরে গাছপালার মধ্যে কুয়া। চারদিকে পাথর সাজানো। আশ্চর্য লাগে হিউ-এন-সাঙ-এর। প্রকৃতির কী বিচিত্র সৃষ্টি। শত শত মাইল বিস্তৃত মরুভূমিতে যেখানে কোথাও এক ফেঁাটা জল নেই, সবুজ নেই, মৃত্যুর মতো প্রাণহীন প্রান্তর, সেখানে কী করে এই মরুদ্যান তৈরি হল কে জানে।

কুয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন দু-জন। বালির মাঝে গভীর গর্ত। কত নীচে জল কে জানে। পাথরের উপর দাঁড়িয়ে নীচের দিকে তাকাতে ঘন অন্ধকার ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না। একদম ধারে যেতে ভয় লাগে। বালির ধ্বস নেমে কুয়ার মধ্যে পড়ে যাওয়ার সম্ভবনা। হিউ-এন-সাঙ প্রশ্ন করলেন, এখান থেকে আপনি কী করে জল তোলেন হাজি খান ?

হিউ-এন-সাঙ-এর কথা শুনে তার দাড়ি গোঁফে ভরা মুখে সামান্য হাসি ফুটে উঠল। কোনো কথা না বলে মানুষটা পাথরের পাশ থেকে লম্বা একখানা কাঠের পাটা নিয়ে আসেন। পাটাটা কুয়ার ওপর পেতে দিলেন। এবার পাটার ওপর উঠে কুয়ার মাঝখানে গিয়ে পাত্রটা নীচে নামিয়ে দিলেন। বেশ কিছুক্ষণ পর পাত্রটা তুলে নিয়ে এলেন। পাত্রের তলায় অল্পখানিক জল আর বালি মেশানো। বেশ কয়েক বার তোলবার পর একটা মাটির পাত্র খানিক ভরে যায়।

হাজি খান বললেন, আজকের মতো জল পাওয়া গেল। সারা রাত আবার জল জমবে।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, এই বালি মেশানো জল কী করে খাবেন ?

হাজি খান কয়েক পলক হিউ-এন-সাঙ-এর দিকে তাকিয়ে থাকেন। তারপর ধীর গলায় উত্তর দিলেন, আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে।

কিছুক্ষণ পরই জলের সব বালি নীচে থিতিয়ে গেল। ওপরে কাচের মতো জল।

পলকে হিউ-এন-সাঙ-এর মনে পড়ে ভগবান বুদ্ধের কথা। তিনিও বলেছেন সময়ের জন্যে অপেক্ষা করতে। সে কাহিনি লো-ইয়াং মঠের এক আচার্যের কাছে শুনেছিলেন। একদিন ভগবান বুদ্ধ শিষ্যদের নিয়ে কোথাও চলেছেন। গ্রীষ্মের দিন। মাথার উপর সূর্যের তাপ ঝরে পড়ছে। সকলেই ক্লান্ত, তৃষ্ণার্ত। কোথাও জল চোখে পড়ছে না। সঙ্গে যেটুকু জল ছিল তাও ফুরিয়ে গিয়েছে। আর চলতে পারছিলেন না বুদ্ধ। হঠাৎ চোখে পড়ল বিশাল এক বটগাছ ডালপালা মেলে ছায়া ছড়িয়ে রয়েছে। বুদ্ধ বললেন, যতক্ষণ না রোদের তাপ কমছে, ততক্ষণ আমরা এই গাছের তলায় বসে বিশ্রাম করি।

সকলে গাছের তলায় এসে বসতেই একজন শিষ্যকে বুদ্ধ বললেন, তুমি দেখ কাছাকাছি কোথায় খাওয়ার জল পাওয়া যায়। শিষ্য জলের সন্ধানে বার হল। বেশ কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলল, প্রভু এখানে কোথাও পান করবার মতো জল নেই।

বিস্মিত হলেন বুদ্ধ। সামান্য আগেই মানুষের বাসগৃহ চোখে পড়ল, অথচ পানের জল নেই !

শিষ্য বলল, একটি দিঘি চোখে পড়ল। সেখানে সামান্য জল রয়েছে। সে জল পানের যোগ্য নয়। সেই জলে গোরু মহিষ স্নান করছে। লোকেরা কাপড় কাচছে। সমস্ত জল এমন কাদা হয়ে গিয়েছে তা আর খাওয়ার উপযুক্ত নয়।

শিষ্যরা বললেন, তাহলে চলুন প্রভু আমরা এগিয়ে যাই। সামনে নিশ্চয়ই কোথাও জল পাব।

বুদ্ধ বললেন, সামনে জল পাবে তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে  ? এখানে যে ছায়াটুকু পেয়েছি তাও হয়তো পাব না।

‘তাহলে আমরা এখন কী করব ভগবান ?’

বুদ্ধ বললেন, আমাদের প্রতীক্ষা করতে হবে।

বুদ্ধের আদেশে সকলে সেখানে প্রতীক্ষা করে। বেলা গড়িয়ে চলে। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ে। বুদ্ধ শিষ্যকে বললেন, এবার তুমি যাও। দেখ দিঘিতে জল পাওয়া যায় কি না।

খানিক পরেই শিষ্য পাত্র ভরে জল নিয়ে আসে। স্বচ্ছ জল। সকলে তৃপ্ত হয়ে জল খায়। বুদ্ধ বললেন, এবার তুমি এমন স্বচ্ছ জল কোথায় পেলে ?

শিষ্য বলল, প্রভু আমি সেই দিঘিতে গিয়ে দেখলাম, সেখানে কেউ নেই। গোরু, ছাগল, মানুষ সকলেই চলে গিয়েছে। শান্ত জল। ভেসে ওঠা কাদা নোংরা থিতিয়ে গিয়ে জল এখন পরিষ্কার হয়েছে।

মৃদু হেসে বুদ্ধ বললেন, এই কারণেই আমি তোমাদের প্রতীক্ষা করতে বলেছিলাম। ধৈর্য আর প্রতীক্ষা করবার শক্তি অর্জন করতে না পারলে জীবনে কখনো সফলতা আসে না।

বুদ্ধের কথা ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে গিয়েছিলেন হিউ-এন-সাঙ। হঠাৎ হাজি খানের ডাকে মুখ ফেরালেন।

‘জল নিন হুজুর।’

হাজি খানের ডাকে কেমন অস্বস্তি অনুভব করছিলেন হিউ-এন-সাঙ। বললেন, আপনি আমাকে হুজুর সম্বোধন করবেন না। মরুভূমির এই নিঃসঙ্গ প্রান্তরে আপনিই আমার একমাত্র বন্ধু।

হাজি খানের দু-চোখে জল চিকচিক করে ওঠে। মাথা নিচু করে বললেন, আমি কি আপনার মতো সাধু পুরুষের বন্ধু হতে পারি ?

হিউ-এন-সাঙ বললেন, আপনি পিপাসার জল দিয়ে, খাবার দিয়ে, আশ্রয় দিয়ে, আমার প্রাণ বাঁচালেন। আপনার চেয়ে বড়ো বন্ধু কে আছে ?

হাজি খান মৃদু গলায় বললেন, এই তো আমার কাজ।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, একা এই নির্জন মরুভূমিতে কাজ করতে ভালো লাগে ?

হাজি খান অল্পক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, প্রথমে যখন এসেছিলাম বাধ্য হয়েই এসেছিলাম। খুব খারাপ লাগত। তারপর অভ্যোস হয়ে গেল। এখন আর কোথাও যেতেই ভালো লাগে না।

কৌতূহলে হিউ-এন-সাঙ বললেন, আপনি কি নিজের ইচ্ছায় এখানে এসেছিলেন ?

মাথা নাড়লেন হাজি খান। প্রথম যৌবনে আমি ভালো লোক ছিলাম না। খুন জখম লুঠ মেয়েদের ওপর অত্যাচার কোনো খারাপ কাজই বাকি ছিল না। একবার টাকার লোভে একজনকে খুন করলাম। সে ছিল সুলতানের কর্মচারী। এই মরুদ্যানের দেখাশোনা করত। পালাতে পারলাম না। সুলতানের সৈন্যদের হাতে ধরা পড়ে গেলাম। বিচারে ফাঁসির সাজা হল। এতদিন মানুষ মেরেছি, মনের মধ্যে কখনো কিছু অনুভব হয়নি। নিজের মরার কথা শুনেই অনুভব করলাম মৃত্যুভয় কী ভয়ংকর। সুলতানের কাছে অনেক কাকুতিমিনতি করলাম। শেষে সুলতান বললেন, যদি এই মরুদ্যানের দায়িত্ব নিই, তবে আমাকে মুক্তি দেবেন। আমি রাজি হয়ে গেলাম। তারপর থেকে আমার কাজ হল এই কূপের দেখাশোনা করা, আর এই পথ দিয়ে যারা যায় তাদের সেবা করা। প্রথম যখন এখানে আসি, কী ভয়ংকর কষ্ট হতো বলার নয়। কোনো মানুষ নেই। কথা বলবার লোক নেই। সারাদিন একা। এই ছোট্ট মরুদ্যানের বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। তখন মনে হত এর চেয়ে মৃত্যুদণ্ড ভালো।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, কখনো মনে হয়নি পালিয়ে যাবেন ?

‘হ্যা, বহুবার মনে হয়েছে। বেশ কয়েক বার পালিয়েও গিয়েছি। কেউ যেন আমাকে আবার টেনে নিয়ে এসেছে এখানে। তা ছাড়া ভয় ছিল, যেখানেই যাই না কেন সুলতানের লোকেরা আমাকে ঠিক ধরে ফেলবে। তখন নিশ্চিত মৃত্যু।’

কয়েক বছর এখানে রয়ে গেলাম। আস্তে আস্তে বুঝতে পারলাম সারা জীবন অনেক পাপ করেছি। এখন মানুষের জন্যে কিছু করে সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।

হাজি খানের দু-চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। পরম মমতায় তার চোখের জল মুছিয়ে দিলেন হিউ-এন-সাঙ। বললেন, মানুষের মধ্যে যখন তার পাপের অনুশোচনা জন্মায় তখনই সে হয়ে ওঠে প্রকৃত মানুষ। আপনি কত বছর ধরে কামনা বাসনা মুক্ত হয়ে মানুষের সেবা করে চলেছেন। কত মৃতপ্রায় মানুষকে জল দিয়ে, খাবার দিয়ে তাদের জীবন ফিরিয়ে দিয়েছেন। আপনি তো ভগবান বুদ্ধের মতোই মহান।

হাজি খানের বুকের মধ্যে বিচিত্র এক অনুভূতি জেগে ওঠে। ধীরে ধীরে হিউ-এন-সাঙ-এর পায়ের ওপর মাথা রেখে বললেন, আমি কি ভগবান বুদ্ধের করুণা পাব ?

হিউ-এন-সাঙ বললেন, তিনি তো করুণাময়। সকলের জন্যেই তঁার অপার করুণা। আপনাকে একটা গল্প বলি। অঙ্গুলিমালের গল্প।

‘কে অঙ্গুলিমাল ?’

‘অঙ্গুলিমাল ছিলেন এক দস্যু। সে শত শত মানুষকে হত্যা করেছিল। একবার ভগবান বুদ্ধ দেশ-পরিক্রমায় এসেছেন কোশল নগরে। নগরবাসীর কাছে প্রচার করছেন তঁার উপদেশ। বেশ কয়েক দিন পর বললেন, আমি এবার যাব কৌশাম্বীতে। সেখানে সবাই আমার জন্য প্রতীক্ষা করছে।

সকলে বলে উঠল কেমন করে সেখানে যাবেন প্রভু। কৌশাম্বী যাবার পথে যে জঙ্গল সেখানেই ভয়ংকর দস্যু অঙ্গুলিমালের আস্তানা। পশুর চেয়েও হিংস্র। ওই পথে যে যায় তাকেই সে খুন করে। তারপর হাতের আঙুল কেটে মালা করে গলায় পরে। সম্রাটের সৈন্যবাহিনীর লোকজনও তার কোনো ক্ষতি করতে পারেনি।

গৌতম বুদ্ধ বলে উঠলেন, তাহলে তো আমাকে তার কাছে যেতেই হবে।

শিষ্যরা বলল, ওইরকম একটা নরদানবের কাছে আপনার কীসের প্রয়োজন ?

‘আমার বেশি প্রয়োজন সেইসব মানুষদের যারা অসুস্থ।’

সকলে সমস্বরে প্রতিবাদ করে, অঙ্গুলিমাল আমাদের চেয়ে সুস্থ, শক্তিশালী।

মৃদু হাসলেন বুদ্ধ। আমি দেহের সুস্থতার কথা বলিনি। অঙ্গুলিমালের অসুখ তার মনে। তাই সে জীবনের স্বাভাবিক বোধ বুদ্ধিকে হারিয়ে ফেলে এমন হিংস্র হয়ে উঠেছে।

‘তার এই অসুখ কেমন করে সারাবেন ?’ প্রশ্ন করে শিষ্যরা।

বুদ্ধ বললেন, আমার প্রেম দিয়ে, করুণা দিয়ে, অন্তরের ভালবাসা দিয়ে।

হাজি খান প্রশ্ন করেন, তারপর কী হল ?

হিউ-এন-সাঙ বললেন, রাজা প্রসেনজিতের বিরাট সেনাবাহিনী যাকে পরাজিত করতে পারেনি, গৌতম বুদ্ধের প্রেমে সেই অঙ্গুলিমাল হয়ে উঠল এক পরম মানবপ্রেমী।

বেলা গড়িয়ে চলে। ধীরে ধীরে রাত নামে। দু-দিন মরুদ্যানে হাজি খানের কুটিরে বিশ্রান নেন হিউ-এন-সাঙ।

হাজি খান বলেন, আপনি আর কয়েকটা দিন এখানে থেকে যান।

হিউ-এন-সাঙ বললেন, আমাকে এখনও বহু পথ যেতে হবে। মন চাইলেও থাকা সম্ভব নয়। আমি কালই হামির উদ্দেশ্যে রওনা হতে চাই। পথের প্রয়োজনীয় জলটুকুর ব্যবস্থা করে দিলে ভালো হয়।

হাজি খান বললেন, আপনি বিশ্রাম নিন। আমি আপনার প্রয়োজনীয় সব কিছুর ব্যবস্থা করছি।

রাতের আকাশে তারা ফুটতেই রওনা হলেন হিউ-এন-সাঙ। পাশে সঙ্গী ঘোড়া। রাত কেটে যায়। আবার সেই দাবদাহ সূর্যের তাপ। এক এক সময় মনে হয় পা দুটো আর চলতে চাইছে না। থমকে গিয়েছে শরীর। ভগবান বুদ্ধের নাম করে আবার এগিয়ে চলেন। দিন ফুরিয়ে অন্ধকার হয় চারদিক। ঘোড়ার পিঠের ওপর হাত রাখেন হিউ-এন-সাঙ। আর তোকে কষ্ট করতে হবে না। কাল সকালেই আমরা হামিতে পৌঁছে যাব। তখন তোর বিশ্রাম।

সমস্ত রাত এগিয়ে চলেন হিউ-এন-সাঙ। সকাল হতেই দূরে আবছা ছায়ার মতো চোখে পড়ল হামির মরুদ্যান। হাজি খানের মুখে শুনেছিলেন হামির মরুদ্যান একটা বড়ো গ্রামের মতো। কয়েক-শো মানুষ এখানে বাস করেন। মনে মনে নিশ্চিত হলেন হিউ-এন-সাঙ, দুপুরের আগেই হামির মরুদ্যানে পৌঁছে যাবেন।

সকল অধ্যায়
১.
গভীর গহন এক রাত
২.
আলোর পথে
৩.
প্রথম সকাল
৪.
রাত্রি শেষ
৫.
যাত্রা হল শুরু
৬.
সীমান্ত পথ
৭.
মৃত্যু উপত্যকা
৮.
মরুদ্যান
৯.
হামি
১০.
তুরফান
১১.
কুচা
১২.
বরফের দেশে
১৩.
ইশিক কুল
১৪.
সমরখন্দ
১৫.
লৌহকপাট
১৬.
বামিয়ান
১৭.
গান্ধার
১৮.
ছায়াগুহা
১৯.
পুরুষপুর
২০.
তক্ষশীলা
২১.
কাশ্মীর
২২.
শাকল
২৩.
জলন্ধর থেকে কুলু
২৪.
মথুরা
২৫.
কান্যকুব্জ
২৬.
অযোধ্যা থেকে কৌশাম্বী
২৭.
প্রয়াগ
২৮.
শ্রাবস্তী
২৯.
কপিলাবস্তু
৩০.
লুম্বিনী
৩১.
কুশীনগর
৩২.
বারাণসী
৩৩.
সারনাথ
৩৪.
বৈশালী
৩৫.
মগধ
৩৬.
শীলভদ্র বিহার
৩৭.
গয়া
৩৮.
বুদ্ধগয়া
৩৯.
বোধিবৃক্ষ
৪০.
মহাভিক্ষুণী
৪১.
রাজগৃহ
৪২.
মানসলোক
৪৩.
নালন্দা
৪৪.
ভারত পরিক্রমা
৪৫.
আবার নালন্দা
৪৬.
শরণাগত

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%